গদ্য, প্রবন্ধ, বই, বইয়ের আলোচনা, বিশ্বসাহিত্য

প্রথমার প্রতারণা ও অনুবাদকের জালিয়াতি

রাজু আলাউদ্দিন | 24 Nov , 2014  

বছর পাঁচেক আগে আর্টস বিডিনিউজ ডটকম-এর সূত্রে অনুবাদের ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত জালিয়াতির তথ্য জেনে চমকে উঠেছিলাম। চমকে ওঠার কারণটা ব্যাখ্যা করার আগে পটভূমিটা জানা দরকার। জুলফিকার নিউটন নামের এক তরুণ তুর্কী বিশ্বসাহিত্যের সুউচ্চ পর্বতগুলো ডিঙিয়ে যাচ্ছিলেন অনুবাদের মাধ্যমে। মুসা ইব্রাহীমের বিজয়ের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলেও নিউটনের বিজয়গাথা নিয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি কখনো। যিনি বা যারা সন্দেহ করতে পারতেন তারা ছিলেন নিশ্চুপ, কারণ অনুবাদের সম্রাট কবীর চৌধুরীর প্রত্যয়ণপুষ্ট এই অনুবাদক ততদিনে সাম্রাজ্য বিস্তার করে দানবীয় রূপ ধারণ করেছেন। কিন্তু রেজাউল করিম সুমনের সন্দেহ আর সমান্তরাল পাঠ এই দানবকে অবশেষে রূপান্তরিত করে এমন এক তস্করে যিনি বিদেশি সাহিত্য অন্য ভাষা থেকে নয়, বরং অন্যদের মারফত ইতিমধ্যে বাংলায় রূপান্তরিত বিদেশি সাহিত্য কিছুটা বদলে আর সিংহভাগ অপরিবর্তিত রূপে নিজের নামে চালিয়ে দিতেন। জালিয়াতির এই নমুনার কথা জানা ছিল না কারুরই।

উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের সনদ জালিয়াতির মতোই সম্প্রতি অনুবাদের ক্ষেত্রে শুরু হয়েছে অভিনব এক প্রতারণা। নিউটনের জালিয়াতি প্রমাণ করা যতটা সহজ, নতুন এই প্রতারণাকে প্রমাণ করা কিছুটা কঠিন। কঠিন এই কারণে যে আগেরটির চেয়ে এটি পদ্ধতি হিসেবে ভিন্ন এবং ভাষিক বাধার কারণে ‘নিরাপদ’। কিন্তু লোকোৎসারিত বচন যার সঙ্গী, যেমনটা স্পানঞলভাষী মানুষেরা বলে থাকেন La curiosidad mata el gato (মার্জার-নিধন কৌতূহল), তখন কোনো বাধাই আর অটুট থাকে না।

আজকাল কেউ কেউ মূল ভাষা থেকে বাংলায় অনুবাদ করছেন। স্পানঞল ভাষা থেকে বাংলা অনুবাদের দৃষ্টান্ত এই বছর কয়েক আগেও তেমন দেখা যায়নি। কিন্তু ইদানীং কলকাতায় কেউ কেউ শুরু করেছেন। বাংলাদেশেও দু একজন শুরু করেছেন–এটা খুবই আশাব্যঞ্জক। কিন্তু আশার মোড়কেই আবার লুকিয়ে আছে হতাশার গোপন কীট।

border=0গত ২০১২ সালে পেরুর নোবেলজয়ী-লেখক মারিও বার্গাস যোসার কিয়েন মাতো আ পালোমিনো মোলেরো বা হু কিল্ড্ পালোমিনো মোলেরো-এর বাংলা অনুবাদ করেছিলেন রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী। ভূমিকার শেষে অনুবাদকের প্রদত্ত পরিচয় থেকে জানতে পারবেন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট-এর স্পানঞল বিভাগের শিক্ষক। ‘প্রথমা’ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত পালোমিনো মোলেরোকে খুন করল কে? গ্রন্থটি মূল (মানে স্পানঞল) থেকে অনুবাদ করা হয়েছে বলে দাবী করেছেন অনুবাদক এবং প্রথমা। কিন্তু পাঠকের মার্জারনিধনকারী কৌতুহলী মন যদি স্পানঞল ও ইংরেজি সংস্করণ দুটোর সঙ্গে রফিকের বাংলা তর্জমাটি মিলিয়ে দেখেন, তাহলে প্রতারণার দুর্গন্ধ তিনি টের পাবেন সঙ্গে সঙ্গে। প্রতারণার নমুনা পরখ করার আগে কয়েকটি তথ্য হাতের মুঠোয় রাখা ভালো। ১. বইটি মূল ভাষায় বেরিয়েছিলো ১৯৮৬ সালে। ২. এর ইংরেজি সংস্করণটি আলফ্রেড ম্যাকাডেম-এর অনুবাদে বেরিয়েছিলো ১৯৮৭ সালে। ঘটনা হচ্ছে ভূমিকায় অনুবাদক সুসজ্জিত চাতুর্যপূর্ণ ভাষায় মূল থেকে অনুবাদ করার দাবী জানালেও এটি যে ইংরেজি অনুবাদের ভিত্তিতে বাংলায় তর্জমা করেছেন তা বুদ্ধিমান, এমনকি নির্বোধ পাঠকও টের পাবেন। আসুন, এবার নিশ্চিত হওয়ার জন্য পাশাপাশি তিনটি সংস্করণই মিলিয়ে দেখা যাক। উপন্যাসের শুরুর বাক্যটি দিয়েই শুরু করা যাক। স্পানঞলে আছে এরকম:

–Jijunagrandisimas—balbuceo Lituma, sintiendo que iba a vomitar-, como te dejaron, flaquito.

চোদনার পুতেরা- গলা ঠেলে বমি বেরিয়ে আসার অনুভূতি নিয়েই তোতলাতে তোতলাতে বললো লিতুমা– ওরা তোর কী অবস্থা করেছে রে চিকনা। (অনুবাদ লেখকের)

এই বাক্যটির ইংরেজি অনুবাদ করা হয়েছে এভাবে:

“Sons of bitches” Lituma felt the vomit rising in his throat. “kid, they really did a job on you.”

