arts.bdnews24.com » গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

আনিসুজ্জামান | ১৮ অক্টোবর ২০১৪ ৫:২৩ অপরাহ্ন

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৭
সমস্ত সত্তা দিয়ে সে চাচ্ছিল, যেন শুধুমাত্র ভেজানো নয়, দরজাটা ভালভাবে হুড়কো লাগানো থাকে যেমনটি সে কথা দিয়েছিল। কিন্তু ওটা ছিল খোলা। ওগুলোকে ধাক্কা দিল আঙ্গুলের ডগা দিয়ে আর কড়াগুলো বিশ্রীভাবে ক্যাৎরিয়ে উঠল আর তার প্রতিধ্বনি ওর অন্ত্রের মধ্যে এক হিমশীতল অনুভুতিতে ভরে দিল। আধাআধিভাবে কোন রকম শব্দ না করে যেই মুহূর্তে ঢুকল তখন থেকেই পেল সে গন্ধটা। তখনও সে ছিল সেই বসার ঘরে যেখানে মেয়েটার তিন ভাই হ্যামক ঝোলাতো যার অবস্থান আর দিক ছিল তার কাছে অজানা। অন্ধকারের মাঝে তা বোঝা ছিল অসম্ভব, সুতরাং একমাত্র উপায় ছিল ঘরটা হাতরিয়ে পার হওয়া আর শোবার ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে কোন ভুল না করে সঠিক বিছানার কাছে নিজেকে নিয়ে যাওয়া। ধাক্কা খেল সে হ্যামকের দড়িগুলোর সঙ্গে, যেগুলোর অবস্থান ছিল যেমনটি সে ভেবেছিল তার থেকেও নীচে, আর নাকডাকা এক লোক সেই মুহূর্তে স্বপ্নটাকে গুলিয়ে ফেলে এক ধরনের বিভ্রমের মাঝে বলে উঠল “ওটা ছিল বুধবার”। যখন শোবার ঘরে দরজা ধাক্কা দিল তখন মেঝের ঢেউ খেলানো তলের সঙ্গে দরজার ঘষা এড়াতে পারল না। নিকষ অন্ধকারে, হঠাৎ করেই প্রতিকারহীন এক স্মৃতিকাতরতার সঙ্গে বুঝতে পরলো যে সে পুরোপুরি দিকভ্রান্ত হয়ে পরেছে। অপরিসর সেই ঘরে ঘুমুতো ওর মা, স্বামীসহ অন্য একটি মেয়ে ও তাদের দুই শিশু ছেলেকে নিয়ে, আর সেই মেয়েটি যে হয়তো অপেক্ষা করছিল না। গন্ধটা ওকে হয়তো পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারত যদি না তা সাড়া বাড়িময় ছড়িয়ে থাকত। এমন বিভ্রান্তিকর আর একই সঙ্গে এমন ধ্রুব ছিল সেই গন্ধ যে তা লেগেছিল সবসময় নিজের সত্তার সাথে। স্থির হয়ে ছিল দীর্ঘক্ষণ, আশ্চর্য হয়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করছিল কিভাবে এসে পড়েছে সে এই বিপুল অসহয়তায়। তখনই প্রসারিত আঙুলসহ একটা হাত অন্ধকারে হাতড়ে এসে ওর মুখের সাথে ধাক্কা খেল। বিস্মিত হল না সে, কারণ তার অজান্তেই সে অপেক্ষা করছিল।

সুতরাং আস্থা রাখল হাটার উপর আর প্রচন্ড অবসাদে ভেঙেপরা হাতটাকে নিয়ে যেতে দিল এমন জায়গায় যেখানে ওর কাপড় খুলে ঝাঁকানো হোল এপাশ ওপাশ করে, সোজাভাবে আবার উল্টো করে আলুর বস্তার মত। ব্যাপারটা ঘটল এক রহস্যময় অন্ধকারে, যে অন্ধকারে হাতের কোন অভাব ছিল না, যেখানে সে আর নারীর গন্ধ নয়, বরং অ্যামনিয়ার গন্ধ পেল, যেখানে সে চেষ্টা করছিল মনে করতে মেয়েটার মুখ, কিন্তু খুঁজে পেল শুধু উরসুলার মুখ, যেখানে বিভ্রান্ত সচেতন অবস্থায় এমন কিছু করছিল যা অনেক আগে থেকেই কামনা করছিল করতে পারার, কিন্তু কখনই কল্পনা করেনি যে বাস্তবে সে তা করতে পারবে। সে যা করছিল তা না জেনেই করছিল, কারণ জানত না কোথায় রয়েছে তার পা, মাথা অথবা কার পা বা কার মাথা। টের পাচ্ছিল আর বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারবে না বৃক্ক আর অন্ত্রের বাতাসের হিমশীতল ফিসফিসানি আর ভয়। ইচ্ছে করছিল দিকগ্বিদিক চিন্তা না করে পালাতে আর একই সাথে সবসময়ের জন্য থেকে যেতে সেই নীরব উত্তেজনায়, সেই ভয়ংকর নিঃসঙ্গতায়।

