বইয়ের আলোচনা

বিরলপ্রজ গল্পকারের বিলম্বিত আত্মপ্রকাশ

santonu_kaiser | 30 Jan , 2015  

border=0২০১৪-র বইমেলায় বেরিয়েছে সৈয়দ কামরুল হাসানের প্রথম গল্পের বই তক্ষক ও অন্যান্য গল্প। বইয়ের ফ্ল্যাপ থেকে জানা যাচ্ছে ১৯৮০-২০১২ এর মধ্যে লেখা গল্পগুলি থেকে নির্বাচন করে তাঁর এই বই প্রকাশিত । গল্পের সংখ্যা মাত্র আট: হবিবর মৌলভীর আলো ও আঁধার,তক্ষক, জলঘুম, টুকরো পাতাল, পল্টুর শবযাএা, উত্তরাধিকার, জলকূট,সাং মুমুরদিয়া । তিন দশকের অধিক সময়কালে তাঁর নির্বাচন মাত্র আটটি গল্প ? মুদ্রণ বিস্ফোরণের এই সময়ে প্রস্তুত হতে না হতেই যেখানে ‘লেখক’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া ব্যাধি সেখানে কামরুলের এই অতি-বিলম্ব ও বেশিমাত্রায় সতর্কতার কারণ কী ?

তাঁর গল্পে একধরণের নেতিই যেন বেশি প্রকাশিত। গল্পের চরিত্ররা আলো বায়ুহীন শূন্যতায় বাস করে,দারিদ্র্য অথবা নিয়তি তাদের পিছু নেয় এবং তাদের জীবন যেন মীমাংসাহীন। গল্পের চরিত্ররাই কি হাঁসফাঁস করে, না লেখকের বিষন্নতা তাদের মধ্যে সংক্রামিত হয়? তাঁর সংকলিত দুটি গল্পের নাম ‘জলঘুম’ ও ‘জলকূট’ । দুটি গল্পেই সংকট রয়েছে, প্রথমটায় এনজিওর পটভূমিতে,সে সম্পর্কিত । আতিককে হতদরিদ্র তথা মার্জিনাল অর্থাৎ প্রান্তিক মানুষদের বিষয়ে এমন প্রতিবেদন রচনা করতে হবে যাতে তাদের তহবিল স্ফীত হয় । দাতাদের মন ভেজাতে না পারলে যে তাদের সকলই মিথ্যে হয়ে যাবে । পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যয়ের মধ্যে আতিক কিভাবে পদোন্নতি পাবে সেটাও একটা ভাববার বিষয় । এদিকে ”কর্মীদের বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট তো বটেই,এমনকি চলতি মাসের বেতন এবং মাসখানেক পর গরু জবেহ করার ঈদের বোনাস পর্যন্ত বন্ধ । ” তবু আতিক ”আল্ট্রাপুওর” খুঁজে পায়না, যাতে তার প্রতিবেদনটা বিশ্বাস ও বিক্রয়যোগ্য হয় ।

বিশ্বাস যখন বিক্রয়যোগ্য হয় তখন তা আর বিশ্বাস থাকে না,তার নাম হয় পণ্য । নীলমনি মাঝির জবাবকেও আতিক তাই গুছিয়ে এনজিওর পণ্য করে তুলতে পারে না । এর অন্যতর প্রকাশ দেখি ‘জলকূট’-এ । গল্পের শুরুর অনুচ্ছেদটাই এরকম: ”চোখের সামনে মুছে যাচ্ছিল একটি বাগান । ধীরে.নিঃশব্দে। রাত নামছিল । প্রথমে আবছাভাবে ভূষো কালির মতো । তারপর গলগল করে উপচানো অন্ধকার সবকিছু ভাসিয়ে দেয়।”

কিন্তু গল্পকারের বর্ণনা কখনো কখনো এমন হয় যে,লেখকই সেখানে প্রধান হয়ে ওঠেন । যেমন এ গল্পের একটি লাইন:”সবি অবিভাজ্য সবুজ”। এই গল্প থেকে আরো কয়েকটি উদাহরণ : ”হালকা হাওয়া বয়ে গেলে ঢেউ শীতল আতিথেয়তা বাড়িয়ে দেয়।” ”পানি উল্লাসে ফুলে উঠছিল শাদা পালের মতো আর পীতাভ ক্রোধে ফেটে পড়ছিল ।” ”ঘোর কৃঞ্চমূর্তি ” হতে পারতো এই রাত্রির উপমা কিন্তু মাঝে মাঝে আকাশের কপাট খুলে নেমে আসছিল রূপালি আগুন।”

বইয়ে সংকলিত কামরুলের প্রথম গল্প ‘হবিবর মৌলভীর আলো ও আঁধার’-এর শেষে একটি পাদটীকা রয়েছে । লেখক জানাচ্ছেন,”কবুল করছি এটি একটি ভাববাদী রচনা। চরিত্র ও ঘটনা একান্তই রচনাকারের কল্পনাপ্রসূত।” এভাবে বলে দেয়াটা কতোটা প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক ? নাকি তা গল্পকারের কোন কৌশল? যাই হোক,গল্পগুলোতে লেখকের কল্পনা ও ভাষা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ।

