জার্নাল

মা যে আমায় গান শোনাতো

fauzia_khan | 27 Dec , 2007  

(এই লেখাটি আমার নির্মাণাধীন নিরীক্ষামূলক একটি চলচ্চিত্রের মনোলগ হিসেবে লেখা। ২০০১ সালের জানুয়ারি মাস। তখন আমার গর্ভপাতের অভিজ্ঞতা হয়। সেই নির্মম নিদারুণ অভিজ্ঞতাই মা যে আমায় গান শোনাতো-র বিষয়। ওরিয়ানা ফালাসির হাত বাড়িয়ে দাও যারা পড়েছেন তারা এর সাথে বিষয়গতভাবে কিছুটা সাম্য পাবেন।
motherhood-64.jpg
মাতৃত্ব, ডিজিটাল চিত্র, ফৌজিয়া খান ২০০২

মানবপ্রজাতির জন্ম প্রক্রিয়ায় নারী আর পুরুষের অংশগ্রহণ বিষয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের নতুন করে কিছু বলার নেই। তবে আমার কাছে মা হচ্ছেন এমন জন যিনি পৃথিবীতে মানবপ্রবাহ টিকিয়ে রেখেছেন। বিনিময়ে সামষ্টিকভাবে নারী কিন্তু কিছু অর্জন করেনি; পেয়েছে কেবল লাঞ্ছনা। পথ চলতে গিয়ে প্রায়শ দুই রিকশাচালককে ঝগড়া করতে শুনি। অকারণের তারা পরস্পর পরস্পরের মাকে গালি দিতে থাকে। শুনে আমার গা রি রি করে; মাথার তালু গরম হয়ে যায়। জিভ নিশপিশ করে কিছু বলার জন্য। কখনো বা বলেও ফেলি, মাকে কেন টেনে আনছেন এখানে? আমার প্রশ্নে তারা বিরক্ত হয়। কিন্তু প্রশ্নের জবাবের মর্মার্থ নিয়ে ভাবে না। ফলে আমার মন খারাপ করা মনে আরো একটি কালো রঙের পোচ পড়ে। মাকে আমার তখন বড় নিঃস্ব, যন্ত্রণায় মূঢ় মনে হয়। তবুও আশ্চর্য আমাদের জীবন। অনেক নারীবন্ধু যারা মা হয়েছেন তাদের কাছে শুনেছি সন্তান তাদের কাছে অপ্রার্থিব প্রাপ্তিতুল্য। বঞ্চনায় ভরপুর জীবনে সন্তান তাদের অমূল্য রতন। মাতৃত্ব যেমন সৃষ্টির আনন্দে ভরপুর তেমনি বেদনারও উৎস–এমনই নির্মম বোধ আমার মনের মধ্যে বারবার খেলে যায়। অনুভূতির এই অনুরণন থেকেই মা যে আমায় গান শোনাতো চলচ্চিত্রের বিষয় মাথায় আছে। আশা করছি আগামী বছর ছবিটি শেষ করে ফেলতে পারব। তার আগে আপাতত ছবির জন্য লেখা আত্মকথনটিই পাঠকের দরবারে হাজির করা গেল।)

যখন থেকে বুঝতে শিখেছিলাম ‘মা’ হয় মেয়েরা কেবল, তখন থেকে ভেবে এসেছি, একটি মেয়ের ‘মা’ হবো আমি; সে হবে আমার একমাত্র সন্তান, আমার কন্যাপাখি! ও উঠবে পাহাড়ে, দেখবে বন, গাইবে গান, বেড়ে উঠবে তার স্বপ্নডানার পেখম ছড়িয়ে। ভেবেছিলাম যে অধরা স্বপ্নগুলো কোনোদিন পাপড়ি মেলেনি আমার তার সব পূর্ণ হবে মেয়ের জীবনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া পর্যন্ত পেখম মেলে উড়তে থাকা কন্যাপাখিটির স্বপ্ন রিনঝিন করে বাজতো আমার মনের জলসা ঘরে।

