সাক্ষাৎকার, স্মৃতি

মহাশ্বেতা দেবী: সাক্ষাতে, অসাক্ষাতে

avijit_sengupta | 10 Jan , 2015  

maha.jpgমহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে সাক্ষাতের কথা ভাবলে মুহূর্তের জন্য আমার মনে ভেসে ওঠে বহুদিন বহু বিষয়ে তার সঙ্গে আমার আলোচনার কথা, যা আমাকে ক্রমশ শ্রদ্ধাশীল কৌতূহলী করে তুলেছিল তার সম্বন্ধে। কয়েক মুহূর্তের সাক্ষাৎকার আর কতটুকু নতুন কথা বলতে পারে একজনের সম্বন্ধে, যখন তার সান্নিধ্যধন্য বহু মুহূর্ত জমা হয়ে আছে বুকের মধ্যে।

যার বই তখন অনেক পড়ে ফেলেছি কিন্তু চাক্ষুষ দেখা হয়ে ওঠেনি– কেন না তার সম্ভাবনাই ঘটেনি– সেই মহাশ্বেতা দেবীকে চোখে দেখার বিবরণ আমি শুনেছিলাম প্রখ্যাত অলঙ্করণশিল্পী আমার ভাই যুধাজিৎ সেনগুপ্তের কাছে, যিনি তখন মহাশ্বেতা দেবীর অচিরেই প্রকাশিতব্য গ্রন্থ এককড়ির স্বপ্ন বইয়ের অলঙ্করণের ভার নিয়েছেন। সে অনেককাল আগেকার কথা– মহাশ্বেতা দেবী তখন থাকেন কাঁকুলিয়ার বাড়িতে।

অলঙ্করণের বিষয়ে কিছু কথাবার্তা বলার জন্য যুধাজিৎ তার বাড়ি গিয়েছিলেন দুপুরবেলা। ব্যক্তিগতভাবে যাওয়া এটা নয়, যুধাজিতের প্রকাশকের তরফ থেকে রীতিমতো কাজের জন্যই যাওয়া। মহাশ্বেতা দেবী বললেন যুধাজিৎকে দুপুরবেলাই যখন সে এসে পড়েছে তখন ভাত খেয়ে যাওয়ার জন্য। স্বভাবতই সঙ্কোচবোধ করছিলেন যুধাজিৎ। কিন্তু মহাশ্বেতা দেবী শুনলেন না। ভাত খেতেই হলো তাকে শেষাবধি। কিন্তু এরপর মহাশ্বেতা দেবী যা করলেন তা সত্য অর্থে হয়ত মোটেই অস্বাভাবিক নয়, বরং খুবই স্বাভাবিক কিন্তু আজ এই ঘুরপাক-খাওয়া সময়ের কবলে পড়ে স্বভাব-অস্বভাবের সীমানাগুলোই তো বিপর্যস্ত হয়ে গেছে। বোধহয় লোডশেডিং ছিল, তখন ফ্যান চলছিল না। মহাশ্বেতা দেবী একটা হাতপাখা তুলে এনে আমার ভাইয়ের কাছে বসে তাঁকে হাওয়া করতে লাগলেন। যুধাজিৎ স্বভাবতই সাংঘাতিক বিব্রতবোধ করছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী তখন অত্যন্ত খ্যাতকীর্তি শ্রদ্ধেয় একজন লেখিকা। আমার ভাই তখনও সে-অর্থে বিখ্যাত হয়ে ওঠেনি– তার শিল্পী জীবনের গোড়ার কথা এটা। বারবার হাওয়া না করার জন্য অনুনয় বিনয় করা সত্ত্বেও মহাশ্বেতা দেবী খাওয়া শেষ না হওয়া অবধি হাওয়া করে গেলেন যুধাজিৎকে।

মহাশ্বেতী দেবীর এই ব্যবহার খুবই ব্যতিক্রমী নাকি খুবই স্বাভাবিক– জানি না; আমি কিন্তু ভাইয়ের কাছ থেকে শোনার পর ঘটনাটা মনে খুবই দাগ কেটে গিয়েছিল, মনে আছে আমার।

