গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ১৯ নভেম্বর ২০১৪ ৮:৫৫ অপরাহ্ন

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৯

যখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বুঝতে পারে যে প্লেগটা সারাগ্রাম দখল করে নিয়েছে। তখন পরিবারের সব প্রধানকে ডেকে অনিদ্রা রোগ সম্মন্ধে তার যা জানা ছিল তা জানায়। আর জলাভূমির অন্যান্য জনবসতিকে এই রোগের রোষানল থেকে রক্ষার জন্য সকলে মিলে কার্যক্রম ঠিক করে। এভাবেই কাকাতুয়ার সঙ্গে বদল করা ঘণ্টিগুলো ছাগলের গলা থেকে খুলে গ্রামের প্রবেশপথে ঝুলিয়ে দেয় তাদের উদ্দেশ্যে, যারা উপদেশ গ্রাহ্য না করে বা পাহারাদারদের অনুরোধ রক্ষা না করে গ্রাম ভ্রমণের জেদ করে। তখনকার সমস্ত আগুন্তুকদের, যারা মাকন্দোর পথ অতিক্রম করত, তাদের অবস্থানের সময় খাবার বা পান করা নিষিদ্ধ ছিল। কারণ, এ ব্যাপারে কারও সন্দেহ ছিল না যে রোগটা ছড়ায় মুখ দিয়ে, আর সমস্ত খাবার এবং পানীয় কলুষিত ছিল অনিদ্রা দিয়ে। এভাবেই প্লেগটা ছিল গ্রামের সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কোয়ারানটিনটা এতই ফলপ্রসূ হয় যে এমন একদিন আসে যখন জরুরি সময়টাই স্বাভাবিক বলে গণ্য হয় আর জীবন ও কাজের ছন্দ এমনভাবে সুসংবদ্ধ হয়ে আসে যে কেউই আর নিদ্রা নামের অপ্রয়োজনীয় অভ্যাসটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করে না।