ওর নাম ছিল পিলার তেরনেরা, মাকন্দো পওনের সময়ে গ্রামত্যাগীদের একজন।

ওর পরিবারের লোকজন ওকে জোর করে নিয়ে আসে সেই লোকটার কাছ থেকে যে ওকে চৌদ্দ বৎসর বয়সে ধর্ষণ করেছিল আর তাকে ভালবেসেছিল বাইশ বছর বয়স পর্যন্ত, কিন্তু কখনই জনসমক্ষে তা প্রকাশ করেনি, কারণ লোকটা ছিল অচেনা। লোকটা প্রতিজ্ঞা করেছিল যে দুনিয়ার শেষ পর্যন্ত হলেও অনুসরণ করবে ওকে, তবে তখনই নয়, আরও পরে যখন সবকিছু গোছগাছ করতে পারবে। তাসগুলোর প্রতিজ্ঞা অনুযায়ী স্থলপথ বা জলপথে, তিন দিন, তিন মাস বা তিন বছরব্যাপী অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে লম্বা, বেটে, তামাটে ও শ্যামলা রংয়ের সমস্ত পুরুষদের মধ্যেই মেয়েটা দেখতে পেত লোকটাকে। অপেক্ষায় থেকে থেকে সে হারিয়ে ফেলেছে উরু আর স্তনের দৃঢ়তা, মনের কোমলতা কিন্তু হৃদয়ের উন্মত্ততা অটুট ছিল পুরোপুরি। সেই আশ্চর্য খেলনায় উন্মত্ত হয়ে হোসে আর্কাদিও খুঁজে বেড়াল ওর মুখ প্রতি রাতে ঘরগুলোর গোলক ধাঁধায়। এক বিশেষ মুহূর্তে সে দরজটা বন্ধ অবস্থায় পেল, বার বার টোকা দিতে লাগলো এটা জেনে যে একবার সাহসী হয়ে প্রথমবার টোকা দিলে শেষ পর্যন্ত তাকে দিয়ে যেতে হবে। কিছু সময় অপেক্ষার পর মেয়েটা দরজা খুলে দিল। দিনেরবেলা ঘুমকাতুরে বিধ্বস্ত সে উপভোগ করত গতরাতের স্মৃতিগুলো। কিন্তু উচ্ছ্বল, উদাসীন ও প্রগলভ মেয়েটা যখন ঘরে ঢুকত সে তখন নিজের উদ্বেগ আড়াল করার কোনো চেষ্টাই করত না, কারণ যে নারীর অট্টহাস্যে কবুতরগুলো ভয়ে শিউরে উঠতো, অদৃশ্য শক্তি নিয়ে তার কিছুই করার ছিল না। এই অদৃশ্য শক্তি ছিল এমনই এক জিনিস যা ভেতর দিকে নিঃশ্বাস নিতে আর হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি নিয়ন্ত্রণ করতে শেখাত, আর বুঝতে শিখিয়েছিল মানুষ কেন মরণকে ভয় পায়। সে এতে এতই মগ্ন ছিল যে ওর বাবা আর ভাইরা যখন সমস্ত বাধা ভেদ করে ধাতব পাত্রের থেকে উরসুলার সোনা পৃথক করার সাফল্যে সাড়া বারি জুড়ে আনন্দের ঝড় তুলে দেয় সেই আনন্দের কারণও সে বুঝতে পারে না।

আসলে প্রচন্ড জটিলতা আর ক্রমাগত চেষ্টার ফলেই সফল হয়েছিল ওরা। আনন্দিত হয়েছিল উরসুলা, এমনকি আলকেমি সৃষ্টির কারনে সে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিয়েছিল। অন্যদিকে গ্রামের লোকজন পরীক্ষাগারটাকে পিষে ফেলছিল, ওদেরকে তারা খেতে দিল বিস্কুটের সঙ্গে পেয়ারার তৈরী মিষ্টি আশ্চর্যজনক এই ব্যাপারটা উদযাপন করতে। আর হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া দেখাচ্ছিল সোনাসহ গলানোর পাত্রটাকে, যেন সে এইমাত্র ওটা আবিস্কার করেছে।

এভাবে দেখাতে দেখাতে সে শেষে বড় ছেলের সামনে আসে যে কিনা শেষের দিকে খুব কম সময়ই পরীক্ষাগারে উঁকি দিত। শুকানো, হলদে, আঠালো পদার্থটাকে তার সামনে রেখে প্রশ্ন করে, “এটা দেখে কি মনে হয়” হোসে আর্কাদিও আন্তরিকতার সঙ্গেই জবাব দেয়, “কুত্তার গু”।