২০০৫ সাল সেটা সিঙ্গুরের জমি নিয়ে তুমুল রাজনৈতিক বাদবিসম্বাদ শুরু হয়েছে। আর মহাশ্বেতা দেবী সিঙ্গুরের জমি দখলের বিরুদ্ধে নিয়মিত লিখে চলেছেন দৈনিক স্টেটসম্যান পত্রিকায়। তখন আমি এই সংক্রান্ত কোনো একটা ব্যাপারেই গিয়েছিলাম তার কাছে। ঠিক কী কারণে এতদিন পর আর স্পষ্ট মনে নেই। নিজের কী পরিচয় দেব ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ‘দেশ’-এ ইতিমধ্যে আমার বেশ কিছু গল্প কবিতা প্রকাশিত হয়েছে, ‘আনন্দবাজার’-এ প্রতিকৃতিসহ গল্পও। সাহস করে নিজেকে একজন দীন সাহিত্যকর্মী হিসেবে পরিচয় দেওয়াই যেত; কিন্তু কেন যেন ঠিক উৎসাহ পাচ্ছিলাম না নিজের সেই পরিচয় দিতে। প্রবীণ-নবীন কত লেখক-লেখিকারাই তো লিখছেন। তার মধ্যে আমার লেখাপড়া ও পড়ে তা আবার মনে করে রাখার কোনো কারণই নেই মহাশ্বেতা দেবীর। আমাকে বাইরের ঘরে বসিয়ে পরিচারিকা ভেতরে গেলেন মহাশ্বেতা দেবীকে খবর দিতে। আমি বাইরের ঘরে বসে ভাবছি, কী পরিচয় দেব। মহাশ্বেতা দেবী ঘরে ঢুকতে আমি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম– আমি যুধাজিৎ সেনগুপ্তের ভাই, যে আপনার এককড়ির স্বপ্ন বইয়ের ছবি এঁকেছিল।

মনে হচ্ছিল মহাশ্বেতা দেবী যেন স্মৃতি হাতড়ালেন কয়েক মুহূর্ত মনে করার জন্য। পারলেন কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। দেখা হলে মহাশ্বেতা দেবীকে যে-কথাটা বলব বলে অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম, সেটাই হঠাৎ বলে ফেললাম– আমার ভাইয়ের কাছে শুনেছি আপনি আমার ভাইকে ভাতের থালার সামনে বসিয়ে তাকে পাখা দিয়ে হাওয়া করেছিলেন।

এখানে বলে রাখি মহাশ্বেতা দেবীর কাছে নিজের পরিচয় দেওয়ার অন্য একটি সূত্র ছিল। বাহাত্তর-তিয়াত্তর সাল নাগাদ আমি তখন ‘সপ্তাহ’ পত্রিকায় ধারাবাহিক লেখা লিখছি। নবারুণ ভট্টচার্যও নিয়মিত লিখতেন সেই পত্রিকায়। সেই সূত্রেই আলাপ। সপ্তাহ-য়ের আড্ডায় গল্পগুজব করতাম সবাই মিলে। তার ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে– এভাবেও আমার প্রাথমিক পরিচয় আমি পেশ করতে পারতাম মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। কিন্তু এসবের মধ্যে না গিয়ে আমি আমার ভাইয়ের পরিচয়টাই কেন পছন্দ করলাম, সে কথা আগেই বলেছি। আমার কথায় মহাশ্বেতা দেবীর মুখে কোনো ভাববিকার লক্ষ করলাম না। আমার কথা যে তার মনে কোনোরকমের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে এমন মনে হলো না। এর পরে আর একজনের সাক্ষাৎকারে জেনেছিলাম মহাশ্বেতা দেবীকে যখন প্রশ্ন করা হলো কোনো ব্যাপারে তিনি খুব বিরক্তবোধ করেন। তিনি উত্তর দিলেন আত্মপ্রশংসা শুনতে তিনি অত্যন্ত বিরক্তিবোধ করেন; কেননা, প্রশংসা পাওয়ার মতো কোনো কাজই নাকি তিনি করেননি।