আউরেলিয়ানো ছিল সেই ব্যক্তি, যে কয়েক মাসের মধ্যেই স্মৃতিবিলোপ প্রতিরোধের সূত্র আবিষ্কার করে। ঘটনাবশত ব্যাপারটা আবিষ্কার করে সে। আক্রান্ত হওয়া প্রথম কয়েকজনের একজন হওয়ায় অনিদ্রায় অভিজ্ঞ আউরেলিয়ানো শিখে ফেলে রৌপ্যকর্ম নিখুঁতভাবে। একদিন ধাতু পিটিয়ে পাতে পরিণত করার জন্য ব্যবহৃত ছোট্ট নেহাই খুঁজছিল সে। আর তার নাম মনে করতে পারছিল না। ওর বাবা বলে নেহাই। আউরেলিয়ানো এক টুকরো কাগজে নামটা লিখে নেহাইর হাতলে আঠা দিয়ে লাগিয়ে দেয়। এভাবেই সে ভবিষ্যতে নামটা ভুলে না যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত হয়। জিনিসটার নামটা কঠিন বিধায় ওর তখনও মনে হয়নি যে, সেটা হচ্ছে স্মৃতিবিলোপের প্রথম ঘটনা।
কিন্তু অল্পকয়েকদিনের মধ্যেই বুঝতে পারে যে পরীক্ষাগারের প্রায় প্রতিটি জিনিসেরই নাম মনে রাখা কঠিন হয়ে পরেছে। সুতরাং যথাযথভাবে নামাঙ্কিত করে প্রতিটি জিনিসকে, যাতে করে শুধুমাত্র বর্ণনা পড়ার ফলেই জিনিসটাকে সনাক্ত করতে পারে। যখন তার কাছে ওর বাবা ছোটবেলায় সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী ঘটনাগুলোও ভুলে যাওয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করে তখন আউরেলিয়ানো তার পদ্ধতি বর্ণনা করে, আর হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওটাকে বাস্তবে কাজে লাগায় সারাবাড়ি আর পরে আরোপ করে গ্রামে। কালিমাখানো এক বুরুষ দিয়ে প্রতিটি জিনিসকে নামাঙ্কিত করে: টেবিল, চেয়ার, ঘড়ি, দরজা, দেয়াল, বিছানা, কড়াই। খোয়াড়ে গিয়ে একইভাবে নামাঙ্কিত করে জীবজন্তুর আর গাছপালার: গরু, ছাগল, শুকর, মুরগি, ইউকা (মিষ্টিআলু জাতীয় এক ধরনের গাছের শেকড়, যা খাদ্যে হিসেবে ব্যবহৃত), মালাংগা (গাছের শিকড়, যা দিয়ে ময়দাজাতীয় খাদ্য বানানো হয়), কলা। আস্তে আস্তে ভুলে যাবার অনন্ত সম্ভাবনার কথা বিশ্লেষণ করে ওরা বুঝতে পারে যে, একদিন এমন হবে যে, পরে জিনিসগুলোকে চিনতে পারবে।
কিন্তু মনে থাকবে না তাদের ব্যবহার। সুতরাং বর্ণনা লিখে আরও বিশদভাবে। স্মৃতিবিলুপ্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত মাকন্দোবাসী গরুর গলায় যে লেখাটা ঝুলিয়েছিল, সেটা ছিল এক আদর্শ নমুনা: ‘এটা হচ্ছে গরু, প্রতি সকালে এটাকে দোয়াতে হয় যাতে করে দুধের উৎপাদন হয়, আর দুধকে ফোটাতে হয় কফিতে মিশিয়ে, দুধসহ কফি বানানোর জন্য।’
আর এভাবেই ওরা বাস করতে লাগল পালিয়ে-যেতে-থাকা এক বাস্তবতায়, কিছুক্ষণের জন্য শব্দের দ্বারা বন্দি হয়ে। কিন্তু লেখা শব্দগুলোর মূল্য বিস্মৃত হলে সেই বাস্তবতা হারিয়ে ফেলার আর কোনো বিকল্প ছিল না।
জলাশয়ে যাওয়ার রাস্তায় ঢোকার মুখে টাঙানো ছিল এক ঘোষণা, যেটাতে লেখা ছিল মাকন্দো, আর প্রধান রাস্তায় আরেকটি ছিল আরও বড় করে লেখা: ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে।’
সবগুলো বাড়িতেই লেখা ছিল জিনিসপত্রের আর অনুভূতি মনে রাখার সংকেত। কিন্তু প্রক্রিয়াটায় এত বেশি সতর্কতা আর নৈতিক দায়িত্বের প্রয়োজন ছিল যে অনেকেই এক কাল্পনিক বাস্তবের জাদুর দ্বারা বশীভূত হয়ে পড়ে, যা ছিল তাদের নিজেদের দ্বারাই উদ্ভাবিত; তা যতটা না বাস্তবানুগ তারচেয়ে বরঞ্চ আরামপ্রদ। এই রহস্যময়তাকে আরও জনপ্রিয় করে তোলার ব্যাপারে বেশী অবদান রাখে পিলার তেরনেরা, তাস দেখে অতীত বানী করে যেমনটা আগে করত ভবিষ্যৎ বাণী। এভাবেই অনিদ্রা রোগীরা বাস করতে শুরু করে তাস দিয়ে গড়া এক অনিশ্চয়তার বিকল্প জগতে, যেখানে আবছাভাবে বাপকে মনে রাখা হয় এপ্রিলের শুরুতে আসা এক গাঢ় রংয়ের পুরুষ হিসেবে। আর মাকে অষ্পষ্টভাবে মনে রাখা হয় এক বাদামি রংয়ের মহিলা হিসেবে, যে বাম হাতের আঙুলে সোনার আংটি পরত। যেখানে জন্মদিন হত সেদিন তেজপাতা গাছে গান গেয়েছিল আলন্দ্রা পাখি। ঐ সমস্ত স্বান্তনাময় চর্চার কাছে হার মেনে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সিদ্ধান্ত নেয় স্মৃতি-উদ্ধার যন্ত্রটা তৈরী করার, যেটাকে একবার বানাতে চেয়েছিল জিপসীদের সব আশ্চর্যজনক আবিস্কার গুলোকে মনে রাখবার জন্য। যন্ত্রটার ভিত্তি ছিল প্রতিদিন সকালে মানুষের জীবনে যত অভিজ্ঞতা আছে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঝালিয়ে নেওয়ার উপর, সেটাকে কল্পনা করে একটা ঘুরন্ত অভিধান হিসেবে যেটা এক অক্ষের উপর বসানো এবং যে কেউ ওটাকে হাতলের মাধ্যমে চালিয়ে অল্প কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জীবনযাত্রার প্রয়োজনীয় ব্যাপারগুলোকে ঝালিয়ে নেবে। যখন জলাশয়ের রাস্তা ধরে ঘুমের মানুষদের করুন ঘন্টা বাজিয়ে, দড়ি দিয়ে বাঁধা পেটমোটা বাক্স আর কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা গাড়ি নিয়ে উদয় হয় এক অদ্ভুতদর্শন বৃদ্ধ ততক্ষণে প্রায় চৌদ্দ হাজার তালিকা লিপিবদ্ধ হয় গেছে। সে সোজা এসে ঢোকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার বাড়ি।

