স্মৃতি

উলানিয়া উপাখ্যান: ডিসেম্বর ১৯৭০

মীর ওয়ালীউজ্জামান | 27 Dec , 2007  

ulania.jpg ২৮ নভেম্বর ১৯৭০। চরফ্যাশন-লালমোহনে ১২ নভেম্বরের ‘গর্কি’-র ছোবলে বিক্ষত উপকূল আর বেঁচে যাওয়া স্বল্পসংখ্যক মানুষদের হাল সরেজমিনে দেখে ফিরে এসে আমি ‘দ্য ইয়াং ট্রিও’-র নৌকা দ্বিতীয় সফরের জন্য সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছি। আসলে হয়েছিল কী, প্রথমবারে নিয়ে যাওয়া রিলিফের একাংশ কেবল আমরা বিলিবিতরণ করতে পেরেছিলাম ওই জনবিরল চর এলাকায়। কাজেই এবারে রসদ তেমন লাগবে না। কেবল খাবার-দাবার এবং লেপকম্বল কিছু নিতে হবে আর গৃহস্থালীর জিনিশপত্র বেশি করে নেয়া। আর হ্যাঁ, বাড়ি তৈরির জন্য টিন নিতে হবে। দুই পকেটে টাকা ভর্তি করে নিয়ে মজনু ভাই ও আমি একদিন বুড়িগঙ্গার ওপারে টিনের আড়তে গিয়ে রানিমার্কা টিন কিনে, নৌকা বোঝাই করে, এপারে রাখা লঞ্চে রেখে এলাম। সদরঘাট এলাকায় গেলে আমরা কাজশেষে বাংলাবাজার চৌরাস্তায় মেহেরবান রেস্তোরাঁয় মাটন বিরিয়ানি চেখে ফিরতাম। সাব্যস্ত হয়েছে, এযাত্রায় আমি টিম লিডার, মজনু ভাই ডেপুটি আর শামীম ভাই উপদেষ্টা হিসেবে ক্যাম্প পরিচালনা করবো।

ডিসেম্বরের শুরুতে এক সন্ধ্যায় আমরা সদরঘাট থেকে যাত্রা করলাম। পরদিন বিকেল নাগাদ গলাচিপা পেরিয়ে, উলানিয়া বাজার থেকে একটু আগে লঞ্চ বাঁধা হল। পাড়ে নেমে সবুজ ঘাসে ঢাকা সমতলের শেষে খোয়া বাঁধানো গ্রামসড়কের ধার ঘেঁষে উলানিয়া উচ্চবিদ্যালয়। গাফফার ভাই—দৈনিক পূর্বদেশের আব্দুল গাফফার চৌধুরীর বাড়ি নাকি এখানেই, শোনা ছিল। অতএব উলানিয়ার সঙ্গে আমার আত্মিক যোগাযোগ একরকমের হয়েই ছিল, মনে হল। দ্রুত চা-বিস্কুট খেয়ে আমরা কজন স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ সারতে বের হলাম। টিমকে কড়া নির্দেশ দিলাম, নিচে নেমে সামনের মাঠে পায়চারি করতে পারবে যার ইচ্ছে, কিন্তু এই সীমানা পেরোতে টিম লিডার অথবা ডেপুটির অনুমতি নিতে হবে। কেউ একা নিজ দায়িত্বে কোথাও যাবে না, কোনো গ্রামবাসীর সঙ্গে কোনো রকম মৌখিক চুক্তি বা আশ্বাস দেবার বিষয়ে স্থায়ী নিষেধ মেনে চলবে। এর অন্যথা হলে ক্যাম্প নেতৃবৃন্দ যে সাজা দেবেন, তা মাথা পেতে নিতে হবে। শৃঙ্খলাবিধান এই ক্যাম্পের প্রথম উদ্দেশ্য, দ্বিতীয়, তৃতীয় ইত্যাদি সকল প্রাধিকার থাকবে ত্রাণকর্মের জন্য তোলা।