নারী আমি, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে মানুষ হয়েও মানুষের পূর্ণ মর্যাদা পাইনি কখনো। এ জীবদ্দশায় পাবোও না হয়তো কোনোদিন। পৃথিবী জুড়ে লক্ষ কোটি বছরে নারী-পুরুষের যে সভ্যতা গড়ে উঠেছে সেখানে আমরা নগণ্য মেয়েমানুষ। দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক, শুদ্রজন। যুগে যুগে গড়ে ওঠা ব্যবস্থায় প্রভু আমাদের পুরুষ। হাতে টাকা, পকেটে বিদ্যার সার্টিফিকেট নিয়ে ওরা হয়ে ওঠেছে পৃথিবীর অধিকর্তা। আইন-ধর্ম সমাজ-রাজনীতি সবই ওদের হাতে। আমাদের জন্য চিরাচরিত বরাদ্দ সন্তান জন্ম দেয়া, তার লালনপালন আর ঘরসংসার সামলে রাখা। যুগে যুগে আমাদের শেখানো হয়েছে: এই-ই তোমাদের কাজ। এ-কাজ সুচারুভাবে করতে গিয়ে কালেভদ্রে দু’একজন মাদাম কুরী কিংবা ইন্দিরা গান্ধীর দেখা পেলেও আমাদের মধ্যে কোনো দান্তে, শেকসপীয়র, মধুসূদন কিংবা রবীন্দ্রনাথ নেই; নেই নিউটন-আইনস্টাইন-ভিঞ্চি-পিকাসো-প্লাতো-আরিস্টটল-মার্ক্স। ইতিহাস দেখেশুনে মনে হয় এ-পৃথিবীতে যা কিছু মহান তার সবটুকু পালনের জন্য বিধাতা কেবল পুরুষদেরই সৃষ্টি করেছেন!!

ওদের স্রষ্টা করে তুলবার জন্য দেশে দেশে আমাদের চারপাশে গড়ে তোলা হয়েছে অগুনতি নিষেধের বেড়াজাল। সুতরাং মন চাইলেই গান আমি করতে পারিনি কোনোদিন, পারিনি স্বপ্নের পেছনে দীপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে। অপূর্ণ আমার মনের ভেতরে তাই পেখম মেলে উড়তে থাকা কন্যা-পাখিটির নিত্য আসা-যাওয়া।
motherhood-66.jpg
মাতৃত্ব, ডিজিটাল চিত্র, ফৌজিয়া খান ২০০২

নারী-পুরুষের অসম এই আবাসভূমিতে আমার কন্যাপাখি তার স্বপ্নডানার পেখম ছড়িয়ে উড়তে চাইলে যতোটা পথ মানুষ হেঁটেছে পৃথিবীর বুকে ততোটাই আবার তাকে হাঁটতে হবে উল্টো পথে। আমরা কি হাঁটবো সে পথে!!

অভিজ্ঞতা বলে, খুব সহজে সে পথে হাঁটবে না মানুষ। ডালিমকুমারদের দেখা মেলে কেবল রূপকথাতে! আমার কন্যাপাখির স্বপ্নগুলো ডানা ভেঙে আছড়ে পড়বে মাটিতে!!

আমি তাই প্রতিজ্ঞা করি: না, সন্তান থাকবে না আমার, কোনো কন্যার ‘মা’ হবো না আমি কোনোদিন।

নিয়তির এমন পরিহাস, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ এই আমাকেও গর্ভ ধারণ করতে হলো একবার। অনাকাক্সিক্ষত সে সন্তানকে ঘুমপাড়ানী গান না শুনিয়ে চির ঘুমের দেশে পাঠাবার পাকাপাকি ব্যবস্থা করলাম নির্মম নিষ্ঠুরতায়। লেসের কাঁটার মতো তীক্ষ্ম ধারালো যন্ত্রের আংটায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওর সদ্য গড়ে উঠতে থাকা গোলাপী আভাময় শরীরটাকে ছিন্ন-ভিন্ন করেছিলাম। আহ্ কী কষ্টই না পেয়েছিলো মেয়ে আমার! আজও বুকে বাজে ওর নীরব কান্নার মোচড় দেওয়া কণ্ঠ! রক্তাক্ত করেছিলাম নিজেকেও। অনাগত সে কন্যা অবশ্য তারপরও ছেড়ে যেতে চায়নি আমাকে। নিজের জরায়ু কোঠর আরো রক্তাক্ত করে ওর থেঁতলে দেয়া দেহের টুকরোগুলো বের করতে হয়েছিলো ডাক্তারকে। আহ সে থেতলানো শরীরের কন্যা আমার!!!

অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম তখন। না সন্তানের শোক যতটা তারচে বেশি আহত জরায়ু আমাকে শয্যাশায়ী করে রাখলো। জরায়ুতে ঘা হয়ে গেলো। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিলো শরীর। অফিস থেকে দু’সপ্তাহের ছুটি নিলাম। সেসময় স্বামী খুব ব্যস্ত। কাজে না বেরুলেই নয়। একা ঘরে পড়ে আছি আচ্ছন্ন হয়ে।

পরদিন মা এলো। তখনো উঠে দাঁড়াতে পারি না। রক্তপাত হচ্ছে। তলপেটে প্রচণ্ড ব্যথা। গায়ে অসম্ভব তাপমাত্রা। মা খাবার বানিয়ে দেয়। মাথা ধুইয়ে দেয়। আমার শরীর নিয়ে দুশ্চিন্তা করে।

একটি দুটি দিন গড়িয়ে যায়। জরায়ুর ক্ষত আর জ্বরতপ্ত শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ি। আর চুপচাপ আমাকে ঘিরে মায়ের উদ্বেগ দেখি। ভাবি, এই আমার মা, আমায় চারপাশের আলো দেখিয়েছেন তিনি। পৃথিবীর বুকে পা রাখার আগে নিজের শরীরের ভেতর আগলে রেখেছিলেন। তার শরীর থেকে রসদ নিয়ে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে আমার শরীর। একই নাড়ির এ-মাথায় আমি ও-মাথায় মা।

যে-আমি সদ্য একটি সন্তানের সম্ভাবনা সমূলে উপড়ে ফেলেছি সেই আমি আমাকে ঘিরে মায়ের অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করছি। জন্মকালে আমার কোনো যাতনা হয়েছিলো কিনা তা মনে করতে পারি না। মা কিন্তু দশ মাস দশ দিনের গর্ভকালে কখন কেমন করে যন্ত্রণা দিয়েছি তাকে, কখন সে পেয়েছে আনন্দ সবই তার শরীরের রোমে রোমে অনুভব করতে পারে এখনো। কতো শতবার মা শুনিয়েছে তার গৌরবোজ্জ্বল, একইসাথে শঙ্কা আর বেদনা মিশ্রিত সেইসব গর্ভদিনের কথা; কী তীব্র বেদনার মধ্য দিয়ে পেয়েছিলো সোনার টুকরা পিতলার এই ধনটিকে! এককালে আমাদের সেই নাড়ির বাঁধনই বোধহয় আজ টেনে এনেছে মাকে। নইলে এমন চিলের মতন উড়ে এলো কেন? কই বাবাকে তো কখনো পেলাম না এমন করে!

ক্ষণিকের যৌনক্রিয়ায় বাবার শুক্রাণু মিলিত হয়েছিলো মা-র ডিম্বাণুর সাথে। সে সময় প্রতিটি পল-অনুপলে নিজের আনন্দ ছাড়া আর তো কিছু ভাবতে হয়নি বাবাকে! তাদের মুহূর্তের ওই আনন্দযাত্রায় যে প্রাণের সূচনা সে-ই আজকের আমি। বাবার না ছিলো কোনো বেদনা, না কোনো ভার! আর মা? বমিতে ভেসে গেছে তার শরীর, ছিঁড়েছে গলার নালী। শরীরটা তার আর নিজের থাকেনি পুরোটা। সেখানে ভাগ বসিয়েছিলাম আমি। খাবারে অরুচি নিয়েও মা পুষ্টি দিয়েছে আমায়। আমাকে গর্ভে নিয়ে হাঁটতে কষ্ট হয়েছে তার। তবুও নিজের কষ্ট অগ্রাহ্য করে আমাকে নিরাপদে রাখার অক্লান্ত চেষ্টা করে গেছে শেষ পর্যন্ত। দশমাস ধরে এক শরীরে আমরা দু’জন দু’প্রাণ নিয়ে ছিলাম মিলেমিশে। তাকে রক্তাক্ত করে, ছিঁড়েফুড়ে জন্মেছি আমি। এক একজন মা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যেভাবে সন্তানের জন্ম দেন! ওহ! সে কী যন্ত্রণা! বেদনায় নীল সে সময়ে কী প্রবল রক্তপাত! এখন মা আর আমি আলাদা দু’জন মানুষ। অথচ জন্মের পরও দুই-আড়াই বছর ধরে আমরা পরস্পরের খুব কাছের ছিলাম। তার বুকের সুধা খেয়ে প্রাণে বেঁচেছি তখন। কতো অভিন্ন ছিলাম আমি আর মা! মায়ের বেঁচে থাকা ছিলো আমার বেঁচে থাকা। মায়ের শ্বাস আমারো আশ। আমি নেই মানে মাও নেই।

আমাকে ঘিরে মায়ের দুশ্চিন্তা দেখে মনে হলো, এমন উদ্বেগ কখনো আমার হবে না। এমন প্রাণের জন আমার কখনো থাকবে না যার জন্যে নিজেকে এমন উজাড় করে দিতে পারি। হ্যাঁ, নিজের অনেকটুকুর ছাড়। আহা, আমাদের সে মহতী মায়েরা! কখোনো কি আমরা স্বীকার করি তাদের সে ঋণ?

