আর্টস, সাক্ষাৎকার

অরুণাভ সরকারের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার: পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তারা অন্যের লেখা ছেপে দিয়েছেন নিজের নামে

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | 20 Dec , 2014  

arunav-sarker.gifকবি অরুণাভ সরকারের জন্ম টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুরে,১৯৪১ সালের ২৯ মে। সব মিলিয়ে তাঁর কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা মাত্র তিন। নগরে বাউল (১৯৭৬), কেউ কিছু জানে না (১৯৮০), নারীরা ফেরে না (২০০৬) শিরোনামের কবিতাগ্রন্থগুলো হয়েছে সমাদৃত, আদর পেয়েছে অগ্রজ অনুজ কবিদের। শিশুসাহিত্যে ছিলেন সাবলীল। খোকনের অভিযান, ইলশেগুঁড়ি, ভালুকার মৌমাছি, ভালুকার দুই বন্ধু, গল্প থেকে গল্প এমন শিরোনামে লিখেছেন শিশুতোষ গ্রন্থ। সব মিলে অরুণাভ সরকারের বই এক ডজন। পেয়েছেন বাংলা একাডেমির কবিতা পুরস্কার, টাঙ্গাইল সাহিত্য সংঘ পুরস্কারসহ নানা পদক। ষাট দশকের অন্যতম শক্তিশালী এ কবি পেশাগতভাবে সাংবাদিকতায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি নিউ নেশন, দৈনিক জনপদ, দৈনিক যুগান্তর, ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদ, ডেইলি মর্ণিং সান, ডেইলি ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। প্রচারবিমুখ, স্বল্পপ্রজ এই কবির ছন্দদক্ষতা ও বাকপ্রতিমা নির্মাণের অনন্যতা তাকে সুপরিচিত করেছে পাঠক মহলে।

ষাটের দশকের অন্যতম কবি অরুণাভ সরকারের কবিতা প্রথম পড়েছি আমি ২০১০ এ। আমীরুল ভাইয়ের মিরপুরের বাসায়। আমার পড়া তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থের নাম নারীরা ফেরে না (২০০৬)। আদতে এটি তাঁর নির্বাচিত কবিতার একটি সংকলন।

২০১১ সালের মে মাসে, তখন আমি ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন এ যোগদান করেছি। ফোন করে একদিন যাই কবির বাসায়। বড় একটা ইন্টারভিউ করি। যা হয়, ৬৮ মিনিট রেকর্ড করা ফুটেজ, আড়াই মিনিটের ‘কবি ভালো নেই’ মার্কা একটা স্টোরি প্রচারের পর, পরের সপ্তাহে পড়ে গেল ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের আর্কাইভ থেকে। আমার মোবাইলে ভাগ্যিস রেকর্ড করেছিলাম। রাতে শুনলাম অরুণাভ দা নাই। কান্নায় ধরে এলো গলা।

অরুণাভ সরকার, প্রিয় কবি, আপনি স্বীকৃতির কাঙাল ছিলেন না, নিজের কবিতা নিয়ে তৃপ্ত ছিলেন, যেখানেই থাকুন, আপনার তৃপ্তিদায়ক কবিতারা ঘিরে থাক আপনাকে।

অতৃপ্তি দিয়ে গেলেন আমাদেরই, যোগ্য সম্মান ও স্থান, আপনাকে দিতে পারিনি আমরা! নিশ্চয়ই নিয়ত অভ্যাসে বহুচর্চিত তাচ্ছিল্যের বাঁকা হাসিতে আর ডানহাত ও ঘাঁড় বাকিয়ে হেঁটে যেতে যেতে আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিচ্ছেন!

