কাশীনাথের কবিতার ছায়াতলে

পুলক হাসান | ১৫ নভেম্বর ২০১৪ ১১:১০ অপরাহ্ন

border=0কবিতা যদি মানুষের অন্তর্গত জীবনের প্রতিচ্ছবি, তবে তা বাস্তবের প্রতিফলনে আরও সরাসরি, আরও জীবন্ত। কবি কাশীনাথ রায়ের কবিতা সে কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের। আর চোখের সামনে খুলে দেয় বিপন্ন এক বিশ্বের মনোদরজা; আর্তপীড়িত সেই বিপন্ন বাস্তবতা তাঁর কবিতায় অনুতাপজারিত এক মানবিক আর্তস্বর।
যতটুকু সুর দিলে সাধারণ কথারাও হয়ে ওঠে হৃদয়ের গান এবং সরাসরি মর্মে গিয়ে পৌঁছে, তারই নমুনা যেন খুঁজে পাওয়া যায় কাশীনাথের কবিতায়। সহজ, অলঙ্কারহীন কিন্তু লক্ষ্যভেদী এক ইঙ্গিত দিয়ে যায় নমিত উচ্চারণে, মৃদুভাষণে। বলার ভঙ্গি সেখানে যতই সহজ হোক, স্বগত সংলাপীয় চরণে চরণে যতই আকার নিক কবিতাশরীর তার মধ্যেই দেখি আত্মপোলব্ধির নানা বাঁকাচোরা দিকদিগন্ত। সেই দিগ্বলয়ের স্বপ্নচ্যুত বাস্তবতার ও থইহারা জীবনের দাগ রেখে যায় আমাদের সামনে। আমরা তখন দেখি স্বদেশ, মা-মাটি ও মানুষের বিপন্নতায় কতটা কাতর এই কবি। চেনা পৃথিবীর বদলে যাওয়া দৃশ্য এবং স্বপ্নের অপমৃত্যু দেখে তাঁর মধ্যে তৈরি হয় এক বিস্বাদ ও পিপাসার পথরেখা:
হাত বাড়ালেই তরতাজা ঘৃণা ঘিনঘিনে অবিশ্বাস কামড়ে ধরে হাতের আঙুল [ওম চাই/ জীবনানন্দ, দেখুন, পৃ. ৭]
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনাগত পিতৃভূমির উদ্দেশে যখন গাইতে যাব পুনর্জন্মের গান… দুহাত মাথায় চেপে আমি দেখলাম আমার কুড়িয়ে তোলা স্বদেশের বুক পেঁচিয়ে পরম উল্লাসে দুলছে বিষধর ব্যাধি: [হযরত নূহের নৌকা/ জীবনানন্দ, দেখুন, পৃ. ১০]

এবং গ্রহের ফেরে পিতৃমাতৃহীন যার রক্ত আমার আপনার আপনাদের সবার শিরায় মানে অসম্মানে বিনা প্রতিবাদে রাতদিন বয়ে চলে সেই বাংলাদেশ, তার চেয়ে বেশি একা কেউ আছে বলে আমি তো জানি না। অথচ অনন্ত অমাবস্যার খা-খা অন্ধকারে কজন মানুষ তার পাশে আছে আপনিই বলুন! [আপনি বলুন/ জীবনানন্দ, দেখুন, পৃ. ৪৭]
‘আমি বেদনার্ত বৃক্ষের পাশে দাঁড়াতে চাই ঝড়ের বুকে উত্যক্ত দিনের ক্ষোভ আলিঙ্গন করতে চাই’ [মতিচ্ছন্ন/ জীবনানন্দ, দেখুন, পৃ. ৪৯]