করি না সচরাচর। করি না বলেই আমার নামের পেছনে কেবল বাবার পদবী, সনদপত্রে অভিভাবক হিসেবে শুধুই বাবার নাম। প্রতিষ্ঠানের তকমা আঁটা কাগজগুলোতে মা নেই। কোথাও নেই। এই নিরস্তিত্ব মায়ের পায়ে শেকল, মুখে কুলুপ। সন্তানের ন্যায়ে দু’কথা বলবারও এখতিয়ার নেই তার। সে শুধু সয়ে যাবে। বইবে আমাদের বোঝা। আর বাবাই হবে আমাদের সকল দণ্ড-মুণ্ডের অধিকর্তা।

পৃথিবী জুড়ে অধঃস্তনতার যে জীবন মেয়েদের, বড়ো নির্মম সে চিত্র। মানুষ আমি। পাখা মেলে উড়তে পারি দিগন্তবিস্তারি আকাশভূমিতে। কই কখনো তো ভাবতে পারিনি সে কথা। মা, নানী, নানীর মা এবং তারও মা, নানী, নানীর মা–বংশ পরম্পরায় মায়েদের যে ত্যাগের মধ্য দিয়ে আজকের আমিতে এসে ঠেকেছে মানুষের এই জীবন সেখানে আমরা–আমাদের মেয়েদের কোচরে এসে জমেছে কেবল চোখের জল; রক্তপাতের শুকিয়ে যাওয়া বর্ণে বিবর্ণ আমাদের পরিধেয়। আর ঝলমলে পোশাকে সজ্জিত পুরুষের হাতে ছড়ি। সে ছড়ির আদেশে চলে আমার গতি! শৃঙ্খলিত সে গতিতে আবার কেন আমার কন্যার ঘূর্ণিপাক খাওয়া?

সুতরাং গর্ভপাত। সুতরাং রক্তপাত।

চাইনি যে সন্তান তাকে শরীর থেকে তাড়াতে গিয়ে আমি শয্যাশায়ী। অথচ স্বামী আমার দিব্যি সুস্থ শরীরে কাজকর্ম করে যাচ্ছেন। কেবল আমার স্বামীই তো নন, পৃথিবীর সকল স্বামীরই তা করবার অবকাশ থেকে যায়। প্রকৃতি তাদের এই অবকাশ দিয়েছে। আরো একবার ঈর্ষা হলো পুরুষ মানুষকে। হা পুরুষ, প্রজনন কতো সহজ তোমার জন্য! তোমার জরায়ু নেই। সুতরাং জরায়ু কোচরে ভ্রুণ জারিত হওয়া নেই; নেই সন্তানকে পুষ্টি যোগানোর ঝক্কি। তোমার গর্ভপাত নেই। নেই রক্তপাত, নেই জরায়ুর ঘায়ে সারা জীবনের জন্য ভোগান্তি বয়ে বেড়ানো। তোমার পেছনে অকালে ঝরে যাওয়া সন্তানের নিরব কান্নার তাড়া নেই। তোমার স্তন্যদান নেই। নেই সন্তানের না-খাওয়া দুধের ভারে টনটনে বুকের ভার। তোমার শরীর সন্তানের সাথে লগ্ন নয়। সেজন্য নিশ্চিন্ত, নির্ভার তুমি। তোমার পৌরুষের জলুস পৃথিবীব্যাপী। সন্তানও তোমার জলুসের অংশ। সে জলুসে উদ্ভাসিত তুমি তাই পৃথিবীর বুকে নিশ্চিন্ত মনে ছড়ি ঘুরাও। তোমার হাতে উড়ে বিজয় কেতন। তোমার অঙ্গুলি নির্দেশে পৃথিবী ওঠে, পৃথিবী বসে। আহ্ কী শান্তি, পরম শান্তি! তোমার হাতে আমার গতি, আমার নতি!!!