সাক্ষাৎকারটি হুবহু পত্রস্থ হলো এখানে…

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: অরুণাভদা, বহুদিন থেকেই আপনার সাথে কথা বলার জন্য মুখিয়ে আছি। প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছি। শুরু করি। বলুন, কেমন আছেন?
অরুণাভ সরকার: ভাল আছি বললে তোমাকে ঠিক সত্যি বলা হবে না। এত ধরনের অসুখ নিয়ে বেঁচে আছি। ভালো থাকা যায় না। বেঁচে থাকার জন্য চিকিৎসা কিছু করতেই হয়। আর তা (চিকিৎসাব্যয়) আমাকে অভাবী মানুষে পরিণত করেছে। এইদেশে কবিতা আর কিছু না দিলেও অভাব দিতে পারে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দাদা, আপনি তো সাংবাদিকতা করছেন দীর্ঘসময়, সাংবাদিকতা আপনাকে স্বচ্ছলতা দেয়নি?
অরুণাভ সরকার:দেখো, সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে তারাই নিয়েছে যারা একটি ন্যায়নীতিনির্ভর রাষ্ট্র চেয়েছে, স্বপ্ন দেখেছে স্বপ্নের মতো ভাল থাকার। আমাদের দেশে অবস্থাটা এখন পাল্টে গেছে। সাংবাদিকরা খুব স্বচ্ছল নয়। কারণ তারা নীতির বাইরে কিছু করতে পারেন না। বিবেকের দংশন তাদের পোড়ায়। কিন্তু সরকারী প্রতিষ্ঠানের বাইরে এখন যেভাবে সারাদেশে সাংবাদিকতা হচ্ছে, তা নিয়ে এমনিতে আশাবাদী চরিত্রের আমিও খুব একটা আশাবাদী নই। এমন সব ব্যবসায়ীরা সংবাদমাধ্যমের মালিক হচ্ছে, তারা জানেন নিজেদের পুঁজি কিভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয়। ফলে সাংবাদিকদেরও হাত পা বাঁধা। সাংবাদিকতা খুব দ্রুতই দেশ থেকে অবসিত হবে। পুঁজি কখনো নৈতিকতার ধার ধারে না, শিমুল। এই যে তুমি যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে গেলে, আমিও করেছি কাজ, তাদের একটি পত্রিকায়, এখন কী করবে! পেট তো চালাতে হবে। আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি, যুদ্ধের আগে পরে কখনো আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাইনি। এখনো চাই না। আমি খুবই আশাবাদী, যে একদিন পুঁজিপতিরা বুঝবে, সততার চেয়ে, সৎ মূল্যায়নের চেয়ে বড় কোন পুঁজি হয় না।
শিমুল সালাহউদ্দিন: আপনি তো বড় হয়েছেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে। বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল, স্বাধীন বাংলাদেশ দেখেছেন। আপনার শৈশবটা কেমন ছিলো? ছেলেবেলার কোন ঘটনা কী মনে আছে দাদা?
অরুনাভ সরকার: আট দশটা দুরন্ত ছেলের শৈশবের মতোই ছিলো আমার গ্রামীণ শৈশব। আমার কবিতায় আমি সেসব বর্ণনা দিয়েছিও। শৈশবের অনেক ছোট ছোট স্মৃতির কথা লিখেছি আমি এমনকী প্রেমের কবিতার আবহ তৈরিতেও। পাকিস্তান ভারত যেদিন হয় তারপর দিন আমাদের গ্রামে একটা মিছিল হয়েছিল, পাকিস্তান জিন্দাবাদ শ্লোগানে, সেটা আমার মনে আছে আবছা আবছা। তখন কত, সাত আট বছর বয়স। তার আগে মনে আছে, খুব ছোট বেলায় একবার কলকাতায় গেলাম বাবার সাথে। একজোড়া বাটার জুতো কিনে দেওয়া হলো আমাকে। খুব গর্ব হচ্ছিল এই ভেবে যে, গ্রামে এমন সুন্দর জুতো আর কারও নেই। বাড়ী ফেরার পথে নৌকা থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে লাফ দিলাম ঘাটে। সময়টা বর্ষাকাল হওয়ায় কাদা পানিতে মাখামাখি হয়ে গেল। পায়ের নতুন জুতোজোড়া সেদিনই হলো নষ্ট। অনেক ধুয়েও নতুনের মতো করা গেলো না সেই জুতোকে। কষ্ট পেয়েছিলাম খুব। এখন অবশ্য এসব শৈশবের মধুর স্মৃতিই মনে হয়।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ তো বেরুলো ১৯৭৬ সালে। আপনি ষাটের দশকের কবি। প্রথম বইটি এত দেরি করে বেরুলো কেনো?
অরুণাভ সরকার: ‘কাব্যগ্রন্থ’ না ‘কবিতাগ্রন্থ’ বলি আমি। কলকাতা থেকে প্রকাশিত পত্রিকা, দেশ, আনন্দবাজার, সন্দেশ এগুলোর সমৃদ্ধ একটা সংগ্রহ ছিল আমাদের বাড়িতে। ওগুলো পড়েই মূলতঃ লিখতে ইচ্ছে হলো। অনুপ্রেরণা পেলামও বলা যায়। আমি প্রথম লিখি যে কবিতা সেটা কয়েক বছর পরই নষ্ট করে ফেলি। কিছুই হয়নি ভেবে। বই অনেক পরে হল, হয়তো আরো পরে হতো। এর একটা কারণ আমি খুব খুঁতখুঁতে, প্রচুর পরিমার্জন করি। তবে ১৯৬০এর আগে লেখা কোনকিছুই বইতে অর্ন্তভূক্ত করিনি আমি। ওগুলোকে নিরীক্ষা বলা যায়, লেখা বলি না। তবে যা লিখেছি তাতে আন্তরিকতা ছিল। চলার পথে কোন ভয় বা অনুকম্পাকে সঙ্গী করিনি আমি। খুব সহজভাবে জীবনের অনুভূতির কথাগুলোই লিখতে চেয়েছি, এবং মূলত বেদনাই লিখেছি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: প্রযুক্তি এখন একটি বড় ভূমিকা রাখছে দাদা। আপনি প্রচণ্ডভাবে এসবের বাইরে। ফোন ছাড়া এমনকী ইমেইল-ও নাকি ব্যবহার করেন না। প্রযুক্তির কারণে সাহিত্য কি বিশেষ কোন সুবিধা বা অসুবিধার মুখোমুখি হচ্ছে বলে মনে করেন? প্রযুক্তির কারণে মানুষের আনন্দক্ষেত্র অনেক বেড়ে যাওয়ায় মানুষ কম কবিতা পড়ছে এমন মনে করেন?
