গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস: নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ২৯ নভেম্বর ২০১৪ ৬:৩৬ অপরাহ্ন

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ১০

সে ফ্রান্সিসকো এল অমব্রেকে পেল গোল হয়ে থাকা একদল উৎসুক শ্রোতাদের মাঝখানে কামালেওনের (এক জাতীয় গিরগিটি) মত বসা অবস্থায়, পুরোনো বেসুরো গলায় খবর গেয়ে যাচ্ছিল গায়ানার স্যার ওয়াল্টার রালে-র কাছ থেকে পাওয়া সেই একই অ্যাকোর্ডিয়ান বাজিয়ে। হাঁটতে পটু সোরার (saltpeter) কারনে ফেটে যাওয়া বড় বড় পা দিয়ে তাল রেখে যাচ্ছিল। পিছনের দিকে একটা দরজা দিয়ে কিছু লোক ঢুকছিল আর বেরিয়ে যাচ্ছিল, আর তার সামনে নীরবে দোলচেয়ারে হাওয়া খাচ্ছিল সেই সম্ভ্রান্ত চেহারার মহিলা, কানে ফেল্টের (কাপড়) তৈরি একটা গোলাপ গুঁজে কাতারিনা দর্শকদের কাছে বিক্রি করছিল গাজানো আখের রসে ভর্তি কাপ আর এই সুযোগে লোকদের কাছে গিয়ে হাত দিচ্ছিল এমন সব জায়গায় যেখানে হাত দেয়া উচিৎ নয়। মধ্যরাতের দিকে গরম ছিল অসহ্য। আউরেলিয়ানো খবরের শেষ পর্যন্ত শুনেও ওর পরিবারের জন্য আগ্রহজনক কিছুই পেল না। যখন সে বাড়ি ফিরে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল তখন মহিলা তাকে হাত দিয়ে ইশারা করে। -“তুইও ঢুকে যা” বলল “দাম হচ্ছে কেবল মাত্র কুড়ি সেন্ট”।
আউরেলিয়ানো কিছুই না বুঝে ওর কোলের উপর রাখা টাকার বাক্সে একটি মুদ্রা ফেলে ঢুকে গেল। কুকুরীর মত ছোট ছোট স্তন নিয়ে মুলাতো (সাদা আর কালোর বর্ণ সঙ্কর)কিশোরী নগ্ন অবস্থায় শোওয়া ছিল বিছানায়। আউরোলিয়ানোর আগেই তেষট্টি জন পুরুষের আগমন ঘটেছিল সেই ঘরে। এতবার ব্যবহারের ফলে কাঁদা হয়ে যেতে আরম্ভ করেছিল ঘাম আর দীর্ঘশ্বাসে মাখামাখি ঘড়ের বাতাস। কিশোরী মেয়েটা ভেজা চাদরটা সরিয়ে নিয়ে এক কোনা ধরতে বলে আউরেলিয়ানোকে। ওটা ছিল ক্যানভাসের মত ভারী। দুই পাশ ধরে নিংড়িয়ে চলল দুজনে যতক্ষণ পর্যন্ত না ওটা ফিরে পায় তার স্বাভাবিক ওজন। মাদুরটাকে উল্টে দেয় ওরা আর এতে করে ঘাম ঝড়ছিল মাদুরের অপর পাশ থেকে। আউরোলিয়ানো উদগ্র মনে চাচ্ছিল যে এই কাজটা যেন কখনই শেষ না হয়। প্রণয়ের তাত্ত্বিক প্রক্রিয়াগুলো তার জানা ছিল, কিন্তু হাটু দুটোর সাহসহীনতার কারণে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না সে। যদিও কামনায় তার চামড়া জ্বলছিল আর লোমগুলো খাড়া হয়ে গিয়েছিল, তবুও পেটের ভার মুক্ত করার আশু প্রয়োজনীয়তাটা কিছুতেই রোধ করতে পারছিল না। যখন মেয়েটা বিছানা পাতা শেষ করে, ওকে আদেশ দেয় নগ্ন হতে আর সে চিন্তাভাবনা ছাড়াই একটা ব্যখ্যা দেয়। “আমাকে জোড় করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আমাকে