ভিতরে বাহিরে কত পথ

মৃণাল বসুচৌধুরী | ২৭ নভেম্বর ২০১৪ ৮:২৭ অপরাহ্ন

border=0রবীন্দ্রপ্রভাব থেকে সরে এসে তিরিশের কবিরা যে স্বতন্ত্রভাষা ও উচ্চারণভঙ্গির কথা ভেবেছিলেন, চল্লিশের কবিদের হাত ছুঁয়ে সেই চেতনাপ্রবাহ পঞ্চাশের কবিদের মধ্যে আরও তীব্র ও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। সামাজিক অবক্ষয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, মূল্যবোধহীন মুখোশপরা মানুষের ভিড় বঙ্গভঙ্গের মানসিক যন্ত্রণা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এসবের মধ্যে পঞ্চাশের কবিরা শুরু করেন ‘স্বাধীন ভ্রমণ’। ‘প্রেম’ শব্দটিতে হঠাৎই শরীরের গন্ধ এসে গেল– একজন নারীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, শুধু আর মনের মণিকোঠায় লুকিয়ে লোকচক্ষুর আড়ালে লালন করা নয়, প্রেম ও শরীর দুটোই অনিবার্যতায় ভয়ংকরভাবে জায়গা করে নিল কবিতায়। কবিতার বিষয়বস্তু, শব্দ নির্বাচন প্রকাশভঙ্গি নিয়ে কোনোরকম ছুঁৎমার্গে বিশ্বাস ছিল না এই কবিদের। যৌনাচারই হোক আর শাশ্বত ভালোবাসার কথাই হোক, কবিতার ধর্ম ও শিল্পরূপের উপর কোনো অশ্রদ্ধা না দেখিয়ে, সরাসরিভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন পঞ্চাশের কবিরা।

রবীন্দ্র ঐতিহ্যে বিশ্বাসী শঙ্খ ঘোষ, নিজস্ব ভাষা, নতুনতর প্রতীক ও চিত্রকল্প নির্মাণের মধ্যে অবগাহন করেছেন কবিতাসমুদ্রে। তাঁর বিশ্বাস, শব্দ সম্পর্কে, ‘নতুন শব্দের সৃষ্টি হয়, শব্দের নতুন সৃষ্টিই কবির অভিপ্রায়’।
বাংলা কবিতায় এক ভিন্ন স্বাদ নিয়ে এসেছিলেন সুনীলকুমার নন্দী। খুব নিচুগলায, নিজস্ব ভঙ্গিতে, ব্যক্তিগত অনুভবের কথা প্রকাশ পেয়েছে তাঁর কবিতায়। ঐতিহ্যের প্রবহমানতায় বিশ্বাসী অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, এক সম্পূর্ণ পৃথক বাচনভঙ্গি, যা তাঁর একান্ত নিজস্ব, দিয়ে সমৃদ্ধ করলেন বাংলা কবিতাকে। নিত্য নতুন শব্দের সন্ধান, অপূর্ব শব্দবিন্যাস তাঁর কবিতার প্রতি আকৃষ্ট করেছিল কবিতা মনস্ক পাঠকদের।