ওর বাবা হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে ওর মুখে কষে এমনভাবে একটা চড় মারল যে রক্ত আর চোখে পানি চলে আসে ওর। সেই রাতে পিলার তেরনেরা অন্ধকারে হাৎড়ে বোতল আর তুলো খুঁজে ফুলো জায়গায় আর্নিকা লাগিয়ে দেয় আর ও যাতে বিরক্ত না হয় এমনভাবে তাকে ভালবাসে একটুও ব্যাথা না দিয়ে। ওরা মিলনে এমন অবস্থায় পৌঁছায় মুহূর্তের মধ্যে নিজেদের অজান্তেই ফিস্ফিস্ করে কথা বলতে শুরু করে–

“কেবল তোর সঙ্গে থাকতে চাই” -সে বলে, “শিঘ্রই একদিন পৃথিবীর সবাইকে জানিয়ে দেব আর শেষ হবে এই লুকোচুরির”।

ওকে শান্ত করার চেষ্টা করে না-
“ভালই হবে”- বলে পিলার-“যদি আমরা এক সঙ্গে থাকি, তাহলে ভাল করে দেখার জন্য বাতি জ্বালিয়ে রাখব আর আমি যত খুশী শিৎকার করতে পারব, কেউ তাতে বাগড়া দিতে আসবে না আর তুই আমার কানে কানে বললি দুনিয়ার যত যৌন-খিস্তি। এই আলাপচারিতা বাপের বিরুদ্ধে হুলফোটানো তিক্ততা, অত্যাসন্ন লাগামহীন মিলনের সম্ভাবনা ওকে এনে দেয় এক দুঃসাহসী অনুপ্রেরণা। হঠাৎ করেই কোন প্রস্তুতি না নিয়েই ওর ভাইকে সে সব বলে দিল।

প্রথম দিকে ছোট্ট আউরেলিয়ানো বুঝতে পারত ব্যাপারটার ঝুঁকি আর ভাইর এই দুঃসাহসিক কাজে বিপদের সমূহ সম্ভাবনার কথা, কিন্তু বুঝে উঠতে পারত না ব্যাপারটার সম্মোহনী শক্তি। একটু একটু করে ওকেও কলুষিত করে উদ্বেগ। ভাইকে বাধ্য করত অভিযানের খুঁটিনাটি বর্ণনা করতে, নিজেকে একাত্ম করে ফেলত ভোগান্তি আর ভোগানন্দের সঙ্গে, অনুভব করত ভয় আর সুখ। জেগে থেকে অপেক্ষা করত সকাল হওয়া পর্যন্ত। নিঃসঙ্গ বিছানা যেন ছিল জ্বলন্ত অঙ্গারে মোড়া মাদুর। দুজনে কথা বলে যেত বিছানা ছেড়ে ওঠা পর্যন্ত আর ফলে শীঘ্রই দুজনকেই পেয়ে বসে নিদ্রাহীনতায়। অনুভব করে আলকেমী আর বাবার প্রজ্ঞার উপর একইরকম অনীহা, আর আশ্রয় নেয় নিঃসঙ্গতার। “এই ছেলেগুলো নির্জীব হয়ে পড়েছে” বলে উরসুলা- “সম্ভবত কৃমি হয়েছে”। ওদের জন্য বানায় পাইকো গাছ পিষে এক অরুচিকর তরল ঔষধ। দুজনেই তা পান করে অপ্রত্যাশিত সহিষ্ণুতা নিয়ে। আর দুজনেই একই সঙ্গে যার যার মলত্যাগের পাত্রে বসে একই দিনে এগার বার আর বের করে দেয় এক ধরনের গোলাপী রংয়ের কৃমি আর প্রচন্ড আনন্দের সঙ্গে তা দেখায় সবাইকে। এই ব্যাপারটাই উরসুলাকে ওদের অমোনযোগী আর সবকিছুতে অনীহার মূল কারণ নির্ধারণে বিভ্রান্ত করতে সাহায্য করে।

আউরেলিয়ানো শুধুমাত্র বুঝতে পারত তাই-ই নয়, যেন ভাইয়ের অভিজ্ঞতাগুলো ছিল ওর নিজেরই জীবনের অংশ। কারণ এক সময় যখন ভালবাসার বিবরণ দিয়ে যাচ্ছিল পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে তখন সে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিরকম লাগে”? হোসে আর্কাদিও ততক্ষনাৎ উত্তর দিল “এটা হচ্ছে ভূমিকম্পের মত”।

