অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 1 Feb , 2015  

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৫

সেই সময় থেকে নিজের ঈশ্বর বিশ্বাসের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়ে আর কখনই তার সঙ্গে দেখা করতে না গিয়ে সম্পূর্ণরূপে গির্জা তৈরীতে আত্মনিয়োগ করেন ফাদার যাতে করে সেটা দ্রুত শেষ হয় । রেবেকা নতুন করে আশার আলো দেখতে পায় । এক রোববার যেদিন ফাদার নিকানোর বাড়িতে একই টেবিলে বসা বাড়ির অন্যান্য সকলের সঙ্গে সকালের নাস্তা সারছিল, আর গির্জা তৈরী শেষ হবার পর ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো কি রকম ধর্মীয় আড়ম্বর ও জৌলুশপূর্ণ হবে এই নিয়ে আলাপ করছিল, সেদিন থেকেই রেবেকার ভবিষ্যৎ ছিল গির্জা তৈরী শেষের সঙ্গে শর্তাধীন । “সবচেয়ে ভাগ্যবতী হবে রেবেকা”– বলে আমারান্তা । আর যেহেতু রেবেকা বুঝতে পারেনি তার কথার গুঢ় অর্থ সেহেতু এক সরল হাসি দিয়ে ব্যাখ্যা করে – “বিয়ের মধ্য দিয়ে গির্জাটাকে উদ্বোধন করতে হবে তোকে” রেবেকা মন্তব্য শোনার আগেই বলতে চেষ্টা করে । “যে গতিতে গির্জা নির্মাণ কাজ এগোচ্ছে তাতে দশ বছরের আগে ওটা শেষ হবে না” । ফাদার নিকানোর একমত হন না; ক্রমবর্ধমান বিশ্বাসীদের বদান্যতার ফলে সময়ের হিসাবটা আরও আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় তার । অপমানিত রেবেকা কিছু না বললেও নাস্তা শেষ করতে পারে না । ফলে উরসুলা আমারান্তার প্রস্তাবটার সঙ্গে একমত হয়ে গির্জাটা তাড়াতাড়ি শেষ করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করে । ফাদার নিকানোর হিসেব অনুযায়ী এরকম আরও একটা সাহায্য অন্য জায়গা থেকে পেলে গির্জার কাজ তিন বছরের মধ্যেই শেষ হবে । আমারান্তা যে সরলতার ভাব দেখিয়ে প্রস্তাবটা করেছে আসলে তা ছিল না-বুঝতে পারার কারণে। ঐ সময় থেকে রেবেকা আর আমারান্তার সঙ্গে কথা বলে না । “এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কম খারাপ তোর জন্য” সেই বিদ্বেষপূর্ণ তর্কের রাতে আমারান্তা বলে- “ এতে করে পরবর্তী তিন বছর তোকে খুন করতে হবে না” । রেবেকা গ্রহণ করে তার এই চ্যালেঞ্জ । পিয়েত্র ক্রেসপি বিয়ের সময় পেছানোর নতুন এই খবরে হতাশায় ভোগে, কিন্তু রেবেকা তাকে বিশ্বস্ততার স্পষ্ট প্রমাণ হিসাবে বলে “যখনই তুমি বলবে আমরা পালিয়ে যাব”। পিয়েত্র ক্রেসপি দুঃসাহসিক কাজে পা দেবার লোক ছিল না । দয়িতার আবেগপ্রবণ স্বভাবের বিরোধিতা করে সে তার কথা রক্ষার ব্যাপারটাকে এমন এক সম্পদ বলে বিবেচনা করে যেটাকে অপচয় করা যায় না । সুতরাং রেবেকা আরও দুঃসাহসী উপায়ের আশ্রয় নেয় । যখন রহস্যময় এক বাতাস বৈঠকখানার বাতি নিভিয়ে দিত, উরসুলা চমকে যেত প্রেমিক প্রেমিকাদের অন্ধকারে চুমু খেতে দেখে । পিয়েত্র ক্রেসপি