অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 21 Jan , 2015  

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১৪

হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া শেষ পর্যন্ত পেয়ে যায় যা খুঁজছিল; ঘড়ির যন্ত্রপাতির সঙ্গে এক দড়ির নর্তকীর সংযোগ ঘটিয়ে ফেলে আর তাতে খেলনাটা নিজস্ব সুর আর ছন্দের সঙ্গে একটানা তিনদিন নেচে যায় । এই আবিস্কারটা তার উদ্ভাবিত অন্য যে কোন ক্ষ্যাপাটে প্রচেষ্টার চেয়ে বেশী সফলকাম হবে মনে করে, খাওয়া ছেড়ে দেয় আবার । ঘুমও দেয় ছেড়ে । উরসুলার সার্বক্ষণিক পাহারা আর সাবধানতা না থাকায় তার অলীক কল্পনা এমন এক মানসিক অপ্রকৃতিস্থতার দিকে নিয়ে যায় তাকে, যে কখনই তার আগেকার অবস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না । উচ্চস্বরে চিন্তা করতে করতে রাত কাটিয়ে দিত ঘরময় পায়চারী করে; আর খুঁজে বেড়াত দোলনের সূত্রটাকে, বলদটানা গাড়ির সঙ্গে মই বা অন্য যে কোন কিছুর গতির সংযোগের সম্ভাবনাকে । অনিদ্রার জ্বর তাকে এতই অবসন্ন করে ফেলে যে এক প্রভাতে সাদা চুলের মাথার বৃদ্ধটাকে চিনতে পারে না, আর সে তার শোবার ঘড়ে ঢুকেছে কিনা সে ব্যাপারেও ছিল অনিশ্চিত । সে ছিল প্রুদেন্সিও আগিলার, শেষ পর্যন্ত যখন চিনতে পারে মৃতরাও বার্ধক্য বরন করে দেখে আশ্চর্যান্বিত হয় আর স্মৃতিকাতরতা নাড়া দিয়ে যায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে । “প্রুদেন্সিও”- কাতর কন্ঠে বলে সে “কিভাবে এত দূর থেকে এসেছ!” মৃত্যুর এত বছর পর জীবিতদের প্রতি তীব্র টান, গুরুত্বপূর্ণ একজন সঙ্গীর প্রয়োজন আর নিকটবর্তী মৃত্যুর ভিতরের আর এক মরণ এতই ভয়ংকর ছিল যে প্রুদেন্সিও আগিলার শেষ পর্যন্ত ভালবেসে ফেলে তার সবচেয়ে বড় শত্রুকেও । তাকে অনেক বছর যাবৎ খুঁজে বেড়াচ্ছে সে । রিওআচার মৃতদের কাছে শুধিয়েছে সে, শুধিয়েছে উপরে উপত্যকার থেকে আসা মৃতদের, যারা আসত জলাভূমি থেকে, তাদেরকেও । কেউই দিতে পারেনি ঠিকানা, কারন মৃত মেলকিয়াদেসের আসা পর্যন্ত মৃতদের কাছে মাকন্দো ছিল অজ্ঞাত এক গ্রাম আর মেলকিয়াদেস দেখিয়ে দেয় গ্রামটাকে, মৃতদের বহুরঙা মানচিত্রে কালো একটি ছোট্ট ফোটা এঁকে । হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া গল্প করে সকাল পর্যন্ত প্রুদেন্সিও আগিলারের সঙ্গে । অল্প কয়েক ঘন্টা পর নিদ্রাহীনতায় পরাস্ত হয়ে আউরেলিয়ানোর কর্মশালায় ঢুকে জিজ্ঞেস করে – “আজ কি বার” আউরেলিয়ানো উত্তর দেয়- “মঙ্গলবার” । “আমিও তাই ভেবেছিলাম” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “কিন্তু শীঘ্রই বুঝতে পারি যে, আজও গতকালের মতই সোমবার, আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ, দেখ, দেয়ালগুলোকে আর বেগনিয়াদের, কিছুই বদলায়নি । সুতরাং আজও হচ্ছে সোমবার” । আউরেলিয়ানো তাকে গুরুত্ব দেয় না । পরেরদিন বুধবারে হোসে আরকাদিও বুয়েন্দিয়া আবার হাজির হয় কর্মশালায় । “এটা হচ্ছে এক দুর্বিপাক”- বলে- “আকাশের দিকে দেখ, শোন সূর্যের গঞ্জরন, গতকাল আর গত পরশুর মতই । সুতরাং আজও সোমবার” । সেই রাত্রে পিয়েত্র ক্রেসপি ওকে পেল বারান্দায়; কাঁদছে; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, বৃদ্ধদের মত কোন আলোড়ন সৃষ্টি না করে । কাঁদছে প্রুদেন্সিও আগিলারের জন্য, মেলকিয়াদেসের জন্য, রেবেকার বাবা মার জন্য,ওর নিজের বাবা মার জন্য, যাদের কথা মনে করতে পারছে তাদের জন্য, আর যারা ছিল মৃত্যুর পর নিঃসঙ্গ তাদের জন্য । পিয়েত্র ক্রেসপি তাকে উপহার দেয় এক দড়ির ভালুক যেটা এক তারের মাধ্যমে দুই পায়ের উপর হাটতে পারে কিন্তু আচ্ছন্নতা থেকে তার মনোযোগ সরাতে সক্ষম হয় না । ওকে জিজ্ঞেস করে একটা পেন্ডুলামের মেশিন বানানোর সম্ভাবনার কথা যেটা মানুষকে উড়তে সাহায্য করবে আর ওর কাছ থেকে জবাব আসে: এটা অসম্ভব, কারন পেন্ডুলাম যে কোন কিছুই শূন্যে উত্তোলন করতে পারে কিন্তু নিজেই নিজেকে উত্তেলিত করতে পারে না । বৃহস্পতিবার আবার গিয়ে হাজির হয় কর্মশালায়, ছাড়খাড় হয়ে যাওয়া জমির মত যন্ত্রণাক্লিষ্ট চেহারা নিয়ে । “সময়-মেশিনটা নস্ট হয়ে গেছে”, প্রায় ফুঁপিয়ে উঠল- “আর উরসুলা ও আমারান্তা কতও দূরে” । আউরেলিয়ানো ওকে ভর্ৎসনা করে বাচ্চাদের মত আর সে বিনীতভাবে তা মেনে নেয় । আগেরদিনের সঙ্গে একটি পার্থক্য নির্ণয়ের জন্য জিনিসপত্রগুলো পরীক্ষা করে ছয় ঘন্টা ধরে সময়ের সাথে যদি কোন পরিবর্তন ঘটে তা বের করার অপেক্ষায়, সারা রাত বিছানায় কাটায় চোখ খোলা অবস্থায় । প্রুদেন্সিও আগিলারকে, মেলকিয়াদেসকে, আর সব মৃতদেরকে ডাকাডাকি করে যাতে তারা তার এই অস্বস্তিকর অবস্থা ভাগ নিতে পারে । কিন্তু কেউ আসে না । শুক্রবার সকলে ঘুম থেকে জাগার পূর্বেই সে আবার প্রকৃতির অবস্থা পরীক্ষা করে আর তাতে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকে না যে তখনও সোমবারই চলছে । সুতরাং দরজার এক হুড়কো নিয়ে, শয়তানে ভর করা মানুষের মত অনর্গল আর সম্পূর্ণরূপে দুর্বোধ্য অশ্লীল ভাষায় চিৎকার করতে করতে তার প্রচন্ড শক্তির বুনো হিংস্রতায় ভেঙ্গে ধংস করে চলে আলকেমির যন্ত্রপাতি, দাগেরোটাইপের আলমারি, রুপার কর্মশালা যতক্ষন পর্যন্ত না ওগুলো ধুলায় পরিনত হয় । এরপর যখন বাড়িটার অবশিষ্টাংশও ভাঙার উপক্রম করে আউরেলিয়ানো তখন প্রতিবেশিদের সাহায্য নেয় । দশজন লোকের প্রয়োজন হয় তাকে ধরাশায়ী করতে আর বিশ জন লাগে উঠানের চেস্টনাট গাছটা পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে, যেখানে তাকে বেঁধে রাখে ওরা মুখ দিয়ে সবুজ গেজলা বেরুনো অদ্ভুত ভাষায় ঘেউ ঘেউরত অবস্থায় । যখন উরসুলা আর আমারান্তা ফিরে আসে তখনও সে চেস্টনাটের গুঁড়ির সঙ্গে হাত