ব্যক্তিগত জীবনে এবং কবিতায় অত্যন্ত মৃদুভাষী অলোক সরকার বিশ্বপ্রকৃতি ও মানুষের অন্তর্লীন যে সত্য, তারই প্রকাশ করেছেন তাঁর কবিতায়। শান্ত সংযত নির্মোহ তাঁর শব্দচয়ন। শরীর নয়, আত্মার কাছাকাছি তাঁর উচ্চারণ।
আধুনিক কবিতাকে দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে রাখার কথা ভাবছিলেন যে সমস্ত পাঠক, তাঁদের জন্য অদ্ভুত এক মুক্তির আনন্দ নিয়ে এলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। বিদেশি ও দেশি পুরাণের অনুষঙ্গ, রাজনীতি, পাণ্ডিত্য মানুষের জন্য মড়াকান্না, নতুন নতুন শব্দ চিত্রকল্প আবিষ্কারের অসফল প্রয়াস প্রাণহীন প্রতিবাদ, কৃত্রিম বিদ্রোহ ও সমস্তই একটু একটু করে কবিতাবিমুখ করছিল মানুষকে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্রচলিত কাব্যভাষায় নয়, একেবারে প্রেমিককের ভাষায়, সাধারণ মানুষের ভাষায় লেখা কিছু কবিতা নিয়ে এলেন এসব পাঠকদের জন্য। যে কবিতার ভাষা অত্যন্ত সজীব, অনন্য যার প্রকাশভঙ্গি। কুয়াশার মধ্যে বসে থাকা অধরা কোনো নারী নয়– একেবারে রক্তমাংসের নারী এল তাঁর কবিতায়, যে কোনো হতাশাগ্রস্ত মানুষের মতো দীর্ঘশ্বাস মিশিয়ে উচ্চারণ করলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি’– সরল শব্দের এই ঘনিষ্ঠ উচ্চারণে মুগ্ধ হল পাঠকসমাজ।
বাংলা কবিতার এই অনুপম বাতাবরণে, কখনও হেমন্তের অরণ্যের মধ্যে দিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে কখনও-বা উড়ন্ত সিংহাসনে বসে জ্বলন্ত রুমাল উড়িয়ে, ছন্দ অন্তর্জাল ছিঁড়তে ছিঁড়তে, ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন কবিতামালা নিয়ে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন যে কবি, তাঁর নাম শক্তি চট্টোপাধ্যায়। সদর্পে যিনি বললেন, ‘সোনার মাছি খুন করেছি।’
তাঁর কবিতায় অনাবিল সারল্য এবং নিরন্তর রহস্যময়।

আকর্ষণে বিমূঢ় পাঠকদের তিনি বললেন:
একটু নেমে দাঁড়াও, যদি আমার কাছে দাঁড়াতে হয়
একটু উঠে এসো, যদি আমার কাছে দাঁড়াতে হয়
দুখানি হাত বাড়াতে হয়, বাহিরে টান ছাড়াতে হয়,
একটু উঠে একটু নেমে আমার কাছে দাঁড়াতে হয়।

শক্তিদার কবিতাকে ছোঁবার জন্য একটু নেমে, একটু উঠে, দুখানি হাত বাড়িয়ে দিলেন তন্নিষ্ঠ পাঠকেরা। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন এই কবিতার অনেক আগেই শক্তিদার কবিতার সঙ্গে পরিচয় আমার। ঘনিষ্ঠতাও। সে সব কথায় পরে আসছি। তার আগে বলে রাখা ভালো, শক্তিদার কবিতার পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা আমার নেই। অনুজ কবি হিসেবে তাঁর কবিতাকে ঘিরে, আমি, আমার মুগ্ধতার কথাই লিখব, যতটুকু পারি।

আমি তখন ‘শ্রুতি’ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৬৫ সালের এপ্রিল থেকে ১৯৭১-এর আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ১৪টি সংখ্যা বেরিয়েছিল ‘শ্রুতি’র। আমাদের পক্ষ থেকে তিনটি ইস্তেহার প্রকাশ করে কবিতা সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণার কথা জানিয়েছিলাম আমরা। জুলাই ১৯৬৬ সালে যে ইস্তেহারটি প্রকাশিত হয়েছিল, সেটিই ছিল আমাদের মূলমন্ত্র।
এরপর ১৯৬৮ ও ১৯৬৯-এও দুটি ইস্তেহার প্রকাশিত হয়েছিল। যেসব লেখার কোনো অবকাশ এখানে নেই। শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে কিছু লেখার আগে, একজন অনুজ কবি হিসেবে আমার কবিতা-ভাবনার অবস্থান জানানোর সামান্য প্রয়োজন আছে বলেই মনে করি।

যাই হোক, ‘৬৬ সালে ‘শ্রুতি’র ইস্তেহার থেকে আমাদের তিনটে ভাবনার কথা এখানে বলা দরকার–
১. কোনো রকম ব্যাখ্যা, বিধান বা তত্ত্ব প্রচারের দায়িত্ব কবিতার নেই।
২. চিৎকার বা বিবৃতি কোনোটাই কবিতা নয়। রাজনীতি, সামাজিকতা বা ক্ষুৎকার যৌন জৈবমত্ততার স্থান আর যেখানেই থাকুক, কবিতায় নেই।
৩. ব্যক্তির কল্পনাময় আন্তরিক অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধির প্রকাশে ব্যক্তিত্বের পরিমণ্ডল রচনাই কবিতা। কবিতা হবে ব্যক্তিগত, মগ্ন ও একান্তই অন্তর্মুখী।
আমরা বিশ্বাস করতাম, জৈব আর্তনাদ বা মেকি সমাজচিন্তা থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে হবে। ব্যক্তিগত জগৎ সৃষ্টির জন্য তৈরি করতে হবে ব্যক্তিগত উচ্চারণরীতি।