আমার আজও মনে প্রশ্ন জাগে, আমার সেদিনকার উক্তি কি তার কাছে প্রশংসার মতোই ঠেকেছিল? তাহলে সেটা আমার নিজেকে প্রকাশ করার অক্ষমতা। আমি সেদিন শুধু আমার মুগ্ধতাই প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম।

সাক্ষাৎকার তার সঙ্গে এর পরে আমার যা হয়েছে তা মূলত সাহিত্য নয়, সমাজ পরিবেশ ও রাজনীতি বিষয়েই। দাগেস্তানের কবি রসুল গামজাতোভ নিজের প্রসঙ্গে এক জায়গায় বলেছিলেন– I am the poet among the politicians and polifician among the poets. . কথাটা মহাশ্বেতা দেবীর ক্ষেত্রেও আমার সমান সত্য মনে হয়। তার সম্বন্ধেও বলা যেতে পারে তিনি সমাজকর্মীদের মধ্যে একজন লেখক এবং লেখকদের মধ্যে একজন সমাজকর্মী।’ কোন পরিচয়টিকে তিনি বেশি মূল্যবান মনে করেন এর একটা অঘোষিত উত্তর তার সঙ্গে সাক্ষাৎকারের মধ্যদিয়ে আমি পেয়েছি।