পা বাঁধা অবস্থায় বৃষ্টিতে ভিজে চেহারায় সম্পূর্ণ এক সারল্য নিয়ে বসে আছে । কিছু বলা হলে ওদের দিকে দৃষ্টি ফেলে চিনতে না পেরে দুর্বোধ্য কিছু কথা বলে । দড়ির ক্ষতের কারণে উরসুলা কব্জি আর গোড়ালি মুক্ত করে দেয় । একমাত্র বাঁধা থাকে কোমড়ের সঙ্গে । পরে রোদ আর বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য তালপাতার এক ছাউনি তুলে দেয় ওখানে ।

আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়া আর রেমেদিওস মসকতের বিয়ে হয় মার্চের এক রোববারে, অতিথিদের বসার ঘরে ফাদার নিকোলাস রেইনার দ্বারা বানানো এক বেদীর সামনে । মসকতের বাড়িতে ঘটনার আকস্মিকতার ধাক্কা চার সপ্তাহ ধরে ছিল চরম সীমায়, কারন বাল্যাভ্যাস ত্যাগের আগেই তার যৌনলোম গজিয়ে যায় । যদিও ওর মা ওকে বয়োসন্ধিকালের পরিবর্তনের ব্যাপারে শিক্ষা দিয়েছিল তবুও প্যান্টিতে মাখানো গাড় বাদামী চকলেট বর্ণের এক পড়তা তরল পদার্থ দেখিয়ে চিৎকার করে আউরেলিয়ানো ও তার বোনদের আলাপচারিতায় বাঁধার সৃষ্টি করে । ঠিক করা হয় বিয়েটা হবে এক মাসের মাথায় । এই সময়টুকুতে শুধুমাত্র ওকে শিখাতে পারা গিয়েছিল গোসল করা, নিজেই নিজের কাপড় পরা আর বোঝাতে পারা গিয়েছিল গৃহস্থালির মৌলিক কিছু কাজ । বিছানা ভিজানোর অভ্যাস বর্জন করানোর জন্য তাকে প্রশ্রাব করানো হল গরম ইটের উপর । বৈবাহিক জীবনের গোপনীয়তার অলঙ্ঘনীয়তার কথা তাকে বোঝাতে প্রচুর কষ্ট করতে হয় কারণ রেমেদিওস ব্যাপারটা খোলাশা করে বলায় এতই অভিভুত হয় আর একই সাথে এতই আশ্চর্যান্বিত হয় যে সমস্ত পৃথিবীকে জানিয়ে দিতে চায় বিয়ের রাতের বিস্তারিত বিষয়গুলো । ভীষণ ক্লান্তিকর চেষ্টার ফলে দেখা গেল উৎসবের নির্দিষ্ট দিনে জাগতিক বিষয়াবলী সম্বন্ধে সে তার অন্যান্য বোনদের মতই ছিল পটু । ফুল আর পুস্পমালা দিয়ে সাজানো রাস্তায় বাজির শব্দ আর বিভিন্ন বাদ্যদলের বাজানো গানের মধ্য দিয়ে দন আপলিনার মসকতে যখন ওর বাহু ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন হাসি উপহার দিয়ে আর হাত নেড়ে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল যারা ওকে জানালা থেকে শুভ কামনা জানাচ্ছিল তাদেরকে । অল্প কয়েক বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সম্মুখে সেই একই ধাতব বন্ধনীসহ একই জুতো আর কালো কোট প্যান্ট পরিহিত আউরেলিয়ানো যখন বাড়ির দোরে বরণ করে বেদীর সম্মুখে নিয়ে যায় তখন তার মুখ ছিল পান্ডুর আর গলায় অনুভব করছিল গিলতে না পারা একটা দলা । তখন রেমেদিওসের ব্যবহার এতই স্বাভাবিক ছিল, ছিল এত বিচক্ষন যে কখনই সে তার শান্ত ভাব হারায় না। এমনকি যখন আঙটি পরানোর চেষ্টা করা হয় আউরেলিয়ানোকে তখনও না । আপ্যায়িতদের গুঞ্জরন আর বিশৃঙ্খলার মাঝে সে তার লেসের দস্তানা পরা হাত উচু করে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যতক্ষন