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে এই ইংরেজি অনুবাদে মূলের balbuceo (তোতলানো) এবং flaquito (চিক্না) শব্দদুটির কোনো অর্থ করা হয়নি বা বর্জন করা হয়েছে (পরে অন্যত্র ‘Flaquito’ শব্দটির ঠিকই বাংলা অনুবাদ করেছেন, কারণ ইংরেজিতে এর অনুসরণে skinny করা হয়েছিলো।)। বাংলা তর্জমায় রফিক মূলের কাছে না গিয়ে ইংরেজির অনুসরণে অনুবাদ করেছেন এভাবে:

‘খানকির পুতেরা,’ লিতুমার গলা ঠেলে বমি বেরোবার জোগাড়। ‘উফ ছোকরাটাকে কীভাবে মেরেছে!’

লক্ষ করলেই দেখা যাবে বাংলা অনুবাদে লিতুমার ‘তোতলানো’ ব্যাপারটা যেমন নেই, তেমনি নেই ‘চিক্না’ শব্দটিও। তর্কপ্রিয় কেউ হয়তো ভাবতে পারেন কেবল এই একটি উদাহরণ দিয়ে প্রতারণার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তাহলে আসুন, আরও কিছু উদাহরণের দিকে তাকাই। প্রথমে স্পানঞল, পরে ইংরেজি এবং সবশেষে বাংলা তর্জমা:

quien carajo hizo esto?– balbuceo, contenido la nausea.

ইংরেজিতে এরকম:
“who the fuck did this?” He stammered, holding back his gorge.

রফিক এই অংশটুকু বাংলায় অনুবাদ করেছেন এভাবে:

‘কোন কুত্তার বাচ্চা যে কাজটি করেছে,’ তোতলাতে তোতলাতে বলে লিতুমা, গলা ঠেলে উঠে আসা বমি কোনো রকমে চেপে ধরে।

আগের বাক্যে রফিক ‘তোতলামি’র ব্যাপারটা বাদ দিয়ে গেছেন, এবার তা দেন নি, কারণ এবার ইংরেজি অনুবাদটিতে মূলের অনুসরণে “stammered” শব্দটি আছে। অতএব রফিকের বাংলা তর্জমায়ও ‘তোতলামি’ চলে এসেছে। দ্বিতীয় এই উদাহরণের পরেও কেউ যদি মনে করেন এটা অনুবাদকের অসতর্কতার কারণে ঘটেছে, তাহলে আপনাদেরকে আমরা আরও কয়েকটি নজিরের মুখোমুখি করতে পারি যা বুঝবার জন্য স্পানঞল ভাষায় গভীর জ্ঞানেরও দরকার হয় না। যেমন ধরুন এই তৃতীয় উদাহরণটি:

–No te carajeo a ti, churre– murmuro Lituma–, carajeo porque parece mentira que haya en el mundo gente tan perversa.

স্পানঞল এই বাক্য দু’টার মূলানুগ অনুবাদ করলে দাঁড়ায় এরকম:
‘তোর উপর রাগ করছি না, ছোকরা,– বিড়বিড় করে বললো লিতুমা। ‘রাগ করছি কারণ, দুনিয়াতে মানুষ এত বিকৃত রুচির হতে পারে তা অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়।’(অনুবাদ লেখকের)

অনুবাদক ইংরেজিতে–ভাবার্থ এক হলেও–এই অভিব্যক্তিটা খানিকটা বদলে নিয়ে করেছেন এভাবে:
“I’m not mad at you. I’m mad that anybody could be bastard enough to do something like this. “

রফিক মূলের কাছে না গিয়ে, ইংরেজিরই প্রতিধ্বনি করে বলছেন:

‘না, না, তোর উপর গরম হইয়া লাভ কী! মেজাজ খারাপ হইয়া গ্যাছে যে, এরকম কাজ মানুষ করে? যারা করছে, তারা মানুষের বাচ্চা না।’

সন্দেহ নেই যে এই অংশটুকু তর্জমায় রফিক খানিকটা স্বাধীনতা নিয়েছেন, তারপরেও এটি মূলের চেয়ে বরং ইংরেজি অনুবাদেরই ঔরসজাত। একটু মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, মূলে ‘লিতুমা বিড়বিড় করে বললো’ কথাটা থাকলেও ইংরেজিতে নেই, আর ইংরেজিতে নেই বলে তা বাংলা অনুবাদেও নেই। আর শেষ বাক্যটিতে ইংরেজ অনুবাদক যেমন, তেমনি বাংলার অনুবাদকও মূল থেকে সড়ে গেছেন খানিকটা।

এবার দেখা যাক উপন্যাসটির দ্বিতীয় অধ্যায়ে রফিক কী করেছেন।

স্পানঞলে দুটো বাক্য হচ্ছে এরকম:

El teniente Silva y yo somos la autoridad policial. La que no coopera es la Aviacion. Y, como el flaquito era avionero, si ellos no cooperan, quien carajo va a cooperar.

যদি এই অংশটুকুর মূলানুগ অনুবাদ করা যায় তাহলে সেটা হবে এরকম:

ল্যাফটেন্যান্ট সিলবা আর আমি, আমরাতো পুলিস কর্তৃপক্ষ( বা পুলিসের লোক)। বিমান বাহিনীতো (এক্ষেত্রে) কোনো সহযোগিতা করছে না। আর চিক্না (Flaquito) যেহেতু বিমানবাহিনীর লোক ছিলো, সুতরাং ওরা যদি সহযোগিতা না করে, তাহলে করবেটা কে? (অনুবাদ লেখকের)

ইংরেজিতে এই অংশটুকুর বক্তব্য এক হলেও ধরনটা একটু ভিন্ন:

“Lieutenant Silva and I are the police authority. the authority I’m talking about is the Air Force. That skinny kid was in the Air Force, so if they don’t help us, who the fuck will?”