দরজা খোলার সময় ভিসিতাসিয়ন চিনতে পারে না, আর অনিরাময়যোগ্য বিস্তৃতির চোরাবালিতে ডুবে যাওয়া এই গ্রামে যে কিছু বিক্রি হয় না, তা অবজ্ঞা করে ভাবে, হয়ত সে কিছু বিক্রি করতে এসেছে। লোকটা ছিল ভগ্নদশাগ্রস্ত। যদিও তার গলার স্বর অনিশ্চয়তার ফলে ভাঙা ছিল; আর হাত জিনিসপত্রের অস্তিত্বে ছিল সন্দিহান, তবুও নিশ্চিত যে, সে এসেছে সেই পৃথিবী থেকে, যেখানে মানুষ এখন ঘুমাতে পারে আর মনে রাখতে পারে।
হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ওকে পেল বৈঠক ঘরে বসা অবস্থায়, তালি দেওয়া এক কালো টুপি দিয়ে বাতাস নিচ্ছে আর মনোযোগ সহকারে অনুকম্পার দৃষ্টি দিয়ে দেয়ালে লাগানো লেখাগুলো পড়ছে। লোকটাকে পরম আন্তরিকতার সঙ্গে সম্ভাষণ জানায় এই ভয়ে যে, হয়ত অন্যসময়ে তাকে চিনত আর এখন তা মনে পড়ছে না। কিন্তু অতিথি তার এই মিথ্যা অভিনয় বুঝতে পারে। বিস্মৃতিতে হারিয়ে যাওয়া মানুষ হিসেবে নিজেকে মনে হয় তার। নিরাময়যোগ্য হৃদয় থেকে বিস্মৃতি নয়; বরঞ্চ তার থেকেও নিষ্ঠুর, অনিবার্য বিস্মৃতি, যাকে সে ভালো করেই চেনে। কারণ, সেটা হচ্ছে মরণের বিস্মৃতি। সুতরাং তা সে মেনে নিল। অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয় এমন জিনিসে ভরা বাক্সটা খুলে তা থেকে অনেকগুলো বোতল ভরা ছোট্ট একটা বাক্স বের করে সে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়াকে পান করতে দেয় এক পান্ডুর কয়ের পদার্থ আর আলোক রশ্মি ফুটে উঠেতার স্মৃতিতে। নামাঙ্কিত জিনিসপত্রে ভরা উদ্ভট বসার ঘরে নিজেকে দেখতে পাওয়ার আগে এবং দেয়ালে লেখা অর্থহীন শব্দগুলোর জন্য লজ্জা পাওয়ার আগেই, সর্বোপরি হতবুদ্ধিকর আনন্দের উজ্জ্বলতায় পাওয়া এই সদ্য আগত লোকটাকে চিনে ওঠার আগেই তার চোখ জলে ভিজে উঠে। সদ্যাগত লোকটা ছিল মেলকিয়াদেস।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0মাকন্দো যখন পুনরায় স্মৃতিজয়ের উৎসব যাপন করছে তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর মেলকিয়াদেস পুরনো বন্ধুত্ব পুনরুজ্জীবিত করে নেয়। জিপসি লোকটা গ্রামেই থেকে যাবার জন্য প্রস্তুত ছিল। সত্যিই মৃত অবস্থায় ছিল সে কিন্তু একাকিত্ব সহ্য না করতে পেরে ফিরে এসেছে। নিজের লোকদের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে জীবনের প্রতি বিশ্বস্ততার শাস্তি হিসেবে অপ্রাকৃতিক সমস্ত ক্ষমতা বর্জিত মেলকিয়াদেস স্থির করে পৃথিবীর এমন এক কোনায় আশ্রয় নিতে এখনও মৃত্যু যার সন্ধান পায়নি; আর নিজেকে উৎসর্গ করে এক দাগেরোটাইপ পরীক্ষাগারে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কখনও এই আবিষ্কারের কথা শোনেনি। কিন্তু যখন সে তাকে আর তার সমস্ত পরিবারকে এক উজ্জ্বল ধাতবপাতের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকতে দেখে তখন সে বিস্ময়ে নির্বাক, নিশ্চল হয়ে পড়ে। তখনকার দিনে মরচে-পরা ধাতবপাতে যে দাগেরোটাইপ চিত্র ধারণ করা হত। তাতে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার চুলগুলো ছিল ছাইরংয়ের এবং খাড়া খাড়া। শক্ত কাগজের কলারের শার্টটা আটকানো ছিল এক তামার বোতাম দিয়ে। আর মুখের ভাবে প্রকাশ পাচ্ছিল এক বিশাল গাম্ভীর্য যাকে উরসুলা– ‘এক ভীত সেনাপতি’ বলে ব্যাঙ্গ করে হাসতে হাসতে মরে।
সেই স্বচ্ছ পরিস্কার ডিসেম্বরের সকালে যখন দাগেরোটাইপটি ধারন করা হয়েছিল তখন সত্যি ভয় পেয়েছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কারন সে ভেবেছিল তারা প্রতিবারই একটু একটু করে ক্ষয় হয় ধাতব পাতে গিয়ে ঠাঁই নিয়ে। আশ্চর্যজনকভাবে উরসুলা তার চরিত্রের সম্পূর্ণ উল্টোটা করে এ ক্ষেত্রে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার মাথা থেকে বের করে দেয় ছবি সমন্ধে তার ভুল ধারণাকে, আর একইভাবে অতীতের তিক্ততা ভুলে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয় যে, মেলকিয়াদেস বাড়িতেই থেকে যাবে। যদিও কখনও আর দাগেরোটাইপ করতে দেয়নি। কারণ (তার নিজের ভাষায়) সে কখনও নাতিনাতনিদের হাসির পাত্র হয়ে থাকতে চায় না ছবিতে। সেই সকালে বাচ্চাদের পরাল সবচেয়ে ভালো জামাকাপড়, মুখে দিল পাউডার, খাইয়ে দিল এক চামচ মজার সিরাপ– যাতে করে প্রায় দুই মিনিট মেলকিয়াদেসের ক্যামেরার সামনে সম্পূর্ণ অনড় হয়ে থাকতে পারে। আউরেলিয়ানোকে কালো মখমলের পোশাকপরা অবস্থায় দেখা যায় শুধুমাত্র পারিবারিক দাগেরোটাইপেই; আর সেখানে সে দাঁড়িয়ে ছিল আমারান্তা আর রেবেকার মাঝখানে। ছিল সেই একই উদ্যমহীনতা, একই ভবিষ্যৎদ্রষ্টার দৃষ্টি, যেমনটি হবে অনেক বছর পর ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে।