বলল বিশ সেন্ট টাকার বাক্সে ফেলতে আর বলল দেরী না করতে”। মেয়েটা তার অজ্ঞতার কথা বুঝতে পারে। “যদি বেরুনোর সময় আরও বিশ সেন্ট ফেলে দিস তবে আরও কিছুক্ষণ দেরী করতে পারিস” নরম স্বরে বলে। ওর নগ্নতা ওর ভাইয়ের নগ্নতার কাছে টিকবে না–এই ধারণার লজ্জায় পীড়িত আউরোলিয়ানো নগ্ন হয়। মেয়েটার উপুর্যুপরি চেষ্টা সত্ত্বেও ও বোধ করে প্রতিবারই অনাসক্তি, প্রতিক্ষণই বোধ করে ভয়ংকর একাকীত্ব। “আরও বিশ সেন্ট রাখব,” বলে হিমশীতল স্বরে। মেয়েটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিরবতার সাথে। পিঠের মাংশ বেরিয়ে গিয়েছিল ওর। বুকের হাড়ের সঙ্গে চামড়া ছিল এক হয়ে আর ভীষণ ক্লান্তির ফলে শ্বাসপ্রশ্বাস ছিল অনিয়মিত আর গভীর। এখান থেকে অনেক দূরে, দু‘বছর আগে মোমবাতি না নিবিয়ে ঘুমিয়ে পরে ও। আর জেগে ওঠে চারিদিকে জ্বলন্ত আগুন নিয়ে। ছাইভষ্মে পরিণত হয় দাদীর বাড়িটা যেখানে ওর দাদী ওকে লালন করেছিল। সেই সময় থেকেই ওর দাদী বিশ সেন্টের বিনিময়ে মেয়েটিকে পুরুষদের সঙ্গে শোয়ানোর জন্য নিয়ে যেত এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে, যাতে করে পুড়ে যাওয়া বাড়িটার দাম শোধ করতে পারে মেয়েটা। মেয়েটার হিসেব অনুযায়ী তখনও বাকি আছে প্রতি রাতে সত্তর জন পুরুষ ধরে হিসাব করে আরও দশ বছর। কারণ শুধুমাত্র বাড়ির টাকাই নয়, তাকে বহন করতে হতো দুজনের যাতায়াত ভাড়া, খাবার দাবার, আর যে আদিবাসীরা দোলচেয়ার বহন করত তাদের বেতন। যখন মহিলা দ্বিতীয়বারের জন্য দরজায় টোকা দেয় তখন আউরেলিয়ানো কান্নার ঘোড় নিয়ে বের হয়ে যায় কিছুই না করে। ঐ রাতে কামনা আর করুণার মিশ্র অনুভূতি নিয়ে আউরেলিয়ানো ঘুমাতে পারে না। অনুভব করে ওকে রক্ষার আর ভালবাসার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ভোরে অনিদ্রার প্রচন্ড অবসাদ আর জ্বর নিয়ে স্থির সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করে মেয়েটাকে অত্যাচারী দাদীর হাত থেকে মুক্ত করার আর প্রতি রাতে সত্তর জন লোককে যে তৃপ্তি মেয়েটা দিত তা একা একা উপভোগ করার। কিন্তু সকাল দশটার সময় যখন সে কাতারিনার দোকানে উপস্থিত হয়েছে ততক্ষণে মেয়েটা গ্রাম থেকে চলে গিয়েছে।

সময়ই তার এই অপরিণামদর্শী ইচ্ছেটাকে প্রশমিত করে কিন্তু বেড়ে যায় তার হতাশা। এতে করে সে আশ্রয় নেয় কাজের মধ্যে। নিজের অনুপযোগিতার লজ্জা লুকাতে সিদ্ধান্ত নেয় সাড়া জীবন মেয়েদের সংস্পর্শহীন পুরুষ হয়ে থাকার। অন্যদিকে, মেলকিয়াদেস মাকন্দোর ধারনযোগ্য সব চিএই তার দাগেরোটিপোতে ধারন করার কাজ শেষে দাগেরটিপোর পরীক্ষাগার পরিত্যাগ করে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার উন্মতত্ততার কাছে, যে নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণে ওটাকে কাজে লাগাতে চায়। সে নিশ্চিত হয় যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব যদি থাকেই তবে সুপারইম্পোজড্ এক্সপোজারের এক জটিল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাড়ির নানান জায়গায় তোলা দাগেরটিপোতে ঈশ্বর ফুটে উঠবেন নতুবা চিরদিনের জন্য ঈশ্বরের অস্তিত্বের ধারণাকে সে ক্ষান্ত দেবে। নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণীগুলো আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে মেলকিয়াদেস। রংচটা মখমলের জামার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় চড়ুই পাখির পায়ের মত সরু হাত দিয়ে হিবিজিবি এঁকে চলে কাগজের উপর অনেক রাত পর্যন্ত, যে হাতের আংটিগুলো হারিয়ে ফেলেছে আগেকার সেই উজ্জলতা। এক রাতে তার মনে এই বিশ্বাস জেগে ওঠে যে সে জেনে ফেলেছে মাকন্দোর ভবিষ্যৎ। মাকন্দো হবে কাঁচের বাড়িঘরওয়ালা এক ঝলমলে শহর যেখানে বুয়েন্দিয়া বংশের কোন চিহ্নই থাকবে না। “এটা একটা ভূল ধারণা” গর্জন করে উঠে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “বাড়িগুলো কাঁচের হবে না, হবে বরফের, আমি যেমনটি স্বপ্নে দেখেছি; আর সবসময়ই বুয়েন্দিয়ারা থাকবে, শতাব্দীর পর শতাব্দী”। ঐ উদ্ভট বাড়িতে সাধারণ মানুষের বুদ্ধিতে যা আসে তা দিয়ে উরসুলা প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলে মিসরীর জীবজন্তুর ব্যবসাটাকে প্রসারিত করতে । একটি চুল্লীতে সারারাত ধরে ঝুড়ির পর ঝুড়ি পাউরুটি, বিভিন্ন ধরনের পুডিং, মেরেংগে (এক ধরনের পিঠা) বিসকোচুয়েলস (স্পঞ্জ কেক) তৈরী হত আর সেগুলো উধাও হয়ে যেত জলাভুমির বন্ধুর রাস্তা ধরে। এমন বয়সে সে পৌঁছেছে যে তার অধিকার ছিল অবসর নেবার কিন্তু প্রতিদিনই সে আরও বেশী কাজ করত । সে এতই ব্যাস্ত ছিল তার সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাবসা নিয়ে যে যখন এক আদিবাসী মেয়ে তাকে ময়দার তালে মিষ্টি মেশাতে সাহায্য করছে তখন, গোধুলির আলোয় সে অন্যমনস্কতার সাথে দেখে অপরিচিত দুই সুন্দরী মেয়ে উঠানে এমব্রয়াডারি করছে। ওরা ছিল রেবেকা আর আমারান্তা, যারা তিন বছরব্যাপী অনমনীয় দৃঢ়তায় ধরে রাখা নানীর মৃত্যুতে শোকের পোশাক কেবলমাত্র ত্যাগ করছে। আর রঙিন পোশাক যেন এই পৃথিবীতে ওদেরকে তৈরি করে দিয়েছে এক নতুন জায়গা। রেবেকা সম্মন্ধে যা ভাবা হচ্ছিল তা উল্টে দিয়ে সে ছিল অপেক্ষাকৃত সুন্দরী। ওর গায়ের রং ছিল স্বচ্ছ, চোখগুলো ছিল শান্ত আর বড় বড়। অদৃশ্য সুতো দিয়ে যাদুকরী হাতগুলো যেন বুনে চলেছে