সিঙ্গুর নদীগ্রামের আন্দোলন যখন চলছে তখন ‘উচ্ছ্বেদের গল্প’ নামে একটি গল্প সংকলন রচনায় আমি হাত দিই। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে একেবারে সাম্প্রতিককালের বহু লেখক যারা রাজনৈতিকভাবে পরস্পর ভিন্ন মতাবলম্বী এমন কি কেউ কেউ তাদের তৎকালীন সরকারি নীতিরও সমর্থক কিন্তু হৃদয়ের সত্যকে অকপটে উন্মোচন করার জায়গা যেখানে সেই সাহিত্য সৃষ্টিতে উচ্ছ্বেদের বিরুদ্ধেই সাহিত্যরচনা করে গেছেন তাদের অনেককে নিয়েই আমার এই সংকলন রচনার প্রয়াস ছিল। স্বাভাবিকভাবেই মহাশ্বেতা দেবীর নাম এক্ষেত্রে সবার আগে আসে। প্রকাশকও স্বভাবতই আগ্রহ প্রকাশ করেন তার রচনার অন্তর্ভুক্তি বিষয়ে। আমার মনে একটু দ্বিধা ছিল। এই সংকলন রচনার পেছনের তাগিদটা ছিল মূলত অব্যবসায়িক। তৎকালীন তুমুল রাজনৈতিক ডামাডোলে যখন উচ্ছ্বেদের পক্ষে রাজনৈতিক দওয়াল চলছে তখন সাংস্কৃতিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক লড়াইটা ছিল এই সংকলনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য। যার জন্য বাংলাদেশের গল্প লেখক মঞ্জু সরকারের গল্পও এই সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। লেখকদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা স্বভাবতই ভাবা হয়নি। ধরে নেওয়া হয়েছিল তারাও যেন এই লড়াইয়েরই অংশীদার। মহাশ্বেতা দেবীর তো লেখাটাই জীবিকা। তিনি কি বিনাপারিশ্রমিকে তার গল্প সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করার অনুমতি দেবেন? মহাশ্বেতা দেবীকে প্রস্তাবটা দিতে তিনি বিনাদ্বিধায় বললেন– হ্যাঁ, নাও না। যে গল্প তোমাদের খুশি বেছে নাও। আমাকে শুধু একবার জানিও। ওঁর ‘মাদার ইন্ডিয়া’ গল্পটা আমি নিয়েছিলাম আমার সংকলনে। বইটি যখন তার হাতে তুলে দিই তিনি সত্যিকারের খুশি হয়েছিলেন। কিন্তু এরপর আমাকে বইটি সম্পর্কে তিনি আর কখনো কিছু বলেননি। এ কথা উল্লেখ করার একটা কারণ আছে। নন্দীগ্রামের আন্দোলন যখন শুরু হয়, চাষীদের জমিজমা হস্তগত করে যখন সেখানে বিশেষ শিল্পতালুক (Spcial Economic Jone) গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয় তখন বারাসতে আমাদের উদ্যোগে গঠিত একটি নাগরিক সংস্থার পক্ষ থেকে ‘সেজ একটি সর্বনাশা সুনামি’ নামে একটি পুস্তিকা রচনায় অনুপ্রাণিত হই। পুস্তিকাটি যখন মহাশ্বেতা দেবীর হাতে দিই তখন তার চোখেমুখে প্রত্যক্ষ করি সজীব উৎসাহের দীপ্তি। সঙ্গে সঙ্গে কিছু কপি তিনি নিয়ে নিলেন নগদ অর্থমূল্যে তাঁর চেনাজানা বিভিন্ন সংগঠনকে দিয়ে তা বিক্রি করানোর জন্য। পরে তার উদ্যোগেই নাকি তা হিন্দিতে অনূদিত হয়ে ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও বিক্রি হয়েছিল। পরে প্রেসক্লাবের একটি সভায় আমার নাম তিনি উল্লেখ করেছিলেন এই পুস্তিকাটি রচনার জন্য। আমার তখন একথাটিই মনে হয়েছিল বিশুদ্ধ শিল্প সৃষ্টি থেকে তিনি যেন বেশি উদ্দীপনা বোধ করেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশ নিতে। নাহলে আমার ওই সামান্য লেখা নিয়ে অত বেশি উৎসাহ তিনি নিশ্চয়ই দেখাতেন না। পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত উদ্বিগ্ন ও সক্রিয়। শান্তিনিকেতনের খোয়াই যখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন-ব্যবসায়ীদের হাতে, নিমর্মভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে শান্তিনিকেতনের আশপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং রবীন্দ্রগর্বী পশ্চিমবাংলার সারস্বত-সমাজ যখন আশ্চর্যভাবে নিশ্চুপ তখন তাঁকে একাই লড়াই চালাতে দেখেছি এই সর্বনাশের বিরুদ্ধে। এমন কি প্রচণ্ড ক্রোধে তাকে পা দিয়ে লাথি মেরে ভেঙে ফেলতেও দেখেছি ‘শান্তিনিকেতন স্ত্রীনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ’-এর উন্নয়ন ফলক। এর পেছনে অনেকটাই হয়ত কাজ করেছিল শান্তিনিকেতনে ছাত্রাবস্থায় কাটানোর সময়ে শান্তিনিকেতনের প্রতি তার ভালোবাসা। শান্তিনিকেতনের কিছু কিছু মানুষকে যখন আমি নিয়ে গেছি তার কাছে শান্তিনিকেতনের পরিবেশ রক্ষার কারণেই তখন কখনোই তিনি নিরাশ করেননি তাদের। সময় দিয়েছেন। কখনো কখনো এ কারণে মনে হয়েছে তাহলে কি লেখকসত্তার চেয়ে তার ভেতরে বেশি ক্রিয়াশীল ছিল সামাজিক কর্মীর সত্তা। কিন্তু তাঁর তো সৃষ্টিমূলক সাহিত্যকর্মও আছে অজস্র। এ প্রসঙ্গেই আমার একটি কৌতুককর অভিজ্ঞতার কথা এখানে বিবৃত করছি। সিঙ্গুর নন্দীগ্রামের আন্দোলনের সেই সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত বিভিন্ন কবিতা নিয়ে আমার একটি কাব্যগ্রন্থ সংক্রান্তির পাঁচালি আমি মহাশ্বেতা দেবীকে উৎসর্গ করে তার হাতে দিতে যাই। উৎসর্গপত্রে নিজের নাম দেখে মহাশ্বেতা দেবী রীতিমতো বিব্রত ভঙ্গিতেই বললেন– এটি! আমাকে আবার কবিতা বই উৎসর্গ করা কেন? কবিতার আমি কি বুঝি? এমনভাবে বললেন কথাটা যেন সত্যই কবিতা সম্বন্ধে তিনি কিছুই বোঝেন না। আমার এর আগে অনেকবার মনে হয়েছিল তার বাবা মনীশ ঘটক তো ছিলেন কল্লোল যুগের এক প্রধান কবি। ‘জান্তব জিগীষা বক্ষে অতীতের সে নিষাদ নহি আমি নহি’– তার কবিতার এরকম সব পঙক্তি মনে দাগ কেটেছিল অনেকেরই। কিন্তু তার কন্যা মহাশ্বেতা দেবীর কখনো কোনো কবিতা কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না। জীবনে কখনোই তাহলে তিনি কবিতা লেখেন কি? যদি না লিখে থাকেন তার কারণইবা কি? এ কথা অবশ্য কোনোদিন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়নি। কিন্তু সেদিন তার কথা শুনে মনে হয়েছিল কবিতা সম্বন্ধে তার যেন একটা সশ্রদ্ধ দ্বিধা আছে। সে কি একারণেই যে, কবিতা গদ্যের চেয়ে অনেকটাই অপ্রত্যক্ষ যাতে প্রত্যক্ষ কর্মে উৎসাহী মহাশ্বেতা দেবী তেমন প্রেরণাবোধ করে না? আমি তবুও বললাম, আমি একটা কবিতা পড়ছি দেখুন, আপনার কেমন লাগে। আশ্চর্য মানুষ! কোনোরকম বিরক্তি প্রকাশ করলেন না এই আব্দারে। খুব মন দিয়ে শুনে খানিকটা খুশি হয়েই তার পত্রিকা ‘বর্তিকা’র কার্যনির্বাহী সম্পাদক জয় ভদ্রকে ডেকে বললেন যে, কবিতাটি সামনের সংখ্যার ‘পত্রিকা’-য় দেওয়া যায় কিনা। জয় ভদ্র বললেন, তা কি করে হয়? বইয়ে ছাপা হয়ে যাওয়া কবিতা কী করে আবার পত্রিকায় ছাপা যাবে?

