আমার শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী

মোস্তফা তোফায়েল | ১৬ নভেম্বর ২০১৪ ১১:৪১ অপরাহ্ন

siddiki.jpgআমার শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী। ১১ নভেম্বর ২০১৪ তারিখ রাত পৌনে বারোটায় তাঁর অবিনশ্বর আত্মা নশ্বর দেহ ফেলে রেখে স্বর্গাশ্রয়ী হয়েছে।
প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় বিশ বছর ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন। তাঁর অধ্যাপনা পেশার অধিকাংশ সময় কেটেছে সেখানে। আমি ১৯৭৪-এর শুরুতে যখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে এম.এ ইংরেজি প্রথম বর্ষে ভর্তি হই, তিনি তখন সেখান থেকে বিদায় পথের পথিক। মনে পড়ে , আমি মাত্র একটি ক্লাশে তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পেয়েছিলাম। তিনি শেক্সপিয়রের সনেট সম্পর্কে কথা বলছিলেন। ওই সময়ে তিনি শেক্সপিয়রের সনেটসমগ্র অনুবাদের কাজ করছিলেন, শুনেছিলাম। এর আগে তিনি জন মিল্টনের অ্যারিওপ্যাজিটিকা অনুবাদ করেছিলেন। তাঁরই সম্পাদিত দীপঙ্কর পত্রিকায় আমি তাঁর টেম্পেস্ট অনুবাদ পড়েছি। তাঁর ক্লাশ-বক্তৃতায় তিনি ছিলেন অসামান্য প্রভাবশালী। সরলতা ও স্নিগ্ধতায় সিক্ত ব্যক্তিত্বে তিনি ছাত্রদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন। রবীন্দ্রসাহিত্যেও তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। শুধু ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীই নয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের জুবেরি হল ও অন্যান্য ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সংস্কৃতির অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে বহুমুখী বিদ্যা ও বহুধাবিস্তৃত সাহিত্য আলোচনায় তিনি বাংলা সাহিত্যের ছাত্র-শিক্ষকসহ অপরাপর বিষয়ের ছাত্র-শিক্ষকদেরও সমীহ আদায় করার মত ঋদ্ধ ও সিদ্ধ ছিলেন।

দেহ ও আত্মা বিষয়ে হাসন রাজার ‘‘লোকে বলে, বলে রে, ঘরবাড়ি ভালা না আমার’’ অথবা লালন ফকিরের ‘‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কমনে আসে যায়’’ কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে, বনের পাখি ছিল বনে’’ ধরনের গান ও কবিতার সাথে আমাদের জানাশুনা আছে। একই বিষয় নিয়ে শেক্সপিয়রের রচিত সনেট নম্বর ১৪৬-এর অনবদ্য সুন্দর বাংলা তর্জমা করেছেন সিদ্দিকী স্যার। মন কেড়ে-নেয়া তাঁর এই তর্জমাটি উদ্ধৃত করলাম:
ওরে আত্মা, পাপে ভরা মাটির দেহের কেন্দ্রস্থলে,
তোর প্রতিপক্ষ, দেহ-সজ্জা, তোকে রেখেছে ভুলিয়ে।
কিসের অভাব, কেন শুকিয়ে মরিস তলে তলে?
কেন এ অমূল্য সজ্জা রেখেছিস প্রাচীরে ঝুলিয়ে?
পড়ন্ত এ-দালানের অল্প ক’টি দিনের ইজারা,
কেন তার জন্যে এই বেহিসেবী বৃথা অর্থ ব্যয়?
দেহের ওয়ারিশ কীট, একদিন খাবে নাকি তারা
এই প্রিয় ভোগ্য, তার এই শেষ পরিণতি নয়?
আত্মা বেঁচে থাক্ তুই দেহের ক্ষতির বিনিময়ে,
ও যতো শুকোবে, ভ’রে উঠবে তোর আপন ভাণ্ডার।
বেচে দে এ তুচ্ছ দিন, কিনে নে এ-অনন্ত সময়,
অন্দরে ঐশ্বর্য আন, ঝরে যাক্ বাহ্য অলঙ্কার।
মৃত্যু, যে মনুষ্য-ভূক, তুই সেই মৃত্যুর খাদক,
যদি একবার মরে, মৃত্যু হবে চির-পলাতক।

