সাক্ষাৎকার

আবদুল মতিনের সাক্ষাৎকার: নিজেদের শিকড় ভুলে গেলে সে জাতির দুর্ভাগ্য বড়ই শোচনীয়

poliar_wahid | 13 Oct , 2014  

abdul-matin.jpgসদ্যপ্রয়াত আবদুল মতিন ভাষা সংগ্রামী এক জীবন্তকিংবদন্তীর নাম। তিনি ১৯২৬ সালের ৩ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার একটি ছোট্ট গ্রাম ধুবালীয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম আব্দুল জলিল। মায়ের নাম আমেনা খাতুন। আবদুল মতিন ছিলেন পরিবারের প্রথম সন্তান। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে জীবনবাজী রেখে রাজপথে মিছিল-মিটিং, লড়াই-সংগ্রাম করেছেন অকুতভয় এই ভাষা সৈনিক। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা এবং এই ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে প্রতিটি সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন আবদুল মতিনসহ তৎকালীন ছাত্রনেতারা। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে কয়েক দফায় বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা হয় তার সঙ্গে। কথা বলেছেন পলিয়ার ওয়াহিদ। বি.স.

পলিয়ার : ‘Urdu and Urdu shall be state language of Pakistan’ এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রথম সরাসরি ‘No, no’ বলে ওঠা সাহসী পুরুষটি আপনি। প্রথমে আপনার সেদিনের কথা শুনতে চাই?
ভাষাসৈনিক
: ১৯৪৮ সালে ২৪ মার্চ সমাবর্তন সভায় পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্নাহ সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশনের বক্তৃতায় যখন বলেন– ‘Urdu and Urdu shall be state language of Pakistan’ তখন আমি সাথে সাথে `No, no’ বলে প্রতিবাদ জানাই। এবং আমার সাথে সাথে অন্যান্য ছাত্ররা`No, no’ বলে চিৎকার করে ওঠে। এবং দাঁড়িয়ে স্লোগান শুরু করি আমরা। সবাই এবার একত্রে স্লোগান শুরু করি। তখন পরিস্থিতি খারাপ দেখে জিন্নাহ সাহেব তাড়াতাড়ি বক্তৃতা শেষ করে সিকিউরিটি নিয়ে দ্রুত প্রস্থান করেন। এরপর হট্টগোলের মধ্যে মিশে আমি হল থেকে বের হলাম। আমার বন্ধুরা কেউ কেউ বাহবা দিতে শুরু করে। অনেকে আমাকে বলে তুই তো বিপদে পড়বি। এসব ব্যাপারে তোর মাথা ঘামাতে হবে না। এগুলো রাষ্ট্রীয় ব্যাপার। তোর এতো কিসের জ্বালা? তবে এ কাজটা করে আমি কি যে আন্দদিত হয়েছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। এ কাজ আমার জীবনের এক অমূল্য সম্পদ তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমি নিজেও নিজেকে ধন্য মনি করি যে আমি তো এই সাহসী কাজটা শুরু করেছিলাম। এর তিন মাস পরে জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর খাজা নাজিমুদ্দিন, লিয়াকত আলী খানসহ আরো অনেকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

পলিয়ার : ১৯৪৮ সালে নাকি বাংলাকে রাষ্টভাষা করার বিরোধিতা করে একটা গোষ্টী? তারা কারা?
ভাষাসৈনিক :
বাংলাকে পাকিস্তানের ভাষা করার আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঢাকায় শাসক গোষ্টীর প্রচারণায় আদিবাসীদের একটা ক্ষুদ্র নগণ্য অংশ বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার বিরোধিতা করেছিলো। এছাড়া আর কোনো বিরোধিতার খবর আমাদের কানে আসেনি।