অরুণাভ সরকার:আমি তা মনে করি না। প্রযুক্তি যতই বিকাশ লাভ করুক সাহিত্য তার জায়গায় অনড়। ইন্টারনেটে বই পড়া যায় হয়ত; কিন্তু একটা ছাপানো বই পড়ায় যে আনন্দ তা ইন্টারনেট দিতে পারে না। আমি অভ্যস্ত হতে পারিনি, সামর্থ্যও হয়তো নাই, এজন্য ব্যবহারও করি না। কিন্তু আমি মনে করি প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও আছে। প্রচুর মানুষ প্রযুক্তির কল্যাণে হয়তো তোমার আমার কবিতা পড়তে পারবে ভবিষ্যতে। এসব কম সুবিধা তো না। আর যে কবিতার পাঠক, কবিতার মজা যে জানে, সে কবিতা পড়বেই। অন্য যত আনন্দক্ষেত্রের কথাই তুমি বলো না কেনো! পৃথিবীতে যত শিল্পমাধ্যম আছে তার মধ্যে কবিতাই শ্রেষ্ঠতম, এটা শুধু আমার কথাই না, পৃথিবীর বড় বড় মনীষীরা বলে গেছেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দাদা, সেদিন একটা টেলিভিশন অনুষ্ঠানে আমাদের এক অগ্রজ কবি বলছিলেন, বর্তমান প্রজন্ম সাহিত্যে আর আনন্দ খুঁজে পায় না। আপনার কী মনে হয় না এতে লেখক সাহিত্যিকদেরও দায় রয়েছে?
অরুণাভ সরকার:তোমার সাথে আমি একমত। অবশ্যই লেখক সাহিত্যিকদের দায় রয়েছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভালো বই একেবারেই কমে আসছে। যা আসছে তাও ভুলে ভরা ও অসম্পাদিত। একটা ভালো বই পাঠককে আকৃষ্ট করবেই। কাজেই ভালো বই বেশি বেরুলে বর্তমান প্রজন্ম না কেবল, সকলেই তাতে আনন্দ খুঁজে পেতে বাধ্য। লেখক হিসেবে লেখকদের এই চ্যালেঞ্জটা নিতে হবে, শুধু নিজের জন্যে না, পাঠকদের কথা মাথায় রেখেও তাই লিখতে হবে। আমার সহজের সাধনা করার এটাও একটা কারণ। আমি চেয়েছি আপামর, অজটিল সাধারণ মানুষ আমার কবিতা পড়ে অনুভূতিতে কম্পন টের পাক।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি তো মুক্তিযোদ্ধা কবি, অরুণাভদা। কিন্তু কবিদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে সবচেয়ে কম উচ্চকিত থাকতে দেখি আপনাকেই। আপনি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বি.এন.পি আমলে লিখেছেন—দেয়াল থেকে তোমার ছবি ফেলেছে ওরা ছিঁড়ে/ করেছে দূর ঘরের সব চিহ্নময়তাকে/ কিন্তু তবু পায়নি খোঁজ আমি যেমুখটিরে/ এঁকেছি এই ত্বকের নিচে গোপন এক ফাঁকে/ সেখানে শুধু আমার দুই করুণ কালো কুপি/ রাত্রিদিন বিরতিহীন জ্বলছে চুপিচুপি।–এই কবিতায়ও খুব কষ্ট করে বুঝতে হয় এটি কাকে নিয়ে লেখা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিরও তাই আপনাকে নিয়ে হইচই নেই। এটাকে কিভাবে দেখেন?
অরুণাভ সরকার: শিমুল, আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম যে পরিস্থিতিতে তখন আমার বয়সী একটা ছেলে দেশের জন্য যুদ্ধে না গেলে সে সারাজীবন নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকতো। কিন্তু আমি যুদ্ধে গিয়েছিলাম বলে যুদ্ধের পরে স্বাধীন দেশের সরকারের কাছে সুবিধা চাইবো তা হতে পারে না। আমি সেটা চাই-ও না। আমাদের সাহিত্যিকদের মধ্যেও অনেকে জানে না যে আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমার এটা নিজের দিক থেকে জানানোর কোন ইচ্ছাও নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ঠিক আছে। বাদ দিলাম। আপনার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলুন।
অরুণাভ সরকার:মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমি। কত স্মৃতি। বীভৎস সব দিন। সব তো আর বলা যাবে না। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে। মা জানলে যেতে দিতেন না। একবার আগরতলা হতে সীমান্তবর্তী একটা ক্যাম্পে গেলাম। আমাদের নেতৃত্বে ছিলেন জহুর আহমেদ চৌধুরী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: চট্টগ্রামের? জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম যার নামে?
অরুণাভ সরকার: উনার নামে স্টেডিয়াম! কি জানি! হতে পারে! সেদিন দুপুরের খাবারে প্লেটে খুব অল্প পরিমাণে তরকারি পড়ল প্রত্যেকের ভাগে। সীমান্তের কাছে খোলা আকাশের নিচে বসে খাচ্ছি আমরা। আমি সীমান্তের এ পাড়ে (বাংলাদেশের ভেতর) গরু,ছাগল দেখিয়ে বললাম, ওইগুলোতো পাক বাহিনীর পেটেই যাবে, আমরা খেয়ে ফেললেই পারি। জবাবে জহুর আহমেদ চৌধুরী বললেন, মুক্তিযোদ্ধারা তা করতে পারে না। তার কথাটি খুব অর্থবহ ছিল আমার কাছে। সারাজীবন সেই অনুভবটা ধরে রাখতে চেয়েছি আমি। মুক্তিযুদ্ধ অনেক চোরকে সাধু বানিয়ে দিয়েছে। এই চেতনাটা ধরে রাখতে পারলে আমরা অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারতাম। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমরা সেটা পারি নাই।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন
: একটু আগে বলছিলেন, আপোষ করলেই আর ভালো কবিতা লেখা যাবে না। তো কবি কি কেবল দুধে ধোঁয়া তুলসী পাতা হবেন? শয়তান একজন, কিংবা মাফিয়া একজন কি দারুণ লেখক হতে পারেন না?
অরুণাভ সরকার: পারেন হয়তো। প্রতিভাকে তো আর নৈতিকতা দিয়ে মাপা যায় না। তবে আমি শুদ্ধতার পক্ষে। শুদ্ধতায় বিশ্বাস করি। ভালো কবিতা লেখার আগে ভালো মানুষ হতে হবে কবিকে, এটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, ধারণ করি। কবির ভেতর সাধু ও শয়তান বসবাস করতে পারে একসাথে, কিন্তু শয়তানকে যে দাবিয়ে রাখতে পারে না তার তো হুশ নেই, মানুষ মানেই তার মান ও হুশ থাকবে। তুমি পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষগুলোই দেখবে কবিতা ফলান। অশুদ্ধ মানুষের হাতে ভালো কবিতা ফলবে বলে মনে হয় না আমার।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি কোনটিকে মনে করেন?
অরুণাভ সরকার:পেশা হিসেবে আমি সাংবাদিকতাকে বেছে নিয়ে ভুল করেছি বলে মনে হয়। সাংবাদিকতায় প্রচুর লিখেতে হয়। কমে যায় লেখার শিল্পমান। ভালো লিখতে সময়ের প্রয়োজন, সে সময় পত্রিকার চাপ একজন সাংবাদিককে দেয় না। টেলিভিশনে তো লেখারই সুযোগ নেই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সাংবাদিকতার কিছু সুবিধাও তো আছে অরুণাভদা। এই যে আপনার সাথে কথা বলতে পারছি কাজের সুবাদে। হা হা । আপনার সবথেকে জনপ্রিয় কবিতা ‘নারীরা ফেরে না’র নামক কবিতাটি। আপনাকে প্রথম দেখায় শুনিয়েছিলাম আমি।
অরুণাভ সরকার: মনে আছে আমার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: যাওয়া বলে কিছু নেই, সকলই ঘুরে-ফিরে আসা// এই কবিতার শেষ স্তবকে আপনি বলছেন, একবার চলে গেলে/ নারীরা ফেরে না।// দাদা, একবার না হয় একজন নারী চলে যায়, এখানে নারীরা কেন? আপনার জীবনে প্রেমের ভূমিকা কেমন?
অরুণাভ সরকার: প্রেমই আমাকে কবিতা লিখিয়েছে এ কথা বলতে পারি। পৃথিবীতে কবিতা লেখার হাজারো বিষয় থাকতে পারে, কিন্তু প্রেম, প্রেমের বেদনা, প্রিয়ার জন্য অপেক্ষা নিয়ে যে কবিতা তার চেয়ে মহৎ আর কিছু হতে পারে না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: দাদা কী প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন? এখনো প্রেম করে চলেছেন?
অরুণাভ সরকার: তোমাদের বৌদির সাথে আমার বিয়েটাকে ঠিক প্রচলিত প্রেমের ছাঁচে ফেলা যাবে না। তবে প্রেম তো করেছি, করছি বটেই। নইলে এত বছর অপ্রেম নিয়ে বাঁচতে পারতাম না। আমি প্রতিদিনই নতুন প্রেমিক, একটি কবিতার জন্য।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন:একটি ডাকে উড়েছিলাম তোমার চোখের অসীম নীলে,/সেখানে ঝড়, মেঘের ঘটা- তুমি কি তা বলেছিলে? আপনার এমন হাজারো পংক্তি ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। আবৃত্তিশিল্পীরা প্রচুর পড়েছেন মঞ্চে মঞ্চে। কবি হিসেবে নিজেকে সফল মনে করেন?
অরুণাভ সরকার: আমি সফল কী না কবি হিসেবে এটা আসলে অন্যরা বলবে। আমি চেষ্টা করেছি প্রতিটি কবিতার জন্ম দিতে নির্ভুল ছন্দে, আমার সামর্থ মতোন যথাসম্ভব সুন্দর বাক্যে। আমার বন্ধুরা বিভিন্ন সময় বলেছে এজন্য আমার কবিতার একটা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। আমাদের এখানে সাহিত্যের সমালোচনা খুব ভালো কখনো যদি দাঁড়ায়, তবে হয়তো আমার কবিতা নিয়ে একটা বিশ্লেষণ কেউ করবে। তবে মানুষ হিসেবে আমি বোধহয় সফল নই, অনেক প্রিয়জনেরই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারিনি, যেসব আমার পূরণ করতে পারা উচিত ছিল।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি তো দাদা একটু আধটু কবিতা পড়ার চেষ্টা করি। আমি যেটুকু আপনার কবিতা পড়েছি, তাতে আমার মনে হয়,ছন্দের দোদুল্যমানতাকে হাতের মুঠোয় নিয়েও যে চিন্তার আকাশ মেলে ধরা যায় কবিতায়, তার এক অভিনব নিরীক্ষা খুবই সফলভাবে করেছেন আপনি। প্রমাণ হলো আপনার কবিতার এই পংক্তিগুলো— ‘বরং যদি মৃত্যু হতো ভ্রূণে/জীবন হতো কেবলই প্রস্থান/ভোরের ঘুমে কাকের ডাক শুনে/এমন করে হতো না উত্থান/তাই কি ভাল ছিল?/তাই কি ভাল ছিল/যদি আমার মৃত্যু হতো ভ্রূণে।//এই যে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুচিন্তার সাথে বেদনার এক সুর মিশিয়ে দেয়া, এ তো অনন্যসাধারণ অরুণাভদা। আমার কেন যেন মনে হয় আপনি নিজেকে অবমূল্যায়ন করেন?