মুণ্ডহীন লাশ হয়ে আলোর উপর লুটিয়ে পড়ে ছিল যে বিধবা/ মমতা সরকার দেবোত্তর মাটিতে দুটি ফলবান বৃক্ষ দুহাতে জড়িয়ে/ ট্যাটাবিদ্ধ বুকে উপুড় হয়ে পড়েছিল যে নিকুঞ্জবিহারী/ সারাদিন মাটি কেটে অশান্ত ক্ষুধা নিয়ে ঘরে ফিরে আত্মঘাতী স্ত্রীর নীল মুখ দেখে/ চিৎকার করে নিজের গলায় ছুরি চালিয়েছিল যে আদম আলি/ আপন শরীরের মায়া বুঝে উঠবার আগেই ছিন্নভিন্ন যোনির রক্তে রাঙা হয়েছিল যে কিশোরী ফুলবানু/ তাদের সবার দগদগে লাল রং ভিজিয়ে রেখেছে আমার বিস্ফারিত মাটি। [এই লাল, সেই লাল/জীবনানন্দ, দেখুন পৃ. ১৮]
border=0
তোমার ভালোবাসায় দগ্ধ হলেও যে/মানুষ ভোলে না তোমার জন্মদিনের গান তারই বুকে, হে আমার বাংলাদেশ, তারই বুকে অপরূপ মুক্তো খুঁজি আমি। [মুক্তোর সন্ধানে/ জীবনানন্দ, দেখুন পৃ. ২০]

আর আমার চোখ? চারপাশের আধপোড়া দৃশ্য থেকে রুগ্ণ গ্রাম/পতিত গঞ্জ প্রতারিত ময়দান থেকে সরে না কিছুতেই/যতবার ঊর্ধ্বে উঠতে বলি ততবারই ফিরে আসে/এই দগ্ধ অববাহিকার দগদগে ঘায়ের দিকে।/অথচ এই মাটিও কি কোনোদিন স্বজন বলে ভুল করবে আমাকে? [এ-কূল ও-কূল/ জীবনানন্দ, দেখুন পৃ. ২৪]

ঈশ্বরের পৃথিবীতে দেখব বলেই তো জন্মেছিলাম একদিন/অসুন্দর আছে বলেই না নির্মলার মতো মেয়েরা আছে/বিষম ঘাতকেরা আছে বলেই না প্রেমেনদার মতো ছেলেরা আছে! আমি তাই চোখ মেলে বন্ধ দরোজার দিকে তাকিয়ে থাকি দুয়ার ভেঙে একদিন হঠাৎ এসে দাঁড়াবেন জ্যোতির্ময় [হে আলো হে জ্যোতির্ময়/ জীবনানন্দ, দেখুন পৃ. ৩০-৩১]
ভূগোল মেলেনি বলে পয়লা আশ্বিন কোথায় পালিয়ে গেল সে বছর! ছুরতজানের স্বামীটিও যুদ্ধে গেল! পুরনো খেয়ার মতো হায়রে বয়স! বাবুদের দোভাষী কোঠায় শেয়াল ডাকেনি, বন্ধু? রাত্রি কত? হয়তো এখন মাঠের দারুণ চোখে জমে না শিশির। [হয়তো পাখিই ওটা/আমি যাহা দিতে পারি পৃ. ৯]

পরিতৃপ্ত শকুনের চোখ মেলে তোমার বেআব্রু বুকে ডানা খুঁটছে অসংখ্য উল্লসিত নখের আঁচড় তোমার জানুদেশ রঙিন করে গোড়ালিতে নেমে গেছে অবসন্ন রক্তের প্রবাহ। জোহরা! জোহরা! [সাক্ষী আছে চন্দ্রতারা/আমি যাহা দিতে পারি পৃ. ২৩] আমরা শীতার্ত। এই গৃহবিমুখ প্রান্তরে অবরুদ্ধ পূর্বাম্বেষী আমরা জেগে থাকতে চাই। অচেনা দৃশ্যের ষড়যন্ত্র থেকে শঙ্কিত মুহূর্ত থেকে আমাদের নগ্ন দেহ বিতাড়িত আত্মাগুচ্ছ কে আড়াল করবে? আমাদের বিশ্বস্ত বল্লম হাতে নেই পিতৃতুল্য শিরস্ত্রাণ নেই ঘুমের আকাঙ্ক্ষা চেপে আমাদের বাস্তুহারা চোখ কেবলি হাতড়ে ফেরে ভরসার সামান্য উত্তাপ! [চারুবাবু ও কতিপয় বিভ্রান্ত স্থপতি/আমি যাহা দিতে পারি পৃ. ২৯] এখন খরার মেলা। দাউদাউ পণ্যে চতুর্দিক সাজালেন বসুন্ধরা: মৃতবাহু, ধূধূ চোখ, দগ্ধ দেয়া-নেয়া। এখন নদীর নাম বালিয়াড়ি, তীরে তীরে মাতাল বণিক দুর্ভিক্ষে বিলাপে শোকে পূর্ণ করে দৃষ্টিহীন খেয়া। [বাসরের জন্য/আমি যাহা দিতে পারি পৃ. ৩৫]