পর্যন্ত না তার প্রেমিক বুট দিয়ে আংটিটাকে থামাতে পারে দরজা পর্যন্ত গড়িয়ে যাওয়ার আগেই আর বেদীতে ফিরে আসে লজ্জায় লাল হয়ে। উৎসবের সময় সে কোন অশোভন কাজ করে এই ভয়ে ওর মা আর বোনেরা এতই তটস্থ ছিল যে শেষ পর্যন্ত তারাই ওকে একটা চুমু খাওয়ার জন্য কোলে নেয়ার মত অশিষ্টতা দেখায় । প্রতিকূল অবস্থায় সে যে রকম দায়িত্বের, স্বাভাবিক মাধুর্য আর স্বচ্ছন্দ নিয়ন্ত্রণের পরিচয় দেবে সেটা সেদিন থেকেই প্রকাশিত হয় । সে-ই নিজের উদ্যোগে বিয়ের কেকটার সবচেয়ে ভাল অংশ আলাদা করে রাখে আর একটা থালা ও একটা কাটা চামচ সাথে নিয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে দেয় ।

চেস্টনাট গুড়ির সাথে বাঁধা তালপাতার ছাউনির নিচে এক কাঠের টুলের উপর উবু হয়ে বসে থাকা, রোদ আর বৃষ্টির ফলে বিবর্ণ এই অতিকায় বৃদ্ধ এক কৃতজ্ঞতার হাসি দেয় আর অবোধগম্য এক স্তব উচ্চারন করতে করতে আঙুল দিয়ে ধরে খেয়ে নেয় । সোমবার সকাল পর্যন্ত চলতে থাকা সেই হট্টগোলে ভরা উৎসবে একমাত্র অসুখী ছিল রেবেকা বুয়েন্দিয়া । এটা ছিল ওর জন্য বিরক্তিকর উৎসব । উরসুলার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একই দিনে ওর বিয়েও উদযাপন করার কথা ছিল। কিন্তু শুক্রবার মার মরণাপন্নতার সংবাদসহ এক চিঠি পায় পিয়েত্র ক্রেসপি । সুতরাং তার বিয়ের দিন বদলানো হয় । চিঠি পাওয়ার এক ঘন্টার মধ্যে পিয়েত্র ক্রেসপি প্রাদেশিক রাজধানীতে চলে যায় আর শনিবার ঠিক সময়ে আউরেলিয়ানোর বিয়ের উৎসবে চলে আসে । অন্যদিকে শনিবার দিন ঠিক সময় মত তার মা একই সময় রাস্তায় বেরিয়ে পথে পিয়েত্রকে অতিক্রম করে ।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0
তার মা আউরেলিয়ানোর বিয়েতে এলে আরিযা ত্রিস্তে গানটা গায়, যেটাকে সে ছেলের বিয়েতে গাওয়ার জন্য তৈরী করেছিল । এদিকে পিয়েত্র ক্রেসপি সঠিক সময়ে বিয়েতে পৌঁছুনোর চেষ্টায় রাস্তায় পাঁচ পাঁচটি ক্লান্ত ঘোড়া বদলিয়েও রোববার মধ্যরাতে উৎসবের ছাই ঝাড়ু দিতে ফিরে আসে । চিঠিটার প্রেরকের ব্যাপারে সে কখনোই কোন অনুসন্ধান করেনি । উরসুলার জেরায় ক্লিষ্ট আমারান্তা তখনও ছুতোরদের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে অবিচ্ছিন্ন বেদীটার সামনে তার নির্দেষিত শপথ করে । বিয়ে পড়ানোর জন্য জলাভূমি থেকে দন আপলিনার মসকতে নিয়ে এসেছিল ফাদার নিকানোর রেইনাকে, যে ছিল তার নিজের যাজক গোষ্ঠীর প্রতি অকৃতজ্ঞতায় মন কঠিন হওয়া এক বৃদ্ধ । গায়ের চামড়া ছিল কোচকানো আর দেহটা ছিল শুধুই হাড়বিশিস্ট, পেটটা ছিল লক্ষনীয় আর গোলাকার, আর চেহারায় ছিল এক বৃদ্ধ দেবদুতের অভিব্যক্তি যেটা যতটা না ছিল ভালোমানুষির জন্য তার চেয়েও বেশী ছিল সরলতার জন্য । বিবাহোৎসবের পর নিজের গির্জায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। কিন্তু