অরুণাভ সরকার: দেখো শিমুল, ধরো ব্যক্তিগত জীবনে আমি যদি আরো সম্পদশালী হতাম, হয়তো আমি আরো কিছু বেশি সম্মান পেতে পারতাম জীবনে। কবিতা লিখতে এসে বড় অবহেলা পেয়েছি আশপাশের মানুষের কাছে। লাঞ্ছনা গঞ্জনা পেয়েছি অনেক বড়ো ছোটো মিলিয়ে। সে আমার প্রিয় দুই কবি জীবনানন্দ দাশ আর শামসুর রাহমানও পেয়েছেন এমন লাঞ্ছনা।

দুজনের মিলগুলো দেখো। দু’জনেরই জন্ম এই ভূখণ্ডে। একজনের কবিতার বই মাত্র সাতটি, অন্যজনের ষাট। বয়সের ব্যবধান ৩০ বছর। দু’জনেই তাদের সময়ের ‘শ্রেষ্ঠ’ কবি। জীবদ্দশায় জীবনানন্দ প্রধানত অবহেলা পেয়েছেন। পেয়েছেন নিন্দা। তাঁর দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। এখন তাকে রবীন্দ্র-পরবর্তী যুগের শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি বলে গণ্য করা হয়। এই ধারণাতেও কোনো ভুল নেই যে, তিনিই বাংলা ভাষার শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবি। এখন তাঁর বইও প্রচুর বিক্রি হয়। তাঁর পাঠকপ্রিয়তা অসাধারণ।
শামসুর রাহমানের জনপ্রিয়তা পশ্চিমবঙ্গেও। সেখানেও তাঁকে খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশে তার সমসাময়িকদের মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ শামসুল হক আর আল মাহমুদ। তবু শামসুর রাহমানই শ্রেষ্ঠ। বিখ্যাত এবং সুদর্শন বলে মেয়েরা তার দিকে ঝুঁকে পড়ত। তিনিও অনেককে বিমুখ করতেন না। তবু তাঁর দাম্পত্য জীবন ছিল খুবই সুখের। জোহরা ছিলেন স্বামীঅন্তঃপ্রাণ। আমার আফসোস হয় আমার সংসারভাগ্য এমন নয়। আমি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হলে হয়তো এমন হতো না। তুমি কবিতা লিখতে চাইলে সরকারী চাকরী বা শিক্ষকতার দিকে যাওয়ার চেষ্টা করো।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অরুণাভ দা, আমার প্রসঙ্গ থাক, আপনার কথা বলুন। আপনি তো প্রচুর পড়েন, এখন কি পড়ছেন?
অরুণাভ সরকার: ভালোবাসার, প্রেমের কবিতা আমার খুব প্রিয়পাঠ্য। প্রেমের কবিতা পড়তে, লিখতেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। মাঝেমাঝেই পড়ি। কখনোবা না দেখেও উচ্চারণ করি, আওড়াই। কিন্তু একই কবিতা বারবার নয়। আজ মনে পড়ছে ‘নীলিমাকে’। সঞ্জয় ভট্টাচার্যের লেখা। পৃথিবীর অধিকাংশ প্রেমের কবিতাই আসলে বিরহের কবিতা। প্রতিটি শব্দে বিচ্ছেদের বেদনা জড়ানো। জড়ানো মিলনের আর্তি। ‘নীলিমাকে’ কবিতায় সেই বেদনা আর আর্তি যেন মাখামাখি হয়ে রয়েছে। কবিতাটিতে ছন্দ-মিল উচ্চকণ্ঠ নয়। তাই তা হৃদয়কে ভরিয়ে তোলে মধুর স্নিগ্ধ আবেশে। আর আমার চোখ নরম হয়ে আসে ঘুমে। এই যে ভালো লাগা পৃথিবীর কোন মাদকের সাথে এর তুলনা হয় না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই যে আপনি বললেন, কবিতাটিতে ছন্দ-মিল- উচ্চকণ্ঠ নয়। আপনার কবিতারও তো বৈশিষ্ট্য এটি।
অরুণাভ সরকার: তা বলতে পারো। তবে নিজের কবিতা নিয়ে কথা বলতে আমার খুব ভালো লাগে না, অস্বস্তি হয়। আমি চেষ্টা করেছি, আমার বেদনার কথা বলতে। একধরনের সামাজিক স্বীকৃতি পেয়েছি কবি হিসেবে, এটা আমার জীবনের কম বড় প্রাপ্তি নয়। এই দেখো, আমার চারভাগ বয়সের একভাগ তুমি, আমার সাথে এসে কথা বলছো, এটাই কী কম বড় প্রাপ্তি। আমি তাই বলি সবসময়, কবিদের, মানে আমার সাথে যারা কথা বলে, মেশে, তাদের, কবিতা কখনো নেয় না, কেবলি দেয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি শীতের রাতে কবিতায় লিখেছেন—এসো, আর বিন্দুমাত্র বিলম্ব করো না/ আকাশে এখন কোনও সোনা/ নেই, বহু আগে/ ঝরে গেছে। রাগে/ গর্জাতে গর্জাতে উত্তরের বায়ু/ ছুটে আসে। ত্বক চাটে। পরমায়ু/ টেনে ছিঁড়ে খায়/ অন্ধকারে, থাবায় থাবায়/ তাই এসো, আর কোনও বিলম্ব করো না/ হাতে গোনা/এই তো সময়। আগে-পরে দিন/ ছোট দিন, তারও দাবি সীমাসংখ্যাহীন/ সে দাবি মেটাতে হয় অক্ষরে অক্ষরে/ প্রতিটি প্রহরে/ তারই জন্য নিন্দা-স্তুতি, ঔদার্য-আক্রোশ/
তাতে কোষ-অণুকোষ/ অবসন্ন। অবসাদ অস্থি ও মজ্জায়/ তাই ডাকি, এসো দুই চোখের শয্যায়।// এই কবিতাটাকে আপনার শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর একটা বলা যায়। এবং আপনার কবিতার মূলসুর ধারণ করে আছে উক্ত পংক্তিমালা।
অরুণাভ সরকার: বাহ্ ! সুন্দর পড়লে তুমি। এটা আমার লেখা কবিতাগুলোর মধ্যেও আমার প্রিয় একটি কবিতা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার প্রচুর কবিতায় অক্ষরবৃত্তের চালের সাথে এমন অন্তঃমিলের এ খেলাটি পাওয়া যায়। করণকৌশল হিসেবে এটা বেছে নেবার কী কোন বিশেষ কারণ আছে? আপনি প্রচুর কবিতা লিখেছেন এভাবে!
অরুণাভ সরকার: তুমি তো আমাকে বিপদে ফেললে দেখছি। ঠিকই ধরেছো। এই মজার প্রকরণটি আমি প্রথম খেয়াল করি অগ্রজ কবি আবুল হোসেন-এর কবিতায়। তবে উনার কবিতায় ছিলো প্রথম পংক্তির শেষ শব্দ আর দ্বিতীয় পংক্তির প্রথম শব্দের মধ্যে অন্তঃমিল, আমি এটাকে অনেক ভেবেচিন্তে সুরটা ঠিক রেখে, প্রাচীন বাংলা কবিতার আদলে অন্তমিলটা অবিন্যস্ত অসমান অক্ষরবৃত্তের শেষ রাখার সিদ্ধান্ত নিই। কিভাবে যে অবচেতনে এটা আমার কবিতার মূলসূর হয়ে উঠেছে, মূল প্রকরণ হয়ে উঠেছে তা ঠিক খেয়াল করিনি।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এ সময়ের তরুণদের লেখা পড়েন? কাদের লেখা ভালো লাগে? কেনো লাগে?