আধুনিক বাতিগুলোর নিম্নমান সম্বন্ধে এক অপরিণামদর্শী ব্যাখ্যা দিত, এমনকি বৈঠকখানায় উচ্চমানের আলোর ব্যবস্থার সাহায্যের প্রস্তাব করে সে । কিন্তু আবার জ্বালানীর সংকট ঘটত বা সলতে আটকে যেত আর উরসুলা রেবেকাকে পেত প্রেমিকের কোলে বসা অবস্থায়, ফলে উরসুলা আর কোন কৈফিয়তই গ্রহণ করত না । রুটি বানানোর কারখানার ভার আদিবাসীর হাতে ন্যস্ত করে দোলচেয়ারে বসে প্রেমিক জুটির উপর নজর রাখতো, আর তার কম বয়সেই সেকেলে হয়ে যাওয়া সমস্ত কায়দার কাছে যেন এই জুটির অভিনব পন্থা যাতে হার না মানে তা নিশ্চিত করতো । “বেচারী মা”, একঘেয়ে সাক্ষাতে হাই তুলতে দেখে ব্যাঙ্গ করে বলে রেবেকা – “মৃত্যুর পরও রেহাই পাবে না এই দোলচেয়ারে বসার শাস্তি থেকে”। তিনমাস নজর রাখা প্রেমে আর গির্জার নির্মাণ কাজের ধীরগতিতে বিরক্ত হয়ে পিয়েত্র ক্রেসপি গির্জার কাজ শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় বাকি টাকাটা ফাদার নিকানোরকে দিয়ে দেয় । এতে করে অধৈর্য হয় না আমারান্তা । প্রতিদিন এমব্রয়ডারি করার সময় বান্ধবীদের সঙ্গে গল্প করতে করতে অথবা বারান্দায় সেলাই করতে করতে নতুন নতুন ফন্দী বের করতে চেষ্টা চালিয়ে যায় । সেটা ছিল গির্জা শেষ হবার দুমাসেরও কম সময় বাকি থাকতে । শোবার ঘরের আলমারীতে বিয়ের পোশাকের সঙ্গে রেবেকার ন্যাপথালিনগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু রেবেকা বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসায় এতই অসহিঞ্চু হয়ে পরে যে, আমারান্তার ভেবে রাখা সময়ের আগেই বিয়ের পোশাকটার সমস্ত আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি শেষ করার । আলামারী খুলে প্রথমে কাগজগুলো সরিয়ে লিলেনের আবরন খোলার পর পেল পোশাকের হেম, নেকাবের সেলাই এমনকি আসার (AZAHAR); ফুলের মুকুটটা পর্যন্ত মথে কেটে ধুলোয় পরিবর্তিত হয়েছে । যদিও রেবেকা নিশ্চিত ছিল যে, পোশাকটা মুড়ে রাখার সময় সে দুই মুঠো ন্যাপথালিন ঢুকিয়েছিল তবুও ঘটনাটা স্বাভাবিক দুর্ঘটনা বলে চিহ্নিত হবে মনে করে সে আমারান্তাকে দোষী করার সাহস পায় না । বিয়ের মাত্র এক মাস বাকী ছিল তখন । আম্পারো মসকতে এক সপ্তাহের মধ্যে এক নতুন বিয়ের পোশাক সেলাইয়ের অঙ্গীকার করে । এক বৃষ্টিঝরা দুপুরে যখন শেষবারের মত রেবেকার গায়ে লাগে কিনা তা দেখার জন্য, একঝলক গুড়ি বৃষ্টিতে আবৃত আমপারো ঘরে ঢোকে তখন আমারান্তার মূর্ছা যাবার উপক্রম হয় । বাকরোধ হয়ে আসে তার আর ঠান্ডা এক ঘামের সুতো নামে মেরুদন্ড বেয়ে।

সেই বিকেলে আমপারো হাজার আলপিন দিয়ে অসীম ধৈর্য সহকারে শরীরের চারপাশে সার্টিনের বর্ম তৈরী করায় রেবেকা যখন গরমে হাসফাস করছে, আমারান্তা তখন উলের বুনুনিতে কয়েকবার ভুল করে ফেলে । আঙ্গুলে সুচ ফোটায় কয়েকবার কিন্তু ভীতিকর শীতলতার সাথে সিদ্ধান্ত নেয় যে দিনটা হবে বিয়ের পূর্বের শেষ শুক্রবার আর, প্রয়োগ করা হবে কফির সাথে কয়েক ফোটা আফিমের আরক ।