তার যুক্তি অকাট্য। মহাশ্বেতা দেবী নিষ্প্রভ হয়ে চুপ করে গেলেন কিন্তু আমার সামনে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন সে মুহূর্তে আর এক মহাশ্বেতা দেবী, যিনি শিশুর মতো আবেগে বিস্মৃত হন লেখার জগতের নানা বিধি-বিধান, আইন কানুন। আসলে তিনি একজন অত্যন্ত আবেগস্পৃষ্ট মানুষ।
বাংলাদেশের লেখকদের সঙ্গে যে তার একটা আত্মিক যোগাযোগ ছিল তার প্রমাণ পাই হাসান আজিজুল হক-কে লেখা তার একটি চিঠি থেকে। ৭৮ সালে ‘অঙ্গীকারের গল্প’ নামে অঙ্গীকারাবদ্ধ শ্রেণিসচেতনতার গল্পের একটি সংকলন তিনি বের করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন, তাতে নক্ষত্র-এ প্রকাশিত ‘রাজহস্তী’ ও ‘৭৭-এর গল্প’ গ্রন্থের ‘তৃষ্ণা’ নামক গল্পটি তিনি নিতে আগ্রহী হয়েছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী অনুরোধ করেছিলেন তাকে বাংলাদেশের এক বা একাধিক লেখকের অন্য গল্প পাঠাতে। আমি এ প্রসঙ্গে তাকে একবার জিজ্ঞেস করছিলাম, আপনি কি মনে করেন না যে বাংলাভাষা হিন্দি আর ইংরেজির দৌরাত্মমুক্ত হয়ে নিজস্ব রূপে বেঁচে থাকবে শুধুমাত্র বাংলাদেশে? মহাশ্বেতা দেবী সম্পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন আমার এই কথায়।