জানুয়ারির এক বৃহস্পতিবার, ভোর দুটোর সময় জন্মালো আমারান্তা। কেউ ঘড়ে ঢোকার আগেই উরসুলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করল ওকে। বাচ্চাটা ছিল খুবই হাল্কা আর গিরগিটির মত স্বচ্ছ; কিন্তু তার সমস্ত অঙ্গগুলো ছিল মানুষের। যতক্ষণ পর্যন্ত না মানুষজনে ঘর ভরে গিয়েছে, আউরেলিয়ানো নতুই এই খবরটা টেরই পায়নি। সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়ে বিশৃঙ্খলার সুযোগে সে ভাইকে খুঁজতে বেরুল, যে নাকি এগারটা থেকেই বিছানায় নেই। খুঁজতে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা এতটাই ঝোঁকের বশে সে নিয়েছে যে পিলার তেরনেরার শোবার ঘড় থেকে ভাইকে কিভাবে বের করে আনবে এ নিয়ে নিজেকে সে কোনো প্রশ্নই করার সময় পায়নি। সংকেতপূর্ণ শীষ দিয়ে কয়েক ঘন্টা ধরে বাড়ি চক্কর দিল; শেষ পর্যন্ত ভোরের আগমনী ইঙ্গিত ওকে বাড়ি ফিরতে বাধ্য করল। মায়ের ঘরে নবজাতিকা বোনের সঙ্গে এক নিস্পাপ মুখে খেলারত অবস্থায় পেল হোসে আর্কাদিওকে।

উরসুলা কেবলমাত্র চল্লিশ দিনের বিশ্রাম নেয়া শেষ করেছে এমন সময় ফিরে এল জিপসীরা। ওরা একই দরাবাজ আর ভেল্কীবাজ যারা বরফ নিয়ে এসেছিল। মেলকিয়াদেসের দল থেকে এরা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, কারণ অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝিয়ে দিল যে ওরা প্রগতির অগ্রদূত নয়, বরং আনন্দের ফেরিওয়ালা। এমনকি যখন তারা বরফ নিয়ে এসেছিল তখনও বলেনি মানুষের জীবনে ওটা কিভাবে কাজে লাগে, বরং দেখিয়েছে সার্কাসের এক দুর্লভ বস্তু হিসেবে। এবার অনেকগুলো যন্ত্র কৌশলের মধ্যে নিয়ে এসেছিল এক উড়ন্ত গালিচা। কিন্তু সেটাকে যানবাহনের এক নতুন উদ্ভাবন হিসেবে না দেখিয়ে, দেখিয়েছিল এক চিত্তবিনোদনের বস্তু হিসেবে। লোকজন, অবশ্যই মাটি খুড়ে বের করে আনল ওদের শেষ স্বর্ণের অংশটুকু, গ্রামের ঘড়গুলোর উপর দিয়ে এক ঝলক উড়ে আসার জন্য। সমস্ত বিশৃঙ্খলার একত্রিকরণের মধ্যে হোসে আর্কাদিও আর পিলার পেল ঘন্টার পর ঘন্টা মুক্তির আনন্দ। ভীড়ের মধ্যে দুই প্রেমিক প্রেমিকা সুখী, ওদের এমনও মনে হল, প্রেম হচ্ছে, শুধুমাত্র রাতের গোপন ক্ষণিক মিলনের চাইতেও অনেক সনাতন, গভীর আর সীমাহীন সুখের ব্যাপার। এ অবস্থায় ওর মোহ ভেঙে দেয় পিলার। যে রকম উৎসাহের সঙ্গে হোসে আর্কাদিও ওর সঙ্গ উপভোগ করছিল, স্থান কাল ভুলে এক ধাক্কায় সারা পৃথিবীটাকে ওর উপর ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এখন তুই সত্যিকার পুরুষ”। যেহেতু সে বুঝতে পারছিল না পিলার কি বলতে চাচ্ছে, তাই ওকে বর্ণনা করল অক্ষরে অক্ষরে, “তোর ছেলে হতে যাচ্ছে”।
কয়েকদিন বাড়ি থেকে বেরুতে সাহস পেল না হোসে আর্কাদিও। রান্নাঘর থেকে আসা পিলারের উত্তেজনাময় অট্টহাসি শোনাই হোসে আর্কাদিওর পক্ষে যথেষ্ট ছিল দৌড়ে পরীক্ষাগারে আশ্রয় নেয়ার জন্য, যে পরীক্ষাগারে আলকেমির কার্যকলাপগুলো পুনরুজ্জীবিত হয়েছে উরসুলার কৃপায়। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া হারিয়ে যাওয়া ছেলেকে বরণ করে নেয় আনন্দের সাথে। অবশেষে ইতিমধ্যে শুরু করা পরশ পাথরের সন্ধানে আবারও লেগে গেল। এক বিকেলে ছেলেরা উৎসাহিত হল পরীক্ষাগারের জানালার সমান উচ্চতায় জিপসী চালককে নিয়ে উড়ন্ত গালিচার দ্রুত উড়ে যাওয়ায় আর গ্রামের কিছু ছেলে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানায় তাকে, কিন্তু হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া চোখ তুলে দেখলোও না। “ওদেরকে স্বপ্ন দেখতে দাও” বলল সে, “ ওদের তুচ্ছ উড়ন্ত বিছানার চেয়ে আমরা অনেক বেশি ভালো উড়ব আরও বেশি বৈজ্ঞানিক উপাদানের সাহায্যে। তার লোক দেখানো আগ্রহ সত্তেও হোসে আর্কাদিও কখনই পরশ পাথরের ক্ষমতার কথা বুঝতে পারল না, ওর কাছে মনে হয়েছিল খারাপভাবে বানানো একটা বোতল মাত্র। দুশ্চিন্তা থেকে ও মুক্তি পায়নি। ক্ষিধে আর ঘুম হারিয়ে ফেলে, অভিযানে ব্যর্থ হওয়ার পর ওর বাবার যেমন অবস্থা হত, তেমনি বশীভূত হল সে বদমেজাজের কাছে, তার বিভ্রান্তি এমন অবস্থায় পৌঁছুল যে স্বয়ং হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া তাকে পরীক্ষাগারের কর্তব্য থেকে রেহাই দেয় এই মনে করে যে সে পরীক্ষাগারের কাজটা খুব গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। অবশ্যই আউরেলিয়ানো বুঝতে পারল যে ভাইয়ের মানসিক যন্ত্রণার সাথে পরশ পাথর খোঁজার কোন সম্পর্কই নাই। কিন্তু সে তার ভাইয়ের আস্থা অর্জন করতে পারছিল না। হোসে আর্কাদিও হারিয়ে ফেলেছে আগের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা। সহযোগী আর আলাপপ্রিয় অবস্থা থেকে সে পরিবর্তিত হয়েছে বৈরী ভাবাপন্ন আর আত্মমুখী ব্যক্তিতে। একাকীত্বের উদ্বেগ আর পৃথিবীর সকলের বিরুদ্ধে মারাত্মক তিক্ততার কামড়ে, এক রাতে অভ্যাসমত বিছানা ত্যাগ করে সে, কিন্তু পিলার তেরনেরা-র বাড়িতে যায় না, যায় মেলার ভিরের মধ্যে হারিয়ে যেতে। সব ধরনে কুশলী যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ঘোরাফেরার পর, একটির প্রতিও আকৃষ্ট না হয়ে, ওর চোখ পড়ল এমন কিছুর উপর যা কোনো প্রদর্শনীর অন্তর্গত ছিলো না: পুঁতির মালার ভারে নুয়ে-পরা কম বয়সী এক জিপসী যুবতী; হোসে আর্কাদিওর কাছে সারা জীবনে দেখা সব থেকে সুন্দরী মেয়ে। মেয়েটা ভীড়ের মধ্যে অন্যদের সঙ্গে দেখছিল বাপমায়ের অবাধ্যতার ফলে মানুষের সাপে পরিণত হওয়ার এক করুণ প্রদর্শনী।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