এই সনেটটিরই একটি সু-স্বাদু বাংলা তর্জমা করেছেন প্রফেসর সারোয়ার, তবে সিদ্দিকী স্যারের তর্জমা যেখানে পাঠকের অন্তরের সাথে কথা বলে, সেলিম সারোয়ারের তর্জমা সেখানে কথা বলে ভাষাদেহের সাথে। আমি বলতে চাই, দ্বিতীয় জন মূলের শব্দ ও ভাষার প্রতি অধিক নিষ্ঠার চর্চা করতে গিয়ে সাহিত্যের নান্দনিক আবেদন ‘‘ অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে’’-র প্রতি অনেকখানি উপেক্ষা ও অযত্নের চর্চাই করেছেন। শুধু তাই নয়
ইংরেজি সনেটের দ্বাদশ লাইন,
Within be fed, without be rich no more-এর তর্জমা সুধীন দত্ত যেখানে করেছেন,‘মিটুক মর্মের ক্ষুধা, ঘনঘটা অশ্রুতে গলুক’, এবং সিদ্দিকী স্যার করেছেন ‘অন্দরে ঐশ্বর্য আনো, ঝরে যাক্ বাহ্য অলংকার’, সেখানে সেলিম সারোয়ার করেছেন ‘‘মিটুক আত্মার ক্ষুধা, শরীরের জেল্লা আর নয়”।

বাংলা একাডেমীর ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘জেল্লা’ শব্দটিকে আরবি ব্যুৎপত্তিগত বলা হয়েছে। আরো বেশ ক’টি সনেটের তর্জমায় সেলিম সারোয়ার ‘জেল্লা’ ব্যবহার করেছেন। ইংরেজি সনেটেরই তো বাংলা তর্জমা করা হচ্ছে, তা হলে আবার অপরিচিত বিদেশি শব্দ কেন? সুধীন দত্তের তর্জমাটিতে দূরাগত অর্থ নিয়ে আসার প্রবণতা আছে, তিনি করেছেন ‘ঘনঘটা অশ্রুতে গলুক’। কিন্তু আমি শ্রেষ্ঠ বলবো সিদ্দিকী স্যারের তর্জমাটিকে।

প্রফেসর সেলিম সারোয়ার তাঁর সুদীর্ঘ ভূমিকায় সিদ্দিকী স্যার সম্পর্কে একটি অভিযোগ তুলেছেন, সেটি অভিযোগ না হয়ে অনুযোগ হলে আমার ভালো লাগতো। সিদ্দিকী স্যার একজন প্রাবন্ধিক, কবি এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি এদেশের সুধী সমাজের একজন অনুকরণযোগ্য শিক্ষকও ছিলেন। সেক্সপিয়রের সনেট অনুবাদ প্রসঙ্গে তাঁর সম্পর্কে সেলিম সারোয়ার বাঁকা তীরের ভঙ্গীতে বলেছেন, ‘‘মিল খোঁজার দায় থেকে অব্যাহতি নিতে কখনো তিনি অবলম্বন করেছেন অমিত্রাক্ষরের ধরন–যেমন সনেট ১১২, ১১৫, ১১৭।’’ অমিত্রাক্ষরের কবিতাকেও অমিত্রাক্ষর ছন্দের কবিতা হিসেবে মেনে নিয়েছেন ছন্দ-শাস্ত্রের সকল শাস্ত্রকার ও কবিকুল। মাইকেল মধুসূদন দত্ত-এর মধ্যে ধ্বনিশৈলী , ‘Sonorous quality’ প্রয়োগ করেছেন। সিদ্দিকী স্যারের তর্জমায় ১১৭ নম্বর সনেটটি অমিত্রাক্ষরে হলেও তা-তে আছে ধ্বনিসৌন্দর্য এবং অর্থের সঠিকতা। বরং বলা যায়, প্রফেসর সেলিম সারোয়ার এই ১১৭ নম্বর সনেটেরই ৫ম ও ৬ষ্ঠ লাইনের সঠিক অর্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও পা-পিছলে যাওয়ার নজির রেখেছেন। কবিতাটির দ্বিতীয় চতুষ্টকে সেলিম সারোয়ার তর্জমা করেছেন,

কাটিয়েছি দীর্ঘকাল কু-সংসর্গে বেগানা মনের,
যা ছিল তোমার প্রাপ্য উড়িয়েছি মুহূর্ত সে-সব,
বিভিন্ন বায়ুতে পাল তুলে যাত্রা করেছি যে ঢের,
নিয়েছে দূরান্তে তারা ছিন্ন করে তোমার সংশ্রব।