মহাশ্বেতা দেবীর গলফ গ্রিনের বাড়িতে আমি গেছি কয়েকবার। তিনি যখন রুচি হাসপাতালের কাছে তার নতুন বাড়িতে উঠে আসেন তখন চিনতাম না সে বাড়ি। অনেক খুঁজে বের করেছিলাম সে-বাড়ি। গলফ গ্রিনের তুলনায় এ বাড়ির পরিসর যে অনেক বড় সে-কথা মহাশ্বেতা দেবীকে বলতে মহাশ্বেতা দেবী খুশি হয়ে বললেন, জানো, এখানে প্রয়োজন মতো কিছু আদিবাসীরাও এসে থাকতে পারবে। তাঁর মুখ খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সুশীল সাহা আমাকে সঙ্গে নিয়ে তারপর গিয়েছিলেন তার সেই নতুন বাড়িতে বাংলাদেশের একটি পত্রিকার জন্য তার লেখা চাইতে।

এরও বেশ কিছুদিন পর আবার যখন তার বাড়ি যাওয়ার জন্য মনস্থ করি অন্য একটি কারণে তখন আর পথ খুঁজে পাই না। সব ব্যাপারেই আমি চিরকাল দিগভ্রান্ত– মহাশ্বেতা দেবীর বাড়ির নিশানাও যে হারিয়ে ফেলব তাতে আর আশ্চর্য কী। একটা রাস্তার গোলোকধাঁধা মোড়ে এসে ভাবছি সুকুমার রায়ের ‘ঠিকানা’ কবিতার মতো এবার কোন রাস্তা ধরব? সব রাস্তাই তো সমান ঘুরপাক আমার কাছে। কে দিকনির্দেশনা দেবে ভাবতে ভাবতে চোখে পড়ে সামনে ছোটোখাটো একটা লন্ড্রি যেখানে উনুনে কয়লা দিচ্ছে রংচটা ময়লা ফ্রক-পরা নিতান্ত গরীব ঘরের এক মেয়ে।
কাছাকাছি মানুষ বলতে তো সে-ই। কিন্তু এ মেয়েটি মহাশ্বেতা দেবীর নাম জানবে কী করে? তবু নিতান্ত জিজ্ঞাসা করার জন্যই জিজ্ঞাসা করতে মেয়েটি বলে– আপনারা মহাশ্বেতা দেবীর বাড়ি খুঁজছেন, বলবেন তো! এই রাস্তা দিয়ে বাঁয়ে গিয়েই প্রথম বাড়িটা মহাশ্বেতা দেবীর। খুবই বিস্মিতবোধ করেছিলাম মেয়েটির কথায়। মহাশ্বেতা দেবী ফিল্মস্টার নন, ক্রিকেট খেলোয়াড় নন, রাজনীতি ব্যবসায়ীও নন, উনুনে কয়লা দেওয়া একটি সামান্য তুচ্ছ মেয়ে তাকে চিনল কী করে?

পরে একজন রিকশাওয়ালা আমাকে বলল– এখানে যাকেই জিজ্ঞেস করবেন সেই বলে দেবে মহাশ্বেতা দেবীর বাড়ি কোথায়। নিশ্চয়ই হাজার চুরাশির মা কিংবা অরণ্যের অধিকার লেখার জন্য কিংবা ম্যাগসেসাই বা জ্ঞানপীঠ পুরস্কার পাওয়ার জন্য লন্ড্রিতে উনুনে-কয়লা দেওয়া এক তুচ্ছ সামান্য মেয়ে তাকে মনে রাখেনি। নিজেদের কাছের মানুষ মনে করেই তারা নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন মহাশ্বেতা দেবীকে। কী করে এটা সম্ভব হলো বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু একজন মানুষের জীবনের এর চেয়ে বড় সার্থকতা আর কী হতে পারে?