হোসে আর্কাদিও ওদিকে মনযোগ দিল না। যে সময়ে সর্প-মানবকে করুণ জেরা করা হচ্ছিল, তখন ভীর ঠেলে জায়গা করে সে চলে এসে দাঁড়ায় জিপসী মেয়েটার পিছনে, প্রথম সাড়িতে। মেয়েটার পিঠে সে চাপ দেয় শরীর দিয়ে। মেয়েটা সরে যেতে চেষ্টা করে কিন্তু হোসে আর্কাদিও আরও শক্তি দিয়ে চাপ দেয় ওর পিছন দিকে। তখনই মেয়েটা অনুভব্ করে ওর পুরুষত্ব। যা ঘটছে তা বিশ্বাস করতে না পেরে, বিস্ময় আর ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্থির দাড়িয়ে থাকে মেয়েটা ওর সঙ্গে। সবশেষে মাথা ঘুড়িয়ে ভীরু হাসি নিয়ে ওর দিকে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে দুই জিপসী সর্প-মানবকে খাঁচায় ঢুকিয়ে নিয়ে গেল তাঁবুর ভিতরে। যে জিপসী প্রদর্শনী পরিচালনা করছিল সে ঘোষণা করল, “এবং এখন, ভদ্র মহিলা ও মহোদয়গণ, আপনাদের দেখাব সেই মেয়েকে যার যা দেখা উচিৎ নয় তা দেখে ফেলার শাস্তিস্বরূপ গলা কাটা হবে প্রতি রাতে এই সময় যা দেড়শ বসর ধরে চলে আসছে।