কিন্তু তখনও সে তার ভাগ্যলিপি সমন্ধে কোনো পূর্বাভাস পায়নি। ওর কাজের সূক্ষ্মতার দরুণ সমস্ত জলাভূমির চারপাশে সে পরিগণিত হত এক দক্ষ রৌপ্যকার হিসেবে। মেলকিয়াদেসের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উন্মত্ত পরীক্ষাগারে সে এতই নিমগ্ন থাকত যে তার নিঃশ্বাসেরও শব্দ পাওয়া যেত। যখন ওর বাবা আর জিপসির মধ্যে নস্ত্রাদামুসের ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে উচ্চস্বরে তর্ক চলে, চলছে ফ্লাস্ক আর বালতির কর্কশ আওয়াজ হয়, কনুইয়ের ধাক্কায় পড়ে যাওয়া সিলভার ব্রোমাইড আর এসিডের মধ্যে পিছলে পড়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলার, তখন সে যেন আশ্রয় নিয়েছে এক অন্য জগতে। কাজের প্রতি এই আত্মনিয়োগ আর যে সুনিপুনভাবে নিজের স্বার্থকে সে পরিচালনা করত, তাতে অল্পসময়ের মধ্যেই বানিয়ে ফেলে উরসুলার মজাদার মিশ্রির জীবজন্তু বিক্রির ব্যবসার চাইতেও বেশি টাকা। তার মত একজন সৎ এবং দস্তুরমত পুরুষের যে কোন মেয়ের সঙ্গে ভাব হবে না তা ছিল এক রকম অসম্ভব। সত্যিই তার কারও সঙ্গে ভাব ছিল না।

