কবিতা

মাহবুব আজীজের গুচ্ছ কবিতা

mahbub_aziz | 31 Jan , 2015  

ভয়

এই খরতপ্ত দগ্ধ জীবন-
মাগো; মুখ লুকানোর জন্যে
আমি তোমার বুক খুঁজে বেড়াচ্ছি।
সামান্য আশ্রয়ের খোঁজে;
বাঘের ছোবলে ক্লান্ত হরিনীর মতো-
আমি আজ মুখ লুকাতে চাই।
ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত, দুরন্ত সেই বালক।
সামান্য একটু আশ্রয়ের খোঁজে
তোমার চিরঅবাধ্য সেই বালক
ছুটতে ছুটতে ছুটতে
আগুনে না পুড়ে যায় মা!

কবেকার ফুল

কবেকার ফুল পড়ে ছিল এককোণে-
ভুলে সে পথে গিয়েছিলাম সেদিন।
নেটওয়ার্কের বাইরে; সহজে মেলে না ফোনে;
আঁকাবাকা পথ। তবুও মুগ্ধতা- শৈশবের ঋণ।

হলুদ দেয়ালের ধাঁধায় ঘেরা প্রশস্থ মাঠ-
আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধুধু ভূমি;
তখন উত্তীর্ণ কৈশোর; সকলই নিজস্ব স্বরাট।
বিকাল হলেই খুঁজি-কোথায় তুমি?

চাপা আগুন লাল সেই ঠোঁট।
কি যে রূপ; তা শুধু আমি জানি।
নির্ঘুম রাত্রি আর উদ্বিগ্ন অপেক্ষা তখন একজোট-
অতীত হয়েছে সবই কোনকালে-নিশ্চিত মানি।

আবার ফিরে সেই পথ। ডাক দেয় একই ভুল।
না। কিচ্ছু ভুলি নাই। সেই কবেকার ফুল!

আধো ঘুম

যেন ডুবে যাচ্ছি ক্রমশঃ জলের গভীরে;
সবুজ জল। নিঃসার হাত-পা; শিরা-উপশিরা।
বন্ধ চোখ। সাড়া নেই পা থেকে শিরে-
নির্বান্ধন, সঙ্গীহীন একা; অনেক মানুষের ভীড়ে।

চেতনা আবার ক্রিয়াশীল হয় নিজেই কখন;
মনে পড়ে না- রবি না সোম? আজ কী বার?
হাত চলে যায় জলের গ্লাসে যখন;
বুঝি; ভাঙছে ঘুম; যুদ্ধ শুরু হবে আবার।

যেতে হবে বাসের লাইনে; দ্রুত হাত মুখ ধুই!
চেনা দীর্ঘ একঘেয়েমী-ভাবলেই রাগে গা জ্বলে;
ঘুম থেকে উঠেই দৌঁড়? তার চেয়ে শুই
আরও কিছুক্ষণ নিরিবিলি। ডুব দিই অতলে।

এভাবে বুঝি জীবন যায়? অর্ধ ঘুম অর্ধ জাগরণে-
আমার তাই ভাল্লাগে। আধো প্রেমে, আধো আলিঙ্গনে।

যাই

যাই। সবকিছু থেকে; সবার থেকে।
অন্ধকার নেমে আসার পরে-
টুক করে ডাক আসে। অনেকের মধ্যে একা-
একটু আগে চুমু খাওয়া চাঁদ ঐ দূরে। ডাকে।
যাই।…
সন্তর্পণে হাঁটি; সর্বংসহা মাটির উপর শান্ত দুই পা-
সন্ধ্যা তখনও হয় নাই। অস্পষ্ট আলো।
এইসব দুঃখ-ব্যথা, ছোট ছোট না-পাওয়া;
ব্যর্থতাসমগ্র…কি যায় আসে!
সন্ধ্যার আকাশ নিমগ্ন নির্ভার।
একখানা আস্ত মানুষজীবন পাওয়া গেল-
আশ্চর্য সুন্দর।
একটু আগে চুমু খাওয়া চাঁদ ঐ দূরে। ডাকে।
যাই। …

পরম্পরা

পারদবর্ণা আকাশের নিচে
বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে;
আজও শিশুর চোখের মতোই ভিজে ওঠে দুই চোখ।
কন্ঠনালীতে কান্নার বুদবুদ-
– কখনই তোমার সংগে আমার আর দেখা হবে না!
জানি, এই দৃশ্য- প্রাগৈতিহাসিক- পুরনো, সহস্র বছরের-
যেমন একদিন আমার সন্তানের সঙ্গেও
কখনই আমার আর দেখা হবে না!
মৃত্যু নামের সেই হিংস্র, নির্মমতম থাবা
এক ঝটকায় নিয়ে যাবে আমাকে
মহাসিন্ধুর ঐপারে।