কবিতা সম্পর্কে আমার বা আমাদের বিশ্বাস যা ছিল, ঠিক তার বিপরীত মেরুতে বসেছিলেন শক্তিদা। কিছুদিন হাংরি জেনারেশনে যোগ দিয়ে অনেক যৌনাত্মক কবিতা লিখেছিলেন। আচার-ব্যবহারেও একটু অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন তিনি। মনে হয়, প্রচলিত কাব্যধারায় বিশ্বাসী পাঠকদের একটু ঝাঁকুনি দিতে চেয়েছিলেন তখন। তাঁদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চেয়েছিলেন। এই শক্তিদাকে, তাঁর কবিতাকে, সে সময়, আমার ভালোবাসার বা পছন্দ করার কথা নয়– আপাতদৃষ্টিতে। কিন্তু তবু, কেন জানি না, সেখানেই শক্তিদার জয়।

ওঁকে চিনতাম অনেক আগে থেকেই। ওঁর প্রায় সব কবিতাই পড়েছি, একসময়। কলেজ স্ট্রিট, কফিহাউস, আনন্দবাজার অফিস এবং আরও বিভিন্ন জায়গায় দেখা হয়েছে অনেকবার। প্রতিবারই এক অমোঘ আকর্ষণ, এক আত্মীয়তা বিহ্বল করেছে আমায়। নিজের বিশ্বাস, নিজের মননকে সজাগ রেখেই এগিয়ে গিয়েছি শক্তিদার দিকে।
মনে আছে ১৯৬৭ সালে শক্তিদার ‘সোনার মাছি খুন করেছি’ বইটি প্রকাশিত হবার দু-একদিনের মধ্যে কিনেছিলাম ‘ভারবি’ থেকে। নিজে তখন, এটুকু বুঝেছি, কবিতা কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে শেষকথা কেউ বলতে পারে না। তেমন ধৃষ্টতাও কারও থাকা উচিত নয়। যে কবিতা অহর্নিশ বাজাত থাকে বুকের ভেতরে, তার অমোঘ আকর্ষণেই, সেই রাত্রেই শেষ করেছিলাম কবিতার বইটি। মনে আছে, সে বড় সুখের সময় নয়’ কবিতাটি এতবার পড়েছিলাম যে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল। শেষ অংশটুকু এখনও মনে আছে–

সে বড় সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয় তখনই
পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্ণিশে কার্ণিশে,
ফুটপাত বদল হয় মধ্যরাতে
বাড়ি ফেরার সময়, বাড়ির ভেতরে বাড়ি, পায়ের ভেতরে পা,
বুকের ভেতরে বুক
আর কিছু নয়।

অনবদ্য এ কবিতাটি মনে পড়লেই দেখতে পাই শক্তিদাকে– শুনতে পাই উদাত্ত গলায় তিনি বলছেন–
মনে করো, গাড়ি রেখে ইস্টিশান দৌড়ুচ্ছে, নিভন্ত ডুমের পাশে
তারার আলো
মনে করো, জুতো হাঁটছে, পা রয়েছে স্থির, আকাশ পাতাল
এতোল বেতোল
মনে করো, শিশুর কাঁধে মড়ার পাল্কি ছুটেছে নিমতলা, পরপারে
বুড়োদের লম্বালম্বি বাসরঘরি নাচ

