প্রবন্ধ, শ্রদ্ধাঞ্জলি, স্মরণ

কবি অরুণাভ সরকার: নগর বাউলের প্রস্থান

tapan_bagchi | 19 Dec , 2014  

arunabha.gifঅরুণাভ সরকারকে চিনি ঢাকায় আসার পর থেকেই, সেই মধ্য আশিতেই। প্রেসক্লাবে কিংবা কবিতার আসরে দেখা হতো। তেমন ঘনিষ্ঠতা হয়নি বয়সের কারণেই। তাঁর ‘খোকনের অভিযান’ পড়ে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম যে তাঁকে খুঁজতে বেরুলাম। অবশেষে শিশু একাডেমিতে গল্পকার বিপ্রদাশ বড়ুয়ার ঘরে পেয়ে গেলাম একদিন। সেখানে তুমুল আড্ডা। তাঁকে ছোটদের জন্য আরো লিখতে অনুরোধ করলাম। কিন্তু তিনি বরাবরই কম লিখতেন।

নিজের চরিত্রের সঙ্গে মিশ-খাওয়া কবিতার বইয়ের নাম নগর বাউল। এরপর কেউ কিছু জানে না আর নারীরা ফেরে না—সাকুল্যে এই তিনটি কবিতার বই তার। পত্রপত্রিকায় ছড়ানো ছিটানো রয়েছে অজস্র কবিতা। কিন্তু কবিতার তিনটি বই দিয়েই তিনি কবিখ্যাতি ধরে রাখতে পেরেছেন। কবিতাগ্রন্থের সংখ্যাবিচারে শহীদ কাদরী, হেলাল হাফিজ, আবুল হাসানের মতোই অবস্থা তাঁর। ছোটদের জন্য লিখেছেন বেশি কিছু গ্রন্থ। সাংবাদিকতা নিয়েও তাঁর দুটি বই আছে। একটি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে, একটি বাংলা একাডেমি থেকে। পেশায় ছিলেন পুরোদস্তুর সাংবাদিক। ইংরেজি পত্রিকাতেই কেটেছে গোটা সাংবাদিক জীবন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়-পাঠ পেরোনোর সুযোগ না পেলেও ইংরেজি ভাষাটা ভালো জানতেন। একই সঙ্গে বাংলাটাও জানতেন। এব্যাপারে ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তাঁর অবস্থানকে তুলনা করা যায়। একই হাতে বাংলা ও ইংরেজি শুদ্ধ করে জানার মানুষ আমাদের সমোজে খুব বেশি কি আছে?

শেষদিকে বাংলা ভাষার ভুল ব্যবহার নিয়ে তুমুল উদ্বিগ্ন ছিলেন। দুটি বইও লিখে ফেললেন। বিভিন্ন সভাসমাবেশে তাৎক্ষণিক দাঁড়িয়ে খ্যাতিমান বক্তাদের ভুল বাক্যবিন্যাস নিয়ে সমালোচনা করে বসতেন। অনেক বড় বড় কবি-লেখককে তুলোধনো করতে দেখেছি। এমনকি মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-রফিক আজাদ-আল মাহমুদ প্রমুখের ভুল শব্দ ভুল বাক্য নিয়েও তিনি প্রকাশ্যে বেশ গালিগালাজ করে বসতেন। কিন্তু আমাদের মতো নবীশদের জন্য তা থেকে ভাষাশিক্ষার সুযোগ ঘটলেও তাঁর আক্রমণের ভঙ্গিতে অগ্রজদের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ পেত বলে আমার ভালো লাগত না। একদিন সাহস করে কথাটা পেড়েই ফেললাম। সে কী রাগ? আমাকে তো খেয়েই ফেলবেন যেন! বললাম যে দাদা, ভাষার শুদ্ধতা রক্ষায় আপনার এই জেহাদকে আমি সম্মান করি, কিন্তু আক্রমণের হাতিয়ারকে একটু মোলায়েম করুন। তিনি রেগেমেগে উঠে চলে যেতেন। পত্রিকার পাতায়ও এইসব নিয়ে লিখতেন। একসময় খেয়াল করলাম যে, তাঁর যুক্তি ঠিক থাকলেও, তত্ত্ব ঠিক থাকলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে তাঁরও কিছু ভুল হয়।

তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রকাশিত ‘ড্যাফোডিল’ এবং ঢাকার ‘নতুনধারা’য় বানান নিয়ে লিখলাম। পড়ে আমার ভেতের বেশকিছু প্রতিক্রিয়া হলো। আমি লিখে পাঠাই কবি ফরিদ কবিরের কাছে। তিনি যথারীতি সেটি ছাপালেন ‘নতুনধারা’য়। প্রতিক্রিয়াটি ছির এমন–

কবি অরুণাভ সরকারের ‘এই সব ভুলভ্রন্তি’ নামের নিবন্ধের প্রথমাংশ পড়েছি পক্ষকাল আগে ওয়াহিদ রেজা সম্পাদিত ‘ড্যাফোডিল’-এ (বর্ষ ৩৩, সংখ্যা ৪৩, ফেব্র“য়ারি-এপ্রিল ২০১০), ‘শিক্ষার এই হাল’ নামে। বিসর্গের বদলে কোথায় বিন্দুচিহ্ন হবে এই কথাটি তিনি চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন (ড্যাফোডিল, পৃ. ১২ এবং নতুনধারা, পৃ. ১৭)। এ-ধরনের ভুল যাঁরা করেছেন, ‘এঁদের কি সামান্য শিক্ষাও নেই?’ বলে প্রশ্ন তোলার যে ভঙ্গি, সেরকম ভঙ্গি তো অরুণাভ সরকারের লেখা পড়েও কেউ করতে পারেন। তিনি লিখেছেন, ‘স্ত্রী লিঙ্গে ষু হয় না, হয় সু। প্রিয়তমাসু অথবা প্রিয়তমেসু।’ কথাটি ঠিক নয়। স্ত্রী লিঙ্গে হয় আসু এবং পুংলিঙ্গে হয় এষু। তাই হবে প্রিয়তমাসু এবং প্রিয়তমেষু। কিংবা শ্রদ্ধাস্পদেষু এবং শ্রদ্ধাস্পদাসু। কেবল সু বা ষু বদল হয় না, এর আগে আ এবং এ-ও বদল হয়। এখন এই ভুল সূত্র দেয়ার জন্য কি কবি অরুণাভ সরকারের ভাষায় প্রশ্ন তুলব? নিশ্চয়ই নয়। কারণ তিনি আমাদের নমস্য। সৈয়দ শামসুল হকের ভুলের ক্ষেত্রে যেমন তিনি মনে করেছেন ‘লেখনিস্খলন আর অন্যদের বেলায় মূর্খতা (‘এঁদের কি সামান্য শিক্ষাও নেই?’)। আমরাও মনে করি, একটু ভুল তাঁর হতেই পারে। কিংবা ধরে নিতে পারি এটি নিতান্তই লেখনিস্খলন। অরুণাভ সরকারের এধরনের লেখা আমরা আগেও পড়েছি। এক লেখা একাধিক স্থানে প্রকাশ না করে নতুন নমুনা ধরে আলোচনা করলে বাংলাভাষায় ভুলের প্রবণতা কমে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। আশা করি তিনি এই ধরনের লেখা চালিয়ে যাবেন। আমরা তাঁর স্কুলে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু গালিগালাজ করতে থাকলে শেখানোর উদ্দেশ্যটাই মাঠে মারা যাবে! নিশ্চয়ই শিক্ষক সেটি শিক্ষার্থীর চেয়ে বেশি ভালো জানেন।