স্কুলবাড়িটা বেশ বড়ো, পুরনো দিনের দোতলা, শক্ত ভিতে দাঁড়িয়ে। জমিদার বাড়ি ছিল হয়তো। পুরনো সকল কিছুর প্রতি আমি এক অজানা কিন্তু অদম্য টান অনুভব করি। আধমাইলটাক হেঁটে, উলানিয়ার ধ্বস্ত বাজারে পৌঁছলাম। বেশির ভাগ দোকানের ভিত পাকা, তার ওপর টিনের একতলা, দোতলা বাড়ি ছিল। সামনে দোকান, ভেতরে উঠোন, বসতবাড়ি, গোলাঘর, গোয়াল ইত্যাদি। অধিকাংশ স্থাপনা ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড়ে (যাকে স্থানীয়রা বলেন ‘গর্কি’) উড়েঝুরে গেছে, একটি-দুটি দালান ঠিকঠাক রয়েছে। ইউনিয়ন কাউন্সিল ভবনটি একতলা, সামনের বারান্দায় চায়ের দোকান। যেমন-তেমন করে হতশ্রী ছাপড়াটি আবার তোলা হয়েছে। নড়বড়ে বেঞ্চে বসে, চা দিতে বলে, বাজারের মানুষজনের সঙ্গে আলাপ জমালাম। উদ্দেশ্য, ঘূর্ণিঝড় পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অবস্থান আঁচ করা। মোটামুটি জানাশোনা হল। চেয়ারম্যান ও দুজন মেম্বারের সঙ্গেও আলাপ হল। ওরা বললেন, আমরা ইচ্ছে করলে স্কুলের দোতলায় দুটো ঘরে থাকতে পারি। কথাটা মাথায় থাকল। কয়েকদিনের মধ্যে জামিল ভাই ঘরবাড়ি তৈরির জন্য আরো টিন, কাঠ ও অন্যান্য সরঞ্জাম ভর্তি আরেকটি নৌযান পাঠাবেন। দরকার হলে স্কুলে জিনিশপত্র রাখা যাবে, প্রয়োজনে দাপ্তরিক কাজেও ওই জায়গা ব্যবহার করা যাবে।

বারণ করা সত্ত্বেও, চেয়ারম্যান, মেম্বাররা আমাদের এগিয়ে দিলেন স্কুল পর্যন্ত; কথা রইল, পরদিন সকাল ন’টা নাগাদ আমরা বাজারে ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে পৌঁছব এবং কাজ শুরু করবো। আমাদের কর্মপরিকল্পনার আভাস পেয়ে স্থানীয়রা উৎফুল্ল, আশান্বিত। খেয়ে-দেয়ে আমি ও শামীম ভাই আমাদের ক্যাবিনে ঘুমোতে গেলাম।

সকালে নাস্তা সেরে আমরা যথারীতি বাজারে পৌঁছে ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে হাজির হলাম। চেয়ারম্যান-মেম্বাররা আগে থেকেই উপস্থিত ছিলেন। দেখে ভাল লাগল। এখানে কাজ করা যাবে। ঘন্টাখানেক আলাপ আলোচনা সেরে আমরা সরল একটি বিলিবিতরণ নীতিমালা তৈরি করে সেটার কার্বন কপি চেয়ারম্যানের দপ্তরে নোটিশ বোর্ডে সেঁটে দিলাম। সবাই পড়ুক, জানুক, কীভাবে এখানে ত্রাণ কর্মসূচি পরিচালিত হবে।

সবার আগে বাজার পুননির্মাণের কাজ শুরু হবে। সর্বার্থেই আবার তৈরি করা, অর্থাৎ ব্যবসা কেন্দ্র ও বাজার লাগোয়া জনপদের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। বহুমুখী ঝামেলার কাজ—নানারকম মানুষের বিভিন্নমুখী দাবি-দাওয়ার কথা শুনতে হবে, যথাসম্ভব মেটাতে হবে।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এধরনের নানারকম জনসেবামূলক কাজে অংশগ্রহণের মাঝেই কেটেছে। আমরা সবকিছু আড্ডার মেজাজে উতরে দিতাম। লাভও তাতে কম হয়নি। আলাপ, জানাশোনার পরিধি বেড়েছে, লোকচরিত্রের বৈচিত্র্য বিষয়ে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরেছে, আত্মবিশ্বাসে ঋজু হয়েছে।