আজ পর্যন্ত যতবার পড়েছি কবিতাটি, বুকের মধ্যে প্রতিবারই এক ধ্রুপদি রক্তক্ষরণ টের পেয়েছি,
এক নিঃশব্দ মুগ্ধতায় ভরে গিয়েছে চরাচর।
‘উড়ন্ত সিংহাসন’ এই বইটির শেষ কবিতা। ১০টি অংশে ভাগ করা হয়েছে কবিতাটি। একটি অংশ (৯) উল্লেখ করা যাব–
সর্বদা চলার পথ পাই
নিকটে ও দূরে,
ভিতরে বাহিরে কত পথ পাই,
সকলের দাবি:
আমাতে প্রথম এসো
পদচিহ্ন রেখে যেয়ো কিছু—
যে সবে দ্বিতীয়, যাবে নির্ভুল তোমারই পিছু পিছু…

কি আশ্চর্য, শান্ত, সমাহিত কণ্ঠস্বরে কবির এই উচ্চারণ। এই কবিতাতেই তিনি লিখেছেন–
সফলতা সব নয়, সে তো শুধু উলঙ্গের কাছে
প্রকৃত পোশাক পরে দেখা দেওয়া
কিংবা শুধু সমুদ্রের তীরে
পাহাড়ের গল্প বলে তিক্ত করা গল্পের আসর
মানুষের আগুপিছু, মানুষের জানার তো নয়!

এর পরেও শক্তিদার কলম থেকে আমরা অনেক আশ্চর্য সুন্দর কবিতা পেয়েছি, কিন্তু কেন জানি না, ‘সোনার মাছি খুন করেছি’ কাব্যগ্রন্থটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। মনে পড়ছে ১৯৭৩-এ শক্তিদার হাত থেকে আবার উপহার পেয়েছিলাম বইটি। আমার একান্ত অনুরোধে শুনিয়েছিলেন ‘হাত বাড়ালে ধরতে পারি’ কবিতাটি–
হাত বাড়ালে ধরতে পারি ছায়ার চেয়ে ঘনান্ধকার
আরেক ছায়া, পথ জুড়ে আজ নাচ দেখাতে ব্যস্ত ভারি
হাত বাড়ালে ধরতে পারি।

বাস্তব-পরাবাস্তব জানি না, বহির্জগৎ অন্তর্জগৎ জানি না। ছন্দোময় সম্মোহন শক্তিদার কবিতার কাছে উদাসীন নতজানু হ’তে জানি।
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার আলোচনা প্রসঙ্গে জগন্নাথ চক্রবর্তী লিখেছিলেন ‘… ছন্দ ও আধুনিক কবিতার মধ্যে যে অহি-নকুলটি এতদিন শার্দুলের মতো বেড়ে উঠেছিল, শক্তি প্রথমেই তাকে বধ করলেন ছন্দের তীক্ষ্ণ অব্যর্থ তির ছুঁড়ে। মিলের চাতুর্যে পাঠকের উপবাসী শ্রুতি সম্মোহিত হল; শক্তি, তিরোহিত আবেগকে ডেকে আনলেন কবিতায়, বসালেন কবিতার প্রথমে, শেষে, সবখানে। এ যেন বিদ্রোহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ…’।

শক্তিদার কবিতার পাঠকেরা জানেন, জগন্নাথ চক্রবর্তীর এই পর্যবেক্ষণ কী ভীষণ যথার্থ। ‘মনে পড়লো’ কবিতাটি মনে আছে?
মনে পড়লো, তোমায় পড়লো মনে
বাঁশি বাজলো হঠাৎই জংশনে
লেভেল ক্রশিং দাঁড়িয়ে আছে ট্রেন
এখন তুমি পড়ছো কি হার্টক্রেন?

কিংবা সেই অসাধারণ পংক্তি দুটি?
… সকাল থেকে একটা ইচ্ছে
আমায় কেমন সাহস দিচ্ছে
উড়ে না যাই…

শক্তিদার কবিতায় ছড়িয়ে আছে অসংখ্য মণি-মাণিক্য। ছন্দের জাদুকর এই কবির কবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, আনন্দ, বিবাদ সবই এসেছে এক অনাবিল সারল্যে – তাঁর কবিতায় শব্দ পেয়েছে এক নতুন মাত্রা – যা অলৌকিক চিত্রময়তায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ক্রমশ। ‘একটি পরমাদ’, ‘হৃদয়পুর’, ‘অবনী বাড়ি আছো’, ‘একবার তুমি’ এমন অসংখ্য সব কবিতা আছে শক্তিদার সৃষ্টিময়তায় যা পাঠকের স্মৃতিকোশে চিরউজ্জ্বল হয়ে থাকবে–
বৃষ্টিপড়ে এখানে বারোমাস
এখানে মেঘ গাভীর মতো চরে…