পলিয়ার : আপনাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’র আহবায়ক করা হয়। সে সময়ে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন?
ভাষাসৈনিক :
হঠাৎ করেই আমাকে ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’র আহবায়ক করা হলো। এতোবড় গুরুদায়িত্ব আমি কিভাবে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়া পরিচালনা করি? একজন আহবায়ককে কিভাবে কমিটি পরিচালনা করতে হয় তাও আমি জানি না। কমিটি সদস্যদের বৈঠকে উপস্থিত করার জন্যে আমি একজন অভিজ্ঞ কর্মীর পরামর্শ চাইলাম। তিনি বললেন, কমিটি সদস্যদের বৈঠাকে ডাকার জন্যে একটি নোটিস বই করুন। সেই নোট বইয়ে কোন কোন তারিখে কোন কোন স্থানে বৈঠক হবে তার আলোচনা থাকবে। এভাবে ১৯৫০ সালে আমি দুটো সভার নোটিশ দিলাম। অর্থসংগ্রহ কার্যক্রম, প্রেস বিজ্ঞপ্তি, যারা বৈঠকে আসবে না তাদের বহিস্কার করা এসব বিষয়। পঞ্চম বৈঠকে শুধু আমি এবং অন্য কাউকে না পেয়ে নতুন ৮ জনকে নিয়ে ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটির সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো ৫ এপ্রিল ১৯৫১ সালে ‘পতাকা দিবস ’ পালন করা হবে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ মার্চ পর্যন্ত বড় বড় নেতা ভাষা অন্দোলন প্রসঙ্গে আঙ্গুলটা পর্যন্ত উত্তলন করেনি, মিছিল মিটিং তো দূরের কথা। আমরা ছাত্ররা মিলেই গণসংযোগের মাধ্যমে টাকা পয়সা সংগ্রহ করতাম। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমার তা করেছি। এভাবে পুনরায় ভাষা আন্দোলন বিকাশিত হতে থাকে। তারপর আবার গণঅর্থ সংগ্রহ করে আমরা ছোট ছোট পতাকা তৈরি করে তাতে লিখি রাষ্টভাষা বাংলা চাই।

পলিয়ার : ‘বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম কমিটি’র সাথে আর কারা কারা জড়িত ছিলেন?
ভাষাসৈনিক :
নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্টভাষা কর্মপরিষদের প্রথম বৈঠক হয় ১৩ মার্চ ১৯৫১ সালে। মাকসুদ আহমদের সভাপতিত্বে এ বৈঠাকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত থাকেন হাবিবুর রহমান শেলী, আমি, বদিউর রহমান, মোশারফ হোসেন, আবদুল ওয়াদুদ, নূরুল আলম, ও তাজউদ্দীন আহমদ। এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম কমিটির আহবায়ক হিসেবে আমার স্বাক্ষরিত স্মারকলিপি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছে ও সংবাদপত্রে পাঠানো হয়। পরে আরো অনেকে এর সাথে জড়িত হয়: সালেহউদ্দিন, রুহুল আমীন চৌধুরী।

পলিয়ার : আপনি কতো সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হন? কোন অপরাধে আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়?
ভাষাসৈনিক :
১৯৪৫ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ পাস কোর্সে ভতি হই। ইতিহাস, রাষ্টবিজ্ঞান ও অর্থনীতি এই তিনটি বিষয়ের শিক্ষকরা প্রত্যেকেই নাম করা পন্ডিত ছিলেন। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সিঁড়ির পাশে পাঁচ নাম্বার রুমে থাকতাম। ১৯৪৮ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে মাস্টার্সে ভতি হই। তৎকালীন সরকার আমাকে সিএসপি বানিয়ে ভাষা আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। আমি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে পাঁচ নাম্বার ওয়ার্ডে থাকতাম। সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক নেতা থাকতেন। হঠাৎ জেলারের মাধ্যমে আমাকে পুলিশ অফিসার একটা কাগজ দেখালেন। তাতে লেখা ছিল– ‘আই শ্যাল সার্ভ এ্যানি গভর্নমেন্ট দ্যাট কামস টু পাওয়ার মোস্ট অবিডিয়েন্টলি অ্যান্ড সাবসার্ভিয়েন্টলি।’ কখনো আর কোনো আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে পারবো না এই মর্মে একটা স্বাক্ষর দিতে হবে। আমি তাতে সই করিনি। আবার জেলার অফিসার এসে বললেন– এখনো সময় আছে ভালভাবে চিন্তা করে দেখেন। প্রস্তাবে রাজি হলে বাড়ি গাড়ি পেতাম। আমি কিন্তু সেই প্রস্তাবে সাড়া দিইনি। তখন অফিসার বললেন– আপনার মতো নির্লোভ মানুষ দেখিনি। ব্যক্তিগত জীবনে আমি এসব বিষয়ে কোনো তোয়াক্কা করিনি। এ ঘটনার দুমাস পরে আমি জেল থেকে মুক্তি পাই। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন। তিনি মুসলিম লীগের অনুসারী ছিলেন। তিনি আমাকে তার অফিসে ডেকে নিলেন এবং অশালীন অশোভন আচরণ করে বললেন এখানে পড়তে হলে তোমাকে বন্ড সই করতে হবে। আমি বললাম আমার কোনো অপরাধ নেই আমি কেন বন্ড সই করবো। তিনি আমাকে তিন বছরের জন্যে বহিস্কার করেন ও হল ছাড়ার নির্দেশ দেন।