border=0উপর্যুক্ত পঙতিগুচ্ছে দেখা যাচ্ছে তাঁর প্রতিটি কবিতাই স্বদেশ ও জীবনমুখী বাস্তবতার এক একটি টুকরো হিরে। আর তাতে আত্মকথনের সরল বয়ানে হৃদয়বৃত্তির এক চিরন্তন উন্মুখতা আর্তি স্থায়ী হয়ে আছে। সে কারণেই তাঁর কবিতার উদ্ধৃতি টানার লোভ সামলানো কঠিন। সেখানে আমরা যেমন আঁতকে উঠি মুক্তিযুদ্ধে লাঞ্ছিত বাংলাদেশকে দেখে, তেমনি যুদ্ধোত্তর বিপরীত বাস্তবতা স্মৃতিভারাতুর করে তোলে কবিকে, তিনি তখন চাপা ক্ষোভ ও অভিমান খুলে দিতে সুর তোলেন অনুচ্চস্বরে এবং নেতি বাস্তবতায় কখনও কখনও আত্মসংকটের নালিশ জানান জীবন দেবতার প্রতি। এখানেই আমরা খুঁজে পাই রবীন্দ্র ভাবজগতে বসবাসী আত্মজারিত পরিশীলিত এক কবিকে। তবে সে জীবন অন্বেষা আমাদের এও দেখিয়ে যায় যে আমাদের মাথার উপর কোনো বীরপুরুষের ছায়া নেই, যিনি শীতার্ত হিম জীবনে বয়ে আনবেন সামান্য ভরসার উত্তাপ, ছড়িয়ে দিবেন অন্ধকার থেকে জেগে ওঠার চেতনার রং।

দুই
কাশীনাথ রায় রাজনীতি সচেতন তো বটেই, এমনকি তার মধ্যে যে সমাজতন্ত্রের আলোটাও পড়েছিল তা তাঁর কবিতায় সমাজতন্ত্রের মৃত্যু প্রসঙ্গটা ঘুরেফিরে যে এসেছে তা থেকেই আমরা অনুভব করতে পারি। তবে সব ছাড়িয়ে, তিনি যে কবিতাক্রান্ত তাঁর এই আকুতি থেকে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়: ‘কবিতার মতো এ জীবনে আর কেউ দাঁড়ায়নি পাশে।’ সেই সঙ্গে এ কথাও বলতে চাই যে, ভাব ও প্রকাশের ঐক্য ঘটলেই তা অপরূপ হয়ে ওঠে। সে-বিবেচনায় কাশীনাথ রায় আমাদের কবিতায় উপহার দিয়েছেন নতুন এক সঞ্চারণ, যা স্বগত সংলাপীয় ঢঙে আত্মবিশ্লেষণে চিন্ময় হয়ে ওঠে। মধ্যষাটে আবির্ভূত নিভৃতচারী এই কবির বেরিয়েছে মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থ। একটি ‘জীবনানন্দ, দেখুন’ (২০০৮), অন্যটি ‘আমি যাহা দিতে পারি’ (২০১১-১২)। সময়ের ব্যবধানে প্রকাশনা সংস্থা ‘ভাষাচিত্র’ ও ‘খেয়া’ থেকে এ দুটি গ্রন্থ প্রকাশিত হলেও তাঁর কবিতার মেজাজ ও ভাবনান বলয় নিয়েছে গভীর থেকে গভীরতর রূপ। আমরা তাঁর সৃষ্টির নতুন নতুন উৎসারের অপেক্ষায় আছি।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com