বংশপরম্পরায় যে আমি জরায়ু কোঠর পৃথিবীকে দান করে চলেছি তার হাত আজ শূন্য, রিক্ত। আমাদের সন্তানেরা আমাদের নয়, তোমাদের। তোমরা যদি পিতৃত্ব অস্বীকার করে বসো–প্রায়ই করে থাকো এটা তোমরা, আর এটা করাটা সহজও বটে, প্রকৃতি তোমাদের সে সুযোগ দিয়েছে–তখন সমাজে কিন্তু আমাদের আর মুখ দেখাবার উপায় থাকে না। আমাদের পিঠে তখন দোররার দগদগে ঘা। তোমাদের ছুড়ে দেয়া পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত আমাদের মাথার খুলি। আইন তোমাদের। আমাদের জন্যে বিচারের আশা তাই দুরাশা। আমরা তখন তুলে নেই বিষের বোতল, ফাঁসের দড়ি। ভগিনী সীতা হয় আমাদের পরম সহচর। সুপ্রাচীন অধঃস্তনতার এই উত্তরাধিকার আজকের আমাকে নিষ্ঠুর, নির্মম করেছে। ক্রুশের কাঁটায় খুচিয়ে তাই শেষ করেছি সন্তানের সম্ভাবনা।

motherhood-67.jpg
মাতৃত্ব, মিশ্র মাধ্যম, ফৌজিয়া খান ২০০২

নির্মম নিষ্ঠুর আমি পৃথিবীর উল্টো পথে হাঁটতে থাকি। আমার সন্তান থাকবে না। আমি উতলা হবো না কারো জন্যে। ঝড়-ঝঞঝায় আছাড় খেয়ে কেউ এসে আশ্রয় নেবে না আমার বুকে। কারো যন্ত্রণা দেখে বেদনায় নীল হবে না আমার হৃদয়। ঝাড়া হাত-পা নিয়ে পুরুষের পৃথিবীতে লড়বো আমি। ওদের অর্থনীতি, আইন কিংবা রাজনীতিতে ঢুকে পড়বো। ওগুলোকে করে তুলবো আমাদের আইন, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের রাজনীতি। মা, নানী, তার নানী এবং তারও মা, নানী, নানীর নানীদের সংখ্যা থেকে অন্তত একজনের সংখ্যা তো কমুক আমার এই নিষ্ঠুরতার বিনিময়ে! অনাগত কন্যা, তুমি ক্ষমা করো তোমার এই নিষ্ঠুর মাকে। আর আনন্দিত হয়ো এই ভেবে যে তোমাকেও এমন অধঃস্তনদের কাতারে এসে দাঁড়াতে হয়নি!

অনাগত কন্যাকে যখন বলছি এই কথা, মা তখন আমাকে বলছেন একজন প্রজননবিদের সাথে পরামর্শ করতে। বিয়ের ছ’বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কেন মা হতে পারিনি সে নিয়ে দুশ্চিন্তা করছেন তিনি। মা জানে না, আমি আর সন্তান চাই না। প্রজননবিদে আমার অনাগ্রহ দেখে টুটকা চিকিৎসার কথা ভাবলেন তিনি। গাঁয়ের কোন বুড়ি দাদি গাছের শেকড়-বাকড়ে মেয়েদের গর্ভ সম্ভব করে তোলেন তার গল্প শোনান আমাকে। মা জানেন টোটকায় বিশ্বাস নেই আমার। তবুও তার মনে আশা–সন্তানের কাক্সক্ষায় প্রজননবিদ যখন ব্যর্থ তখন অন্তত টোটকায় ভর করবো আমি।

মেরু সমান দূরত্বের দু’প্রান্তে আমরা দু’জন। মা ও মেয়ে। মা বলেন আমি শুনি। বলতেই থাকেন তিনি। কারণ শত বঞ্চনার যে জীবন তার সেখানে তো সন্তানই ছিলো একমাত্র আনন্দ–পরমানন্দ! সে পরমানন্দের স্বাদ কেন পাবে না তার মেয়ে? চুপ করেই থাকি আমি।

after-a-long-time-6-copy.jpg
অনেক দিনের পরে, ডিজিটাল চিত্র, ফোজিয়া খান ২০০৭

সন্তান ধারণ করার আনন্দ বর্জনের বিপরীতে যা আমি পেতে চাই একজন মেয়ের জন্য তা এখনো আমাদের সমাজে খুব নন্দিত নয়। উল্টো, সন্তানহীনতা সমাজে নারীকে আরো হেয় করে। মাকে আর এসব কথা বলার ইচ্ছে হয় না আমার। না, মা আমায় ঘৃণা করবে না, নিন্দাও নয়। বরং আর দশজন যে তা করবে সে দুশ্চিন্তা তার দুঃখের ভার আরো বাড়াবে। বঞ্চনায় প্রায় নিঃশেষিত মায়ের দুঃখ আর বাড়াতে চাই না আমি। আমি তাই চুপ করে যাই…।