মাকন্দোবাসীদের বিধর্মীতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে পরেন তিনি, কারণ ছেলেমেয়েদের ব্যাপটাইজ না করিয়ে, উৎসবগুলোকে ধর্মীয়ভাবে না উদযাপন করে সাধারণ আদি-প্রাকৃতিক নীতিতে চলে। বিভিন্ন কুকাজের মধ্য দিয়েও উন্নতি করে চলছে এরা । এখানকার চেয়ে পৃথিবীর আর কোনো জায়গাতেই ঈশ্বরের বীজমন্ত্রের এত প্রয়োজন নেই বুঝতে পেরে খৎনাধারী আর পৌত্তলিকদের খ্রীস্ট ধর্মে দীক্ষা দিতে, বিয়ে না করে সহাবস্থানকারীদের বিয়ের মন্ত্র পরিয়ে বৈধ করার আর মুমূর্ষুদের সাক্রামেন্ট (খ্রীস্ট ধর্মীয় বাধনে বাঁধা) করার জন্য আরও এক সপ্তাহ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি । কিন্তু কারুরই মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হন না তিনি । মাকন্দোবাসী তাকে বলে যে তারা পাদ্রিবিহীন বাস করে চলছে অনেকদিন যাবত । আত্মার ব্যাপারগুলো তারা সরাসরি ঈশ্বরের সঙ্গে ঠিকঠাক করে । যার ফলে নশ্বর পাপের খারাপ ব্যাপারটা কেটে গেছে তাদের । মরুভুমিতে ধর্মোপদেশ দিয়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন এক গির্জা তৈরী করার যেটা হবে পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় । থাকবে প্রমাণ আকারের সেইন্টদের মূর্তি, দেয়াল হবে রং বেরঙের কাঁচ দিয়ে তৈরী, যাতে করে রোম থেকেও লোক আসবে এই নাস্তিকতার মাঝখানে ঈশ্বরকে সম্মান জানাতে । তামার এক বাসন নিয়ে সব জায়গায় দাক্ষিণ্য চেয়ে বেড়ান উনি। ওকে অনেক দেয়া হত কিন্তু সে চাইত আরও বেশী কারণ গির্জাটার ঘণ্টাটা এমন হতে হবে যে ঘন্টার গর্জন ডুবন্তদেরও ভাসিয়ে তুলবে । এতই অনুনয় করতেন যে এতে করে তার গলা ভেঙে যায়, আর হাড়গোর ভরে ওঠে শব্দে । এক শনিবার, তখনও এমনকি দরজাগুলোর খরচের টাকাও একত্রিত করতে পারেননি, প্রচন্ডভাবে হতাশ হয়ে পরেন । প্লাজায় এক বেদী তৈরী করে হাতে অনিদ্রার সময়ের মত এক ঘন্টি নিয়ে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়ান এক উন্মুক্ত উপাসনা উৎসবের ঘোষণা করে । কৌতূহলবশত অনেকেই যোগ দেয় । অন্যেরা যোগ দেয় স্মৃতিকাতরতায় । আর অন্যেরা যোগ দেয় ঈশ্বর যেন তার এই মধ্যস্থতার অবজ্ঞা নিজস্ব অপমান হিসেবে না নেন । এভাবেই সকাল আটটার সময় অর্ধেক গ্রাম গিয়ে জমায়েত হয় প্লাজায়, যেখানে ফাদার নিকোলাস রেইনা ধর্মীয় সংগীত গায় তার অনুনয়ের কারণে ভাঙা গলায়। উপাসনা শেষে যোগদানকারীদের দলটা যখন বিচ্ছিন্ন হতে শুরু করেছে, তখন তিনি হাত তোলেন সকলের মনোযোগ আকর্ষণ করতে । -“এক মিনিট”- বলেন, “ এবার আমরা দেখব ঈশ্বরের বিতর্কাতীত অসীম ক্ষমতার প্রমাণ ।”