কে ভুলবে এই কবিতা? কিংবা এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা রহস্যময় স্বপ্নের জগৎ?
শক্তি চট্টোপাধ্যায় ‘প্রেমের কবি’ ছিলেন কি না, এ নিয়ে অনেকেই তর্কে মাতেন। আমার মনে হয়, প্রেম এবং প্রকৃতি শক্তিদার কবিতায় স্নায়ু ও শিরায়। কিন্তু প্রেম তাঁর কাছে কোনোদিনই জৈব আর্তনাদ বা কামাতুর উচ্চারণ ছিল না — উঁচু তারে বাঁধা নয়, তাঁর প্রেম ছিল শান্ত সমাহিত, ক্ষুব্ধ, সাবলীল।

মেঘ ডাকছে ডাকুক
আমার কাছেই থাকুক
ভালো থাকবো সুখো থাকবো
এই কামনা রাখুক।
……………..
এতই যদি লজ্জা তাহার দুহাতে মুখ ঢাকুক
আমার কাছে থাকুক, তবু আমার কাছে থাকুক।

তাঁর কবিতায় নারী কেমন যেন সততই অধরা। রক্তমাংসের নারীকে নিয়ে যৌন ভাবাবেগ তাঁর কবিতায় প্রায় ছিল না বললেই চলে। স্তন, যোনি, ওষ্ঠাধার, চুম্বন, নাভির গোলাপ, এমন কিছু শব্দ তাঁর কবিতায় কদাচিৎ দেখা গেলেও তাঁর কবিতায় নারী কখনো মায়াময় বিষাদপ্রতিমা কখনো বা সোনার হরিণ। অসাধারণ একটি প্রেমের কবিতার উল্লেখ না করে পারছি না, এ প্রসঙ্গে।
আমি যাকে ভালোবাসি, সে অন্তত গোপনে আমাকে
মেরেছে সহস্রবার,
কিন্তু আমি মরিনি একাকী
দৃশ্যত নিস্তব্ধ হয়ে, তাকেও মুখর করে রাখি
ক্রন্দনে, মরিনি, বলে তাকেও মুখর করে রাখি।

(ছিন্ন বিচ্ছিন্ন)
শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে একটি রচনায় অধ্যাপক তরুণ মুখোপাধ্যায় দুটি সাক্ষাৎকারের উল্লেখ করেছেন। নারী সম্পর্কে বলতে গিয়ে কবি বলেছিলেন–
“নারী, ইন বোরাষ্ট সেন্স আমার আসে না, বা আমি আসতে দিই না হয়তো… কিন্তু চাপা নারী আসেই।…..”

প্রেম ও যৌনতা নিয়ে তাঁর অনুভূতির কথা জানা যায়, রুচিরা শ্যামকে দেওয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার থেকে–

“… সেক্স এক যন্ত্রণাকার অভিজ্ঞতা। সমস্ত মনটাকে সৌন্দর্য থেকে দূরে সরিয়ে ফেলে…”
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এই অনুভব তাঁর কবিতায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, উদ্ধৃতি সহকারে তা প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই– তন্নিষ্ঠ পাঠকেরা যাঁরা তাঁর কবিতার অনুরাগী তাঁরা জানেন তাঁর কবিতায় ভালোবাসা বাঁচায় এবং মারে।
প্রেম, প্রকৃতি ছাড়াও তাঁর কবিতায় মানুষ তার সুখ দুঃখ মান অপমান নিয়ে জেগে আছে। ‘মানুষ বড়ো কাঁদছে’র কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বুক জুড়ে ছিল মানুষ আর মানুষের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা। তাঁর একটি কবিতা–

মানুষের অন্ধকার, মানুষের আলোর সাঁতারে
যে কেউ, যে কোন কিছু, ভেসে যেতে পারে?