শুরু হল উলানিয়া মহাযজ্ঞ। একদিকে দোকানবাড়ির মালিক পরিবার ও ঘরামি-মিস্ত্রির সহায়তায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী যুগিয়ে, ঘরবাড়ি তোলার কাজ শুরু হয়েছে। আমাদের ক’জনের প্রধান কাজ হল সমন্বয়, সরবরাহের যোগান অব্যাহত রাখা এবং স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। কোনো ভুলবোঝাবুঝি, অভিযোগের জন্ম দেয়া অথবা টিমের কারো কর্তব্যে অবহেলার কথা কানে এলেই শামীম, মজনু অথবা আমি ছুটে যাই, ঘটনার চুলচেরা তদন্তশেষে তাৎক্ষণিক সমাধান বাতলাই।

যে ব্যাপারটা খুবই মনোগ্রাহী হয়েছিল, সেটি হল, স্থানীয় মানুষের সহনশীলতা, ভদ্রতা ও কাজে সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহ—তা সে ত্রাণ বিলির সময়ে হোক বা আঁধার রাতে কীর্তনের আসরে কুড়ি কুড়ি কাপ গুড়-চা করে সকলকে খাওয়ানোর ব্যাপার হোক—সব কিছু ঘিরেই আমরা উলানিয়ার মানুষজনের মনের উষ্ণতা, সেবাপরায়ণতা আর ধৈর্য্যরে প্রমাণ পেয়েছি, কৃতজ্ঞ বোধ করেছি। কষ্ট করে ওদের বোঝাতে হয়নি যে এলাকার দ্রুত উন্নতি তথা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হবে সর্বাগ্রে বাজারটা পুরোপুরি চালু হলেই। ওরা বিশ্বাস করেছিল, আমরা সত্যিই ওদের এলাকা পুনর্গঠনে লাগাতার সহায়তা দিয়ে যাবো। আমাদেরও অন্ততঃ বিশ্বাস সেরকমই ছিল। মানুষের বিশ্বাস, ভরসার পাত্র হয়ে ওঠা—এই আবেগ আমাকে মথিত করত, বিশেষ করে রিলিফের কাপড় নিয়ে কোনো একদা স্বচ্ছল বর্ষীয়সী মা যখন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন, তখন মানুষের খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষমতা আমাকে আপ্লুত করত, সার্থক মনে হত দিনরাতের ওই ব্রত পালন করে যাওয়া—যার কোনো স্পষ্ট লক্ষ্য বা কারণ আমরা কখনো তেমনভাবে খুঁজিনি। আলাদা করে ভাবার সময়ও হয়নি তখন।

টিমের সদস্যদের প্রায় সকলেই ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বাইরের এক-দ’ুজনের মধ্যে একজন ‘আদুভাই’ ছিলেন কর্মজীবী ছাত্র। দিনে করনিক-রাতে ল’ কলেজে নাম লিখিয়ে অনায়াসে এলএলবি ডিগ্রীটা তুলে নেবার মহড়া দেয়া। উনি মজনু ভাইয়ের পাড়াতুতো বন্ধু, গোপীবাগেই বসবাস। এর বেশি কিছু আমরা জানতাম না, জিজ্ঞেসও করিনি।

উলানিয়া বাজারে নানাপেশার ব্যবসায়ীর বসত। কামার-লোহারের সঙ্গে কর্মকারও ছিল কয়েকঘর। এদেরই মাঝে একটি পরিবারের সঙ্গে আমাদের ওঠাবসা নিয়মিত হতে হতে আত্মজনের সঙ্গে যেমন হয়, তেমনি ঘনিষ্ঠ এবং ঘরোয়া হয়ে উঠেছিল। কর্মকার সোনার অলঙ্কার গড়তেন। ১২ নভেম্বরের ঝড় তার দোতলা টিনের বাড়ি কাম ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাকা ভিত আর লোহার খুঁটি ক’টি রেখে বাকি সবই উড়িয়ে নিয়েছিল। দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া ক’টা টিনের টুকরো ওরা খুঁজে পেতে এনে জড়ো করে রেখে, খোলা আকাশের নিচে উঠোনের বেলতলায় কোনোক্রমে বাস করছিলেন। বাজারের অন্যান্য বাসিন্দাদের মতো কর্মকার পরিবারের জন্যও টিনের ঘর তৈরি শুরু হল। ইতোমধ্যে একপ্রস্থ পরিধেয় পৌঁছে দেয়া হয়েছে সকলকে। দেয়া হয়েছে চাল-ডাল, লেপ-কম্বল ও সংসারের অন্যান্য সরঞ্জাম। স্বেচ্ছাসেবক দলের অন্তরঙ্গ ব্যবহারে ত্রাণগ্রহীতা কেউ কেউ ত্রাণসামগ্রী পছন্দমতো বদলে নিতেও আসছিলেন। ভিড় না থাকলে আমরা গ্রামীণ মানুষের ওরকম আবদার রক্ষাও করেছি।