যে ছেলেটা তাকে এই উপাসনা উৎসবে সাহায্য করে সে এক কাপ ঘন ধুমায়িত কফি এগিয়ে দেয় আর উনি এক নিঃশ্বাসে তা পান করেন । পরে আস্তিন থেকে একটি রুমাল বের করে ঠোঁটগুলো মুছে হাত ছাড়িয়ে চোখ দুটো বন্ধ করেন । এসময়ই মাটি থেকে বারো সেন্টিমিটার উপরে উঠে যান তিনি । এটা ছিল বিশ্বাস জন্মানোর এক ভালো পন্থা । এভাবেই পরে দিকে অনেকদিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে চকলেট দিয়ে বানানো উত্তেজকের মাধ্যমে শূন্যে উঠে ঈশ্বরের ক্ষমতার প্রমাণ দেখাতেন উনি আর তার বেদীতে সাহায্যকারী বালক তখন এক থলিতে টাকা তুলত । এভাবেই এক মাসের কম সময়ের মধ্যে আরম্ভ করে দেয়া হল গির্জা বানানোর কাজ । এক সকালে যখন আর একবার সেই শূন্যে উত্তোলনের প্রদর্শনী দেখতে একদল লোক চেস্টনাটের নীচে জমায়েত হয় তখন একমাত্র হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ব্যতীত কেউই তার এই স্বর্গীয় প্রদর্শনীর উৎসের ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করে না ।

একটু সোজা হয়ে বসে কাঁধটাকে নীচু করে যখন ফাদার নিকানোর রেইনা যে চেয়ারটায় বসেছিলেন সেটা শুদ্ধ মাটির উপরে উঠে যেতে শুরু করে, তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বলে –“হক এস্ত সিমপ্রিসিসিমাস । হোমো ইস্তে স্ট্যাটাম কোয়ারটাম ম্যাটারিয়ে ইনভেনিট । (এটা তো খুবই সহজ ব্যাপার । মানুষই আবিস্কার করেছে এই জিনিসটা) ফাদার নিকানোর হাত দুটো উঁচু করেন আর চেয়ারটার চারটে পা একই সঙ্গে মাটিতে স্থান নেয় । -নেগ- বলেন – ফ্যাক্টুম হক একজিস্টেনসিয়াম দেই প্রোব্যাত সিনে দুবিও । ( না- বলেন- এটাই হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্বের সন্দেহাতীত প্রমাণ) এভাবেই উনি বুঝতে পারেন যে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার শয়তানে ভর করা দুর্বোধ্য বুলিটা হচ্ছে লাতিন । আর তিনিই একমাত্র লোক যিনি লাতিনে তার সাথে যোগাযোগে সক্ষম । এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে ফাদার নিকোনার তার শৃঙ্খলাহীন মস্তিষ্কে ঈশ্বরের বিশ্বাস রোপনের চেষ্টা করেন । প্রতি বিকেলে চেস্টনাটে গুড়ির পাশে বসে লাতিনে তাকে ধর্মোপদেশ দিতেন কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এক গুঁয়েমির সঙ্গে এই বাগাড়ম্বরপূর্ণ কথার মারপ্যাচ, এমনকি চকলেটের রূপান্তরকেও গ্রহণযোগ্য মনে করে না আর দাবি করে যে একমাত্র দাগেরটাইপই হচ্ছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব প্রমাণের একমাত্র উপায় । সুতরাং ফাদার নিকানোর তার কাছে নিয়ে যায় মেডেল, বিভিন্ন ধর্মীয় ছবি, এমনকি ভেরনিকার ছবি আঁকা কাপড়ের এক প্রতিরূপ কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে কারণ এগুলো হচ্ছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিহীন হস্তশিল্প । সে ছিল এতই একগুঁয়ে যে শেষ পর্যন্ত ফাদার নিকোনার তার খ্রীস্টধর্মী প্রচেষ্টায় ক্ষান্ত দিয়ে তার সঙ্গে দেখা করা চালাতে থাকেন মানবতার খাতিরে ।