যেমন অনতিক্রমণীয় তেমনি এক বিরাট বাঁধা বিয়ের দিনটাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দিতে বাধ্য করে । নির্দিষ্ট করা বিয়ের দিনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে ছোট্ট রেমেদিওস মাঝরাতে জেগে ওঠে তার অন্ত্রের মধ্যে মর্মান্তিক উদগীরণের মধ্য দিয়ে, বিস্ফোরিত এক গরম স্যুপের মধ্যে ভিজে জবজবে অবস্থায়, আর মারা যায় তিনদিন পর নিজের পরিবার প্রয়োগকৃত বিষপান করে, আর সঙ্গে মারা যায় তার পেটের মধ্যে আড়াআড়ি অবস্থায় থাকা এক জোড়া জমজ শিশু । আমারান্তা বিবেক দংশনে ভোগে । ঈশ্বরের কাছে সে প্রার্থনা করেছিল যেন এমন ভয়ংকর কিছু ঘটে যাতে করে রেবেকাকে বিষ খাওয়াতে না হয় আর ফলে সে রেমেদিওসের মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে । রেমেদিওস বাড়িতে নিয়ে এসেছিল এক পরশ আনন্দের দমকা হাওয়া । সে ঠাঁই নিয়েছিল কর্মশালার কাছেই এক শোবার ঘরে, যেটাকে সাজিয়েছিল তার সদ্য পার হওয়া শৈশবের খেলনা আর পুতুল দিয়ে, আর তার প্রাণবন্ত আনন্দময় শোবার ঘরের চার দেয়াল পেরিয়ে উপচে পড়ত বেগনিয়া-ঘেরা বারান্দায় এক স্বাস্থ্যময় দমকা হাওয়ার মত । ভোরবেলা থেকে আরম্ভ করত গান গাইতে। একমাত্র সে-ই সাহস করেছিল রেবেকা আর আমারান্তার বিরোধে মধ্যস্ততা করতে । হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার দেখাশোনা করবার মত ধকলপূর্ণ কাজও নিজের কাঁধে নেয় সে । তাকে খাবার দিত, নিত্যনৈমিত্তিক কাজগুলোতে সাহায্য করত, তার পা ধুয়ে দিত সাবান আর ছোবা দিয়ে । তার চুল,দাড়ি,উকুন ও উকুনের ডিমমুক্ত রাখত। তালপাতার ছাউনিটাকে সবসময় ঠিক করে রাখত আর ঝড়ের সময় সেটাকে আরও মজবুত করতে ছাউনির উপর চাপিয়ে দিত পানিনিরোধক ক্যানভাস । জীবনের শেষের কয় মাস ল্যাটিন ভাষার প্রাথমিক বুলি দিয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারত রেমিদিওস । যখন আউরেলিয়ানো আর পিলার তেরোনেরার ছেলে জন্ম নেয়, আর বাড়িতে নিয়ে এসে তার নাম আউরেলিয়ানো হোসে রেখে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানে ব্যাপটাইজ করা হয়, তখন রেমেদিওস সিদ্ধান্ত নেয় বাচ্চাটাকে তার প্রথম ছেলে হিসাবে পরিচয় দেবার । তার মাতৃপ্রবৃত্তি অবাক করে দেয় উরসুলাকে । অন্যদিকে আউরেলিয়ানো বেঁচে থাকার সঙ্গত কারণ খুঁজে পায় ওর ভিতর । প্রতিদিনই কর্মশালায় কাজ করত সে, আর মধ্য সকালে চিনি ছাড়া এক কাপ কফি নিয়ে দিত রেমেদিওস তাকে । দুজনে প্রতি রাতে বেড়াতে যেত মসকতেদের বাড়ি । যখন আউরেলিয়ানো অন্তহীন ডোমিনো খেলত তার শ্বশুরের সংগে, তখন রেমেদিওস বোনদের সংগে গল্প করত অথবা মায়ের সঙ্গে বয়স্কদের ব্যাপারগুলো