যেদিন ছাপা হয়, তার পরদিন সকালে আমরা ঢাকার বেশ কয়েকজন কবি জড় হয়েছি জাদুঘরের সামনে। ওখান থেকে বাসযোগে আমরা টাঙ্গাইল যাবো। কবি মাহমুদ কামালের আমন্ত্রণে। রিক্সা থেমে বাসের দিকে এগোতেই দেখি কবি অরুণাভ সরকারের স্ত্রী আজিজা সরকার। বৌদিকে নমস্কার জানাতেই বললেন, তপন, অরুণের শরীরটা খুব খারাপ। তুমি নাকি ওর বিরুদ্ধে কী লিখেছ। কালকে অনেকেই ফোন করে তাকে জানিয়েছে। সে খুব ক্ষেপে আছে তোমার উপর। ওর সামনে পড়ো না।’ বহুত মুসিবত তো!। এক গাড়িতে যাবে, এক অনুষ্ঠানে যাবো, সামনে না পড়ে তো উপায় নেই। দেখি, একটু দূরে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছেন। সাতপাঁচ না ভেবে আমি তাঁর সামনে গিয়ে নমস্কার জানিয়ে পত্রিকাটি মেলে ধরি। আর বলি, দাদা, আমার উপর রেগে আছেন কেন অন্যের কথা শুনে? পড়ে দেখুন। ভুল করলে শিখিয়ে দিন।’
তিনি পত্রিকাটি হাতে নিয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন, ‘তুমি ঠিকই লিখেছ তপন। আমার এতটা রেগে যাওয়া ঠিক নয়। তাছাড়া আমার ভুলও যখন বের করেছ, তাহলে এসব নিয়ে লেখার আগে তো আরো ভাবতে হবে।’ যাক, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। একসঙ্গে টাঙ্গাইল গেলাম, ফিরে এলাম। সারাদিন একসঙ্গে কাটালাম। তবে এরপর আর অন্যের বানান ভুল ধরলেও গালাগালি করতেন না। ভুল ধরিয়ে দিতেন। আমার প্রতি তাঁর এউ উদারতায় আমি খুব কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি।

আমি যখন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে চাকরি করি, তখন তিনি প্রায়ই সেখানে যেতেন। ডিজি-ডিরেক্টরদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন দীর্ঘক্ষণ। আমার ঘরেও আসতেন। একদিন খুব হাসতে-হাসতে আমাকে বললেন, ‘আমার প্রতিবেশীদের থেকে সাবধান!’ আমি তাঁর কথার অর্থ যখন বুঝতে পারি, তখন আর সাবধান হওয়ার সুযোগ ছিল না। তিনি তখন আরো অনেক কথা বলেছিলেন। যা এখন অপ্রাসঙ্গিক বলে উহ্য রাখা যায়।
বাংলা একাডেমিতেও অনেকবার এসেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পরে একদিন বললেন, তপন পুরস্কার না পেলেও চলত, কিন্তু টাকাটা খুব দরকার ছিল। খুব অভাবেই কেটেছে তার শেষের দিনগুলো। পত্রিকার চাকরিতে অনিয়মিত ছিলেন। ফুসফুসের যন্ত্রণা ছিল। অনেকেই শেষদিকে তাঁর চিকিৎসার জন্য এগিয়ে এসেছিলেন। আর্থিক সহায়তাও করেছেন কেউ কেউ। তবে তা যথেষ্ট ছিল না।

সাংবাদিকতা তার পেশা হলেও কবিখ্যাতি ছিল যথেষ্ট। কবিতার জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। টাঙ্গাইল সাহিত্য সংসদ পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তার চেয়ে বড় পুরস্কার পেয়েছেন মানুষের ভালবাসা। সবাই ভালবাসতেন অরুণাভ সরকারকে। সংসারের টানাটানি ছিল বলে শুনেছি। কিন্তু হাতে টাকা থাকলে দুহাতে খরচ করতে পিছপা হতেন না।