ফ্রেমের উপর এমব্রয়েডারী কাজ। বয়সে ছোট আমারান্তা ছিল সামান্য মাধুর্যহীন কিন্তু সে ছিল স্বভাবসুলভভাবে স্বতন্ত্র আর মনটা ছিল মৃত নানীর মত বিশাল। ওদের সঙ্গে আর্কাদিওর মধ্যে যদিও বাপের শারীরিক গঠন প্রকাশ পাচ্ছে তবুও তখনও তাকে দেখে মনে হত শিশু। আর্কাদিও নিজেকে নিবেদন করেছিল আউরেলিয়ানোর কাছে রৌপ্য কর্ম শেখায়। এছাড়াও আউরেলিয়ানো তাকে শেখায় লিখতে আর পড়তে। হঠাৎ করেই উরসুলা খেয়াল করে তাদের বাড়ি লোকজনে ভরে গিয়েছে, ছেলেমেয়েরা কিছুদিনের মধ্যেই বিয়ে করবে, তাদের বাচ্চা হবে আর জায়গার অভাবে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পরতে বাধ্য হবে। সুতরাং বের করে আনে অনেকদিনের কষ্টার্জিত জমানো টাকা, ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয় আর আরম্ভ করে বাড়ি বাড়ানোর কাজ। স্থির করে তৈরি করার: অতিথিদের জন্য একটা আনুষ্ঠানিক বসার ঘড়, প্রতিনিয়ত ব্যবহারের জন্য আর একটা বসার ঘড় যেটা আরও বেশী শীতল ও আরামপ্রদ, বাড়ির সকলে এবং অতিথিসহ একসঙ্গে বারোজন লোকের বসার ব্যবস্থা থাকা খাবার টেবিল সমেত খাবার ঘড়, উঠানের দিকে জানালা সমেত নয়টা শোবার ঘড়ের মধ্যদিনের রৌদ্রের তীক্ষ্ণতা থেকে আড়াল করতে গোলাপের বাগান দিয়ে ঘেড়া টানা বারান্দা আর ফার্ন ও বেগনিয়ার টব রাখার জন্য চওড়া রেলিংয়ের। স্থির করে রান্না ঘড়টাকে আরও বড় করার যাতে করে দুটো চুল্লী এটে যায় ভিতরে; যে খামারে পিলার তেরনেরা হোসে আর্কাদিওর হাত দেখেছিল সেটাকে ধ্বংস করে দ্বিগুণ বড় করতে যাতে করে কখনই বাড়ির খাবারের কোন অভাব হবে না। উঠানে চেশনাট গাছের তলায় বানানো আরম্ভ হলো একটা মেয়েদের গোসলখানা, অপরটি পুরুষদের; একেবারে পিছনদিকে সুপরিসর আস্তাবল, তার দিয়ে ঘেরা মুরগীর খোয়ার; দুধ দোয়ানোর গোয়াল আর চতুর্দিকে খোলা পাখির আবাসস্থল যাতে করে নির্দিষ্ট জায়গায় সবসময় না থেকে নিজেদের খুশিমত যেখানে সেখানে থাকতে পারে পাখিগুলো। সে ডজনখানেক রাজমিস্ত্রি আর কাঠমিস্ত্রিদের আলো আর উত্তাপের অবস্থান নির্দিষ্ট করে দিয়ে সব কিছুর জায়গা ভাগ করে দেয় সীমাহীনভাবে, যেন স্বামীর চিত্তবিভ্রম তার উপর ভর করেছে। পত্তনকারীদের প্রকৌশলের প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ভবনটা ভরে ওঠে যন্ত্রপাতি আর মালপত্রে, ঘেমে নেয়েওঠা আর মানুষের হাড়ের নিঃশব্দ ঝংকারে সবজায়গায় ধাবিত হওয়া মজুরে, যারা নিজেরাই সকলকে বিরক্ত করছে সেটা চিন্তা না করে সবাইকে বলছে তাদের বিরক্ত না করতে। সেই অস্বস্তিকর অবস্থায়, কেউ ভাল করে বুঝতে পারে না কিভাবে চুন আর আলকাতরা নিঃশ্বাস নিতে নিতে মাটি থেকে আশ্চর্যজনকভাবে গড়ে উঠেছে শুধুমাত্র গ্রামের সবচেয়ে বড় বাড়িই নয় বরঞ্চ সমস্ত জলাভূমির মধ্যে সবচেয়ে বড়, অতিথিপরায়ণ আর ঠান্ডা বাড়ি যেরকমটি আর কখনই বানানো হবে না। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বুঝতে পারে সবচেয়ে কম, কারন সে তখন বিশাল ওলট পালটের মাধ্যমে স্বর্গীয় দূরদর্শিতাকে চমকে দিতে ব্যস্ত। বাড়িটা যখন প্রায় শেষের দিকে তখন উরসুলা একদিন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে তার অবাস্তব পৃথিবী থেকে বের করে এনে জানাল যে ওরা বাড়িটার সামনেটা সাদা রং করতে স্থির করেছিল, কিন্তু সেটা না করে নীল রং করার আদেশ এসেছে। ওকে দেখায় সরকারী এক কাগজে লেখা আদেশনামাটা। বউ কি বলছে না বুঝতে পেরে সাক্ষরটা পড়ে সে।
-“কে এই লোকটা”- জিজ্ঞেস করে।
-“ম্যাজিষ্ট্রেট”- ক্রোধান্বিত উরসুলা জবাব দেয় “সকলে বলে যে সে হচ্ছে কর্তৃপক্ষ যাকে সরকার পাঠিয়েছে”। ম্যাজিষ্ট্রেট, দন আপলিনার মাসকতে মাকন্দোতে আসে বিশেষ কোন ঘোষণা না করে। এসে প্রথম রাত কাটায় বিভিন্ন হাবিজাবি জিনিষের বিনিময়ে ম্যাকাও পাখি নেয়া আরবদের একজনের বানানো হোটেল দে জ্যাকবে। আর পরের দিন ভাড়া নেয় বুয়েন্দিয়ার বাড়ি থেকে দুই ব্লক দূরে রাস্তার দিকে দরজাওয়ালা ছোট এক কামরা। জ্যাকব থেকে কেনা একটা টেবিল আর চেয়ার বসায় সেখানে, দেয়ালে তারকাটা গেথে লাগায় ওর সঙ্গে আনা প্রজাতন্ত্রের ফলকটা আর কালি দিয়ে দরজায় লিখে ‘ম্যজিষ্ট্রেট’। তার প্রথম আদেশ ছিল জাতীয় স্বাধীনতাবার্ষিকী উপলক্ষে সমস্ত বাড়ি নীল রং করার। আদেশনামাটা হাতে নিয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওকে পেল তার ছোট অফিসের মধ্যে ঝুলন্ত এক হ্যামকে দিবানিদ্রায় মগ্ন অবস্থায়। “তুমি লিখেছ এটা” জিজ্ঞেস করে। অভিজ্ঞ, লাজুক কিন্তু রাগে লাল হয়ে যাওয়া চেহারার দন আপলিনার মাসকতে জবাব দেয় “হ্যাঁ”; “কোন অধিকারে?” আবার জিজ্ঞেস করে হোসে আর্কেদিও বুয়েন্দিয়া। দেরাজ থেকে একটা কাগজ খুঁজে বের করে দেখিয়ে বলে “আমাকে নিয়োগ করা হয়েছে এই গ্রামের ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে”। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এমনকি দেখেও না কাগজটা-“এই গ্রামে আমরা কেউ কাগজ দিয়ে আদেশ দিই না”- শান্তভাবে নিয়ন্ত্রণ না হারিয়ে বলে, “প্রথম আর শেষ বারের মত বলে দিচ্ছি যে এখানে ম্যাজিষ্ট্রেটের কোন প্রয়োজন নেই। কারন এখানে শুধরাবার মত কিছু নেই”। দন অপলিনারের ভয়হীন দৃষ্টির সামনে কখনই গলা উচু না করে পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে বর্ণনা করে কিভাবে গ্রাম পত্তন করেছে, কিভাবে জমি বিলি করেছে, কিভাবে রাস্তা বের করেছে আর গ্রামের অন্যান্য উন্নতি করেছে সরকারকে কোন বিরক্ত না করে আর কারো দ্বারা কোন রকম ত্যাক্ত না হয়ে।