হোসে আর্কাদিও আর মেয়েটা গলা কাটার খেলা দেখল না। চলে গেল মেয়েটার তাবুতে, যেখানে ওরা কাপড় খুলতে খুলতে চুমো খাচ্ছিল এক ব্যাকুল উন্মত্ততা নিয়ে। উপরে পড়া অন্তর্বাস, অনেক পড়তের কাপড় দিয়ে বানানো মাড় দেয়া ঘাগড়া, তার দিয়ে বানানো নিস্ফল নিতম্ব বন্ধনী, পুতীর বোঝা, সব খুলে ফেলার পর মেয়েটা পরিবর্তিত হয় অদৃশ্যে। পা দুটো এতই চিকন যে হোসে আর্কাদিওর বাহুও তার থেকে পুরু, আর সদ্য ওঠা বুক নিয়ে সে যেন এক দুর্বল ব্যাঙ্গাচী, চিকন দুটো পা, যা হোসে আর্কাদিওর বাহুর সঙ্গেও সে পেরে উঠবে না, কিন্তু তার দৃঢ়তা আর তীব্র কামনা পুষিয়ে দেয় তার ভঙ্গুর শরীরকে। কিন্তু হোসে আর্কাদিও ঠিক মত সাড়া দিতে পারছিল না কারণ তাঁবুটাও ছিল এক রকম বারোয়ারী তাঁবু, যেখান দিয়ে জিপ্সীরা যাতায়াত করে ওদের সার্কাসের জিনিশপত্র নিয়ে, সমাধান করে বিভিন্ন সমস্যার, এমনকি বিছানার পাশে দাড়িয়ে বিরতি নিচ্ছিল একদান ছক্কা খেলার জন্য। বাতিটা ঝোলানো ছিল মাঝের খুঁটিটায় আর তাতে আলোকিত ছিল পুরো বস্তি। আদরের এক বিরতির পর, কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া নগ্ন হয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায় আর মেয়েটা চেষ্টা করছে ওকে সাহস দেবার। অপূর্ব শরীরের অধিকারী এক জিপসী যুবতী একটু পরেই তাঁবুতে ঢোকে তার সঙ্গীকে নিয়ে যারা ঐ থিয়েটারের দলের অংশ ছিল না, এমনকি গ্রামেরও কেউ নয়। আর উভয়ই বিছানার সামনে উপভোগে রত হয়। পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই যুবতী হোসে আর্কাদিওর দিকে তাকায় আর এক ধরণের করুন আবেগতপ্ত দৃষ্টি নিয়ে ওর রাজকীয় জন্তুটাকে বিশ্রমরত অবস্থায় দেখতে পায়। “এই ছেলে” বিস্মিত হয়ে বলে, “খোদা যেন ওটাকে এভাবেই সংরক্ষণ করে।” হোসে আর্কাদিওর সঙ্গিনী ওদের শান্তিতে থাকতে দিতে বলে, ফলে ওরা বিছানার খুব কাছেই মেঝেতে শুয়ে পড়ে। অন্যদের রতিক্রিয়া হোসে আর্কাদিওকে জাগিয়ে তোলে। প্রথম মিলনের ধাক্কায়, মেয়েটার হাড়গুলো যেন দোমিনো গুটির মত মড় মড় করে খুলে পড়ে, তার চামড়া থেকে ঝরে পড়ে পাণ্ডুর ঘাম, চোখ ওঠে জ্বলে, সমস্ত শরীর থেকে বের হয় এক নিরানন্দ অনুশোচনা আর আবছা কাদার গন্ধ। কিন্তু ধাক্কাটা সহ্য করে নেয় দৃঢ়তা আর প্রসংশনীয় সাহসের সঙ্গে। হোসে আর্কাদিও অনুভব করে সে অকস্মাৎ উঠে গেছে এক স্বর্গীয় অনুপ্রেরনার স্তরে যেখানে তার বিধ্বস্ত হৃদয়াবেগ বেরিয়ে আসছে আদরে আর কুৎসিত যৌনালাপের মাধ্যমে আর তা মেয়েটার কান দিয়ে প্রবেশ করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে তার নিজস্ব ভাষায়। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। মাথায় এক লাল কাপড় বেধে হোসে আর্কাদিও চলে যায় জিপসীদের সাথে।