পলিয়ার : এরপর আপনি কোথায় থাকেন? এবং কিভাবে চলেন একটু বললে খুশি হবো?
ভাষাসৈনিক :
আপাতত ইকবাল হল-এ উঠলাম। তখন ইকবাল হল ছিল বাশের তৈরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেখানে ভাড়া দিয়ে থাকতে পারতো। যদিও সব সময় দুঃচিন্তার মধ্যে কাটাতে হতো। টিউশনি শুরু করি। ড. কামাল হোসেনের এক মামা আমার বন্ধু ছিলো। তার নাম সৈয়দ আলী কবীর। পরে সে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়। ও আমাকে টিউশনি জোগার করে দেয়। কামাল হোসেনের পরীক্ষা মাত্র তিন মাস বাকী থাকতে পড়াই। পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে। আমি তাকে পড়াতাম। তখন প্রতিমাসে টিউশনী করে চল্লিশ টাকা ইনকাম করতাম।

পলিয়ার : পাকিস্তান হবার পর রাষ্টভাষা আন্দোলনই সর্বপ্রথম এক গণঅভ্যূত্থান। এই গণঅভ্যূত্থানের সাথে আপনার সম্পর্কই ছিল অগ্রগণ্য। শুনতে চাই সেসব দিনের কিছু কথা?
ভাষাসৈনিক :
১৯৫২ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত হবার পর এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিকালে কর্মপরিষদের উদ্যোগে এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিনের মিছিলটি ছিল বিশাল। সভা শেষে প্রায় পাঁচ হাজার ছাত্রছাত্রী এক সুদীর্ঘ মিছিল বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে করতে সদরঘাট থেকে চকবাজার হয়ে সারা শহর প্রদক্ষিণ করে। সাধারণ মানুষ সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয় এবং পুষ্পাজ্ঞালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানায়।

পলিয়ার : ১৯৫২ সালে ২০ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে যে মতামত দিয়েছিলেন সে সম্পর্কে জানতে চাই?
ভাষাসৈনিক :
২০ ফেব্রুয়ারি এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারলে রাষ্টভাষা বাংলা করার আন্দোলন মুখ থুবড়ে পড়তো। ‘সর্বদলীয় রাষ্টভাষা সংগ্রাম পরিষদের’র ১১ জন মত প্রকাশ করেছিলেন সরকার আরোপিত ১৪৪ ধারা মেনে নিয়ে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করা। আর তার বিপরীতে মাত্র ৪জন অলি আহাদ, গোলাম মাওলা, শামসুল আলম, এবং আমি আবদুল মতিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে মত দিই।

পলিয়ার : ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিজ্ঞতা জানতে চাই?
ভাষাসৈনিক :
২১ ফেব্রুয়ারি এক অভ্যূত্থান হলো। আমি সেদিন বক্তৃতা দিয়েছিলাম–আজ ১৪৪ ধারা ভাঙা না হলে ভাষা অন্দোলন তো বটেই, ভবিষ্যতে কোন আন্দোলই ১৪৪ ধারা ভেঙে এগিয়ে নেয়া যাবে না। বিক্ষুব্ধ দীর্ঘ পথ পার হয়ে আন্দোলন বর্তমান পর্যায়ে এসে পৌছেছে। এখন পিছিয়ে আসার কোনো উপায় নেই। আমি সমবেত ছাত্রদের কাছে প্রশ্ন করি আমরা কি তাহলে ১৪৪ ধারার ভয়ে পিছিয়ে যাবো? জবাবে সবাই সমস্বরে উত্তেজিত কন্ঠে উচ্চারণ করে ‘না, না।’ তখন আমি বললাম ‘দশজন করে করে এক লাইনে দাঁড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’ তবে এ ভাবনা শুধু আমার একার ছিল না। মোহাম্মদ তোয়াহ ও আবদুস সামাদ আজাদসহ একত্রে মিলে নিয়েছিলাম। ছাত্র-জনতার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারে? ভাষা আন্দোলন এক নতুন মাত্রা পেল। কিন্তু পুলিশ গুলি চালালে আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন, আবদুল জব্বার শহীদ হন। এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়।