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0“ আমরা এতই শান্তিপূর্ণভাবে বাস করছি যে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেনি । বলল- “দেখেছ এখনও আমাদের কোনো কবরস্থান নেই ।“ সরকার যে তাদেরকে সাহায্য করেনি তাতে তাদের কোন কষ্টই হয়নি । বরঞ্চ আনন্দিত হয়েছে কারন তখন পর্যন্ত ওদেরকে শান্তির সাথে বেড়ে উঠতে দিয়েছে। আর আশা করছিল এভাবেই ওদেরকে বেড়ে উঠতে দেয়া হবে, কারন ওরা এমন কোনো গ্রামের পত্তন করেনি যেখানে প্রথম আগন্তুক এসেই বলে দিতে পারবে কোথায় কি করতে হবে। প্যান্টের মতই সাদা ডেনিমের কোট পরিহিত দন আপলিনার মাসকতে সবসময়ই তার অভিব্যাক্তিতে পবিত্রতা বজায় রেখে চলছিল । “সুতরাং, যদি অন্য যে কোন সাধারন নাগরিকের মত এখানে থাকতে চাও তাহলে তোমাকে স্বাগতম”- ইতি টেনে বলে হোসে আর্কেদিও বুয়েন্দিয়া- “ কিন্তু যদি লোকজনের বাড়ি নীল রঙ করতে বাধ্য করিয়ে বিশৃঙ্খলা বাধাতে চাও তাহলে তোমার তল্পিতল্পা গুঁটিয়ে যেখান থেকে এসেছ সেখানে ভাগতে পার, কারন আমার বাড়ি হবে কবুতরের মত সাদা” । পান্ডুর বর্ণ ধারন করে দন আপলিনার মাসকতে । এক পা পেছনে হেটে চোয়াল শক্ত করে কাতরতার সঙ্গে বলে- “ তোমাকে সাবধান করে দিচ্ছি যে আমার কাছে অস্ত্র আছে ।“ হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া টেরও পেলনা কখন তার হাতে যুবক বয়সের ঘোড়া বশ করার শক্তি এসে ভর করে। দন আপলিনার মাসকতের কোটের বুকের সামনের অংশটা ধরে নিজের চোখের উচ্চতায় তুলে ফেলে । “ এটাই করব” বলল, “কারন আমার বাকি সাড়া জীবন, মৃত অবস্থায় তোমাকে বহন করার চাইতে জীবিত বহন করাটাই শ্রেয় বলে মনে করি” । এভাবেই বুকের সামনেটা আকড়ে ধরে বয়ে নিয়ে গেল রাস্তার মাঝখান পর্যন্ত আর ছেড়ে দিল যাতে করে তার পা দুটো জলাভূমিতে যাওয়ার রাস্তাটা স্পর্শ করতে পারে। এক সপ্তাহ পরে খালি পা, জীর্ণ বস্ত্রের ছ জন শটগানধারী সৈন্য নিয়ে ফিরে আসে সে । সঙ্গে ছিল তার স্ত্রী আর সাত মেয়ে বহনকারী গরুর গাড়ি। মাকন্দোর পত্তনকারীরা ওদের বড় ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের বহিষ্কারের সিদ্ধান্তে নিশ্চিত হয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে সাহায্যের ইচ্ছে জানায়। কিন্তু সে তার বিরোধিতা করে, কারন দন আপলিনার মাসকতে ফিরে এসেছে তার বউ ও মেয়েদের নিয়ে, একজন পুরুষ মানুষকে তার পরিবারের সামনে অপ্রস্তুত করা পুরুষোচিত কাজ নয়। আর এই কারনেই সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাপারটা ভালোয় ভালোয় মিটিয়ে ফেলতে।

