বইয়ের আলোচনা

খলিলের কার্টুন : জনমনের প্রতিচ্ছবি

shakil_mahmud | 8 Nov , 2014  

nazrul-1.gif২০০৮ সাল। সারাদেশে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী সবাইকে দৌড়ের উপর রেখেছে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন সরকার। ঠিক সে সময়ে খলিলের আঁকা একটি কার্টুনে দেখানো হয়েছে, সামনের সিটে চালকের আসনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমদ। পেছনে অন্য একজন গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছেন। সেনা সমর্থিত সেই সরকারের সময়ে বিভিন্ন পত্রিকার মন্তব্য প্রতিবেদনে ও টেলিভিশনের টকশোর আলোচনায়ও উঠে আসে তার কার্টুন।
অনেক সংবাদকর্মীই জানতেন যে ফখরুদ্দিনকে অন্য কেউ চালাচ্ছে, কিন্তু সে খবর প্রকাশের সাহস হয়নি অনেকের। এখানেই একজন সংবাদকর্মী ও একজন কার্টুনিস্টের মূল পার্থক্য। একজন সংবাদকর্মী সহজে যা প্রকাশ করতে পারেন না অনেকক্ষেত্রে একজন কার্টুনিস্ট তার কার্টুনের রেখায় প্রকাশ করতে পারেন।
পৃথিবীতে স্বৈরশাসকের কথা উচ্চারণ হলে সবার আগে উঠে আসে এডলফ হিটলারের কথা। আর হিটলারের অন্যতম আতঙ্ক ছিল কার্টুন। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইভিনিং স্টান্ডার্ড-এ প্রকাশিত হত ডেভিড লোর কার্টুন। যা বড্ড ভয় পেতেন হিটলার। সারা বিশ্বে এখনও রাজনীতির না বলা কথা খবরের কাগজের পাতায় তুলে আনার অনবদ্য কাজটি করেন একজন কার্টুনিস্ট।
বাংলাদেশে গত এক দশকে, কার্টুনিস্ট খলিল রহমানও ছিলেন এই প্রতিবাদী শিল্পচেতনার একজন কারিগর। রাজনীতি যেভাবে দিনদিন মানুষের মধ্যে হতাশা জাগিয়ে তুলছে। তারুণ্য আগ্রহ হারাচ্ছে রাজনীতির কাছে। এমনকি প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ায় বারবার হতাশ হতে হচ্ছে জনগণকে। রাজনৈতিক এসব দুর্বৃত্তায়নের চিত্র তখনই উঠে এসেছে দেশের জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট খলিলের তুলির আঁচড়ে। সম্প্রতি ‘নতুনপাতা’ প্রকাশ করেছে, খলিলের ৪৮টি কার্টুন নিয়ে নির্বাচিত একটি অ্যালবাম। এই সমাজ বাস্তবতার চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো বেশকিছু সংগ্রহ যেখানে ফুটে উঠেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের দুর্নীতি দমন বিষয়ে তার একটি কার্টুন এ রকম– নদীতে একটি বড় শক্তিশালী কুমির। কুমিরটি দুর্নীতি। কুমিরটির তুলনায় বেশ ছোট দুর্বল দুর্নীতি দমন কমিশন পানিতে নেমে জাল দিয়ে কুমিরের লেজ ধরছে।
বইটিতে খলিলের কার্টুনের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন দেশের খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী (রনবী), শিশির ভট্টাচার্য, বিশ্ববিখ্যাত কার্টুনিস্ট রানান লুরি, লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এডিটরিয়াল কার্টুনিস্ট মার্টিন রশন, আমেরিকার পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত এডিটরিয়াল কার্টুনিস্ট স্টেভ স্যাক ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের পলিটিক্যাল কার্টুনিস্ট হ্যারি হ্যারিসন।
nazrul-2.gif