আমি এটা বলতে চাচ্ছি না যে ইংরেজিতে অনুবাদক এই অংশটির ভাবের বিপর্যয় ঘটিয়েছেন। তবে দ্বিতীয় বাক্যটিতে (The authority I’m talking about is the Air Force.) যা বলেছেন, মূলে
(La que no coopera es la Aviacion যার আক্ষরিক তর্জমা হলো ‘বিমানবাহিনী সহযোগিতা করছে না’) কিন্তু তা বলা হয়নি।

রফিক যদি মূলের দিকে লক্ষ্য রাখতেন তাহলে নিশ্চয় দূরত্বটা বুঝতে পারতেন। সেক্ষেত্রে ভুল ও দূরত্বব্যঞ্জক ইংরেজির প্রতিধ্বনি হওয়া থেকে বিরত থাকতেন। কিন্তু দুঃখজনক সত্যি হলো তিনি ইংরেজিরই বিশ্বস্ত প্রতিধ্বনি করে লিখলেন:

লেফটেন্যান্ট সিলবা আর আমি সিভিল গার্ড। আমি বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষের কথা বলছি। নিহত রোগা তরুণটি বিমানবাহিনীর। সুতরাং ওরা যদি আমাদের সাহায্য না করে, তাহলেই শালার যত সমস্যা। (পৃ: ১৮)

যদিও মূলে যেমন, তেমনি ইংরেজি অনুবাদেও ‘নিহত’ কথাটা নেই। আরেকটি ব্যাপার ‘রোগা’ (চিকনা অর্থে) শব্দটা রফিক এখানে ঠিকই ব্যবহার করলেন, অথচ মূলে প্রথম অধ্যায়ের শুরুর বাক্যে রোগাবাচক (Flaquito) শব্দটি থাকলেও তিনি ইংরেজি অনুবাদের প্রতারক আলোয় পথ চলতে গিয়ে খেয়াল করেননি। তাছাড়া মূলে কিন্তু বলা হয়নি ‘ আমি বিমানবাহিনী কর্তৃপক্ষের কথা বলছি।’ বরং বলা হচ্ছে ‘বিমানবাহিনী সহযোগিতা করছে না’

কিভাবে তিনি বিভ্রান্ত ইংরেজি অনুবাদের এলাহি ভরসায় ক্রমাগত এগিয়ে গেছেন তার আরেকটা নমুনা পরবর্তি বাক্যালাপে খুঁজে পাওয়া যাবে:

ইংরেজিতে ছিলো:

“We do understand,” said josefina, “But talking about a corpse all the time is boring. Why don’t you forget about the guy, Lituma? He’s dead.”

রফিক এর হুবহু প্রতিধ্বনি করে লিখলেন:

‘আমরা সেটা বুঝি,’ হোসেফিনা বলে। কিন্তু সারাক্ষণ একটা মরা মানুষ নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। লিতুমা, ছোকরাটার কথা ভুলতে পারছিল না কেন? ও তো মারা গেছে।’

ইংরেজি এবং ইংরেজির অনুসরণে বাংলায় শেষ দুটো বাক্যের যে তর্জমা হয়েছে তা মোটেই স্পানঞল বাকভঙ্গী বা অর্থের অনুসারী নয়। স্পানঞলে কেবল বলা হচ্ছে এভাবে:

No jodas mas con tu muertito, Lituma.

এখানে একটিই বাক্য এবং এর ভাষান্তর করলে দাড়ায়: ‘লিতুমা, তোর এই মরা(র ঝামেলা )নিয়ে আর জ্বালাইছ না।’

এখানে কিন্তু কোথাও বলা হয়নি “ছোকরাটার কথা ভুলতে পারছিস না কেন?”। মূলে Cadaver (মৃতদেহ) বলে একটা শব্দ আছে বটে কিন্তু সেটাকেই কি টেনেটুনে ‘ও তো মারা গেছে।’ বলতে হবে? তবুও এই দূরত্ববিলাসী অবিশ্বস্ত তর্জমাকেও মেনে নেয়া যেত যদি এর কোনো ইংরেজি অনুবাদ না থাকতো এবং মূল থেকে তর্জমা করার সততা ও পরিশ্রম তিনি মেনে নিতেন। তিনি যে এই সততাকে পুঁজি করে এগোননি তার আরেকটি উদাহরণ এখানে তুলে দিচ্ছি প্রথমে স্পানঞল, পরে ইংরেজি এবং সবশেষে রফিকের বাংলায়।

স্পানঞলে বলা হয়েছে:

–Una pregunta Chunguita–la desafia Josefina–Ningun cliente te ha roto una botella en la cabeza por contestar como contestas?

এর আক্ষরিক অনুবাদ করলে দাঁড়ায়:
‘চুঙ্গিতা, একটা প্রশ্ন: তুই যেভাবে উত্তর দেস সেভাবে উত্তর দেয়ার জন্য কখনো কোনো খদ্দের তোর মাথায় বোতল ভাঙেনি?’ (অনুবাদ লেখকের)

ইংরেজি অনুবাদক মূলের বাচনভঙ্গীকে খানিকটা বদলে নিয়ে করেছেন এভাবে:

” One question, Chunguita, Didn’t anyone ever crack a bottle over your head for being such a wise guy? “

ইংরেজি বাক্যটিতে মূলের শ্লেষটা আনা হয়েছে wise guy বলে ব্যাজস্তুতির (irony) মাধ্যমে। কিন্তু মূলে এই ব্যাজস্তুতি নেই। রফিকও এই ভ্রমাত্মক ইংরেজির অনুরসণে লিখলেন:

‘একটা প্রশ্ন চুঙ্গিতা। এত বুদ্ধি যে মাথায় রাখো সে মাথায় কখনো কেউ বোতল ভাঙে নাই? (পৃ: ২০)

আরেকটা উদাহরণ দেয়া যাক মূলের সঙ্গে মিলিয়ে যার ইংরেজি অনুবাদ যেমন মূলের সাথে প্রতারণা করেছে, তেমনি ইংরেজির বশ্যতা মানার কারনে বাংলা সংস্করণটিও হয়ে উঠেছে সেরকম। যথারীতি প্রথমে স্পানঞ্ল, পরে ইংরেজি এবং সবশেষে বাংলা।
– No tengo plata ni para esta cerveza– dejo Lituma– . Me vas a fiar, no, chunguita?
– Que te fie la que ya sabes –repuso la chunga, desde el mostrador, con aire aburrido.
– -me imaginaba lo que ibas a contestar- dijo Lituma-. Lo hacia por fregarte, nomas.