দুই
‘হবিবর মৌলভীর আলো ও আঁধার’ একটি অমীমাংসিত ধাঁধাঁ । গুরু হুজুরের নির্দেশ মেনে সে ভক্তদের কাছ থেকে যেমন ”নেওয়াজ-নজরানা” নেয় না তেমনি ”ফুঁ দেয়া পর্যন্ত” ছেড়ে দিয়েছে । ”বেদায়াতি” কর্মকান্ডেও তার আপত্তি । এমনকি ধর্মীয় লাইনের বড় ভায়রার সঙ্গেও তার বিরোধ। তবু তার জীবনেও অতীন্দ্রিয়তা ঘটে । যত ক্ষুদ্রই হোক,মানুষের জীবন রহস্যময় বটে ।

‘তক্ষক’ গল্পেও রয়েছে অদ্ভুত পরিবেশ। বাড়ির মেয়ে মমতা আজন্ম রোগী, ব্যারামের শিকার । আসমাবিবির এই মেয়ের জায়গা হয় ”ভাঁড়ার ঘরে”। ”ভাঁড়ার ঘরে একটা মটকা পড়ে আছে অদ্ভুত শূন্য। আর আছে পুরনো বাস্তুসাপের মতো অন্ধকার।” মেয়ের মামা হাসমত আলী চাকুরি করেছেন, নানা জায়গায় ঘুরে বেড়ান, হজ্বও করেছেন । গল্পকারের এক লাইনের বর্ণনা বিষয়টিকে স্পষ্ট করে ,”সেই দিল্লি লন্ডন আসমাবিবির একফোঁটা সংসারে ধরে কি ধরে না ।” এই সংসারে বড় ছেলে দায়হীন, ছোট ছেলে ”সিনা টান করে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চায়।” মেয়ের বাপ মনে করে,”বেরাইম্যা ম্ইয়ারে কেডায় নিব। সারা জীবন ভইরা পালন লাগব ।”
কিন্তু হাসমত আলী মেয়ের বিয়ের জন্য প্রস্তাব আনেন এবং জানান, ছেলের জায়গা-জমি আছে, দুই মাসের খোরাকি চলে, স্বভাবচরিত্র ভালো । ”অসুকে(খ) মেয়ের” জন্য ”এর চেয়ে ভালা জামাই অহন কই পাস? ”খোলা জানালাহীন ঘরে হাঁপানির টানে ”মেয়ের বুক হাপরের মত উঠে আর নামে।”

রোগা মেয়ে বলে ওর কোনো বান্ধবী নেই যে, বিয়ের দিন ওকে একটু সাজিয়ে গুছিযে দেবে। ঘরের দেওয়াল ”ক্ষুধাতুর।” বিয়ের দিন বরও আসে না । ”অরা কার কাছে হুনছে মাইয়্যার যম-ব্যারাম-পোলার চাচা মামুরা কি পোলারে গাঙে ভাসাইব?”
গল্পের উপসংহারে দেখি, ভাঁড়ার ঘরের বিছানায় তার ”চার হাত-পা বিছানায় ফেলে একটি পিপাসার্ত পুরনো তক্ষক উবু হয়ে ডাকছে । অবিকল তক্ষক;বাদামি সবুজে ছোপ সারা গায়ে ?”

পুরাণের তক্ষক বাস্তবে। বড় নিষ্ঠুর এই গল্পকার। গল্পের আসমাবিবি যেমন এ বাড়ির সব জীবজন্তু সম্পর্কে ভালো জানেন তেমনি গল্পকারও এত জানেন যে তাঁরও নিষ্ঠুর না হয়ে উপায় নেই। গল্পকার বলছেন আসমাবিবির ‘চোখ-মুখে কঠিন শিলালিপি ।’ গল্পের বাস্তবতার সঙ্গে এই বর্ণনা মানিয়ে যায়, একটুও বানানো বা আরোপিত মনে হয় না । ‘তক্ষক’ সৈয়দ কামরুল হাসানের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য গল্প।