যখন উরসুলা টের পেল তার অনুপস্থিতি, গ্রামময় তাকে খুঁজে বেড়াল। জিপসীদের ভেঙ্গে দেয়া ছাউনির জায়গায় সদ্য নিভিয়ে ফেলা চুল্লির ধোয়া, ছাঁই আর যত্রসত্র ছড়িয়ে থাকা বর্জ্য পদার্থ ছাড়া কিছুই ছিল না। কেউ একজন আবর্জনার মধ্যে পুতির দানাই খুঁজে বেড়াচ্ছিল, বলল উরসুরাকে যে গত রাতে সে থিয়েটারের ভীড়ের মধ্যে তার ছেলেকে দেখেছে, সর্প-মানবের খাঁচা-বওয়া গাড়ি ঠেলছে। “ও জিপসীর দলে ভীড়েছে” উরসুলা চিৎকার করল স্বামীর উদ্দেশ্যে যে কিনা ওর উধাও হওয়ায় বিন্দু মাত্র উদ্বিগ্ন ছিল না।
“সত্যিই যেন তাই হয়” বলল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া হাজার বার গুড়ো করা, গরম করে আবারও গুড়ো করতে করতে “এভাবেই সে পুরুষ হতে শিখবে।”
উরসুলা জিজ্ঞেস করল জিপসীরা কোন দিক দিয়ে গিয়েছে। বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞেস করে পথ ধরে এগুতে লাগল এই বিশ্বাসে যে এখনও সময় আছে তাদের নাগাল পাওয়ার। গ্রাম থেকে সরে যেতে লাগল আরও দূরে, যখন বুঝতে পারল সে এতই দূরে চলে এসেছে যে আর ফিরে যাওয়ার চিন্তা করল না। হোসে আর্কাদিও বুয়োন্দিয়া তার স্ত্রীর অভাব অনুভব করে না রাত আটটা পর্যন্ত যখন সে গুঁড়া করা জিনিসগুলোকে আবার গরম করতে দিয়েছে এক পরত ঘসির আগুনে আর দেখতে গিয়েছে কি হয়েছে ছোট্ট আমারান্তার যে কাঁদতে কাঁদতে গলা ভেঙ্গে ফেলেছে। অল্প কয়েক ঘন্টার মধ্যে সে জড় করল কিছু লোককে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রসহ, আমারান্তাকে দিল এক মহিলার হাতে কারণ সে আমারান্তাকে বুকের দুধ খায়ানোর প্রস্তাব করেছিল, আর সে উধাও হল উরসুলার খোঁজে অদৃশ্য পথ ধরে। আউরেলিয়ানো ওদের সঙ্গ নিল। প্রত্যুষে কিছু আদিবাসী জেলে যাদের ভাষা ছিল তাদের অজানা ওরা আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল যে কাউকে এদিক দিয়ে তারা যেতে দেখেনি। তিন দিনের বৃথা খোঁজাখুজির পর গ্রামে ফিরে যায় ওরা।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ হতাশায় ভেঙে পড়ে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া। সে ছোট আমারান্তার মায়ের স্থান দখল করে। ওকে গোসল করাত আর তার কাপড় বদলাত, তাকে নিয়ে যেত দিনে চারবার বুকের দুধ খাওয়াতে, এমনকি রাতে এমন সব গান শোনাত যেসব গান উরসুলে কখনই গাইতে জানেনি। একেক সময় পিলার তেরনেরা উরসুলা ফিরে আসা পর্যন্ত বাড়ির কাজ করে দিতে ইচ্ছা প্রকাশ করে। আউরেলিয়ানো, যার রহস্যময় স্বজ্ঞা এই দুর্ভাগ্যের কারণে আরও প্রখর হয়ে উঠছে, সে পিলাবকে ঢুকতে দেখে এক দিব্যদৃষ্টি অনুভব করল। সুতরাং বুঝল কোনো এক ব্যাখ্যাতীত কারণে ওর ভাইয়ের পালানো অার পরবর্তীতে মায়ের অদৃশ্য হ্ওয়ার জন্য এই মেয়েটাই দায়ী। আর ওকে এক নিঃশব্দ, নির্দয়তার সাথে এমনভাবে অপমান করে যে সে আর কখনই ঐ বাড়িতে ঢোকে না।
সময় সবকিছুই ঠিক করে দেয়। হোসে আর্কাদিও আর তার ছেলে বুঝতে পারল না কখন তারা পরীক্ষাগারে ধুলো ঝারছে, গরম পানির সাইফনে আগুন জ্বালিয়ে, ঘসির চুল্লির পরতের উপর কয়েক মাস ধরে শুয়ে থাকা বস্তুটাকে বশে আনার কাজে ধৈর্য সহকারে লেগে পড়েছে। এমনকি আমারান্তা ডালে ঝোলানো ঝুড়িতে শুয়ে আগ্রহ সহকারে পর্যবেক্ষণ করে বাবা আর তার ভাইয়ের ছোট্ট ঘরে পারদের বাষ্পে ভরে থাকা বাতাসে একাগ্রচিত্তে করা কাজ। একবার উরসুলা চলে যাবার অনেক মাস পর, অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে শুরু করল। একটা খালি পাত্র অনেক দিন ধরে বিস্মৃত অবস্থায় আলমারিতে রাখা ছিল, সেটা এতই ভারী হয়েছিল যে সেটাকে নড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়ল। টেবিলে রাখা এক পানিভর্তী কড়াই আধঘন্টা ধরে ফুটল কোন আগুন ছাড়াই যতক্ষণ না তার সব পানি বাস্প হয়ে উড়ে গেল। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আর ওর ছেলে ওই সব আজব ঘটনাগুলো এক ধরণের ভয় পাওয়া আনন্দের সাথে পর্যবেক্ষণ করত, কিন্তু ঘটনার কারণ ব্যাখ্যা না করতে পেরে মনে করে এগুলো হচ্ছে ঐ পদার্থেরই (পরশ পাথর) ঘোষণা। একদিন আমারান্তাসহ ঝুড়িটা নিজস্ব শক্তিতে নড়তে শুরু করে আর সম্পূর্ণ এক পাক খায় ঘরের মধ্যে আউরেলিয়ানকে হতবুদ্ধি করে দিয়ে। আউরেলিয়ান দ্রুত থামাতে যায়, কিন্তু ওর বাবা বিচলিত হয় না। ঝুড়িটাকে জায়গামত রেখে টেবিলের এক পায়ের সঙ্গে বেঁধে রাখে এই বিশ্বাসে যে প্রত্যাশিত ঘটনাটা অত্যাসন্ন। এক দিন আউরেলিয়ানো ওকে বলতে শোনে, “যদি খোদাকে ভয় নাও কর, ভয় কর ধাতব পদার্থগুলোকে।”
উধাও হবার প্রায় পাঁচ মাস পর ফিরে আসে উরসুলা। ফিরে আসে উল্লসিত পূর্ণযৌবনপ্রাপ্ত, গ্রামের অপরিচিত ধরণের নতুন জামাকাপড় পরে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া কোনো রকমে ঘটনাটার ধাক্কা সহ্য করে নেয়। “এটাই তাহলে আসল ব্যাপার,” চিৎকার করছিল, “আমি জানতাম যে এটাই ঘটতে যাচ্ছে।” আর সত্যিই তা বিশ্বাস করত কারণ তার দীর্ঘ সময়ের বন্দীদশায় জিনিষটাকে রূপান্তরের সময় সে সমস্ত হৃদয় দিয়ে গভীরভাবে চাচ্ছিল যে অলৌকিক ব্যাপারটা যেন পরশ পাথর আবিস্কার অথবা সমস্ত ধাতব পদার্থের জ্যান্ত হয়ে ওঠা সেই ফুঁয়ের আবিস্কার বা বাইরের তালা আর কক্ষগুলোকে সোনায় পরিণত করার ক্ষমতা না হয়ে যেন হয় উরসুলার ফিরে আসা। কিন্তু উরসুলা এই আনন্দে অংশ গ্রহণ করে না। যেন এক ঘন্টার বেশি অনুপস্থিত থাকেনি, এমন সাধারণ একটা চুমু খেয়ে বলল– “দরজার পাশে এস”। যখন রাস্তায় বেরুল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া হতভম্ভভাবটা কাটতে ওর দীর্ঘ সময় লাগল আর দেখতে পেল ভীরটা। ওরা জিপসী ছিল না। ছিল ওদের মতই পুরুষ ও মহিলা, সোজা চুল, প্রগাঢ় চামড়া একই ভাষায় কথা বলে আর একই রকম সাধারণ দুঃখ বেদনা নিয়ে অনুতাপ করে।