অতএব হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া উদ্যোগ নেয় যুক্তি দিয়ে ফাদারের ঈশ্বর বিশ্বাস ভেঙে দিতে । মাঝে মাঝে ফাদার নিকোনার চেস্টনাটের কাছে নিয়ে যেত পাশা খেলার বোর্ড আর এক গুটি তাকে খেলায় আমন্ত্রণ জানাত কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া খেলতে অস্বীকার করে । কারণ হিসাবে জানায় যে খেলাগুলোর নিয়ম কানুনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা আগে থেকেই একমত, সেই খেলাগুলোর উদ্দেশ্য সে কখনই বুঝতে পারেনি । ফাদার নিকোনার কখনই পাশা খেলাকে এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেননি আর এতে করে তিনি কখনই আর খেলাটা খেলেননি । প্রতিবারই হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার প্রাঞ্জলতায় আরও বেশী বিস্মিত হয়ে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেন যে এটা কি করে সম্ভব যে সে একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা । -“হক এস্ত সিমপ্লিসিজিমম” সে উত্তর দেয়- “কারন আমি পাগল। “
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১০ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-১৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


1 Response

  1. আনিস says:

    প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Prodip — আগস্ট ১৩, ২০১৪ @ ১২:২৫ অপরাহ্ন
    ধন্যবাদ , সুন্দর উদ্যোগ, একেবারে স্পানিশ থেকেই অনুবাদ। এর আগে আরও অনুবাদ পড়েছি, বুঝতে অসুবিধা হয়েছে, তাই এখন আবার ইংরেজি পড়ছি । বাংলায় অনুবাদের সমস্যা হল, এক লাইনে সুদীর্ঘ বর্ণনার যে অনবদ্য মুন্সীয়ানা মার্কেসের আছে,তার স্পানিশের জাদুতে(অনুমান করতে পারি) যেভাবে ফুটিয়ে তোলা গেছে, বাংলা গদ্যে তার সেই ব্যঞ্জনা হয়ত সেভাবে ধরে রাখা সম্ভব নয় । তাই সেটা হয়তো দুর্বোধ্য হবে, নয়ত তা কবিতার অনুরনন তৈরি করবে। গদ্যের ভঙ্গী ছেড়ে যদি তা কবিতার কাছাকাছি চলে যায়, তাতে ঘটনার দৃশ্যমানতা কী বাধাপ্রাপ্ত হবে না? তাই আমার একান্ত বিশ্বাস, মূল লাইনটা যদি ভেঙ্গে, যতি দিয়ে, দ্বিধা বা ত্রিধা বিভক্ত করে ঘটনার চিত্রটাকে অনুরূপ রেখে প্রকাশ করা যায়,তাতে পাঠকের অর্জন অপরিমিত হবে । “এমনকি বহু দিন আগে থেকে খুঁজে না-পাওয়া জিনিসগুলো বেরিয়ে আসে একই জায়গা থেকে, যেখানে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয়েছিল, আর স্ক্রু-পেরেকগুলো বেরিয়ে না আসতে পারার যন্ত্রণায় ক্যাচকেচিয়ে ওঠে। ” ‘মরিচা-ধরা’ না হয়ে কী ‘মরচেপড়া’ হলে আরও শ্রুতি মধুর হতো না ?
    আবারো ধন্যবাদ, আগামী কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম ।

    Prodip>>> এখন কেমন হচ্ছে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.