যদি বিশ্বস্ত ও আক্ষরিক অনুবাদ করা যায় তাহলে হওয়া উচিত:
‘এই বিয়ারের বিলটা দেয়ার পয়সাও আমার নেই’– লিতুমা বললো– ‘আমাকে বাকিতে দিবিতো, নাকি চুঙ্গিতা?’
— কে তোকে বাকি দেবে তা তো তুই জানিসই, — কাউন্টার থেকে বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে চুঙ্গা উত্তর দেয়।
–তুই কি উত্তর দিবি আমি জানতাম– লিতুমা বললো-। তোকে কেবল খ্যাপানোর জন্যই ও কথা বলেছি।
(অনুবাদ লেখকের)

বলবার এই ধরনটা যে ইংরেজি অনুবাদে নেই তা যে কেউ মিলিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবেন:
“me? I don’t even have the dough for this beer. You’ll let me pay later, won’t you, Chunguita?’
“Maybe your mama will let you pay later”, answered la Chunga, looking bored.
“I figured you’d say something like that. I just wanted to screw around.”

মূলের ভাবটুকু বুঝবার জন্য এই অনুবাদ নিশ্চয়ই কোনো বাধা নয়, তবে মূলের বাচনভঙ্গী এবং বাক্যরীতিকে বদলে নেয়ার কারনে তা স্থানিক স্বাতন্ত্র্যকে মুছে ফেলা হয়েছে। স্বাতন্ত্র্য-বিলোপকারী এই ইংরেজি অনুবাদেরই প্রতিধ্বনি করে রফিক লিখলেন:
‘আমি? আমার কাছে তো বিয়ারের বিলের পয়সাও নেই। চুঙ্গিতা, পরে বিল যা আসে, দিয়ে যাব। ঠিক আছে?’
‘আমি কি তোমার মা নাকি,’ বারের মালিক লা চুঙ্গা কেমন একটা বিরক্তি-মেশানো স্বরে বলে।
‘আমি জানতাম, তুমি এ রকম কিছু একটা বলবে। এমনি এমনি শয়তানি করে বলেছি।’

(পৃ: ১৯)

border=0প্রশ্ন হলো যিনি স্পানঞল ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তার অনুবাদ মূলের সঙ্গে না মিলে কেন ইংরেজি অনুবাদের সঙ্গে মিলে যায়? ভুলে যাচ্ছি না যে অনুবাদের ক্ষেত্রে কখনো কখনো স্বাধীনতা নেয়াটা অনিবার্যও হয়ে ওঠে মূল অনুষঙ্গের প্রতিরূপ, বা নিকবর্তী অভিব্যক্তির কোনো কিছু উদ্বিষ্ট ভাষায় পাওয়া যায় না বলে। আমরা এ পর্যন্ত যতগুলো উদাহরণের মধ্য দিয়ে এসেছি তাতে করে আমার অন্তত এটা মনে হয়নি যে বাংলা ভাষায় সে রকম কোনো সম্ভাব্য সংকটের কারণে অনুবাদ মূলের বাচনভঙ্গী, সংলাপ এবং বর্ণনাভঙ্গী বদলে দিতে পারে। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই যে তিনি বাংলাভাষার দীনতার কারণেই বদলে নিয়েছেন, তাহলে সেই বদল কী করে আশ্চর্য রকমের প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে ইংরেজি অনুবাদের?

এই মিলের ব্যাপারে অনুবাদক কি একেবারেই অসচেতন ছিলেন? এ প্রশ্নও কি আমাদের মধ্যে উঁকি দেবে না যে যদি মূলানুগই হবে তাহলে কী করে অন্য একটি অনুবাদের সঙ্গে তা মিলে যায়? অথচ তিনি অনুবাদকের ভূমিকায় জানিয়েছেন যে “১৯৯৯ সালে প্রকাশনা সংস্থা Alfaguara (Mexico) থেকে প্রকাশিত মারিয়ো বার্গাস য়োসার Obra reunida: Narrativa breve সংকলনটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলো কয়েকটি গল্প ও চারটি উপন্যাস। তার একটি Quien mato a Palomino Molero? ” (পৃ: ১৬৩–৩২০)। “এই বাংলা সংস্করণটির তর্জমা সেই সংকলন থেকেই।” (পৃ-১৩) এই তথ্য জানাবার পরপরই তিনি এও বলছেন যে, “বাংলায় উপন্যাসটি লিখলে বার্গাস য়োসা কেমন লিখতেন– তর্জমা করার সময় প্রশ্নটি সব সময় মাথায় রেখেছি।” (পৃ: ১৩)

এটুকু পড়ার পর আমাদের এই বিশ্বাস জন্মায় যে তিনি মূলানুগ থাকার ব্যাপারে বেশ ভাবিত ছিলেন। ভূমিকায় তিনি এও জানিয়েছেন যে উপন্যাসটির বহু অনুষঙ্গ এবং শব্দের তাৎপর্য বুঝবার লক্ষ্যে ‘পেরুর লিমায় বসবাসরত’ এক ‘গবেষকের শরনাপন্ন হতে’ হয়েছে তাঁকে। কিন্তু অনুবাদের নমুনাগুলো তাঁর ভূমিকার বক্তব্যকে পুরোপুরি মিথ্যা প্রমাণ করে ইংরেজি অনুবাদের নিষ্প্রাণ ঝাল খাওয়ার কারণে। অনুবাদক ইনিয়ে বিনিয়ে যতই বলুন না কেন তিনি মূল থেকে অনুবাদ করেছেন, কিন্তু এইসব নমুনা কোনোভাবেই প্রমাণ করে না যে ইংরেজি অনুবাদের বিশ্বস্ত প্রতিধ্বনি এটা নয়।
মনে পড়ছে সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘অর্থং অর্থং’ বলে একটা লেখা পড়েছিলাম বহুদিন আগে। তাতে এক ভূয়া অনুবাদকের গল্প(বা সত্যিও হতে পারে) বলছিলেন তিনি, যিনি–আশ্চর্য সে্ও এক চৌধুরী–`বুর্নফের একটি অচলিত ছোট লেখার অনুবাদ’ করেছিলেন ইংরেজীতে। ‘আসলে সে সেটা করেছিলো এক আনাড়ি ছোকরার সাহায্যে, যার ফরাসী জ্ঞান ছিল অত্যন্ত কাঁচা’। “কি করে যেন ওই অনুবাদ প্যারিসে পৌঁছে গেলে তাদের এক পত্রিকায় বেরোয়–“ The originality of the translator has come out with extraordinary success in those passages where he has failed to understand the original!”” (সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ মুজতবা আলী রচনাবলী, দ্বিতীয় খন্ড, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, প্রকাশকাল: ষষ্ঠ মুদ্রণ ফাল্গুন ১৩৯৯, পৃ:১৬০)
ঘটনা প্রায় একই রকম, এখানে কেবল ‘আনাড়ি ছোকরার’ পরিবর্তে আনাড়ি ইংরেজি অনুবাদক ভেবে নিলেই সাযুজ্যে পৌঁছে যাওয়া সহজ হয়ে যায়।

