কবিতা

হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা

habibullah_siraji | 17 Dec , 2014  

কিছুই ঘটে না

বানান শেখার জন্য ঘুরে দাঁড়িয়েছে শব্দ
পাতার পতন আটকাবে ব’লে গতি বদলিয়েছে বাতাস
বাঁশি শুনাবে ব’লে রাইফেলের কার্তুজ ফেলে দিয়েছে সৈনিক
মঞ্চে ওঠার জন্য গোয়ালের খুঁটিতে শিং ভেঙেছে গরু
টুপিতে ঢুকবে ব’লে নাপিতের হাতে মাথা পেতেছে শুক্রবার

কিছুই ঘটে না

পদ্যের মতো একটি পুকুর হানা দিলো নীলিমা
রোদের মতো একটি ফুটবল খেয়ে ফেললো মাঠ
অরণ্যের মতো একটি আনন্দ জয় করলো এভারেস্ট
সাহসের মতো একটি বৃত্ত চেখে দেখলো পনির
জ্যৈষ্ঠের মতো একটি জায়নামাজ পাতা হ’লো পশ্চিমে

কিছুই ঘটে না

না ঘটার জন্য কল্পকের ফাঁসির দাবি উঠলে
কারাগারের মূল ফটকের ঘড়ি নামিয়ে ফেললো জল্লাদ


মিত্রশত্রু

আমার মিত্র যে স্বপ্নগাত্র খুলেছে সে
ওলো দাসী, চক্ষু মেলে শাদা পক্ষী ধর —
শাদা বায়ু, শাদা আয়ু, পক্ষী তো সলক
অঘোর পক্ষের গর্ভে সৃষ্টির ফলক ;
আমিও যে তার মিত্র— অষ্টযাত্রা কর !

আমার শত্রু যে লীলাফাঁদ পেতেছে সে
ওলো দাসী, নেত্রমূলে কৃষ্ণচন্দ্র ধর—
কৃষ্ণ ধূপ, কৃষ্ণ রূপ, চন্দ্র তো কাঁচুলি
রশ্মির ছলনা মাখা জন্মান্ধ গোধূলি ;
আমিও যে তার শত্রু— ঊর্ধ্ববার্তা কর !

যার মিত্র, শত্রু তার
সেবাধামে মহাদাসী যাচ্ঞাপাত্রে ভার !


হৃদয় মেলিয়া কাক দেখিলাম

অবসর খাকি টুপি জমা দিলে
টুটাফাটা জুতো হা-মুখে তাকায় —
ডুবে থাকা ঘাড়ে ছেঁড়া ফিতে বেঁধে
লগ এলাকায় মামলা নামায় !

ঢিলে চামড়ায় জমে থাকা নুনে
ফাটা আঙুলের দায় শতকণা —
দুই চোখে ঠুলি, তুলো গোঁজা কানে
সোনার ওজনে তামা বনিবনা !

হাঁটুতে বুদ্ধি হোঁচটে লালসা
যা সকল ডান তার সব বাম
লুট করে নিলে শাপলার বিল
হৃদয় মেলিয়া কাক দেখিলাম !

ভুট্টাক্ষেতে মই দেবেন না

জমাট মাটিতে ঈষ হবো
তুলে নেবো চামড়া, খুলে ফেলবো মাংস, ঢুকে যাবো হাড়ে
আকুল হ’য়ে আছি, বৃষ্টির আগেই উপযোগী হবো
যারা মই দিতে চান, তারাসাবধান !

ডালে ও পাতায় ফড়িং হ’য়ে আছি
ছাল খুলে নেবো, দানা ভেঙে দেবো
লালা মিশিয়ে গোলা হ’লে গিলে ফেলবো
ব্যাকুল হ’য়ে আছি, আগুন লাগার আগে
দয়া করে ভুট্টাক্ষেতে মই দেবেন না !

বীজ তুলে রেখে দেবো ব’লেমাটি খুঁজি গর্ভের আহ্লাদে —
হে তরঙ্গ, আপনি সম্মানিত করুন
আমাদের শস্যমালা বংশ দিয়েছে !

আমি তো পূর্বেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম
দানা তার আশ্রয় ফিরে পাবে
ভুট্টাক্ষেতে কেউ মই দেবেন না।

জাদু ও বাঁশি

উড়ছে বাংলাদেশ।
সবুজ ও সূর্য উড়তে-উড়তে
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল হ’য়ে গেলে
আমার সোনার বাংলা … আমারই পতাকা —
যে পারে সে ধরে
জাদুকর তাহারে ওড়ায়।

বাঁশি শুনে কাজ আছে
সুর হে, বনেরও যে মন পোড়ে
বায়ু বহে — ফোটে স্নেহলাল
দিবস-রজনী নিয়ে বাঁশি তাই লিখে রাখে
মানুষের নাম।