একদিন আমি বাজারে কর্মকারের পাশের বাড়িতে গেছি ঘরতোলার কাজ দেখতে। বাড়ির গিন্নী চা-বিস্কুট খেতে দিয়ে বল্লেন, ‘বাবা, এখানে আপনাদের একটা সম্মানের জায়গা তৈরি অইছে। আপনারা কাজ করিয়া সেইডা পাইছেন। কিন্তু আপনাগোর মইদ্যে কেউ কেউ আবার আপনাগো মতো না—গেরামের চ্যারম্যান-মেম্বারের মতোন আকাম করতাছে। হেইদিকে আপনে চোক রাইখেন। নাইলে বদনাম করবো মানুষে। দ্যাশের মানুষ তো বালা না, বোজলেন?’

‘হ্যাঁ, বুঝলাম, তবে দেশের মানুষকে কুকথা বলার সুযোগ যদি আমি করে দিই, তাহলে তাদেরই দোষ দেবেন কী করে?’ বলে আমি কর্তব্য ভাবতে থাকি। আচ্ছা, ‘আপনি কি জানেন অন্যরকম ব্যাপারটা ঠিক কী হয়েছে?’

‘দূর বাবা, ওয়া দেহি নাই মুই, হুনছি। আপনাগো লঞ্চের থাইকা ইনবার্সিটির ছাত্র একজন শাড়ি আইন্যা দিছে ওই কর্মকারের হোন্দরী মাইয়া দুইডারে,’ বলে মহিলা পানসুপারি মুখে দেন।

‘ঠিক আছে, আর কাউকে আপনি এ বিষয়ে কিছু বলবেন না, কেমন?’ অনুরোধ জানিয়ে আমি উঠি। পরিদর্শনের কাজ সেরে ভরদুপুরে লঞ্চে ফেরত যাই। আগের দিনের সাঁঝে নামানো খেজুর রসের হাঁড়ি ছাদে রোদে খানিকটা গেঁজিয়ে তখন ডেইটপাম বিয়ারের গুণ অর্জন করেছে। তাই গ্লাস দু’য়েক মজনু ভাই আর শামীম ভাইয়ের সঙ্গে বসে পান করি আর কর্মকারের বাড়ি সংক্রান্ত রিলিফ সমস্যা আলোচনা করি। ‘তুই ভাবিস না, খেতে বসে আমি কথাটা তুলব সবার সঙ্গে আর অপরাধী শনাক্ত করে দেব। শাস্তিবিধান তোমার কাজ হবে। ওকে?’ বলে মজনু ভাই রোদে গা তাতিয়ে নিচে যায় স্নান করতে। শামীম ভাই তখন চোখ বুঁজে সারেং কেবিনে হেলান দিয়ে বসে রবীন্দ্রসংগীত গাইছেন।

খাবার টেবিলে মজনু ভাই কৌশলে স্বীকারোক্তি আদায় করে। সেই কায়েদে আজম ল’ কলেজের আদুভাই সরলভাবে বললেন, দীপালি আর অঞ্জলি ওদের শাড়ি দু’টো বদলে নিতে চায়, উনি সেই শাড়ি ওদের বাড়ি পৌঁছে দিয়েছেন। এতে কোনো গুরুতর নিয়মভঙ্গ ঘটে থাকলে উনি ক্যাম্প কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত সাজা মাথা পেতে নেবেন। আমি মনে মনে মজনু ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ বোধ করি। একটা বোঝা নেমে গেল যেন। আর, টিমের অন্যান্য সদস্যরাও এতে একটুখানি হলেও সাবধান হবে।