‘প্রথমা’র মতো একটি প্রতিষ্ঠান কী করে এ ধরনের জালিয়াতিকে প্রশ্রয় দিয়ে পাঠকদের সাথে প্রতারণার অংশভাক হয়ে উঠতে পারে তা কিছুতেই বুঝতে পারছি না।

‘প্রথমা’ প্রকাশনী হিসেবে অল্পবয়সী হলেও ইতিমধ্যে নানা কারণে আলোচিত এবং পরিচিত। পাঠক-ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে ‘প্রথমা’র উচিৎ আরও সতর্ক হওয়া। এর আগেও তারা আলীম আজীজের অনুবাদে কার্লোস ফুয়েন্তেসের আউরা উপন্যাসের ক্রুটিপূর্ণ অনুবাদের কারণে সমালোচিত হয়েছিলো। প্রথম আলোর প্রতিপত্তি ও খ্যাতিকে পুঁজি করে ‘প্রথমা’ যদি এ ধরনের ভুল ও জালিয়াতির প্রশ্রয়দাতা হয়ে ওঠে তাহলে ‘যা কিছু ভালো তার সাথে প্রথম আলো’র শ্লোগানটিকে সবাই নিছক কথার কথা হিসেবে বিপরীতার্থে নেবে।
Flag Counter


25 Responses

  1. আহমাদ মাযহার says:

    বাংলাদেশে ইয়োরোপীয় ভাষাগুলো থেকে যেসব রচনা অনূদিত হয়েছে তার শতকরা ৯০ ভাগ ইংরেজি থেকেই হয়েছে। ইংরেজি ভাষার বাইরে যারা অন্য মূলভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন বলে দাবি করেছেন তা নিয়ে প্রশ্ন করা প্রায় হয়ই নি। এমনকি রাশিয়া থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন রচনাবলির ক্ষেত্রেও কথাটা প্রযোজ্য বলেও আমার মনে হয়েছে। স্প্যানিশ ভাষার সাংস্কৃতিক অনুধাবনের জন্য ইংরেজি অনুবাদের সহযোগিতাও নেয়া হয়ে থাকতে পারে যা দোষের নয়। কিন্তু রাজু আলাউদ্দিন যেভাবে মূল স্প্যানিশ ভাষার টেক্সটের সঙ্গে ও ইংরেজি অনুবাদের টেক্সটের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন এমন নিদর্শন তো আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না! আমার আশঙ্কা মূলভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন বলে যাঁদের দাবি এমন অনেকেরই অনুবাদ পরীক্ষা করলেও এমনটা পাওয়া যাবে। অনুবাদের সামর্থ্যের হেরফের নিয়ে সমালোচনা কিছুটা হলেও মূল ভাষা থেকেই অনুবাদ হয়নি– অনুবাদের সততা নিয়ে এমন বিস্তারিত প্রশ্ন তুলতে দেখাই যায় না। তাছাড়া আরেকটি ব্যাপার লক্ষণীয় যে এইধরনের অভিযোগকে আমলে নিয়ে সংস্কার সাধনেরও দৃষ্টান্ত তেমন একটা আমাদের দেশে নেই। বরং এমন ভাব দেখা গেছে যে ‘নিন্দুকেরা কত কথাই তো বলে’! আমার মনে হয় এ ধরনের মূলভাষার দৃষ্টান্তসহ নির্মোহ সমালোচনাই পারে এই ‘প্রতারক’ প্রবণতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে। রাজু আলাউদ্দিনের হাতে এর সূচনা ঘটল! তাঁকে ধন্যবাদ।

  2. আশরাফুল আলম says:

    প্রথমা সম্ভবতঃ অনুবাদকের কাজ পরখ করে দেখেই নি, স্রেফ ছাপিয়ে দিয়েছে। মূল অভিযোগটা উত্থাপিত হওয়া দরকার অনুবাদকের ব্যাপারে – ইংরেজী থেকেই যদি অনুবাদ করে থাকেন, তাহলে মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করার দাবী করা কেন? “উপন্যাসটির বহু অনুষঙ্গ এবং শব্দের তাৎপর্য বুঝবার লক্ষ্যে ‘পেরুর লিমায় বসবাসরত’ এক ‘গবেষকের শরনাপন্ন হতে’ হয়েছে অনুবাদককে” – এ ধরণের দাবী করে সম্ভবত মূল ভাষা থেকে অনুবাদের ব্যাপারে একটা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরী করা হয়েছে। এটা স্রেফ বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা।

  3. Raju bhai
    Thanks sharing this article, we can be aware before buying these books

  4. হাসান ইকবাল says:

    প্রথমা’র কিছু কোয়ালিটি বুকস,পাবলিকেশনস আছে। এ ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়াটা জরুরি। ফিলিং ডিসএপয়ন্টেড!

  5. mrinal basu chaudhuri says:

    khub valo laglo…..sundar blslation…..