পলিয়ার : ভাসানী আপনার প্রিয় নেতা, তার সম্পর্কে কিছু বলবেন?
ভাষাসৈনিক :
ভাসানীর মতো নেতা এখন আর কোথায় পাবে? সে তো যুগে যুগে দু’একজন আসে পৃথিবীতে। এমন মাটির মানুষ আর চোখে দেখলাম না। সারাটা জীবন যেন মাটির মতোই থেকে গেল। কোনো স্বার্থ তাকে স্পর্শ করতে পারিনি। এমন মানুষ কোথায় পাবে? বড় দরকার ছিল এমন মানুষের। বঙ্গবন্ধুও তাকে চিনতে পারলো না। এ দেশের বামরাজনীতির পুরোধা এই ব্যক্তি আমাদের দিয়েছেন মুক্তির মন্ত্রণা আর পথ চলার সাহস।

পলিয়ার : মোট কতবার আপনাকে গ্রেফতার করা হয়? এবং জীবনের কতবছর আপনাকে জেল খাটতে হয়েছে?
ভাষাসৈনিক :
পাঁচবার আমাকে গ্রেফতার করে জেলে ঢুকানো হয়েছে। প্রথমবার গ্রেফতার করে ১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিম্নবেতনভূক্ত কর্মচারিগণ ধর্মঘট করে সেখানে আমি তাদের সমর্থনে পিকেটিং করেছিলাম। পুলিশ সচিবালয়ের গেটে থেকে ধরে দু’মাসের ডিটেনশন দেয়। দ্বিতীয়বার ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে শান্তিনগর কমিটির মিটিং ডাকা হয়। ‘সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’ পুনরুজ্জীবিত করার সিন্ধান্ত গৃহিত হয়। ২৮ ফেব্রয়ারি ১৯৫২ সালে আমার নামসহ বহু নেতার নামে গ্রেফতারি পরয়ানা জারি করে। আটক হয় আবুল হাশিম, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, খন্দকার মোশতাক আহমদ, আবদুল রশীদ তর্কবাগীশ, ওসমান আলী, মাদার বক্স, মুনীর চৌধুরী, অজিত কুমার গুহ, মুজাফফার আহমদ চৌধুরী, পুলিন দে, ড. পিসি চক্রবর্তী, ডা. আজমত আলী, খয়রাত হোসেন, গোবিন্দ লাল মুখার্জি, মির্জা গোলাম হাফিজ, মোহাম্মদ তোয়াহ, আজিজ আহম্মদ, অলি আহাদ, এসএ বারী এটি, খালেদ নেওয়াজ, শওকত আলী, হাশিমুদ্দিন আহমদ, ফজলুল করিম, অনোয়ারুল হক, সাদেক খান, লতিফ চৌধুরী, হেদায়েত হোসেন চৌধুরী, মজিবুল হক, হাসান পারভেজ আরো অনেকে। সেবার ১ বছর সাত দিন জেলে থেকে ১৪ মার্চ ১৯৫৩ সালে মুক্তিলাভ করি। তৃতীয় বার গ্রেফতার হই ঈশ্বরদীতে আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা অবস্থায়। সেবার সরকার আমাকে ধরিয়ে দিতে পাঁচ হাজার টাকা ঘোষণা করে। চতুর্থবার ধরা পড়ি ৫ জুন ১৯৭২ সালে নাটোর থেকে। ১৯৭৭ সালে মুক্তি পেয়ে আবার রাজনীতিতে সক্রিয় হই। তারপর আবার শেষবার ধরা পড়ি এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালে। সবমিলে পাঁচবার গ্রেফতার হয়ে প্রায় দশ বছর জেল খেটেছি।

পলিয়ার : যে বাড়িতে আসেন এটা কি আপনার নিজের বাড়ি?
ভাষাসৈনিক :
না, এটা আমার না। ভাড়া বাড়ি। আমার কোনো বাড়ি নেই। নিজের বাড়ি কোথায় পাবো? আমার কি এতো টাকা আছে যে ঢাকা শহরে বাড়ি থাকবে?