বিকেলে চা খেয়ে নিত্যকার ‘মিট দ্য পিপল’ কর্মসূচি বাস্তবায়নে টিমের সকলে বেরোবে। একত্রিত দলকে আমি সংক্ষেপে জানালাম, আদুভাই এখন থেকে লঞ্চে থাকবেন এবং সকাল ও বিকেলে ক্যাম্পের দাপ্তরিক কাজগুলো সারবেন। হিসাবপত্র, বাজারের বিল পরিশোধ, রিলিফ স্টকের হালনাগাদকরণ ইত্যাদি যেসব কাজ এতদিন আমি-শামীম-মজনু করে এসেছি, সে দায়িত্ব এখন থেকে আদুভাই পালন করবেন। ক্যাম্প পরিচালকেরা অবশ্যই এ কাজে তাকে সহায়তা দেবেন। একই সঙ্গে জানালাম, কর্মকারের বাড়িতে কারো যখন-তখন যাওয়া আর চলবে না। দুর্নাম এড়িয়ে চলা ভাল, এমত অটো সাজেশন উচ্চারণ করে দল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ফেরার সময় সবাই বাজারে ইউনিয়ন অফিসে নির্ধারিত সময়ে একত্রিত হবে, একসঙ্গে মার্চ করে গণসঙ্গীত গাইতে গাইতে ফেরা হবে।

দিন কুড়ি পরে প্রায় দু’শো বাড়ি-দোকানঘর তৈরি হবার পর উলানিয়া বাজার যখন আবার মোটামুটি জমেছে, ব্যবসা বাড়ছে, ঘাটে মালামাল নিতে, সরবরাহ করতে যখন নৌকো ভিড়ছে, স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা সংক্ষেপে সারা হয়েছে এবং জমে থাকা রিলিফ বিতরণ প্রায় শেষ পর্যায়ে—তখন আমরা একদিন চেয়ারম্যান ও অন্যান্য মাতব্বরদের জানালাম, ডিসেম্বরের কাজ আপাতত শেষ এবং আমরা জানুয়ারিতে ফিরে নিকটতম দু’টি গ্রামে কাজ করবো। অবশ্য ভলান্টিয়ার না পেলে একসঙ্গে দুই গ্রামের কাজে নামবো না, এটাও জানিয়ে রাখলাম। চেয়ারম্যান ও হেডমাস্টার আবদার করলেন, আমাদের ক্যাম্পকে ওরা সম্বর্ধনা-সম্মাননা জানাবে। স্কুলবাড়িতে এক সাদাসিধে অনুষ্ঠান হবে। সবাই তাতে খুশি। ক্যাম্প ও বাজারের সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হোক প্রস্তাব করলাম। খরচের বেশিরভাগ ক্যাম্প বহন করবে। খরচ শেয়ার করার ব্যাপারে গাঁইগুঁই করলেও চেয়ারম্যান অবশেষে রাজি হলেন।

জানুয়ারির কাজের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে আমরা বাজারে ও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবার সাথে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতের প্রয়োজন সম্পর্কে বিশদ জানতে চেষ্টা করলাম। ফলে, রিলিফ উপকরণের তালিকা দীর্ঘতর হল। তুলনামূলকভাবে কম দরকারী জিনিস বাদ দেয়া হল। এরপর নিকটবর্তী কয়েকটি গ্রাম পরিদর্শন, গর্কি ঘটিত ক্ষয়ক্ষতি আন্দাজ করে ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী যাত্রায় কোথায় কাজ হবে, সে বিষয়ে গৃহীত পরামর্শ ও সিদ্ধান্তসমূহ নথিবদ্ধ করা হল।

যাবার দিন ঘনাল। সংবর্ধনার দিনে সকালে সবাই স্কুলে একত্রিত হবে। দিনভর গানবাজনা, খাওয়াদাওয়া, আলাপ শেষ করে সন্ধ্যায় আমরা লঞ্চ ছেড়ে ফেরত যাবো, ঠিক হল। গত ক’দিনে আদুভাই একেবারে নিজের মধ্যে গুটিয়ে গেছেন, আমি বুঝতে পারছিলাম। উনি আমাদের ক’জনকে এড়িয়ে চলছেন। লঞ্চে বসে কাজকর্ম করছেন ঠিকই, তবুও আদুভাই যেন ওখানে থেকেও নেই। ভাবছিলাম, যাবার দিন সকালে ওর ওপর জারি করা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবো। ভাবনার সমর্থনে যখন সেই বয়স্কা মহিলা, যিনি ঐ অঞ্জলি-দীপালির শাড়ি বদলানোর কেচ্ছাটি আমার কানে তুলেছিলেন, তার কাছ থেকেই অনুরোধ এল। আমি অপার বিস্ময়ে সে সন্ধ্যায় ডেটপাম বিয়ার পান করেছিলাম গেলাসের পরিবর্তে হাঁড়ি উপুড় করে।