  6. মোস্তাক শরীফ says:

    আর কত সাহিত্যিক প্রতারণার খবর শুনতে হবে আমাদের? রাজু আলাউদ্দিনের আলোচনা থেকে দিনের আলোর মতই পরিষ্কার: অনুবাদক মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদের কথা বললেও আসলে করেছেন ইংরেজি থেকে এবং এখানে যে ক’টা নমুনা দেখলাম তাতে মনে হচ্ছে ইংরেজি থেকে অনুবাদটাও খুব একটা যুৎসইভাবে করতে পারেননি। সাহিত্য ব্যাপারটার সঙ্গে সততা-র ব্যাপারটি ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের বাদবাকি সব ক্ষেত্রের মত সাহিত্যেও প্রচণ্ড ভেজাল ঢুকে গেছে। সংশ্লিষ্টদের বলছি, মিথ্যে বাহ্বা কুড়ানোর লোভ সংবরণ করুন। মানুষ আপনাদের প্রতারক হিসেবে নয়, সাহিত্যের সেবক হিসেবে মনে রাখুক – সে চেষ্টা করুন।

  7. সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল says:

    দারুন কাজ করেছেন রাজু।

  8. Prodip says:

    কেউ কেউ দাবী করে, মূল থেকে অনুবাদের। যখন তা পড়ে দেখি এবং একই বইয়ের ইংরেজি থেকে অনুবাদটাও পড়ি, তখন কেমন জানি গোলমেলে লাগে। মূল থেকে অনুবাদটা প্রায়ই দুর্বোধ্য এবং অসংলগ্ন লাগে । আসলে এই যে মূল থেকে অনুবাদ, এটা একধরনের ব্যবসায়িক চমক বলেই মনে হয়। প্রথমা’ এই ব্যবসায়িক চমকের একটা উজ্জ্বল উদাহরণ। ইতিমধ্যে সে স্বাক্ষর তারা রেখেছে তা যে কী পরিমান অনৈতিক এবং ভন্ডামিপূর্ণ তার প্রমান একটা দুটা নয়, ততোধিক।

  9. Ankur Saha says:

    khub bhaalo laaglo, Razu bhai!!

  10. Lipu says:

    এতো দেখি ফরমালিন সাহিত্য চর্চা। অনুবাদক আবার শিক্ষক ও বটে! বাহ, দেশের সাহিত্য চর্চার একি হাল! প্রথম আলো আবার তাদের রাখাল!!!

  11. নজরুল হোসেন বুলবুল says:

    রাজু আলাউদ্দিন-এর এই লেখা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘৃণিত । লেখার পরতে পরতে ঈর্ষা, একদেশদর্শীতা ও অন্যকে অপমানের কালা পাহাড়ি মনোভাব ফুটে উঠেছে ।

  12. orup zaman says:

    Dear Nazrul, there are people like you in our country and that is the reason people like this writer can cheat. not only in this sector everywhere happen same type of cheating. if someone like Razu show the real face of this people he should be congratulated. please change our country and help to do that. the writer could be your friend but it does not mean you should help him cheating. thanks for understanding.

  13. রাজু আলাউদ্দিন অসাধারণ এক কল্যাণমূলক কাজ করেছেন প্রচুর শ্রম ও মেধা ব্যয় করে। আসলে অনুবাদের ক্ষেত্রে কোনও ফাঁকি বা সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই– সম্মানিত অনুবাদকদের এটি মনে রাখা উচিত। অনেক ধন্যবাদ লেখককে।

  14. Khaleda Khan Bithi says:

    জনাব রাজু আলাউদ্দিন, আপনি তো নাম না জানা এই অনুবাদককে ফেমাস করে দিচ্ছেন। আপনি কার পক্ষে?

  15. mostafa tofayel says:

    I must appreciate first the role of bdnews that they opened up a new vista of literary movement in their page.From it I understand the contribution of Mr Razu in poetry, Rabindranath, criticism and translation. He is particularly excellent in Spanish and Portuguese literature. It is Mr Razu who has made possible finding out what is insincere about Rafiqum Munir. Hail Razu,the righteous and the devoted.

  16. Hamid Rayhan says:

    Mr. Raju,
    Thanks a lot for unfolding the appearance of the translator, who not only cheats the readers, but also his inner ugliness. Will Protoma take any step against him?
    Hamid Rayhan
    Sreemongal

  17. আলী আহমদ says:

    রাজু আলাউদ্দিন মাঝে-মধ্যেই এই অত্যাবশ্যকীয় কাজটি করে থাকেন। মনে পড়ছে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কোন একটা সময়ের কথা। আমরা কেউ কেউ তখন দৈনিক সংবাদের সাহিত্য পাতায় লিখতাম। নতুন-আসা এক তরুণ বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন দিকপালদের নিয়ে নিয়মিত একটি কলাম লেখা শুরু করেছিলেন। আমরা প্রায় হকচকিয়ে উঠলাম–ভাবতে শুরু করলাম, এত অল্প সময়ের ব্যবধানে এতসব বিভিন্ন দেশের বই পড়ে তা নিয়ে অমন বিদগ্ধ আলোচনা কেমন করে সম্ভব! অল্পদিনের মধ্যেই বেরিয়ে গেল রাজুর লেখা। তিনি দেখিয়ে দিলেন, Martin Seymour-Smith এর Guide to Modern World Literature নামের ঢাউস বইখানার কোন পৃষ্ঠা থেকে কতোখানি লেখার হু-বহু বাংলা অনুবাদ করে দেয়া হয়েছে। বলা বাহুল্য, ওই কলাম লেখা সেই যে বন্ধ হয়েছিল, তা’ আর কোনোদিন চালু হয়নি।

    আসলে সৎ সমালোচনার ঝুঁকি আমাদের দেশে মারাত্মক। এখানে সমালোচনা মানে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা। অন্যথায়, লেখক ও সমালোচকের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এমন ঝুঁকি সাধারণত এখানে কেউ নিতে চান না। তাই সমালোচনা-সাহিত্যও এখানে নেই; কোনোদিন তৈরি হবে কিনা তা-ও জানি না। এটা খুব সুস্পষ্টভাবে জেনেও , রাজু মাঝে-মাঝে এই জাতীয় কাজগুলো যে করেন সেজন্য তিনি শুধু ধন্যবাদের পাত্রই নন, তিনি আমাদের কৃতজ্ঞতা পাওয়ার যোগ্য।