পলিয়ার : শুনেছি সরকার নাকি আপনাকে পুরান ঢাকায় একটা বাড়ি দিয়েছেন। তাহলে এখনো এই ভাড়া বাড়িতে থাকেন কেন?
ভাষাসৈনিক :
আমি তো আমার আদর্শ থেকে একচুলও নড়তে পারবো না। সরকার আমাকে বাড়ি দিয়েছে ঠিক কিন্তু সেটা নাকি কারা দখল করে আছে, তাদেরকে হটিয়ে সেখানে আমাকে উঠতে হবে। কী তামাশার ব্যাপার। সেখানে লোক পাঠানো হয়েছিল, এক হিন্দু বয়স্ক মহিলা রান্নাঘর থেকে বটি বের করে বলেছে– ‘কারা এসেছে আমার বাড়ি দখল করতে? আসুক না আমার সামনে খুন করে ফেলব সবগুলোকে।’ ভয়ে বেচারা চলে এসে নিজের জীবন বাঁচিয়েছে আর কি। সেই মহিলার তিনকূলে কেউ নেই।( ভাষাসৈনিকের স্ত্রী মনিকা বলেন ওগুলো আর বলো না বাবা। সব দল তাকে ডেকেছে। কোন দলের হয়ে ছাফাই গাইতে পারিনি বলে তারা আর তাকে দেখেনি। শেখ মুজিব – জিয়া সবাই এসেছে তার কাছে। সেখানে গিয়ে শেখ মুজিব আর মেজর জিয়ার গুনগান গাইতে হবে আর কি। এসব আর ভালো লাগে না। গাইতে পারলে মতিন সব পেতো, গায়নি বলে পেল না কিছুই। )

পলিয়ার : বায়ান্নতে আপনার বয়স ২৫ বছর। আর বাঙলি ও বাঙলা ভাষার ইতিহাসে সবচেয়ে সাহসী ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ছিল এই ৫২’র ভাষা আন্দেলন। কথা হচ্ছে একুশে পদক পেয়েছেন ২০০২ সালে। কারণ জানতে পারি?
ভাষাসৈনিক :
কারণ কি করে জানবো? কারণ তো তোমরা দেশের মানুষ জানো। দেখো কমরেড, আমি কারও দালালী করতে পারিনি কখনো। সেখানেই যত মুশকিল। হয়তো সেজন্যে এতো বছর পরে এটা পেলাম।ে তাও তো বিদেশ থেকে একটি সংগঠন জোর দাবি তুলেছিল যে এতো বছর পরেও কেন ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনকে একুশে পদক দেয়া হচ্ছে না। তখন হাসিনা সরকার ক্ষমতায় ছিল কিন্তু পরে এসে খালেদা সরকার একুশে পদক দেয়। বোধ হয় চাপে পড়ে এটা করেছে। যাই হোক ও সব কথা থাক। পদকের জন্যে তো আর এসব জীবনবাজি রেখে করিনি। করেছি মাতৃভাষা আর মাতৃভূমির ভালবাসায়। এগুলো আমার নৈতিক দায়িত্ব ছিল। আমার দায়িত্ব আমি পালন করেছি এখন তোমাদের দায়িত্ব তোমরা কি করবা সেটা তোমারাই জানো। দেশপ্রেম একটা আলাদা জিনিস, এটা থেকে কেউ বের হতে পারে না। কিন্তু কে কতটুকু করতে পারে এটাই আসল কথা।

পলিয়ার : ছবিতে দেখেছি আপনি চীন ও আমেরিকা ঘুরে এসেছেন। কিভাবে গেলেন সেখানে? বিদেশ ঘুরতে এতো টাকা কোথায় পেলেন?
ভাষাসৈনিক :
১৯৮২ সালে আমি চীনা কমিউনিষ্ট পার্টির আমন্ত্রণে চীন সফরে যাই। চীনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ঘুরে দেখি। সেখানে আমার হার্টের চিকিৎসা করানো হয়। তারপর ২০০০ সালে প্রবাসী বাঙালিদের আমন্ত্রণে আমেরিকায় যাই। সেখানে প্রবাসীরা মিলে ‘ঐতিহাসিক মাতৃভাষা দিবস’ পালন করেন। সেখানে আমি চার মাস থেকেছি। আমেরিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থান ঘুরে দেখি। এবং প্রবাসী বাঙলীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি।