খচ্চরের পিঠভর্তী খাদ্যদ্রব্য, বলদের গাড়ি বোঝাই আসবাবপত্র আর ঘরোয়া তৈজসপত্র, চুরুট আর ফেরিওয়ালাদের হাক ডাক ছাড়া বিক্রির জন্য দৈনন্দিন জীবনের জিনিষপত্র নিয়ে এসেছে তারা। মাত্র দুই দিনের ভ্রমনে জলাভূমির ওপর থেকে এসেছে ওরা যেখানকার গ্রামগুলোতে প্রতি মাসেই চিঠিপত্র আসে। ভাল থাকার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির সঙ্গে তারা পরিচিত। উরসুলা জিপসীদের নাগাল পায়নি, কিন্তু পেয়েছিল সেই রাস্তা যা তার স্বামী বড় বড় হতাশাপূর্ণ অভিযানের দ্বারা খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়।
(চলবে)
কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৫ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৬ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন bithi — অক্টোবর ২৭, ২০১৪ @ ১২:৩২ পূর্বাহ্ন

      পড়ে বরাবরের মত ভালই লাগল। কিস্তি গুলির আকৃতি ও প্রকাশের দিন দূরত্ব বোধহয় আবেদন একটু কমিয়ে দিয়েছে। তবুও ধন্যবাদ বিডিনিউজ কে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com