    কি পত্রিকায় আর কি-বা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে, লেখা প্রকাশের আগে আমাদের এখানে সম্পাদনার কোন ধারণাই এখনো তৈরি হয়নি। খোদ রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসের অন্তত এক জায়গায় বাক্য গঠনের ত্রুটি আমি পেয়েছি, এবং তা’ নিয়ে লিখেছিও। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভুল লিখতেন, মোটেই সেকথা আমরা বলতে চাইনি। আমাদের কথা হল এই যে যে-কোনো মানুষেরই ভুল হতে পারে। সম্পাদনার দায়িত্ব হল সেটা দূর করে দেয়া। তার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘প্রথমা’ সে-কাজটি আন্তরিকতার সাথে শুরু করলে, বাংলা প্রকাশনা জগতের এই আজন্ম কলঙ্কটি মোচন হওয়া শুরু হতো।

    রফিক আর রাজু–দুজনি আমার স্নেহের। মনে আছে, ঐ নব্বইয়ের দশকেরই কোন একটা সময়ে তখনকার কিশোর রফিক-কে আমার কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলো রাজু। এর পরও, আশা করি, ওদের বন্ধুত্ব টিকে থাকবে।

    রাজু দেখিয়ে দিয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে অনুবাদকের স্বাধীনতা নেয়ার যে-কথা বলা হয়ে থাকে, তার অলিখিত একটা নিয়ম অবশ্যই আছে। বর্তমান ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তা’ হয়নি। রাজু যেদিকে ইশারা করেছে সেটাই হয়তো সঠিক। রফিক এবং ‘প্রথমা’–উভয়েরই বিষয়টি গভীর ভাবে ভেবে দেখা উচিৎ।

  18. anisuz zaman says:

    ধন্যবাদ আলি আহমদ ভাই!! আপনি একদম আসল কথাটাই লিখেছেন। আশা করব এই সমালচনাটাকে ধ্বংসাত্মক অর্থে না নিয়ে রফিক ভাই এবং প্রথমা আমাদের সাহিত্যের উন্নতির খাতিরেই গঠনমূলকভাবে নেবেন। আর আশা করব আপনার মতই ” এতকিছুর পরও যেন ওদের বন্ধুত্ব অটুট থাকে।”

  19. আদনান সৈয়দ says:

    অবাক হলাম সেই সাথে অপার বিস্ময়!!! যদি তাই হয় তাহলে আস্থার বাতিঘর কোথায়? অনুবাদ সম্পর্কে সৈয়দ মুজতবা আলী বলেছিলেন, “অনুবাদ হল কাশ্মিরি শাল এর উল্টো পিঠ”। কিন্তু লেখক যখন অনুবাদের ক্ষেত্রে নিজের মনগড়া কাহিনী চাপিয়ে দেন তখনতো চোখে অন্ধকার দেখা ছাড়া আর কোন গতি থাকে না। এ কথা আমরা সবাই জানি যে অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল নির্যাস থেকে পাঠক অনেকাংশেই বঞ্চিত হন। স্পেনিশ থেকে ইংরেজি, ইংরেজি থেকে বাংলায় রুপান্তর হয়ে যখন আমাদের মুখের সামনে এসে লেখাটি দাড়ায় তখন সত্যি এর কংকালসার চেহাড়া দেখে দুঃখ লাগে বৈকি!! তবে সবচেয়ে বেশি ভয়াবহ ঘটনা হল যখন লেখক নিজেকে দক্ষ অনুবাদক হিশেবে জাহির করার জন্যে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। এবং সরলমনা পাঠকদের সাথে শঠতা করে যাচ্ছেন। মুক্তির উপায় কি? ভাববার বিষয়। ধন্যবাদ কবি রাজু আলাউদ্দিনকে।

  20. রহিমা আফরোজ মুন্নী says:

    অবাক কাণ্ড, এই রকম করে কি আর মহৎ কিছুর জন্ম হয়, রাজু ভাইয়ের তালাশ জারি থাকুক…

  21. মাসুদ আনোয়ার says:

    জুলফিকার নিউটন তো। ভাল করেই জানি। ৮০-এর দশকের শেষ দিকে একবার ইত্তেফাকের কচি কাঁচার আসরে মাসের ব্যবধানে দু’দুটো লেখা ছাপিয়ে আমাদের নতুন লিখিয়েদের টাসকি খাইয়ে দিয়েছিলেন। পরে একদিন দাদাভাই নিজেই বিজ্ঞপ্তি দিলেন তার পাতায়। কী? না, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অমুক হল থেকে পাঠানো জুলফিকার নিউটনের দুটো লেখাই ভারতের অমুক অমুক লেখকের লেখার হুবহু নকল। তার লেখা আর ইত্তেফাকে ছাপা হবে না।

  22. ফরিদুল হক says:

    আসলে রাজু যেহেতু স্পেনিশ ভাষার শিখেছে, এবং শুধু তাই নয় স্পেনিশ ভাষা উক্তির ভঙ্গীটিও জানে, ফলে স্পেনিশ ভাষার শিক্ষক রফিক-উম-মুনীর চৌধুরীর অনুবাদের ভুলগুলোও পরখ করতে পারে! এই ক্ষেত্রে কথা বলার মানুষজন আমাদের অপ্রতুল! আর অনুবাদক ইংরেজী থেকে অনুবাদ করেছে এবং সেক্ষেত্রে স্বাধীনতা দিয়েছে–এই সত্য স্বীকার করতে বাঁধা কোথাই ছিল? আমি এখনও বুঝিতে পারছি না ! তবে রাজুর উচিত নয় অনুবাদকের প্রতি অসাহিত্যিক গোচের অপভাষা ব্যবহার করা !