খলিলের কার্টুন সম্পর্কে খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী (রনবী) লিখেছেন, ‘আমি তার কার্টুন দেখি এবং চমৎকৃত হই। এও জানি বর্তমানে তরুণ কার্টুনিস্ট হিসেবে তার একটি ভালো অবস্থান রয়েছে এবং ক্ষেত্রটিতে সে খুবই মনোযোগী আর নিষ্ঠাবান। ড্রইংয়ের ক্ষেত্রে নিজস্বতা আছে। বেশ সারল্য রয়েছে ভাব প্রকাশে। ব্যঙ্গ উপস্থাপনে রস সৃষ্টিতেও বুদ্ধিদীপ্ততা রয়েছে।’
খ্যাতিমান কার্টুনিস্ট শিশির ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘আমার ভালো লাগে ভালো কোনো কার্টুন দেখলে, খলিলের কার্টুন নিয়মিতই দেখা হয়। ভালো কার্টুনের সংখ্যাটাই বেশি। চারুকলায় না পড়েও ওর এই পারদর্শীতায় মুগ্ধ হই।’
স্টেভ স্যাক লিখেছেন, ÔKhalil Rahman’s cartoons are a fresh and witty visual delight. With his vibrant drawing style he expertly comments on today’s issues with cleverness and charm.’
বয়সে তারণ্যের তুর্কিবাদক দলের সাহসী এই কার্টুনিস্ট বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন, কেমন আছে বাংলাদেশ। কেমন চলছে এখানকার রাজনীতি। যে কেউ এক নজরে গত দশবছরে দেশের হালচিত্র খুঁজে পাবেন খলিল রহমানের কার্টুনে।
তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা এখনও পায়নি বাংলাদেশ, এমন চিন্তনও মানবমনে ভাবিয়ে তোলেন তিনি। গণতন্ত্র নামে দুটি পাখির বাচ্চাকে পুড়িয়ে দিচ্ছে সহিংস রাজনীতির আগুন। বাংলাদেশের সহিংস রাজনীতি সঠিক চিত্রটি উঠে এসেছে খলিলের কার্টুনে। যখন সুন্দরবন ধ্বংস করার মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ব্যস্ত সরকার। তখন কার্টুনিস্ট আঁকলেন– সুন্দরবন ধ্বংসের আশঙ্কা। সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার রাজধানী ঢাকায় চলে এসেছে। একজন বাড়িওয়ালাকে বলছে সুন্দরবনে আর থাকা যাবে না, একটু থাকতে দেবেন প্লিজ…। যুদ্ধাপরাধী জামায়াতের রাজনৈতিক দেউলিয়াপনাও আছে খলিলের কার্টুনে।
২০১৩ সালে যখন সরকার বিরোধী পক্ষ হরতাল অবরোধের মতো একের পর এক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দিচ্ছে; অন্যদিকে সরকারও তাদের কর্মসূচি ঠেকাতে উঠেপড়ে লেগেছে তখন খলিল আঁকেন, বিরোধীদল আর সরকারের নিষ্পেষণে নিষ্পেষিত জনগণের আর্তনাদ।
দেশের রাজনীতির বাইরেও আন্তর্জাতিক রথি-মহারথিদেরও কার্টুনে এনেছেন খলিল।
এ তালিকায় সাম্প্রতিক ক্রিমিয়া সংকট নিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মনোভাব কিংবা মিশরে গণতন্ত্র হরণ করে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির ক্ষমতায় চলে আসাও উঠে এসেছে খলিলের কার্টুনে।
খলিল তার নির্বাচিত কার্টুন শেষ করেছেন, তবুও এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ নামের কার্টুন দিয়ে। যেখানে দুর্যোগ, রাজনৈতিক সংকট এবং দুর্নীতির রাহুগ্রাস পেছনে ফেলে জন্মভূমির এগিয়ে চলার স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনি। সচেতন পাঠকমাত্রই খুঁজে নিতে পারেন খলিলের নির্বাচিত কার্টুন সমগ্র। রকমারি ডটকমে পাওয়া যাচ্ছে বইটি। মূল্য মাত্র ১৫০ টাকা।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.