অরুণাভ সরকার:তরুণদের লেখা খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ার চেষ্টা করি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হোঁচট খাই। কেউ কেউ ভাষার প্রয়োগ বিধি, ছন্দ ইত্যাদি না জেনেই লিখছে। ভাষা সম্বন্ধে ভালোভাবে না জানলে নির্ভুল গদ্য বা পদ্য কোনটাই লেখা সম্ভব নয়। ভালো ভালো বই পড়লে ভালো লেখা বেরিয়ে আসবে। আবার কেউ কেউ দেখি ভাষাটাকেই পাল্টে দিচ্ছে। ভাষা পাল্টে দেয়া খারাপ নয়, কিন্তু বিকৃত করে ফেলাটা অপরাধ। কবি খুব ইনফ্লুয়েন্সিয়াল, ভাষার অভিভাবক বলি আমরা কবিদের। কবি যখন একটা শব্দ ব্যবহার করেন তখন তার ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। সেই শব্দটা সাধারণ মানুষ তখন ব্যবহার করেন। আশি নব্বইতে একধরনের কবিরা চেষ্টা করেছেন ভাষাটাকে কলুষিত করতে। তারা বিভ্রান্তিমূলক বানানরীতি ঢুকিয়ে দিয়েছেন স্বৈরাচারের মত। রফিকও তো (রফিক আজাদ) সঙ্গমের আঞ্চলিক যে প্রায়োগিক শব্দটি আছে তা ব্যবহার করেছেন, কিন্তু খুবই শিল্পসম্মতভাবে। এখন অনেকেই কবিতা কি তা না বুঝেই যাচ্ছে তাই লিখছেন। এটা সবসময়ই ছিলো অবশ্য। তবে আমার ব্যক্তিগত মতের কথা যদি জানতে চাও, ন্যূনতম নান্দনিকতার কথা মাথায় না রেখে যারা বাংলার মতো সুন্দর ভাষাটাকে কলুষিত করছে তাদের আমার হত্যা করতে ইচ্ছে করে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাংলাদেশে তো আল মাহমুদ আপনার সবচেয়ে প্রিয়। আর কার কার লেখার কথা বলবেন?
অরুণাভ সরকার: কবিতাতে আল মাহমুদের লেখাই সবচেয়ে প্রিয় আমার। আগেও বলেছি তোমাকে কয়েকজনের কথা। আরও আছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ। মোহাম্মদ রফিকের কবিতার শুদ্ধতা আমাকে আপ্লুত করে। আমার অনুজদের মধ্যে আছেন আবিদ আজাদ, নাসিমা সুলতানাসহ অনেকে।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একজন মুক্তিযোদ্ধা কবি আপনি। দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন?
অরুণাভ সরকার:অবশ্যই। এই দেশটার জন্য অস্ত্র হাতে লড়াই করেছি। সতীর্থের লাশ তুলেছি কাঁধে। এদেশের লোক শিক্ষিত হোক, লেখাপড়া শিখুক এটাই চাই। আমি চাই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা নিজেদের উদ্যোগে কিছু পড়াশোনা করুক, দেশটার উজ্জ্বল এক ভবিষ্যত আমি দেখি আমার একান্ত স্বপ্নে। কারণ এদেশে যাদের জাতীয় অধ্যাপক বলা হয় তারা একেবারেই মূর্খ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বিশেষ কাউকে কী ইঙ্গিত করছেন দাদা?
অরুণাভ সরকার:হ্যাঁ, তা বলতে পারো। মানুষের শ্রদ্ধা পাওয়ার মত অনেক কাজই হয়ত তারা করেছেন কিন্তু তারা লেখা পড়া জানেন না। তাদের ছাপানো বই ভুলে ভরা। পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা তারা অন্যের লেখা ছেপে দিয়েছেন নিজের নামে, এমনকী কৃতজ্ঞতা স্বীকার না করেই। একটা দেশের একজন জাতীয় অধ্যাপক যদি এমন হন, চৌর্য্যবৃত্তির গুণে গুণান্বিত হন, সে দেশের তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা হয়।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি বাংলা কবিতার উজ্জ্বল এক সময়ের প্রতিনিধি। ষাটের দশক। আপনারা ষাটের দশকের একসাথে অনেকজন ভিন্নস্বরের কবি। আপনাদের পরে যারা লিখতে এলো তাদের জন্য কী বলবেন?
অরুণাভ সরকার: কবিত্ব না থাকলে কবিতা লেখা যায় না। তবে ভাষার প্রয়োগবিধি, ছন্দ ইত্যাদি না জানলে কবিত্ব থাকা সত্ত্বেও কবিতা পূর্ণতা পায় না। ছন্দকে অস্বীকার করতেও ছন্দ জানা প্রয়োজন। আমরা একসাথে কয়েকজন ভালো কবিতা লিখেছি, তাই তোমাদের মুখে এই চল্লিশ বছর পরে এসে ষাটের দশক ষাটের দশক শুনি। আমি কখনো সংঘে ছিলাম না তেমন, কিন্তু এখন মনে হয় ভালো কবিতার জন্য সংঘ জরুরী। একদশকে সংঘ ভেঙে যায় হয়তো, শঙ্খ ঘোষের কবিতা, কিন্তু তবুও কবিদের সংঘ করা দরকার। একজন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বা একজন সিকানদার আবু জাফর না থাকলে ষাটের দশক ষাটের দশক তোমরা করতে না এখন। উনাদের অবদানের কারণেই ষাটের দশকের এতজন ভালো কবিকে পেলো বাংলা কবিতা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন:কবিতা ছাড়া আপনার বেঁচে থাকার আর কোন প্রেরণা রয়েছে দাদা?
অরুণাভ সরকার: আশাবাদ, কখনও নৈরাশ্যবাদী নই আমি। কাল ভোরবেলা সকালের আলো যখন পড়বে পৃথিবীতে সে মুহূর্তটি দেখার জন্য আজ রাতে ঘুমুতে যাবো আমি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনাকে বিরক্ত করলাম দাদা। মাফ করবেন। আমার বিরক্তি সহ্য করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
অরুণাভ সরকার: ধন্যবাদ তোমাকে আমাকে বিরক্ত করতে করতে কিছু ভালো সময় উপহার দেবার জন্য। তোমার জন্য আমার আশির্বাদ থাকলো। কত কথা বলিয়ে নিলে তুমি বাবা! (হাসি)