কয়েকমাস পর ফিরে আসে বিশ্বভ্রমণকারী ব্যক্তি হুয়ান ফ্রান্সিস্কো। ফ্রান্সিস্কো এল অমব্রে, যার বয়স ছিল প্রায় ২০০ বছর; আর সে নিজের রচিত গান পরিবেশন করে যেত প্রায়ই মাকন্দোতে এসে। গানগুলোতে ফ্রানসিস্কো এল অমব্রে মানাউর থেকে জলাভূমি পর্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করত ঘটে যাওয়া সমস্ত গ্রামের ঘটনাবলি। আর কেউ যদি কাউকে কোনো বার্তা পাঠাতে চাইত অথবা কোনো ঘোষণা করার ইচ্ছে থাকত, তাহলে তাকে দুই পয়সা দিত, যাতে সে ঘটনাবলিকে তার খবরের সঙ্গে সংযুক্ত করে নেয়। এভাবেই ঘটনাচক্রে, হোসে আর্কাদিও সমন্ধে কিছু জানা যায় কি না, এই আশায় যখন উরসুলা গান শুনছিল– জানতে পারে তার মায়ের মৃত্যুসংবাদ। ওর নাম ছিল ফ্রান্সিসকো এল অমব্রে। কারণ সে তাৎক্ষনিকভাবে রচিত সংগীতের এক দ্বৈরথে শয়তানকে হারিয়ে দেয়; আর ওর সত্যিকারের নাম কেউ কখনও জানেনি। অনিদ্রা রোগের প্লেগের সময় সে গ্রাম থেকে উধাও হয়ে যায় আর কোনো আগাম সংবাদ না দিয়ে হঠাৎ করেই আবার একরাতে হাজির হয় কাতারিনোর দোকানে। কী ঘটছে পৃথিবীতে জানার জন্য গ্রামশুদ্ধ সবাই হাজির হয় সেখানে। এইবার ওর সঙ্গে আসে এক মোটা মহিলা। এতই মোটা যে চারজন আদিবাসীর দরকার হত ওকে দোলচেয়ারে বসিয়ে বহন করতে। আর এক অবহেলিত মুলাতো(সাদা ও কালোর বর্ণ শংকর) কিশোরী, যে ওকে রৌদ্র থেকে রক্ষা করত একটা ছাতা ধরে। ঐ রাতে আউনেলিয়ানো যায় কাতারিনোর দোকানে।
(চলবে)
কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৭ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৮ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mamun Khondokar — নভেম্বর ২০, ২০১৪ @ ১:৩৪ পূর্বাহ্ন

      একটু অনিয়মিত বলে খেই হারিয়ে ফেলছি। কিস্তিগুলো আর ঘন ঘন দেয়া যায় না?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anisuz Zaman — নভেম্বর ২০, ২০১৪ @ ৯:১০ অপরাহ্ন

      only artsbdnews24.com can answer this question.

      বিভাগীয় সম্পাদকের পক্ষে:

      ধারাবাহিকের ক্ষেত্রে আমরা প্রতি সপ্তাহে একবার পরবর্তী অংশ প্রকাশ প্রকাশ করে থাকি। এই নিয়ম বলবৎ ছিলো যখন হোমপেজে মাত্র একটি লেখাই প্রদর্শিত হতো । এখন যেহেতু হোমপেজে তিনটি লেখা একযোগে প্রদর্শিত হয়, অতএব উদ্বিষ্ট লেখাটি হোমপেজ থেকে সরে যা্ওয়ার সাতদিনের মাথায় প্রদর্শিত হ্ওয়ার নতুন নিয়ম ধার্য হয়েছে। আপনার প্রশ্নের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com