এবার আউরেলিয়ানো তার সঙ্গী হয়। তখন তার কেবলমাত্র সূচালো গোফ গজিয়েছে, গলার স্বর হয়েছে গমগমে। আর এগুলোই যুদ্ধের সময় তাকে এনে দেবে বৈশিষ্ট। গার্ডদের অগ্রাহ্য করে খালি হাতে অফিসের বারান্দায় উপস্থিত হয় ওরা। দন আপলিনার মাসকতে ধৈর্য হারায় না। ঘটনাক্রমে ওইখানে থাকা তার দুই মেয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। ষোলো বছরের আমপারো, মায়ের মতই শ্যামলা আর রেমেদিওস, বয়স কেবল মাত্র নয় হয়েছে; লিলি ফুলের মত গায়ের রঙ আর সবুজ চোখ নিয়ে খুব সুন্দরী এক কিশোরী। ওরা ছিলো আনন্দোচ্ছল আর শিক্ষিতা। যখন ঘরে ঢোকে, পরিচয় পর্বের আগেই মেয়ে দুটো চেয়ার এগিয়ে দেয় বসার জন্য কিন্তু ওরা উভয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। “ঠিক আছে বন্ধু” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “তুমি এখানে থাকতে পারবে কিন্তু দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা ঐ শটগানধারী দস্যুদের কারনে নয়, তোমাকে থাকতে দিচ্ছি তোমার বউ আর মেয়েদের কথা বিবেচনা করে”

দন আপলিনার মাসকতে বিচলিত হয়ে পরে কিন্তু তাকে উত্তর দেবার সময় দেয় না হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া “শুধুমাত্র দুটো শর্ত আরোপ করছি” যোগ করে, “ প্রথমটি হচ্ছে সবাই যার যার ইচ্ছেমত নিজেদের বাড়ি রঙ করবে। দ্বিতীয়টি সৈনিকদের চলে যেতে হবে এই মুহূর্তেই। আমরা শৃঙ্খলার নিশ্চয়তা দিচ্ছি”। ম্যাজিস্ট্রেট তার ডান হাত উঁচু করে সবগুলো আঙ্গুল বিস্তৃত করে ।
“-সম্মানের শপথ”
“-শত্রুর শপথ” বলে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আরও তিক্ত স্বরে যোগ করে, “ কারন একটা কথা তোমাকে বলতে চাইঃ তুমি আর আমি পরস্পরের শত্রুই থাকছি ।“

সেই বিকেলেই বিদেয় নেয় সৈন্যরা। কয়েকদিন পরই ম্যাজিস্ট্রেটের পরিবারের জন্য একটা বাড়ি যোগাড় করে দেয় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া। আউরোলিয়ানো ছাড়া সকলেই শান্তি পেল। ম্যাজিস্ট্রেটের ছোট মেয়ে, বয়সের তুলনায় যে নাকি আউরেলিয়ানোর মেয়ে হতে পারতো সেই রেমেদিয়সের প্রতিচ্ছবি আউরেলিয়ানোর শরীরের কোনও জায়গা ব্যাথার সৃষ্টি করতে লাগল। সেটা ছিল এক শারীরিক অনুভূতি, যেন জুতোর ভিতরে ছোট্ট এক নুড়ি পাথর।
(চলবে)

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৯ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমিত্র পুরকায়স্থ — december ১২, ২০১৪ @ ১১:০৬ পূর্বাহ্ন

      আগ্রহ ভরে অনুবাদগুলি পড়ছি। অন্যদেরও পড়তে অনুরোধ করছি। কিস্তি-১১ বেরিয়েছে কি? না বেরোলে কবে বেরোবে?

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com