Flag Counter


11 Responses

  1. “” শিমুল সালাহ্উদ্দিন: একটু আগে বলছিলেন, আপোষ করলেই আর ভালো কবিতা লেখা যাবে না। তো কবি কি কেবল দুধে ধোঁয়া তুলসী পাতা হবেন? শয়তান একজন, কিংবা মাফিয়া একজন কি দারুণ লেখক হতে পারেন না?

    অরুণাভ সরকার: পারেন হয়তো। প্রতিভাকে তো আর নৈতিকতা দিয়ে মাপা যায় না। তবে আমি শুদ্ধতার পক্ষে। শুদ্ধতায় বিশ্বাস করি। ভালো কবিতা লেখার আগে ভালো মানুষ হতে হবে কবিকে, এটা আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, ধারণ করি। কবির ভেতর সাধু ও শয়তান বসবাস করতে পারে একসাথে, কিন্তু শয়তানকে যে দাবিয়ে রাখতে পারে না তার তো হুশ নেই, মানুষ মানেই তার মান ও হুশ থাকবে। তুমি পৃথিবীর শুদ্ধতম মানুষগুলোই দেখবে কবিতা ফলান। অশুদ্ধ মানুষের হাতে ভালো কবিতা ফলবে বলে মনে হয় না আমার।””

    Ki Okopot bishwash er kotha bollen kobi. Khub valo laglo sakkhatkar ta. pran chue gelo amar. Arunavada ke chintam ami. khub beshi kobita pora hoy ni jodio.Sakkhatkar ta pore akta porajito manusher jonno koshto hocche. jekhanei thakun valo thakun kobi arunava sarkar. sakkhatkar grohita ke anek anek ashirbad korchi, prarthona kori tini jeno jiboner protiti muhurte sofol hon. Amar hridoyer somosto valobasha tar jonno thaklo. ami abegapluto.