ঢাকা, ২০০১

fauziakhan70@yahoo.com


4 Responses

  1. সানাউল্লাহ লাবলু says:

    নতুন কিছু নয়, তবে এটা প্রতিটি মায়ের প্রতিটি মাতৃত্বকালের অনুভূতি। আপনি লিখলেন বলে আমি পুরুষ সে অসাধারণ অনুভূতির কথা জানতে পারলাম। হায় পুরুষ! এই অনুভূতি আমি কখনোই পাবো না।

  2. হিমেল শফিক says:

    মেয়েদের ও মায়ের অনুভূতি অসাধারণ ভাবে প্রকাশ করেছেন। তবে গল্পে বৈপরীত্য বিদ্যমান। গল্পে গর্ভপাতের যে কারণ ব্যাখ্যা করেছেন তা কেবল মানসিক রোগীরাই করতে পারে, যা আপনি গল্পে বলেননি। উল্টা নিজের কাহিনী দাবি করেছেন।

  3. মানিক says:

    ফৌজিয়া খান

    শুভেচ্ছা জানবেন

    arts.bdnews24.com-এ, ২০০৭-এর ডিসেম্বরে পোস্ট করা আপনার লেখাটি আমার মতো অলসের নজরে আসলো ২০০৮-এর মধ্য মে’তে। আপনার এই লেখাটি সম্পর্কে গতানুগতিক আলাপচরিতা না করে পুরুষ হিসেবে আমি শুধু আমার ব্যক্তিগতবোধের কথাই — নারী হিসাবে আপনাকে বলতে চাই। স্বীকার করি এই বলতে চাওয়ায় জগতে হয়তো কোনো পরিবর্তন আসবে না।
    নারীর সন্তান ধারণ এবং এই ধারণ প্রক্রিয়ায় মানব সন্তানের জন্ম দেয়া আমার কাছে বরাবরই বিস্ময়ের সেইসাথে মনে হয় এই ঘটনা জগতে ঘটলেও এটি আমার জ্ঞাত পার্থিব কিছু নয়। নারীর সন্তান ধারণ প্রক্রিয়া আমার অগম্য। ব্যক্তিগতভাবে যখন আমি কোনো নারীকে গর্ভধারণ অবস্থায় দেখি, আমার মধ্যে তখন এক বিশেষ ধরনের অনুভূতির সঞ্চার হয়। এই অনুভূতিটা শ্রদ্ধার এবং সম্মানের। আমি বারংবার আশ্চর্যান্বিত হই, কী বিস্ময় এই ধারণে! আমার তখন সেই নারীর কাছে মাথা নত করতে ইচ্ছে করে। মনে হয় আমি তার চিরকালীন দাস হয়ে থাকি।
    আফসোস আমাদের ‘বাবাগিরি(পুরুষ)সমাজ’ (অমানবিক সমাজ)নারীকে কখনো বুঝতে দেয় না নারী কেমনতর সম্মান পাবার যোগ্যতা/অধিকার রাখে।
    মানবপ্রবাহ টিকিয়ে রাখবার প্রক্রিয়ায় নারী যে বেদনা সহ্য করে সেই বেদনার যথার্থ মূল্যায়ন কীসে হতে পারে আমি জানি না। আমি জানি না পুরুষ হয়ে জন্মাবার এই অপরাধ শোধ হতে পারে কীসে । তবে আশা করি পরজনমে নারী হবো।

    মানিক

  4. Fauzia Khan says:

    মানিক,

    আপনার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। লেখাটি আপনার মনে কিছুটা হলেও অনুভূতি জাগিয়েছে — এটা জেনে আমি আনন্দিত। তবে আমি কোনো মতেই চাই না আপনি পরের জন্মে মেয়ে হয়ে জন্মান! মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য যে অপমান প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে হজম করতে হয় সেটা কোনো মানুষকে ভোগ করতে হোক সেটা আমি চাই না।

    ফৌজিয়া খান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.