কবিতায় তিনি ষাট দশকীয় সরলতাকেই অঙ্গীকার করেছিলেন। কোনো ভাঙচুরের ঘোষণা কিংবা নিরীক্ষার নামে নতুন কিছু না করেও যে কবি হওয়া যায়, অরুণাভ সরকারই ছিলেন তাঁর জ্বলন্ত উদাহারণ। ”নারীরা ফেরে না” কাব্যের নামকবিতায় লিখেছেন-
যাওয়া বলে কিচ্ছু নেই, সবই ঘুরে-ফিরে আসা
শূন্যতায় মাথা কুটে ফিরে আসে সমস্ত সংলাপ
সব শী্ত্কার চী্ত্কার
বিশাল রণপা-য় চেপে
প্রাচীন গোধূলি ফিরে আসে,
নীলিমা-ভ্রমণ শেষে ফেরে পাখি,
নদী, তারও গতি নয় শুধুই সাগরে
সেও মেঘে মেঘে ঝরনার নিকটে ফিরে যায়।
তবু
একবার চলে গেলে
নারীরা ফেরে না।প্রজাপতি মাথা কোটে জানালার কাচে
প্রজাপতি স্বচ্ছতা জানে না
স্বচ্ছতা জানে না বলে মাথা কোটে
ভাবে, ওই তো রয়েছে তার কাঙ্ক্ষিত আকাশ
এক্ষুণি সে উড়ে চলে যাবে।

আকাশ আকাশে থাকে
জানালায় থাকে স্বচ্ছ কাচ
প্রজাপতি মাথা কোটে স্বচ্ছতায়, কাচে
প্রজাপতি স্বচ্ছতা জানে না বলে মাথা কোটে।
প্রজাপতি মাথা কোটে জানালার কাচে।

খুবই পরিচ্ছন্ন কবিতা। অযথা ধোঁয়া ছড়িয়ে দুর্বোধ্য বানানোর চেষ্টা নেই। পাঠককে ধোঁকা দেওয়ার অপচেষ্টা নেই। নিজের জীবনের মতোই সহজ ছিল তাঁর কবিতা। ২০১৩ এর শীতে তিনি লিখেছিলেন—
এসো, আর বিন্দুমাত্র বিলম্ব করো না
আকাশে এখন কোনো সোনা
নেই, বহু আগে
ঝরে গেছে। রাগে
গর্জাতে গর্জাতে উত্তরের বায়ু
ছুটে আসে। ত্বক চাটে। পরমায়ু
টেনে ছিঁড়ে খায়
অন্ধকারে, থাবায় থাবায়
তাই এসো, আর কোনো বিলম্ব করো না।

তিনি কাকে ডেকেছিলেন, পরের শীতে তিনি বিন্দুমাত্র দেরি না করেই নিজেই চলে গেলেন কার কাছে? নারীরা ফেরে না বলে তিনি যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আজ তো তিনিই চলে গেলেন আর ফিরবেন না বলে? হয়তো শারীরিক প্রত্যাবর্তন আর হবে না, কিন্তু তাঁর কবিতার হাত ধরে তিনি ফিরে ফিরে আসবেন। আমাদের ‘নগরে বাউল’ ছিলেন তিনি, নাগরিক মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন মোক্ষধামে। কবি অরুণাভ সরকার, বিনম্র শ্রদ্ধা।
Flag Counter


3 Responses

  1. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল says:

    তপন, খুব ভালো লিখেছো।

  2. অধীর says:

    তপনদা’র নির্মোহ সত্য স্মরণ, প্রাঞ্জল বিশ্লেষণ আর কৃতজ্ঞতার সাবলীল বহিঃপ্রকাশ অপূর্ব।

  3. হেলাল উদ্দিন হৃদয় says:

    তপন’দা সত্যিই চমৎকার একটি লেখা। খুবই ভালো লাগল লেখাটি পড়ে। আপনাকে ধন্যবাদ। নমস্য এই মানুষটিকে ঘিরে আমারও যে অনেক স্মৃতি আছে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.