সবার বাড়িতে যেমন যাচ্ছিলাম, তেমনি এক বিকেলে কর্মকার বাড়িতে গল্প সেরে বিদায় নিয়ে পাশের বাড়িতে গিয়েছি। গিন্নি যথারীতি আমাকে মোড়া দিলেন বসতে, নিজে বসলেন পানের বাটা কোলে। ‘শোনেন বাবা, আপনাগো কাজ কাম আর নিয়মকানুন লইয়া হগ্গলে বালা কইতেছে। তয় একটা কতা মুই কমু আপনারে, কতাডা রাকবেন?’ মহিলার কন্ঠে আকুতি। ‘আপনি বলেন, আমার সাধ্যে যতদূর সম্ভব অবশ্যই করব।’ চায়ের কাপ হাতে নিলাম। ‘আপনাগো যাওনের দিনে আমরা বাজারের হগ্গলে ইস্কুলে যামু, খাওয়াদাওয়া করমু, আমোদ করমু সারাদিন। তাই কই, ওই দিনের জইন্য সেই মানুষডারেও হগ্গলের লগে মিলতে দ্যান, কতা কইতে দ্যান। অনেকদিন শাস্তি অইয়া গ্যাছে। নাকি কন?’ করুণমুখ মায়ের মতন মহিলাটির দিকে আমি অপলক তাকিয়ে রইলাম। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম, ‘তাই হবে, আমি ভদ্রলোককে আপনার কথা বলব, ঠিক আছে?’ ভদ্রমহিলার ফর্সা মুখ লাল হয়। ‘না না বাবা, আপনে আমারে না করছিলেন, আমি আর কেউরে ওই বিষয়ে কিচ্ছু কই নাই। আপনেও কাউরে কিছু কইয়েন না, কেমন?’ ‘ঠিক আছে,’ বলে উঠলাম, আপনমনে হেঁটে ফিরলাম লঞ্চে।

শেষ হয়ে আসছে দিন। আঁধার ঘনায়। আমি ঝোলা থেকে ফ্ল্যাশলাইট বের করি। গ্রামাঞ্চলে গেলে আমার এই একটি ব্যাপারে অস্বস্তি হয়, সাপ। যদিও শীতে সাপ বেরোয় না। ঘুমোয় নাকি পড়ে পড়ে—আমার তেমন ভরসা হয় না। তাই রাতে আলো জ্বেলে পথ চলা। এতে অবশ্য হোঁচট খাওয়া থেকেও বাঁচা যায়। ছেলেবেলায় মফস্বলে বেড়াতে গিয়ে আকাশের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে হাঁটতে গিয়ে বহুবার পায়ে চোট লেগেছে, নখ ভেঙে গেছে, আঙুলে পট্টি জড়িয়ে ঢাকায় ফিরেছি। উলানিয়া হাইস্কুল আর ঘাটে বাঁধা লঞ্চ—এর মাঝে মস্ত সমভূমি সবুজে ঢাকা—পরবর্তী জীবনে নানা দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক প্রতিবেশে হেঁটেছি। ওই উলানিয়া স্কুলের সবুজ মাঠ, যা কিনা একেবারে নদী পর্যন্ত বিস্তৃত, সমতল—স্মৃতির ঘরে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে।

