ব্যক্তিত্ব, সংস্কৃতি, সাহিত্য সংবাদ

আবদুল গাফফার চৌধুরী : অশীতিপর এক তরুণের গল্প

rahim_shah | 15 Dec , 2014  

abdul-gaffar.gifপাকিস্তানি তমসা মোচন করে বাঙালি জাতির যে জাগরণ সূচিত হয় বায়ান্নর একুশেতে, তা সর্বজনের অন্তরে সর্বকালের জন্য ঠাঁই করে নেয় দুই নবীনের কথা ও সুরের সম্মিলনে, আবদুল গাফফার চৌধুরীর রচনা ও আলতাফ মাহমুদের(উল্লেখ্য যে এ গানটির প্রথম সুরকার ছিলেন সংগীতশিল্পী আবদুল লতিফ।) সুরস্পর্শে সৃজিত হয় অমর গান `আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুযশে ফেব্রুয়ারি’। সেই থেকে বাঙালির জাতীয় চেতনার বিকাশের প্রতিটি সংগ্রাম ও তার বিভিন্ন উত্থানের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আবদুল গাফফার চৌধুরীর নাম।

সাহিত্যে তিনি যে সিদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন সেই সাধনায় স্থিত হওয়ার অবকাশ সমকাল তাঁকে দেয়নি। জাতির মুক্তি-চেতনা তাঁকে ব্রতী করেছিল আরও প্রত্যক্ষ ও প্রভাবসঞ্চারী সাংবাদিকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে। লোকভাষার অনন্য মাধুর্য ও ইতিহাস-চেতনার প্রসারতা মিলিয়ে তিনি জাতির আন্তর্তাগিদের রূপ মেলে ধরছিলেন সংবাদপত্রের পাতায়, তাঁর ক্ষুরধার ও ব্যতিক্রমী লেখনীতে। যে অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক চেতনার অনন্য ভাষ্যকার হয়ে উঠেছিলেন তিনি, তা স্বাধীনতার পথে জাতির অভিযাত্রায় হয়েছিল বিশেষ প্রেরণা।

এ ছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’― এই অমর গানের রচয়িতা, প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরীর প্রতি সাধারণ মানুষের মূল্যায়ন। গত ১২ ডিসেম্বর ছিল তার ৮০তম জন্মবার্ষিকী।

এ উপলক্ষে ‘আবদুল গাফফার চৌধুরীর ৮০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি’ ওইদিন বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে জাতীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রবিরশ্মির শিল্পীদের পরিবেশনায় সম্মেলক কণ্ঠে জাতীয় সংগীত এবং একুশের গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর মহান ভাষা-আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদ এবং সম্প্রতি প্রয়াত দেশের বিশিষ্টজনদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান বলেন, বাঙালির জাতির জীবনে এমন অবিস্মরণীয় সংবর্ধনা খুব কমই এসেছে। এই সংবর্ধনাতো তাঁরই প্রাপ্য যিনি একুশের ঐতিহাসিক গান রচনার পাশাপাশি একটি ধর্মনিরপেক্ষ-যুক্তিবাদী-মানবিক বাংলাদেশের ভবিষ্যত নির্মাণে কলমযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে ৮০তম জন্মদিনে ৮০টি গোলাপে তৈরি মালা এবং একাডেমি প্রকাশিত পুস্তক উপহার দিয়ে আবদুল গাফফার চৌধুরীকে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

অনুষ্ঠান চলাকালে টেলিফোনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা আবদুল গাফফার চৌধুরীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান।
এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে নূরুল ফজল বুলবুল একুশের গানের রচয়িতার কাছে সম্মাননাসূচক একুশ লক্ষ টাকার চেক হস্তান্তর করেন।
এরপর আবদুল গাফফার চৌধুরীকে ফুলের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে এইচ টি ইমাম ও ডা. দিপু মণি, সৈয়দ শামসুল হক ও আনোয়ারা সৈয়দ হক, জাতীয় কবিতা পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, গণজাগরণ মঞ্চ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, ঢাকা কলেজ, আওয়ামী সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় ও ঢাবি শাখা, স্বভূমি লেখক সংঘ, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষে ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী, পেশাজেবী ঐক্য পরিষদ, মেহেন্দীগঞ্জ সমিতি, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি, কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট, সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তের পরিবার, দৈনিক সমকাল, বাংলা একাডেমি কর্মচারি ইউনিয়ন, অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম, হামদর্দ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাজ্য ও সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষে শফিকুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মুকিত চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক আসাদ মান্নান।