তিন
এই গল্পের বইয়ে মুক্তিযুদ্ধের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে । বইয়ের শেষ গল্প ‘সাং মুমুরদিয়া’ প্রত্যক্ষত মুক্তিযুদ্ধের গল্প। গল্পের শুরুতে ”সাং মুমুরদিয়া”র যে সান্ধ্যবাজারের কথা বলা হয়েছে তার একটি অংশ থেকে বোঝা যায় লেখকের বর্ণনা কতটা যথার্থ ও শৈল্পিক : ”কয়েক হাত দূরে একটু উঁচু মতোন জায়গায় এক নরসুন্দর জনৈক বুড়ো মুসল্লির দাঁড়ি কামিয়ে আনার কাজে ব্যস্ত। পিঁড়িতে বসা খদ্দের, দড়ি দিয়ে অস্থায়ীভাবে টানানো মোটা কুপিবাতির শিখা তার মুখটিকে যেমন খুশি তেমনভাবে আচড়ায় ও মোচড়ায় ।”
গল্পে দুলু ফকিরের সমাধি আছে । কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা “দুলু ফকিরকে নিয়ে একটা গ্রাম্যগীতি রচনার চেষ্টা করছে মুমুরদিয়া জুনিয়র স্কুলের হেডমওলবির এসএসসি ফেল ছেলে জয়নাল প্রামাণিক ।” এক্ষেত্রে সে একটি গল্প গুছিয়ে তোলার চেষ্টা করে। পড়াশোনার প্রতিযোগিতামূলক এই পণ্য-বাজারে গল্পকার জোর দিচ্ছেন সৃজনশীলতার ওপর,পাস-ফেলের ওপর নয় ।
কিন্তু এই গল্পের বাস্তবতাও বড় নিষ্ঠুর। এখানে রাজনীতির জন্য দাঙ্গা-হাঙ্গামা লাগাতে ও খুন করতে হয় এবং তা থেকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য ফায়দাও তুলতে হয়,আর “দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়াতে হলে চাই পার্টির প্রশ্রয়-কি সরকারি কি বিরোধীদল”-ঘুরেফিরে ওরাই যেহেতু ক্ষমতায় যায়, “তাই নিজ বংশের মধ্যেই যুক্তি-পরামর্শ করে দুই বিপরীত অবস্থান টিকিয়ে রাখতে হয় ।”
অতএব মুক্তিযুদ্ধের আবেগে লেখক সত্য ও বাস্তবতাকে বিস্মৃত হন না, বরং হয়ে ওঠেন নির্মম কথাকার ।

চার
বাস্তবতাকে আক্ষরিকভাবে স্পষ্ট করে তোলার জন্যই হয়তো তিনি তাঁর গল্পে কথার পরিবর্তে সংখ্যায় প্রকাশে অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন । যেমন ‘সাং মুমুরদিয়া’তেই রয়েছে এমন উদাহরণ: ‘২/৪টে বিক্রেতা’, ‘২/১ জন লোক’, ‘২/৪ দম’, ‘আবার ২ দিনের পাড়ি’, ‘সারা দিনে ২ বার’, ‘৩ ছেলেমেয়ে নিয়ে হালিমা তখন —’, ‘প্রতিদিন ভোরবেলায় ধনু নদীর বাঁকে ২/৪/১০ টা লাশ এসে আটকাতো।’ ‘স্বামী যুদ্ধে যাওয়ার পর আরও ৯ মাস বউটিকে এখানে ওখানে লুকিয়ে ,অভাবে দারিদ্র্যে খেয়ে না খেয়ে —- এইসব গল্প কে শোনে ?’
কামরুলের প্রায় সব গল্পে ‘জোছনা’র উপস্থিতি এত প্রকট যে মনে হয়,সে নিজেও বুঝি একটি চরিত্র । এ কি গল্পকারের সৌন্দর্যবোধ,না কি নির্মম জীবনের বৈপরীত্য ? যেমন ‘জলঘুম’-এর একটি সামান্য বর্ণনা :”কোনো সৌখিন বউ নিজ খরচাশেষে স্বামীর জন্য কটা বিড়িও কিনে নেয় ।” জোছনারই বর্ণনা ‘তক্ষক’-এ ,”জোছনা জোড়াতালি দিয়েও পোড়াকপালে রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না ।’
গল্পের শব্দ ব্যবহারও কখনো কখনো তৃণমূলীয় ও বাস্তবানুগ । যেমন ভাল ‘বালা’,অসুখ ‘অসুক’,ভাইজান ‘বাইজান’,ভাগ্যে ‘বাইগ্যে’,কিন্তু আবার লেখকের বর্ণনায় তা পরিশীলিতও হয়ে ওঠে,যেমন ‘হিতৈষী আঙুল’। এই নিরীক্ষা সুক্ষ্ন হলেও মাঝে মাঝে গল্পের জন্য বেশ দরকারিও হয়ে ওঠে ।
গল্পের উপসংহারও তাকে নৈর্ব্যক্তিক ও শিল্পসম্মত করে । দুটি উদাহরণ :
ক. মাঝে মাঝে অল্প হাওয়ায় জ্যোস্নায় নীলমনির নাও দোল খায় । (জলঘুম)
খ. মেঘের ওপর বেলা আরো গড়িয়ে যায় । (টুকরো পাতাল)

পাঁচ
স্বভাবের বাইরে কেউ নন । গল্পকারও নন । তবে আশা করা কি যায় না সৈয়দ কামরুল হাসান ভবিষ্যতে আরও একটু বেশি লিখবেন ?

তক্ষক ও অন্যান্য গল্প
সৈয়দ কামরুল হাসান
প্রকৃতি,কাঁটাবন,ঢাকা;ফেব্রুয়ারি,২০১৪
প্রচ্ছদ:শিবুকুমার শীল
মূল্য : ১২০ টাকা
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.