মোহন আনন্দ মিলে যেই মায়াজাদু
বাঁশি তার অপার বেদনা।


রোদমঞ্জু ছায়াবেলা

ছায়া ও পাথরে যুদ্ধ হ’চ্ছে
ছাদ থেকে দেয়াল তারপর মেঝে আক্রান্ত হ’লে
ছায়া জিজ্ঞেস করে, আরো
পাথর নিশ্চুপ

রোদ বেড়াতে গিয়েছিলো পর্বতে
বরফ বললো, আছি প্রিয়তম
চুম্বনের অগ্রভাগে আমাকে রেখো
রোদ হাসে

পাথর ও বরফের মধ্যে সন্ধি হলে
রোদমঞ্জু ছায়াবেলা হবে

Flag Counter


9 Responses

  1. mrinal basu chaudhuri says:

    asadharan koyekti kabita porlam….saradin sishu hatyar khobore matha nichu kore bosechilam…..ei kabitaguli amar kache ananda-prolep hoye elo…. CHAYABELAR apekkhai thaki…..kritaggata janai kabike….

  2. হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা শব্দপ্রহেলিকা ও অর্থগূঢ়তায় উচ্চমার্গীয়। গভীর দ্যোতনাদ্যুতির ছত্রে-ছত্রে শুনি শব্দব্রহ্মের ওঙ্কারধ্বনি, যা হৃদয়-মননে সঞ্চার করে পরম আনন্দ। পংক্তিমালার পাঠোদ্ধার হয় না, কেবল পাওয়া যায় ভালো-লাগা ভাব-অনুভবের অগ্নিপরশ। বিশুদ্ধ নন্দনের পুণ্যজলে স্নান করে ধন্য হই। ধন্যবাদ কবিকে!

  3. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    বাহ্! দুর্দান্ত কয়েকটি কবিতা পড়লাম। নতুন কিছু ভঙ্গিমা দারুন লাগলো। বদলিয়েছে’র ব্যবহার চমকপ্রদ। হৃদয় মেলিয়া কাক দেখিলাম কবিতাটাই বেস্ট অব দ্যা বাঞ্চ। কবির প্রতি শ্রদ্ধা রইলো। তাঁর নিরোগ দীর্ঘায়ূ কামনা করছি। ধন্যবাদ আর্টসকে সত্তরের দশকের অগ্রপথিক এ কবির কবিতা প্রকাশ করার জন্য।

  4. Habibullah Sirajee says:

    অনেক ধন্যবাদ মৃণালদা।

  5. Morshed hossain says:

    New style of writing attracts me

  6. matin bairagi says:

    কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর কবিতাগুলো পড়তে পড়তে মনে হলো কয়টা নতুন কবিতা পড়লাম। ভাষা এবং স্টাইল আমার কাছে অভিনব মনে হলো। ব্যঙ্গবিদ্রুপগুলো শিল্পিত এবং বাক্য নির্মাণে অনেকটাই আলাদা। এরকম কিছু কবিতা রয়েছে মিউশের শেষের দিকের। সিরাজী ভাই যেমন বলেন
    ‘কিছুই ঘটে না
    না ঘটার জন্য কল্পকের ফাঁসির দাবি উঠলে
    কারাগারের মূল ফটকের ঘড়ি নামিয়ে ফেললো জল্লাদ’ বা ‘ডালে ও পাতায় ফড়িং হ’য়ে আছি
    ছাল খুলে নেবো, দানা ভেঙে দেবো
    লালা মিশিয়ে গোলা হ’লে গিলে ফেলবো
    ’‘পাথর ও বরফের মধ্যে সন্ধি হলে
    রোদমঞ্জু ছায়াবেলা হবে’ ব্যাকুল হ’য়ে আছি,
    আগুন লাগার আগে
    দয়া করে ভুট্টাক্ষেতে মই দেবেন না !’ তখন তো তিনি কেবল কতগুলো দৃশ্যই তৈরি করেন নি আর ‘কারাগারের মূল ফটকের ঘড়ি নামিয়ে ফেললো জল্লাদ’ হয়ে উঠল অদ্ভুত দ্যোতনাময় এক পঙক্তি যা একটু একটু করে অনুভব করে নিতে হয় নিজের কল্পনায় যা আছে আর যা বলা হয়েছে তাকে। এখানেই কাব্য। সিরাজী ভাইকে অনেক ধন্যবাদ।

  7. Habibullah Sirajee says:

    বিনয় বর্মন,শিমুল সালাহউদ্দিন,মোরশেদ হোসেন।
    আপনাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

  8. Habibullah Sirajee says:

    ভাই মতিন বৈরাগী।
    আপনার বিবেচনা মাথা পেতে নিয়ে বলি, শেষ পর্যন্ত তো কবিতারই জয়। অসংখ্য ধন্যবাদ।

  9. MD MASUD AHAMED says:

    অসাধারণ সব কবিতা ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.