উদ্ধৃত এই সমিত্রাক্ষর তর্জমায় ‘কুসংসর্গে বেগানা মনের’ সঠিক তর্জমা নয়, অনূদিত কবিতাও নয় কবিতার মতো ব্যঞ্জনাময়। সিদ্দিকী স্যারের তর্জমাটির কাব্যসম্পদকে এগিয়ে রেখেই আমি উক্ত চতুষ্টকের একটি স্ব-কৃত তর্জমা উপস্থাপন করছি:

অথচ, তোমার গাঢ় ভালোবাসা ভুলে গিয়ে আমি
ঘুরেছি বেগানা সব ঘরে ঘরে টোকা মেরে মেরে।
আমার অন্তরে কেনা তোমার স্বত্বাধিকারী জমি
বিলিয়েছি যথাতথা, দিয়েছি পালের নৌকা ছেড়ে
বাতাস যেদিকে ধায়, তোমার দৃষ্টির সীমা ভেঙে
…………………………………………………..
মূল কবিতার ঐ চতুষ্টকে কিন্তু পর পর তিনটি কমা নেই;অথচ সেলিম সারোয়ার তিন পঙক্তির শেষে তিনটি কমা ব্যবহার করেছেন। ‘নিয়েছে দূরান্তে তারা ছিন্ন করে তোমার সংশ্রব’ পড়লে মনে হয় এই ছত্রটিই বরং পাঠককে কোন দূর দূরান্তে ঠেলে দিচ্ছে! মূল ইংরেজিটা এরকম:

That I have frequent been with unknown minds,
And given to time your own dear-purchased right;
That I have hoisted sail to all the winds
Which should transport me farthest from your sight.

সেক্সপিয়রের সনেটসমগ্র তর্জমা-কালে আমি দত্ত, দে, সিদ্দিকী, সারোয়ার–সবার তর্জমার সহযোগিতা নিয়েছি। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আমাকে সহযোগিতা করেছেন। ‘‘গ্রহণ করেছি যতো, ঋণী ততো করেছ আমায়’’। সবাই আমার পূর্বসূরী এবং মহাজ্ঞানী মহাজন।

অতুল প্রভাববিস্তারী, অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী ও অসামান্য প্রজ্ঞাবান শিক্ষক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী আর নেই। কিন্তু তিনি যে সাংস্কৃতিক বোধ এবং মনীষা রেখে গেলেন, তাঁর ছাত্রসমাজ , গুণগ্রাহীগণ এবং কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ভাষায় ‘যতদূর বাংলাভাষা, ততদূর বাংলাদেশ’-এর মানুষ তা স্মরণে রাখবে। শুধু শিক্ষকতাসুলভ শিক্ষা দান করে নয়, অনুবাদকসুলভ অনুবাদ দিয়ে কিংবা প্রাবন্ধিকসুলভ প্রবন্ধ রচনা করেই নয়; তাঁর মধ্যে আমরা খুঁজে পেয়েছি একটি সমগ্র আদর্শ, একটি মডেল, একটি প্রভাবক ব্যক্তিত্ব। সেটি হয়তো সহজে পূরণ হবে না। পূরণ না হোক, তিনি তো মডেল হিসেবে থেকেই গেলেন! তাঁর দেহখাঁচা ধূলিতে পড়ে থাকবে, কিন্তু তাঁর আত্মা বেঁচে থাকবে অমরত্ব নিয়ে এদেশের আলোতে বাতাসে তরঙ্গে তরঙ্গে, বাঙালির সংস্কৃতির সত্তায় সত্তায়, পরতে পরতে। আপনাকে শেষ প্রণতি, শ্রদ্ধেয় সিদ্দিকী স্যার।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাজহারউল মান্নান — নভেম্বর ১৮, ২০১৪ @ ৯:২২ অপরাহ্ন

      একটি চমৎকার ঋদ্ধ আলোচনা। একজন মহৎ শিক্ষককে খুব গভীরভাবে উপলব্ধি না করলে এমন লেখা সম্ভব নয়। অভিনন্দন মোস্তফা তোফায়েলকে। কৃতজ্ঞতা বিডি নিউজকে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Ashrafuzzaman — নভেম্বর ১৯, ২০১৪ @ ৫:৫৩ অপরাহ্ন

      প্রফেসর জেড আর সিদ্দিকীর মতো ব‌্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সাথে সাথে তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন মোস্তফা তোফায়েল। তাঁর লেখায় আবেগ আছে, কারণ সরাসরি শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এ আবেগ তৈরি হয়েছে। মোস্তফা তোফায়েলকে ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Rasel Miah — নভেম্বর ১৯, ২০১৪ @ ৭:০৩ অপরাহ্ন