যে সন্ধ্যায় আমাদের যাবার কথা, সেদিন সকাল থেকে বাজার ও নিকটবর্তী গ্রামের মানুষ রিলিফে পাওয়া পোশাকাদি পরে, কেউ কেউ মাথায় মেলার পশরা নিয়ে, চেয়ারম্যান -মম্বাররা তাদের জনকল্যাণের ব্রত সঙ্গী করে স্কুলবাড়িতে সমবেত হচ্ছিল। আমরা সেদিন সবাই আলসেমি করে একটু দেরিতে উঠছি, একে একে, একজন দু’জন যেমন তৈরি হয়ে খাবার জায়গায় পৌঁছুচ্ছে, লঞ্চের বাবুর্চি-খানসামারা তেমনি তাদের গরম নাশতা পরিবেশন করছে, ধীরেসুস্থে। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। প্রশান্ত নিরবচ্ছিন্ন নীলাকাশ, মেঘের লেশমাত্র নেই, নদীর জলে ছোট ছোট ঢেউ ভাঙছে। মাসখানেক আগের সেই ভয়ঙ্কর গর্কি তখন দূরের দুঃস্বপ্ন প্রায়। আশ্চর্য উলানিয়ার মানুষের জীবনতৃষা। জীবন সংগ্রাম এদের প্রায় সারা জীবনের সঙ্গী—অনেকেরই—অধিকাংশেরই। এই কদিনেই জেনে গিয়ের্ছিলাম, বাজারের দু’চারজন বড় ব্যবসায়ীর কেবল ব্যাংক একাউন্ট রয়েছে। বাকি সকলের প্রায় সব সম্পদ তাদের হাতের নাগালেই থাকে, যার সবটাই প্রায় গর্কির ছোবলে হারিয়ে গেছে। নাশতা খেতে বসে আদুভাইকে ডেকে পাঠালাম। ‘আপনি আজ ঐ উৎসবে নিমন্ত্রিত, অতএব এখন থেকে যাবার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আপনি ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াতে পারেন। আমার তরফ থেকে আর কোনো নিষেধ রইল না।’ আমার কথা শেষ হতে আদুভাই একই রকম নিরাসক্ত মুখে বললেন, ‘আমি আপনার সঙ্গে থাকব সারাক্ষণ, অবশ্য এতে যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।’ অবাক আমি সোল্লাসে বলে উঠলাম, ‘ইউ আর মোউস্ট ওয়েলকাম। নাথিং ক্যান বি এনি বেটার দ্যান দিস্ অ্যারেঞ্জমেন্ট। চলেন, স্নান সেরে নিচে যাই।’

স্কুলের ফটকে পৌঁছতেই চেয়ারম্যান এবং হেডমাস্টার মশাই এগিয়ে এসে করমর্দন করলেন। একসঙ্গে হেঁটে গিয়ে বারান্দায় রাখা চেয়ারে বসলাম। বেশিক্ষণ একজায়গায় বসে থাকতে প্রাণ চায় না, যদি হাতে কোনো বই খোলা না থাকে। কাজেই এরকম গ্রামীণ মেলায় যেখানে প্রায় সবাই আমার পরিচিত, বসে থাকবো কী করে ? অতএব আদুভাইকে সঙ্গে নিয়ে আমি ঘুরে ঘুরে রান্নার আয়োজন, মেলার পশরা, মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা, খোঁজখবর নেয়া, সহায়তা করা, একটু এগিয়ে দেয়া—ইত্যাকার স্বেচ্ছাসেবা পরিবেশন করে গেলাম সারাদিনমান। এরি মাঝে, ফাঁকে ফাঁকে, গ্রামবাসীদের গানের আসরে গলা মেলানো, লঞ্চে উঠে ছাদে রাখা খেজুর রসের গ্যাঁজানি পান, চমৎকার ভর্তা-চচ্চড়ি শুক্তো-ঘন্ট-ঝালে-ঝোলে-অম্বলে গড়ানো দুপুরে খাওয়া, খাবার সময়ে এর-ওর পাতে এটা-ওটা তুলে দেয়া, তেমনি অন্যপাতের মাছভাজা নিজের পাতে এসে পড়া—খাবার পর গল্পগাছা সবই হয়েছে।

ভাল কেটেছে দিন। মন ভরে গেছে। আরও ভাল লাগছিল দেখে আদুভাইকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ক্রমশঃ আমার সঙ্গী হিসেবে সবকিছুতে সানন্দে গিয়ে মিলছিল, গান গাইছিল, এমনকি অঞ্জলি-দীপালিদের সঙ্গেও হেসে সহজভাবে কথা বলেছে—আমি ক্যাজুয়ালি ঘুরে বেড়ালেও আদুভাইকে দেখে আমার মন অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠছিল। বার দু’বার অভিনন্দনও জানিয়েছিলাম বোধকরি নিজেকে নিজেই।

এবার কেবল ঢাকায় ফেরা।

mir.waliuzzaman@bdnews24.com


1 Response

  1. ফয়সল নোই says:

    লেখাটি আমাকে আলোড়িত করেছে।আমার বাড়ি চরফ্যাশন।এই ঝড়ে আমাদের পরিবারেরও কয়েক জন সদস্য মারা যান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.