(ছিন্ন বিচ্ছিন্ন)

কিংবা ‘জুলন্ত রুমাল’-এর সেই ‘সে কিছু দুর্বল, ভালো’ মনে পড়ছে —
আমিও মানুষ, হাতে কিছু নেই – করতলে রেখা
আছে হিজিবিজি ভাগ্য, উড়ে যায়, উড়ে পুড়ে যায়
কিন্তু, তা কখনো ছুটে মানুষকে আঘাত করে না–
সে কিছু দুর্বল, ভালো, কিছুটা মানুষে মায়াবাদী।

যাঁরা মায়াবাদী শক্তিদার সংস্পর্শে এসেছেন, তাঁরা জানেন, তাঁর মধ্যে একসঙ্গে উদাসীন, অন্যমনস্ক এবং মায়াময় তিনজন মানুষ বসবাস করতেন।
মৃত্যুচিন্তায় কিংবা জগতের প্রতি অভিমানে তিনি যখন লেখেন–
খুব বেশিদিন বাঁচবো না আমি বাঁচতে চাই না
শস্য ফুটলে আমি নেবো তার মুগ্ধদৃশ্য
নিজস্ব গৃহে প্রজা বসিয়েছি প্রায়ান্ধকার
কিছু কিছু নেবো কিছুদিন বেশি বাঁচতে চাই না

(চতুরঙ্গ)

পড়তে পড়তে কেমন যেন সব ভুল হয়ে যায়। ‘প্রায়ান্ধকার গৃহে’ প্রজা বসিয়ে কবির কবিতার মধ্যে হাঁটতে থাকি, যেতে থাকি সেদিকেই, যেখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস যেখানে মেঘ গাভীর মতো চরে। শক্তিদাকে ঘিরে অজস্র স্মৃতির মেলা। একটা দিনের উল্লেখ না করলেই নয়। মেঘালয়, আসাম, বিহার ঘুরে দীর্ঘদিন পরে আমি তখন সবেমাত্র কলকাতায় এসেছি। আনন্দবাজারের পাশেই ছিল আমার অফিস। অনেক কবি, গল্পকাররা আসতেন সেখানে। শক্তিদাও মাঝে মধ্যে বিকেলের দিকে আসতেন আমার অফিসে। একদিন, অফিসের পরে নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁর প্রিয় একটা পানশালায়। সেদিন ওঁকে দেখে মনে হচ্ছিল, একেবারে অন্য মানুষ। কথা বলছিলেন, কিন্তু এলোমেলো, অন্যমনস্ক। কেমন যেন আত্মমগ্ন। বুঝতে পারছিলাম ওঁর মন ভালো নেই– হঠাৎ হঠাৎই যেন একটা জগতে চলে যাচ্ছিলেন। মনে আছে, এ কথা সে কথার পর কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন। পানশালায় বসে শক্তিদার এইরূপ আগে বা পরে কখনো দেখিনি। যাইহোক, সেদিন ওঁকে শুনিয়েছিলাম ওঁরই একটা কবিতা।

মনে কি তোমার এখনও লাগে নি দোলা,
চিল্কার জলে ভাসালাম গণ্ডোলা
জ্যোৎস্না হয়েছে ঘোর, শুধু দাঁড় বলে–
রূপোর পাহাড় তুমি চোর আমি চোর!
মনে কি তোমার এখনও ওড়েনি পাখি
যতবার তাকে আনমনে বেঁধে রাখি,
উড়ে যায় দূর বনে–
এখনও ওড়েনি পাখি কি তোমার মনে?

হেসেছিলেন শক্তিদা। বলেছিলেন — ‘আমার কবিতা কেন? নিজের কবিতা শোনাবি তো!’ কবিতা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল সেদিন। কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন — ‘যে কবিতা স্মৃতিতে ধারণ করা যায় না, সে কবিতা বেশিদিন বাঁচে না।’

অনেকেরই এমন বিশ্বাস। আবার অনেকে তা মানেন না। এ নিয়ে বিতর্ক হলে ঠিক কোনদিকে যাব জানি না, তবে প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের যান্ত্রিকতার মধ্যে মেধা ও মননহীন মানুষের অশালীন ছায়ায় ভেঙে পড়তে পড়তে এখনও দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই অমোঘ পঙ্ক্তি–