      শ্রদ্ধাঞ্জলিতে শেক্সপিয়রের সনেট প্রসঙ্গ এসেছে। আমরা ছাত্র থাকা কালে জেড.আর. সিদ্দিকীর অনুবাদ পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। মোস্তফা তোফায়েল তাঁর প্রতি একই সাথে ছাত্রের শ্রদ্ধা এবং অনুবাদক হিসেবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। শেক্সপিয়রের সনেটসমগ্রের অন্যান্য খ্যাতিমান অনুবাদকগণের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এখন আমাদের কৌতূহল আরো বেড়ে গেল। আমরা সকল অনুবাদকের অনুবাদ পাশাপাশি রেখে রস নিতে পারবো। নতুনদেরও স্বাগত জানাবো। সম্প্রতি প্রয়াত মহান শিক্ষক ও সাহিত্যিক জেড.আর. সিদ্দিকীর প্রতি শ্রদ্ধা রইল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Ferdous Ahmmed — নভেম্বর ১৯, ২০১৪ @ ৭:১৬ অপরাহ্ন

      আমার খুব ভালো লেগেছে যে মোস্তফা তোফায়েল তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলিতে মরহুম অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার পাশাপাশি পূবসূরী সনেট অনুবাদকগণের প্রত্যেকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Nurunnabi Shanto — নভেম্বর ২০, ২০১৪ @ ৯:২১ পূর্বাহ্ন

      জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীকে সরাসরি শিক্ষক হিসেবে না পেলেও স্বননের (বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘজীবী আবৃত্তি সংগঠন) অনুষ্ঠানে পেয়েছি। তাঁর অনুবাদ পড়ে বরাবরই মুগ্ধ হয়েছি শিক্ষার্থী থাকতেই। মোস্তফা তোফায়েলকে ধন্যবাদ যে তাঁর শ্রদ্ধাঞ্জলিতে এই পরম জ্ঞানপিয়াসী ব্যক্তিত্বের সৃষ্টিশীলতার সামান্য হলেও মূল্যায়নে আছে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Jamal Uddin Ahmad — নভেম্বর ২০, ২০১৪ @ ৯:১২ অপরাহ্ন

      There is digression in the tribute to Z.R. Siddiqui, paid by Mostafa Tofayel. The digression concerns a vindication for Late Professor Z.R. Siddiqui and against Professor Selim Sarwar resting on the works of translation of Shakespeare’s Sonnet. Though there are lines of digression from common tributes, yet Mostafa Tofayel has causes to defend his favorite teacher ad praise him unconditionally. I observe that Mostafa Tofayel has acknowledged his debt to all the translators of Shakespeare’s Sonnets, even to Professor Selim Sarwar. He seems to be a soft-liner rather than a hard-liner. Now it is time for us to see how good he himself translates Shakespeare’s Sonnets.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mostafa Tofayel — নভেম্বর ২২, ২০১৪ @ ১১:৩০ পূর্বাহ্ন

      বন্ধুদের অনেকেই মন্তব্য করেছেন, শ্রদ্ধাঞ্জলি লিখতে গিয়ে আমি ডাইগ্রেশান করেছি। বন্ধুদের বলি, সাহিত্যে ডাইগ্রেশান চার শ বছর আগেও ছিল, এখনও আছে। সেকালে ক্রিস্টোফার মার্লো করেছেন, একালে এলিস মুনরো। তবে প্রয়াত প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এলে তাঁর সাহিত্যচর্চাও আসে; এটা ডাইগ্রেশান নয়–এক প্রসঙ্গ থেকে আরেক প্রসঙ্গে আসা ।
      শেক্সপীয়ারের ২১ নম্বর সনেটের সপ্তম ও অষ্টম লাইনের গদ্য ব্যাখ্যায় প্রফেসর সেলিম সারোয়ার লিখেছেন, ওই দু’লাইনে আছে “আকাশের তলে এই বিপুল বিশ্বের বিভিন্ন বস্তুর কথা যার সঙ্গে নকল কবিরা তাদের পিয়ার তুলনা করে।” সনেটটির ওই দুই লাইন,
      “With April’s first-form flowers and all things rare
      That heaven’s air in this huge rondure hems”