গতবার যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো তখন একজনের একটি পাণ্ডুলিপি তিনি খুঁটিয়ে দেখছিলেন মতামত দেওয়ার জন্য। তার চোখ দিয়ে জল পড়ে। মাঝে-মধ্যে তিনি পড়া থামিয়ে একটি রুমাল দিয়ে চোখের কোণের জল আস্তে মুছে নিচ্ছিলেন। বুঝতে পারছিলাম তার কষ্ট হচ্ছে খুব কিন্তু তবু নিজের কৃত্যকাজ থেকে তিনি সরে আসতে রাজী নন। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম তার এই আন্তরিক কর্মসাধনা। কোনোমতে উপর উপর পড়ে তিনি একটা দায়সারা মতামত দিয়ে দিলেই পারতেন কিন্তু তিনি তা করছিলেন না। ইতিমধ্যে পাশের ঘরে জয় ভদ্রের ছোটো শিশুসন্তানকে– ‘তোমার বুদ্ধি আমি চুরি করে নিয়েছি’ বলে খেপাতে শুরু করেছে। শিশুটি আর্তস্বরে কেঁদে আঁটোসাঁটো গলায় বলছে– আমার বুদ্ধি আমাকে দিয়ে দাও। বড়রা মজা পেয়ে খুব হাসছে।

মহাশ্বেতা দেবী লেখা থেকে মুখ তুলে কেমন অস্থিরভাবে তাকাচ্ছিলেন। আমাদের কাছে যেন কৈফিয়ৎ দেওয়ার সুরে বললো, দেখেছ, বুদ্ধি চুরি হয়ে গেছে বলে কীরকম কাঁদছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পরিচারিকাকে ডেকে বললেন, ওর বুদ্ধিটা ওকে ফিরিয়ে দিলেই তো হয়। কেন কাঁদাচ্ছে এভাবে?

বুঝলাম শিশুটির কান্নায় তিনি খুবই পীড়িতবোধ করছেন। আর তখন আমার মনে হলো অসহায় নির্যাতিত লোটা শরবদের কান্না আর এই শিশুর কান্না তার কাছে একাকার হয়ে গেছে। অত্যাচারীদের অসহায় কান্না তিনি অন্তর থেকেই সহ্য করতে পারেন না। ওই শিশুটি যেন সেই অত্যাচারিতদেরই প্রতীক।

মহাশ্বেতা দেবী ডায়াবেটিসের রুগী। খাওয়ার আগে তিনি ইনসুলিন নেন। একদিন কী কথা প্রসঙ্গে আমি তার অসুস্থ শরীরের অপারগতার কথা তুলেছিলাম। তিনি বেশ ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন– না, না। বাজে কথা। আমি অসুস্থ তোমাকে কে বলল? আমি কাজ করছি না। কথাটা সেদিন বলে ফেলে আমি খুব বিব্রতবোধ করেছিলাম।

এবার তুলনায় ওকে খুব সুস্থ মনে হচ্ছিল। আমি মনের খুশিতে কথাটা বলেই ফেললাম ওকে। বললাম, খুব ভালো লাগছে আপনাকে দেখে। একদিন আপনাকে অসুস্থ বলাতে খুব রাগ করেছিলেন আপনি।
মহাশ্বেতা দেবী কৌতূহলী হয়ে বললেন, তাই নাকি? কীরকম?
কথাটা তাকে বলতে তিনি বললেন, দ্যাখো তো, এগুলি বোকার মতো কথা নয়? অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও আমি বলে বেড়াব আমি সুস্থ, নীরোগ।
আমি বললাম, আমরা সবাই তো তাই-ই চাই মহাশ্বেতাদি, আপনি আরও দীর্ঘদিন নীরোগ সুস্থ থাকুন। মহাশ্বেতাদি খুব প্রসন্ন স্নেহের মৃদু হাসি হেসে বললেন, তুমিও ভালো থেকো।

যখন নেমে আসছিলাম তখন সেই শিশুর কান্না থেমে গেছে। হয়ত সে আশ্বস্ত হয়েছে তার বুদ্ধি চুরি যায়নি। সবদিক কেমন শান্ত তৃপ্ত। মহাশ্বেতা দেবীর স্নেহের হাসিটি আমার চোখে শুধু ভাসছিল।
Flag Counter


2 Responses

  1. prokash says:

    আমাদের আরো মহাশ্বেতা দেবী জরুরি। লেখাটি ভালো লেগেছে।

  2. অপূর্ব সাহা says:

    লেখাটি পাঠ করে আবেগস্পৃষ্ট হলাম। ধন্যবাদ লেখককে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.