রূপকথা, নীলপদ্ম-
দুই আত্মজা আমার-
আজ থেকে দুই দশক পর ; তোমরা এখন কোথায়?
নিউইয়র্ক, মেলবোর্ন? নাকি লন্ডনের রাজপথে?
ঐ অচেনা নগরে তোমরা এখন আত্মপ্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অবতীর্ণ তবে?
নাকি ঢাকা নামে তোমাদের বাবার প্রিয় শহরটিতেই
তোমরা লড়ে যাচ্ছো তারই মতো অহর্নিশ?

যেখানেই থাকো; নিশ্চিত জানি-
ঐ একই দূর মফস্বলে তোমাদের পিতার কবরের পাশে
তোমরা ঠিক দাঁড়াবে একদিন !
না, কলজেছেড়া আত্মজারা আমার-
তোমাদের সাথে এরপর কখনই আমার আর দেখা হবে না!

জীবন এমনই-
নিষ্ঠুরতম নির্মমতম এই জীবন।
বেঁচে থাকার সামান্য এই সময়টিতে
তাই তোমরা-
বাঁচো, প্রাণভরে বাঁচো।
বাঁচো- আনন্দে, বেদনায়, উল্লাসে, ক্রন্দনে-
যতটা পারো- বাঁচো-
জীবনের ধুলোর মধ্যে পড়ে যাবে তুমি, তোমরা-
থেমে থাকবে না; উঠে দাঁড়াও; দাও দৌঁড়- বাঁচো-
দুঃখ পাবে; পাবেই- তাকে অবধারিত জেনে
হাসি আনো চোখের তারায়; বাঁচো-
ভালোবাসো ছোট্ট ঘাসফুলটিকেও- বাঁচো-
আঁকড়ে ধরো সব সুস্বাদ;
স্বপ্ন দেখো- হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে যাবে
স্বপ্নসীমার শেষবিন্দু পর্যন্ত- বাঁচো-
একটামাত্র জীবন
নিজের যতটা সাধ্য চুমুকে চুমুকে বাঁচো।

Flag Counter


9 Responses

  1. কিচ্ছু ভুলি নাই। সেই কবেকার ফুল-অসাধারণ লাগল।

  2. মুস্তাফিজ শফি says:

    ভাল লাগলো। কবিকে অভিনন্দন

  3. আধো ঘুম কবিতার ‘আমার তাই ভাল্লাগে। আধো প্রেমে, আধো আলিঙ্গনে’-এই অংশটি পছন্দের।

  4. একসাথে এতোগুলো কবিতা পড়ে ভালো লাগলো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে “যাই” কবিতাটি। অসাধারণ একটি লাইন- “যাই। সবকিছু থেকে; সবার থেকে।”

  5. মুন খান says:

    অসম্ভব ভাল লেগেছে প্রতিটি কবিতা । বর্তমান , অতীত , প্রেম , আগামীর স্বপ্ন বিষয়ক প্রতিটি আলাদা আলাদা করে ভাললাগা ছুঁযে গেলো । কবিকে শুভেচ্ছা ।

  6. abid azam says:

    valo legese.kobi r boi kobe berube?

  7. আজাদ বাঙালি says:

    `ভয়’ কবিতাটি খুবই ভালো লাগছে

  8. রাশেদ মেহেদী says:

    “তোমার চিরঅবাধ্য সেই বালক
    ছুটতে ছুটতে ছুটতে
    আগুনে না পুড়ে যায় মা!”………কবির মত এই আতংকে আছি আমরাও..এই অভাগা দেশে একিদন ‌’বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসত’ আর এখন চামরা পোড়া গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে…

    ‘জীবন এমনই-
    নিষ্ঠুরতম নির্মমতম এই জীবন।
    বেঁচে থাকার সামান্য এই সময়টিতে
    তাই তোমরা-
    বাঁচো, প্রাণভরে বাঁচো।’…..এটাই বোধ হয় বেঁচে থাকার শাশ্বত আকুতি…ধন্যবাদ নিদারুণ সময়ের মানবিক কবিকে…

  9. জামাল says:

    মাঝেমধ্যে এমন সুস্বাদু কবিতা খুবই উপাদেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.