জাতীয় সংবর্ধনা কমিটির পক্ষে মানপত্র পাঠ করেন কবি আসাদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন কবি সৈয়দ শামসুল হক, এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক, সাবেক সচিব এম মোকাম্মেল হক, ভাষাসংগ্রামী প্রতিভা মুৎসুদ্দী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. হারুন অর রশিদ, ড. আনোয়ার হোসেন, সাংবাদিক আবেদ খান, বিবি রায় চৌধুরী, ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টির মনোনয়নপ্রার্থী মিনা রহমান। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামী লীগ নেতা নূহ উল আলম লেলিন, সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারসহ শিল্পসাহিত্য সংস্কৃতির গণ্যমান্য অসংখ্য মানুষ।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, আবদুল গাফফার চৌধুরী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ এক সমার্থক শব্দ। আদর্শের প্রশ্নে তাঁর আপোষহীন অবস্থান সমকালে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তিনি এক অসমসাহসী যোদ্ধা। বিশ্বব্যাপী যারাই বাংলা ভাষাকে ভালোবাসেন, লালন করেন তাদের অন্তরে তিনি এক আলোকবর্তিকা হিসেবে পথনির্দেশ করে যাবেন। তাঁর মতো গুণী বাঙালির জীবন ও কর্মকে উত্তরপ্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁকে নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যচিত্র নির্মাণ করা জরুরি।

সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘লালগঞ্জের তীরে সূর্যোদয়’ কবিতা আবৃত্তির মধ্য দিয়ে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।
সংবর্ধনার জবাবে আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, অমর একুশের স্মরণে গান রচনা করে আজ আমি এই অভূতপূর্ব সংবর্ধনা লাভ করেছি। যাদের এই সংবর্ধনা প্রাপ্য ছিল সেই সালাম, বরকত, রফিক, সফিক, জব্বার ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে নীরবে এই পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। আমরা মাতৃভাষা বাংলার জন্য রক্ত দিয়েছি কিন্তু দুঃখের বিষয় আজ উর্দুর পরিবর্তে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষাসাম্রাজ্যবাদের কবলে আমরা গভীরভাবে নিপতিত। তিনি বলেন, পঞ্চাশ দশকের আমার প্রায় সকল সহযোদ্ধা ও বন্ধু যারা তৎকালীন পূর্ব বাংলার রেনেসাঁস সংঘটনে ভূমিকা রেখেছেন তারা সবাই আজ প্রয়াত। আমি তাদের স্মৃতিবাহক হয়ে বেঁচে আছি, যুদ্ধ করছি-মৌলবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ও বিবেকহীনতার বিরুদ্ধে। তিনি বলেন এই ঢাকায় ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো পণ্ডিত বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হতে পারেন নি। কিন্তু আজ সামান্য পদপদবীর জন্য অনেককেই বিবেক বিক্রি করতে দেখা যায় যা সত্যি হতাশাজনক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আজ মৌলবাদ নামক বিষফোঁড়ার আক্রমণে জর্জরিত। পুলিশ ও র‌্যাব দিয়ে মৌলবাদ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার শিক্ষা ও সচেতনতা। নিরপেক্ষতার নামে কিছু সংবাদমাধ্যম ও গোষ্ঠী মৌলবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে যাচ্ছে যার বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়ানো দরকার। আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, আমি এই সংবর্ধনা সকল ভাষাশহিদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মানবমুক্তির সংগ্রামে যুগে যুগে প্রাণ বিসর্জনকারী সকল সংগ্রামীর উদ্দেশে উৎসর্গ করছি।