    Nomoskar to kobi shimul. kobi na hole onno procharbimukh kobike amon kotha bolano jay na.

  2. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল says:

    অনেক কিছু জানতে পারলাম।

  3. sazzad biplob says:

    Onek okopot kothamala uthe esheche shakkhatkar tire. Thanks to Shimul Salauddin.

  4. শাহনেওয়াজ বিপ্লব says:

    ‘…ব্যক্তিগত জীবনে আমি যদি আরো সম্পদশালী হতাম, হয়তো আমি আরো কিছু বেশি সম্মান পেতে পারতাম জীবনে। কবিতা লিখতে এসে বড় অবহেলা পেয়েছি আশপাশের মানুষের কাছে। লাঞ্ছনা গঞ্জনা পেয়েছি অনেক বড়ো ছোটো মিলিয়ে।’…অশ্রুসজল হলাম,প্রয়াত কবি অরুণাভ সরকারের এ দুর্লভ সাক্ষাতকারটি পড়ে । অনেক ধন্যবাদ,প্রিয় কবি শিমুল সালাহউদ্দিন, সত্যিকারের একজন কবিকে জানার সুযোগ করে দেবার জন্যে।

  5. mahboob hasan says:

    অরুণাভ সরকার আমার প্রিয় কবিদের একজন। তিনি আমাকে অশেষ ভালোবাসা দিয়েছেন। না, তার জন্য তার কবিতার গুণগ্রাহী নই আমি। তিনি শুদ্ধাচারী, প্রায় সব ক্ষেত্রেই! অধ্যাপক মনসুরউদ্দিন সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমি ‌নগর বাউল’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম অরুণদার কবিতা থেকে ধার নিয়ে। তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। তার সাথে আমার সম্পর্ক বড়ো বাই ছোটো ভাইয়ের, কিন্তু তিনি বন্ধুর মতো আচরণ করতেন। বহুদিন আমাদের কেটেছে আড্ডা দিয়ে।
    শিমুল খুব ভালো একটা কাজ করেছেন অরুণদার সাক্ষাৎকার নিয়ে। তিনি আমার দীর্ঘদিনের পুরোনো সহকর্মী ছিলেন, সেই ১৯৭৬ সাল থেকে। আমার অগ্রজ মাহবুব সাদিকের বন্ধু তিনি, কিন্তু বেশি সময় আমরাই কাটিয়েছি আড্ডা দিয়ে। কিশোর বাংলা আর যুগান্তরে আমরা একসাথে ছিলাম। মাঝখানের অনেক বছরের ফারাক থাকলেও আসলে কোনো ফারাক ছিলো না। প্রেসক্লাবে তো বটেই, সুযোগ পেলেই আমরা কবিতা নিয়ে আলোচনায় বসতাম। চা ছিলো তার প্রধান প্রিয় পানীয়। এক চুমুক, দুই চুমুকের বেশি দিতেন না, কিন্তু কবিতায় পড়ে থাকতেন সারাদিন, মনের গহনে পুষে রেখে বেড়াতেন সব বেদনার ভার, যা তিনি সরাতে পারতেন না।
    আমি খুব কষ্ট পাচ্ছি এই ভেবে যে তাকে নিয়ে তেমন কিছু লেখা হয়নি আমার। আসলে কাছের লোকের গুণ সম্পর্কে লেখা কষ্টকর। আমি এখন হয়তো লিখতে পারবো। কিন্তু বিদেশে তার বই কোথায়! দেশে এলে আমি তার কবিতা নিয়ে লিখবো। আমার ঋণ যে তার কাছে অনেক, তা শোধ করতেই হবে।

  6. Belayat Hossain Mamun says:

    পড়ে ভালো লাগলো। ওনার কবিতা একদমই পড়া হয়নি। পড়তে হবে। শিমুল, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ !

  7. সৈকত রুশদী says:

    এই প্রথম কবি অরুণাভ সরকারের কোন সাক্ষাত্কার পড়লাম | মানুষ হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন, তা’ স্পষ্টতই প্রতিফলিত হয়েছে | ব্যক্তিগতভাবে প্রায় তিন দশক ধরে চেনা অরুনাভদা’কে কখনও একটানা এতো কথা বলতে শুনিনি! ধন্যবাদ শিমুল |

  8. বেশ কিছু চুম্বক অংশ রয়েছে সাক্ষাতকারটিতে। ….
    ভালো লাগলো….

  9. মাসুদুর রহমান says:

    অনেক অনেক ধন্যবাদ এমন একটি বিষয় তুলে ধরার জন্য । অনেক কিছুই জানার আছে।

  10. banna says:

    a good job done shimul

  11. কামাল আহমেদ খান says:

    অসামান্য ও ঐতিহাসিক কাজ। ভালোবাসা নেবেন শিমুল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.