      প্রতিটি শব্দ ধরে নিয়ে সাজানো হলে দাঁড়ায়: মধুর বসন্তের প্রথম ফোটা ফুল আর অন্যান্য সব বিরল বস্তুনিচয়ের সমাহারে ঋদ্ধ বিশ্বের যে অসীম ও অতুল মনোরম রূপ, তা বায়ুমণ্ডলের গোলাকার দিগন্ত রেখা তার সীমাবদ্ধ বলয়ে ধারণ করার চেষ্টা করলেই তা সীমিত হয়ে যায় না। ৮ম লাইনের heaven, huge, hems শব্দগুলির কষ্টসাধ্য ‘হ’ ধ্বনি শেক্সপীয়ার প্রয়োগ করেছেন কথিত সকল কবিদের কষ্টকর ওই তুলনা প্রয়াসকেই ব্যঙ্গ করার জন্য। হ্যামলেট নাটকে এবং অন্য অনেক জায়গায় শেক্সপীয়ার এমনতর অনেক ধ্বনিবাচক শব্দ-অনোমেটোপিয়া উপহার দিয়েছেন। শব্দার্থের দিক থেকে heaven অর্থ বায়ুমন্ডল; huge অর্থ বৃহদাকার; rondure অর্থ গোলাকার (ফরাসি বুৎপত্তি থেকে); hems – একটি ক্রিয়াপদ, যার অর্থ ভাঁজ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে সীমিত করার প্রয়াস । বাক্যটিতে ‘বায়ুম-লের গোলাকার দিগন্ত বলয়’ কর্তৃকারক ভাঁজ করে নেওয়া ক্রিয়াপদ। সনেট নম্বর ২১ এর আলোচ্য দুই লাইনসহ চতুষ্টকটির চার লাইন যদি আলোচনায় নিয়ে আসি:
      Making a couplement of proud compare 7
      With sun and moon, with earth and sea’s rich gems; 8
      With April’s first-form flowers and all things rare 9
      That heaven’s air in this huge rondure hems. 10