এই আশি বছর বয়সেও তারুণ্যে ঝলমলে যেন আমাদের আবদুল গাফফার চৌধুরী। দীর্ঘদিন লেখালেখি করেও ক্লান্ত নন তিনি। বক্তব্যে উচ্চারিত হয়েছে, ‘যতদিন বেঁচে আছি লিখে যাব। পাশাপাশি থাকতে চাই প্রতিটি বাঙালির মাঝে।’
বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ থানার উলানিয়া গ্রামের চৌধুরী পরিবারের অসংখ্য প্রতিভাবান তারকার মাঝে, ব্রিটিশ আমলে বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সভাপতি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে কারাবন্দি, জমিদার হাজি ওয়াহেদ রেজা চৌধুরী ও জোহরা খাতুনের দুই ছেলে, চার মেয়ের মধ্যে অন্যতম সন্তান আবদুল গাফফার চৌধুরী। তিনি একাধারে কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট, সম্পাদক, নাট্যকার, গীতিকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, রাজনীতিক ও বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষকসহ বহু অভিধায় ভূষিত। তিনি স্বকীয় উজ্জ্বলতায় ভাস্বর অনন্য গুণী শিল্পী। সাহিত্যিক ও কলামিস্ট হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত এই মহান লেখকের জীবন ইতিহাস বৈচিত্র্যময় ও সংগ্রামমুখর। যখন তিনি ক্লাস ফোরে পড়েন তখন কবিতা লেখার মাধ্যমে লেখালেখির সূচনা। তারপর তাঁর কলম উপহার দিয়েছে বাঙালির জন্য অগণিত কালজয়ী রচনা। তাঁর প্রখ্যাত কবিতা সংগ্রহ সময়ের ঘড়ি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন গ্রামবাংলার চিত্র নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম প্রকাশিত গল্পের নাম ‘স্বাক্ষর’। এটি ১৯৪৯ সালে মাসিক সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত। আবদুল গাফফার চৌধুরী ছিলেন সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’র নিয়মিত গল্পলেখক। তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ কৃষ্ণপক্ষ প্রকাশিত হয় ১৯৫৮ সালে। তারপর সম্রাটের ছবি, সুন্দর হে সুন্দরসহ জীবন ঘনিষ্ঠ কিছু গল্পগ্রন্থ লেখক আমাদের উপহার দেন।

চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান নামক বিখ্যাত উপন্যাস দিয়ে উপন্যাস-সাহিত্যে তাঁর যাত্রা শুরু। এরপর একে একে রচিত হল শেষ রজনীর চাঁদ, নাম না জানা ভোর, নীল যমুনাসহ আলোচিত সব উপন্যাস। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লেখক কবিতা, গল্প, উপন্যাস ছাড়াও লিখেছেন দশটির মতো রাজনৈতিক নিবন্ধের বই। লিখেছেন স্মৃতিকথামূলক কয়েকটি বই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে লিখেছেন ইতিহাসের রক্তপলাশ পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর। এ ছাড়াও তিনি একজন সফল নাট্যকার। জীবননির্ভর, সফলভাবে মঞ্চায়িত বহু নাটকের স্রষ্টা তিনি। তিনি সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ কালজয়ী সব গান। ব্যতিক্রমী এই গীতিকারের গানের সংখ্যা দুশর উপরে। সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়তা পেয়েছে তাঁর লেখা একুশের গান। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার দাবিতে কারফিউ ভাঙার সময় ভাষাশহিদ রফিকের গুলিবিদ্ধ রক্তাক্ত লাশ দেখে লেখকের সংবেদনশীল হৃদয়ে অনুরণিত হয়–‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলতে পারি।’ ত্রিশ পঙ্ক্তির এই অমর গানটির প্রথম ৬ পঙ্ক্তি মাত্র গাওয়া হয়।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত গান পরিবেশন করেন হিমাংশু গোস্বামী, এছাড়া পঞ্চকবির গান ছাড়াও ছিল ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে লালনগীতি।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.