রোজই যাকে কাঁদতে হয়, সে কি আর দুঃখ পেতে জানে?’
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন TANIYA CHAKRABORTY — নভেম্বর ২৮, ২০১৪ @ ৮:১৯ অপরাহ্ন

      bhison bhalo lekha…

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সতীশ বিশ্বাস — নভেম্বর ২৯, ২০১৪ @ ১১:৩৬ পূর্বাহ্ন

      ‘যে কবিতা স্মৃতিতে ধারণ করা যায় না, সে কবিতা বেশিদিন বাঁচে না।’ আর এমন কবিতার বিষয় হতে পারে শুধুমাত্র শাশ্বত প্রেম; কোনমতেই রক্তমাংসের শরীর নয়।…আলোচনাটি খুব ভাল লাগল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাবীবুল্লাহ সিরাজী — নভেম্বর ৩০, ২০১৪ @ ৭:৩২ পূর্বাহ্ন

      খুব ভালো লেখা পড়ার সুযোগ পেলাম।
      বাঁচার আনন্দ প্রভাত দেখিয়ে গেলো।
      মৃণালপূর্ণ শক্তি কিংবা শক্তিময় মৃণাল তো আমাদেরই দোসর।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Quamrul Bahar Arif — নভেম্বর ৩০, ২০১৪ @ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

      যাই হোক, ‘৬৬ সালে ‘শ্রুতি’র ইস্তেহার থেকে আমাদের তিনটে ভাবনার কথা এখানে বলা দরকার–
      ১. কোনো রকম ব্যাখ্যা, বিধান বা তত্ত্ব প্রচারের দায়িত্ব কবিতার নেই।
      ২. চিৎকার বা বিবৃতি কোনোটাই কবিতা নয়। রাজনীতি, সামাজিকতা বা ক্ষুৎকার যৌন জৈবমত্ততার স্থান আর যেখানেই থাকুক, কবিতায় নেই।
      ৩. ব্যক্তির কল্পনাময় আন্তরিক অভিজ্ঞতা বা উপলব্ধির প্রকাশে ব্যক্তিত্বের পরিমণ্ডল রচনাই কবিতা। কবিতা হবে ব্যক্তিগত, মগ্ন ও একান্তই অন্তর্মুখী।
      আমরা বিশ্বাস করতাম, জৈব আর্তনাদ বা মেকি সমাজচিন্তা থেকে কবিতাকে মুক্ত করতে হবে। ব্যক্তিগত জগৎ সৃষ্টির জন্য তৈরি করতে হবে ব্যক্তিগত উচ্চারণরীতি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — নভেম্বর ৩০, ২০১৪ @ ৬:১৪ অপরাহ্ন

      মৃণাল দা লেখাটি আজ পড়লাম। কি বলব একটি সুন্দর লেখার জন্য যে সব বিষয়াবলীর দরকার এবং যা পাঠককেও আপ্লুত করে এ তাই। কবি শক্তি চট্টোপধ্যায়ের উপরে আপনার আলোচনা, কথকতা,স্মৃতি এবং কবির অসাধারণ কবিতাগুলোর উল্লেখ সত্যি আনন্দস্পর্শে প্রশান্ত করে মন। লেখার ঢঙটা তো ভারি সুন্দর কখনো স্মৃতির ভেতর থেকে বের হয়ে আবার ফিরে গিয়ে আবার এগিয়ে যাওয়া নানা কিছু নিয়ে । বলে যাওয়া নানা দিক থেকে উন্মোচিত করে নিজের আবেগ আর নিষ্ঠ উচ্চারণ। শ্রদ্ধা তো রইলোই—
      মতিন বৈরাগী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত — december ১, ২০১৪ @ ১২:১৫ অপরাহ্ন

      মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ে গেলাম। এক সহজ সরল অনাড়ম্বর ধ্রুপদী কবির স্মৃতিচারণে ওপর এক কিংবদন্তি। পাঠকের পরম প্রাপ্তি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Debarati Bhattacharyya — december ২, ২০১৪ @ ২:০৪ পূর্বাহ্ন

      Mrinal da lekhati saty i mantromugdher mato porlam, Ki shabolil gati, thik jeno dheu khelano. Pathok der kache satyikarer durmulyo akti alochona , akti prapti o , tader prioyo kobir samparke.Khub bhalo laglo.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com