  23. জাহিদুল ইসলাম says:

    একটা চমৎকার আলোচনা। এইজন্যে রাজু আলাউদ্দিন অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য। তিনি জ্ঞানী। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। তিনি যে চোর ধরার মত নিখুঁত তদন্তে কাজটা সমাধা করেছেন, তাতে আমরা বিস্ময় মানি। একমাত্র একজন মেধাবি ও অক্লান্ত সাহিত্যকর্মীর পক্ষেই এটা সম্ভব।

    তবে সত্যি কথা হলো, আজকাল সভ্য সমাজে, চোরকে শাস্তি দেয়া হলেও, তার প্রতি সংযত ভাষা ব্যবহার করা হয়। অনুমান করি, অনুবাদকের অসততা তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়েছে। এজন্য তেমন দোষ তাঁকে দেয়া যায় না।

    তবে, জ্ঞানীদের কাছ থেকে আমরা শুধু জ্ঞানই গ্রহণ করি না, তাঁদের সাংস্কৃতিক আচরণেও দীক্ষা নিই। তাদেরকে অনেকটা শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করি। সেজন্য একজন জ্ঞানীর সহজাত গুণ হবে বিনয়। তাঁরা উত্তেজনা সংবরণ করবেন, নৈর্ব্যক্তিকভাবে বিষয়কে তুলে ধরবেন, বজায় রাখবেন নির্মোহতা। নাহলে, তাঁদের উপস্থাপিত জ্ঞানের সূত্রটির প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে, হতে পারে শ্রদ্ধার ঘাটতি। হয়তো এই জায়গাটিতে সমালোচক জনাব আলাউদ্দিন আর একটু সতর্ক হতে পারতেন।

    যাহোক, এসব আচরণের কথা। প্রত্যেকের ধরন, জীবনদর্শণ, আলাদা। সেটা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। তিনি সত্য তুলে ধরেছেন কিনা, সেই তর্কটাই জরুরি।

    আর এই মূল তর্কে, তাঁকে ১০ এ ১০ দিতে হবে।

    রাজু আলাউদ্দিনকে শুভেচ্ছা।

  24. খালিদ সাইফ says:

    রাজু ভাই ভালো স্প্যানিশ জানেন। তিনি অনুবাদও করেন। তাই রাজু ভাইয়ের উচিৎ স্প্যানিশের কিছু সেরা সাহিত্য কর্মের বাংলা অনুবাদ করা। আশা করি তিনি আমাদের বঞ্চিত করবেন না।

  25. ২০৷১০৷১৮
    প্রকাশক ওইসব কিছু দেখে না৷ দেখবে কি? সে তো কিছু বোঝে না ! সে বোঝে বইটা কত কপি খাবে৷ মালটা যাবে কিনা৷ সম্প্রতি গ্যুন্টার গ্রাসের “বিড়াল ও ইঁদুর” বইখানার ক্ষেত্রে যেমন হল৷ মূলে দুখানা অনুচ্ছেদ – অনুবাদে বাইশ খানা৷ আর তার অনূদিত বাক্য? আমি ভাই তার বাংলা অর্থ করতে পারলাম না৷ যদিও আমি নিজেকে দুচার কলম লিখতে পারা বাঙালী ব’লে দাবি করতে পারি৷ ওই একই প্রকাশনের সাহিত্য পত্রিকায় ওই বইটার সমালোচনায় তাকে শুইয়ে দিতে হয়েছিল৷ বললাম, দাদা অপারেশনটা অন্য কাউকে দিয়ে করান৷ ওরা বলল, না আপনিই করুন৷ ভগবান জানে কি ভেবেছিল৷ দুই হাউসে কোনও রেষারেষি ছিল কিনা! তবে সমালোচনা বেরিয়ে যাবার পর বিক্রীর খতিয়ানটা কিন্তু পরখ করবার সুযোগ আমি পাইনি৷
    আমি খুব জোরের সঙ্গে বলব, অনুবাদ প্রকাশে প্রকাশন সংস্থার খবরদারী দরকার৷ যেটা ইউরোপে দেখি৷ ভাষা জানা লোক ভাড়া করা দরকার৷ এডিটার রাখা দরকার৷ আমি নিজের অনুবাদের ক্ষেত্রে এডিটার-এর প্রয়োজন ভীষণভাবে অনুভব করি৷ একটা অনুবাদ মানে একটা গবেষণার কাজ৷ অনুবাদক কাজ করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত গবেষণা করবে, দেখবে শব্দসম্মান রক্ষিত হচ্ছে কিনা, তথ্যাদি সঠিক দেওয়া হয়েছে কিনা, দরকার হলে মূল লেখককে সংশোধন করবে, মূল লেখকের তরফ থেকে সহায়তা আদায় করবে৷ গ্যুন্টার গ্রাস-এর অনুবাদের ক্ষেত্রে আমি এটা আদায় করেছি৷ আমার দুয়েকজন সেইদেশী বন্ধুর কাছে সহায়তা পাই আমি নিয়মিত৷(এতে লজ্জার কিছু নেই৷ যেটা দেব তাতে কোন্ও খুঁত থাক তা কেউ বরদাস্ত করে না) যেজন্য আমার গ্রাস-অনুবাদের ওপরে “authoritative” কথাটার একটা অলিখিত তকমা পড়েছে৷
    কিন্তু প্রকাশক এত খরচ সামলাবেন কি ক’রে৷ বইয়ের দাম তো তাহলে পাঠক দিতে পারবে না? এখানে সরকারের এগিয়ে আসা উচিত৷ জার্মানিতে অস্ট্রিয়ায় সর্বত্র এরকম ব্যবস্থা আছে৷ গ্র্যান্ট আছে৷ বাংলাদেশে অনুবাদের যেরকম চাহিদা, সেখানে তো এটা খানিকটা লাভজনকও বটে৷ বিশেষত সরকার বিদেশের সেই দেশটির সঙ্গে যদি চুক্তি করে, তাহলে৷ তখন Quality Controll আসবে৷ সেই সব লোক অনুবাদ করবেন যাঁরা যোগ্য৷ তবে একটা জিনিস দেখবেন, অনুবাদক বাছাইয়ে পলিটিকস যেন না আসে, কড়ি চালাচালি না হয়, যোগ্য অনুবাদক যেন তার যোগ্যতা অনুযায়ী তার কাজের সম্মানমূল্য পায়, ভাল কাজ করলে সে যেন পুরষ্কৃত হয়৷
    জোরের সঙ্গে বলব, অনুবাদ একটা পয়গম্বরের কাজ৷ একটা গবেষণার চেয়েও মহৎ কাজ৷ সরকার তো এজন্য ফেলোশিপ-ও দিতে পারে৷
    (এখানেই শেষ করছি৷ বস্তুত এ বিষয়ে একটা কথা বললেই আর একটা কথা উঠে আসে৷ চিঠিতে এই অনন্ত শব্দমালায় নিজেকে আর জড়াতে চাইছি না)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.