নিয়ে আলোচনা করত । গ্রামটাতে বুয়েন্দিয়ার কর্তৃত্ব আরও পোক্ত হয় দন আপলিনার মসকতের কর্তৃত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে । দন আপলিনার মসকতে প্রাদেশিক রাজধানীতে বার বার যাতায়াত করে সরকারকে রাজী করাতে সক্ষম একটা স্কুল বানাতে যেখানে ভর্তি হয় আর্কাদিও, যে তার উত্তরাধিকার সূত্রে দাদার কাছ থেকে পেয়েছে শিক্ষার উদ্দীপনা । অটল প্রত্যয় দিয়ে জাতীয় স্বাধীনতা দিবস আসার আগেই বেশীর ভাগ বাড়ি নীল রঙ করাতে সক্ষম হয় দন আপলিনার মসকতে । ফাদার নিকানোরের ক্রমাগত অনুরোধে কাতরিনার দোকানটাকে সরানো হল দূরের এক রাস্তায়, বন্ধ করা হল গ্রামের কেন্দ্রের বিভিন্ন লজ্জাজনক জায়গাগুলো, যেগুলো প্রতিদিনই প্রচুর উন্নতি করে যাচ্ছিল । একবার সে ফিরে আসে অস্ত্রধারী পুলিশ সঙ্গে করে আর তাদের দেয়া হয় শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব । কারুরই মনে থাকে না গ্রামে অস্ত্রধারী লোকা না রাখার আদি চুক্তিটার কথা । শ্বশুরের দক্ষতা আনন্দিত করত আউরেলিয়ানোকে । “তুইও ওর মতই মোটা হয়ে যাবি” বলত তার বন্ধুরা । কিন্তু প্রচুর সময় বসে কাটানোর ফলে উচু হওয়া তার চোখের দীপ্তিকে কেন্দ্রীভূত করলেও, ওজন বাড়ে না তার, বা চরিত্রের শান্তভাব হারায় না সে, বরং তার ঠোঁটের উপর নির্জন মগ্নতার ও দৃঢ় সংকল্পের রেখাটাকে স্থায়ী করে তোলে । সে আর তার স্ত্রী দুই পরিবার থেকেই এত গভীর মমতা অর্জন করেছিল যে যখন রেমেদিওস তার আশু সন্তান আগমনের সংবাদ দেয় তখন, এমনকি রেবেকা আর আমারান্তাও ঝগড়া বাদ দিয়ে চুক্তি করে, ছেলে হলে নীল উলের আর মেয়ে হলে গোলাপী উলের পোশাক বোনার । অল্প কয়েক বছর পর আর্কাদিও ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাড়িয়ে সবার শেষে চিন্তা করে রেমেদিওসের কথা ।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
অতি আবশ্যিক কারণগুলো ছাড়া দরজা জানালা বন্ধ রেখে সকলের আগমন বা নির্গমন বন্ধ করে এক শোক পর্বের আয়োজন করে উরসুলা; এক বছর উচ্চস্বরে কথাবার্তা নিষিদ্ধ করা হয়, আর যেখানে মৃতদেহের নিশি শোকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেখানে এক কালো লেস বাঁধা রেমেদিওসের দাগেরটিপো স্থাপন করা হয় এক অনির্বান তেলের বাতির সঙ্গে । ভবিষ্যৎ বংশধররা, যারা কখনই সেই বাতিটাকে নিভতে দেয়নি, তাদের হতবুদ্ধি করে দেবে কুঁচি দেয়া স্কার্ট, সাদা জুতো আর অর্গান্ডির লেস বাঁধা মেয়েটার প্রতিচ্ছবি, যেটাকে গৎবাঁধা পরদাদীর অবয়বের সংগে কিছুতেই মেলাতে পারবে না তারা । আমারান্তা আউরেলিয়ানো হোসের যত্নের ভার নেয় । ছেলে হিসেবে গ্রহণ করে তাকে, যে নাকি তার একাকীত্বের অংশীদার হয়ে উপশম করবে তার ঠিক জায়গামত না লাগা প্রার্থনা, আর অনিচ্ছাকৃত আফিমের আরক কফিতে মিশে যাবার ভার । সন্ধ্যাবেলা পা টিপে, টুপিতে কাল লেস লাগিয়ে ঘরে ঢুকত পিয়েত্র ক্রেসপি রেবেকাকে দেখে যেতে, আর মনে হত হাতের মুঠি পর্যন্ত কালো পোশাকের মধ্যে রেবেকার রক্তক্ষরণ হচ্ছে । ওই সময়ে, বিয়ের নতুন একটা দিনের চিন্তা এতই শ্রদ্ধাহীন হত যে ওদের প্রেম পরিণত হল এক চিরন্তন সম্পর্কে, এক ক্লান্তিকর তত্ত্বাবধানহীন প্রণয়ে । অন্যদিনে যে প্রেমিকরা চুমু খাবার জন্য বাতি নষ্ট করে ফেলত তাদের প্রেমকে যেন মৃত্যুর ইচ্ছের হাতে ছেড়ে দেয়া হয় । লক্ষহীন সম্পূর্ণরূপে হতোদ্যম রেবেকা আবার মাটি খেতে আরম্ভ করে ।

যখন শোকপর্বটা দীর্ঘায়িত হতে হতে এমন পর্যায়ে আসে যে উলের কাটার বুনুনির পর্বটা আবার আরম্ভ হয়। তখন নিঃশব্দ দুপুর দুটোর প্রাণান্তকর গরমের মধ্যে কেউ একজন এমনভাবে রাস্তার দিকের দরজাটা ধাক্কা দেয় যে দরজার সংগে লাগানো সিমেন্টের পিলারগুলো কেঁপে ওঠে প্রচন্ড শক্তির প্রবলতায়, আর গোলচেয়ারে আঙ্গুল চোষণরত রেবেকা, রান্নাঘরে উরসুলা, কর্মশালায় আউরেলিয়ানো, এমনকি নিঃসঙ্গ চেস্টনাটের নীচে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ারও মনে হয় যেন এক ভূমিকম্প বাড়িটাকে ছিন্নভিন্ন করছে । বিশাল শরীরের এক লোক ভেতরে ঢোকে । তার চতুর্ভুজ পিঠটা কোনরকমে দরজার মধ্যে এঁটে যায় । তার বাইসনের মত গলা থেকে ঝুলছিল ভার্জিন রেমেদিওসের মেডাল, বাহুগুলো আর বুক ছিল সম্পূর্ণভাবে রহস্যময় সব উল্কি দিয়ে ঢাকা । আর ডান কব্জিতে শক্ত করে লাগানো তামার বালাতে খোঁদাই করে করা নিনঞস-এন-ক্রস (ক্রসের ভিতর শিশু)ওর গায়ের চামড়া ছিল উন্মুক্ত, লবনাক্ত বাতাসের কারণে তামাটে, চুল খাটো করে খচ্চরের কেশরের মত করে ছাটা, চোয়াল দুটো লোহার মত শক্ত আর এক করুন চাহনী । ঘোড়ার জীনের দিগুণ চওড়া কোমড়বন্ধনী, হাটু পর্যন্ত লম্বা মোজাসহ ঘোড়া দাবরানোর কাটাওয়ালা ও লোহা দিয়ে আবৃত বুটসহ লোকটার উপস্থিতি চারপাশে এক ভুকম্পনের মত অবস্থার সৃষ্টি করে । বৈঠকখানা পার হয়ে ভিতরে বসার ঘর পার হয়ে, প্রায় ছিন্ন কিছু চামড়ার থলে (SADLLE BAG) হাতে নিয়ে বজ্রের মত আবির্ভূত হয় সে বেগনিয়ার বাগানে, যেখানে আমারান্তা আর তার বান্ধবীরা বাতাসে সুচ তুলে ধরে চলৎশক্তিহীন হয়ে পরে । “শুভ দুপুর” বলে ক্লান্ত স্বরে, আর থলেগুলো কাজের টেবিলের উপর ফেলে বাড়ির পিছন দিকে পা বাড়ায় । “শুভ দুপুর” চমকে ওঠা রেবেকাকে বলে, যখন রেবেকা তার শোবার ঘরের দরজার সামনেটা পার হতে দেখছিল তাকে। “শুভ দুপুর” বলে পঞ্চম ইন্দ্রিয় কেন্দ্রীভূত করে সতর্ক অবস্থায় রৌপ্যকর্মের টেবিলে বসা আউরেলিয়ানোকে । কারও সঙ্গেই সময় কাটানোর জন্য দাড়ায় না সে । সরাসরি গিয়ে উপস্থিত হয় রান্নাঘরে আর সেখানেই প্রথমবারের জন্য থামে এক সফর শেষে, যে সফর শুরু করেছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে । “শুভ দুপুর” বলে । উরসুলা এক সেকেন্ডের জন্য মুখ হা করে থ হয়ে থাকে । চোখগুলোকে দেখে, চীৎকার করে লাফিয়ে উঠে তার গলা জড়িয়ে ধরে আর চীৎকার করতে থাকে আনন্দমন্ডিত কান্নায় । সে ছিল হোসে আর্কাদিও, যে নিঃস্ব অবস্থায় চলে গিয়েছিল, ঐভাবেই খালি হাতে ফিরে এসেছে । এতটাই নিঃস্ব সে যে তার ঘোড়া ভাড়া বাবদ দু পেসো দিতে হল উরসুলাকে । এসপানঞলের সঙ্গে নাবিকদের খিস্তি মিশিয়ে কথা বলছিল সে । কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর দিল “এখানে-ওখানে” । যে ঘরটা ওকে বরাদ্দ করা হল সেখানে হ্যামক ঝুলিয়ে ঘুমিয়ে নিল তিনদিন । যখন জেগে উঠল ষোলটা কাঁচা ডিম পান করে সোজা কাতরিনার দোকানের দিকে রওয়ানা দিল যেখানে ওর প্রমাণ সাইজের শরীর, মেয়েদের মাঝে আতংকভরা কৌতূহলের সৃষ্টি করে । ওর খরচে সকলের জন্য পান আর আখের রসের মদ দিতে বলে । একই সঙ্গে পাঁচজনের সংগে পাঞ্জার বাজীর প্রস্তাব করে সে । “এটা অসম্ভব” ওর বাহু নাড়াতে পারবে না এটা নিশ্চিত হয়ে ওরা বলে । “ওর কাছে নিন্ঞস-এন-ক্রস আছে “। কাতারিনা দৈবশক্তিতে বিশ্বাস না করে প্রতিপক্ষকে নাড়াতে পারবে না বলে, বারো পেসো বাজী ধরে । হোসে আর্কাদিও সেটাকে জায়গা থেকে সরিয়ে মাথার উপর তুলে পরে নামিয়ে রাখে রাস্তার উপর । এগারোজন লোকের প্রয়োজন হয় সেটাকে ভিতরে ঢোকাতে । নীল আর লাল অক্ষরে জট লাগানো বিভিন্ন ভাষার উল্কিতে সারা শরীর ঢাকা হোসে আর্কাদিও প্রতিপক্ষের উপর অবিশ্বাস্য পুরুষত্ব দেখানোয় এক উৎসবেরও আমেজ তৈরি হয় । লোলুপতা নিয়ে ঘিরে থাকা মেয়েদেরকে জিজ্ঞেস করে কে ওকে বেশী দাম দেবে । যার সবচেয়ে বেশী ছিল সে বিশ পেসো করে । সুতরাং সে লটারীর প্রস্তাব জনপ্রতি দশ পেসো করে । দামটা ছিল অচিন্তনীয় কারণ সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মেয়েটির আয় ছিল এক রাত্রের জন্য আট পেসো । তবুও ওরা প্রস্তাবে একমত হয়ে ওদের নাম লেখে চৌদ্দ টুকরো কাগজে আর ঢুকায় এক টুপিতে প্রতিজনে একটা কাগজ তোলার জন্য । যখন মাত্র দুটো কাগজ বাকি থাকে তখন সকলেই বুঝতে পারে ওদুটোর মালিক কারা । “প্রতিজনে আরও পাঁচ পেসো করে দাও” প্রস্তাব করে হোসে আর্কাদিও আর আমাকে ভাগ করে দেব তোমাদের দুজনের মধ্যে ।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর
Flag Counter


2 Responses

  1. বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে, বিশেষ করে অনুবাদের ক্ষেত্রে, এটি এক অসাধারণ উপহার ।
    আনিসুজ্জামানকে ধন্যবাদ।

  2. Anisuz Zaman says:

    Bachchu, i received my best compliment ever from you. but i like to have a little more details. may i know what am i doing different than all others? best regards.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.