      (ওরা খোঁজে উপমাকে, সুরুয ও চাঁদের বিভাসে;
      ভূলোকের , সাগরের মহামূল্য মণি ও কাঞ্চনে;
      প্রথম বসন্ত দিনে ফোটা ফুলে; অতুল আভাসে
      যেমন দিগন্ত রেখা ঘিরে দেয় অসীম অঙ্গনে।)
      এমন অনুবাদে মূলের ব্যঞ্জনা ও রিটোরিক পূর্ণতা পায় না, তবু একটু চেষ্টা করা। এই অংশটির অনুবাদে সুধীন দত্ত, জেড. আর সিদ্দিকী ও সেলিম সারোয়ার কী করেছেন, এবার তা পাশাপাশি উপস্থাপন করি:
      ধূলার ধরায় তারা কোনও কালে নয় বদ্ধমূল, ৭
      পেড়ে আপন জ্যোতিষ্কেরে, মন্থে যারা সিঞ্চু মণিময়, ৮
      অম্লান যাদের মাল্যে ফাল্গুনের আশুক্লান্ত ফুল, ৯
      বিজড়িত বাহুপ্রান্তে নীলকান্ত বায়ুর বলয়। ১০
      –সুধীন দত্ত
      উপমার গর্বে যিনি রূপবতী প্রিয়াকে মিলান ৭
      চাঁদ সুরুযের সাথে হীরাপান্না-জহরতের সাথে, ৮
      ঋতুর প্রথম ফুল, যা কিছু দুর্লভ, মূল্যবান, ৯
      দিগন্তের বলয়ে যা বন্দী আছে, আছে তা প্রিয়াতে। ১০
      –জেড. আর. সিদ্দিকী
      দিয়ে জোড়াতালি তারা সৃষ্টি করে গর্বিত রূপক ৭
      পৃথিবী সাগর চন্দ্র-সূর্য থেকে রত্লাবলী লুটে, ৮
      যা কিছু দুর্লভ, বসন্তের তাজা পুষ্প-স্তবক, ৯
      স্বর্গের যে দান পড়ে উপচে বিশ্বের করপুটে। ১০
      –সেলিম সারোয়ার
      সুধাংশুরঞ্জন ঘোষের অনুবাদ আমার কাছে নেই। প্রফেসর সেলিম সারোয়ার তাঁর তথ্যবহুল, ব্যাখ্যাপুষ্ট ও সাবলীল ভূমিকাবক্তব্যে যে দৃষ্টিকোণ থেকে প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও সুুধাংশুরঞ্জন ঘোষকে যুগলগুরুত্বে উপস্থাপন করেছেন, (“শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে এদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ”-পৃষ্ঠা-১৪; “কিন্তু সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ এবং জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর জন্য ‘সনেটের কঠিন বন্ধ’ মুক্তি নয়, ‘ক্রন্দনে’র হেতু হয়ে দাঁড়িয়েছে”:২৪)। ‘ক্রন্দন’ শব্দটি হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। আমি সে-ভাষা পছন্দ করতে পারিনি। বাংলাদেশের সাহিত্য, বাংলাসাহিত্য কোনো প্রেক্ষিতেই জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী ও সুধাংশুরঞ্জন ঘোষ একই পদবাচ্য নন। অন্য কোনো মাপকাঠিতে কিংবা শেক্ধসঢ়;পিয়ারের সনেট অনুবাদের মাপকাঠিতেও না। এই নাম দুটি একসাথে উচ্চরিত হবে, তা সাহিত্য-আলোচকমহলে কোথাও প্রত্যাশিত বা কাম্য, আমি এটা মনে করি না। আমার ছাত্রতুল্য দৃষ্টিতে জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী একজন অসাধারণ শিক্ষক, মনীষীতুল্য ব্যক্তিত্ব, পণ্ডিত-তুল্য বিদ্বান ব্যক্তি এবং একই সাথে উঁচুমানের সাহিত্যিক যা বাংলাদেশের সব ক’টি মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক পত্রিকায় প্রকাশিত বিশিষ্টজনদের প্রবন্ধ, স্মৃতিচারণে ফুটে উঠেছে। আমি তাঁর শুধুই ছাত্র ও শিষ্য, আর কিছু নই। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে পেরেই আমি নিজেকে ধন্য মনে করি। আমি আমার যে দু’একটা শেক্সপিয়ার সনেট-অনুবাদ প্রসঙ্গক্রমে নিয়ে এসেছি, তা কেবল ওই সনেটগুলোর অর্থ উদ্ধারের ছাত্রসুলভ প্রয়াস। কারণ, আমি আগামীতে যদি কখনো শেক্সপিয়ারর সনেটসমগ্রের অনুবাদ প্রকাশে ব্রতী হই, তখন নিশ্চয়ই পূর্ববর্তী অনুবাদকগণের প্রসঙ্গ আমার ভূমিকাবক্তব্যে টেনে এনে প্রবীণদের হেয় করার চেষ্টা করবো না। নিশ্চয়ই তা থেকে বিরত থাকবো।

      শেক্সপিয়ারর সনেটের ইতিবৃত্ত, এগুলোর অর্থ, সামাজিক প্রেক্ষিত, ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে সনেটের অবস্থান, বিশেষত: প্রতিটি সনেটের আক্ষরিক অর্থ উদ্ধার প্রচেষ্টায় আমি সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছি প্রফসর সেলিম সারোয়ারের ‘উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সনেট সমগ্র’ বইটি থেকে, যার প্রকাশক বাংলা একাডেমী। যখন মতৈক্যে তখন; যখন ঐক্যে নই, তখনও । কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন চতুর্দশপদী ও অষ্টাদশপদী অমিত্রাক্ষর ও মিত্রাক্ষর কবিতা। আমি কবিতার ছাত্র হিসেবে উত্তম-মধ্যম-অধম একটাও নই; তবে খুব কাঁচা। ঢাকা শহরের কবি-তালিকায় আমার নাম নেই। অনুবাদক তালিকায় বা প্রবন্ধকার তালিকায় নাম নেই। কথাসাহিত্যের চর্চাই করি না, নাম থাকবে কী করে। আমার একটাই কাজ: যাঁরা অগ্রণী ও শিক্ষাদীক্ষায় গুণী তাঁদের শ্রদ্ধা করা ও তাঁদের পরামর্শ নেয়া।
      আবারও শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রয়াত প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী স্যারের উজ্জ্বল স্মৃতির প্রতি ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Sanat Singha Goswami — নভেম্বর ২২, ২০১৪ @ ৬:৪৯ অপরাহ্ন

      Both Mr. Tofail and bdnews24 deserve thanks as they have brought before the nation a glimpse of the life of an enlightened man and his works. Since the writer had the opportunity of coming in close contact with Professor Jillur Rahaman, he had a great fascination for his learning and wisdom. We wish Mr. Tofail wrote elaborately about the dedicated teacher.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com