পলিয়ার : আপনি ভাষা অন্দোলন ছাড়াও কৃষক অন্দোলন, বাম অন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সে সম্পর্কে কিছু বলবেন?
ভাষাসৈনিক :
১৯৭৭ সালে জেল থেকে বের হয়ে আমি চারু মজুমদারের দল ত্যাগ করে কৃষকদের নিয়ে ‘চাষী মুক্তি সমিতি’ গঠন করি। পরে ‘চাষী মুক্তি সমিতি’, ‘কৃষক ফেডারেশন’, ও ‘কৃষক সংগ্রাম সমিতি’ ঐক্যবদ্ধ হয়। পাবনা জেলার বেড়া থানার প্রায় বিশ হাজার কৃষকের উপস্থিতিতে ‘জাতীয় কৃষক সমিতি’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। তার সভাপতি ছিলাম আমি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিমল বিশ্বাস।

পলিয়ার : আপনি সারাটা জীবন এই আন্দোলন সংগ্রামের পিছনে জীবনটা ব্যয় করলেন। জীবন সম্পর্কে আপনার অনুভূতি কী?
ভাষাসৈনিক :
জীবন এক বিচিত্র রঙয়ের বাহার। সাদা কালো নীল যেমন আমাদের মনের পর্দায় উঁকি মারে ঠিক তেমনি দুঃখ কষ্ট সুখ সবকিছু মিলেই তো জীবন। কষ্টের মাত্রা যার জীবনে যত বেশি সে তত বেশি খাঁটি মানুষ হতে পারে। জীবন মানে অভিজ্ঞতা। যার জীবনে অভিজ্ঞতা থাকে না সে জীবনের মানেই জানে না। সাতার না জানা বালকের জীবন তো আর গুলতি নিয়ে পাখি মারা বালকের জীবন এক রকম হতে পারে না। এটাই যেমন বিস্তর ফারকা, ঠিক জীবনও ততটাই ফারাক। মূলত দুঃখই মানুষকে মানুষ হতে সাহায্য করে। আর সুখতো নিজস্ব ব্যাপার। নিজের মনেই তৈরি করে নিতে হয় সুখ। এই যে ভালবাসা, আমি কি কোনো কালে ভেবেছি এতো বুড়ো বয়সে আমি তোমার মতো তরুণের মুখোমুখি বসে জীবনের গল্প বলবো। আমার খুব ভাল লাগছে। এটাই তো সুখ। কেউ আসে না। বন্ধুরা সবাই তো চলে গেছে। যারা আছে তারা চলতে পারে না। আর সারাজীবনে যে মানুষের ভালোবাসা পেয়েছি তা তো দশজীবনে শোধ করতে পারব না। আসলে আমাদের সকলকে ভালোবাসা উচিত। না শত্রু না মিত্র। মানুষের জন্যে সংগ্রাম কার উচিত। যেন আমরা তাদের মুখে হাসি ফুটাতে পারি। তাহলে নিজে সুখি হওয়া যাবে। যারা নিজের সুখের জন্য ছুটে বেড়ায় তাদের কি প্রকৃত সুখ আছে, গিয়ে দেখ? সুখ তাদের লুট হয়েছে আগেই। অন্যকে সুখী করার মধ্যেই আছে নিজের সুখ। আর এসব সুখ ভাষায় প্রকাশ সম্ভব না।

পলিয়ার : আচ্ছা আপনার স্ত্রী গুলবদন নেছা মনিকার সাথে বিয়ে হবার গল্প শুনতে চাই।
ভাষাসৈনিক :
(দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি, তারপর বলা শুরু করলেন। ভাষাসৈনিকের চোখে জল ছলছল করছে।) আমি তখন পার্টি করি। সারারাত সারাদিন শুধু পার্টি করে বেড়াই। আমার বয়স তখন চল্লিশ। আর মনিকার বয়স বিশ। একদিন আমার পার্টির লোকেরা ধরলো মতিন ভাই আপনাকে বিয়ে করতে হবে। আমি তো সংসারী মানুষ না। সারা জীবন যে বাহিরে বাহিরে কাটিয়ে দিল ভেতর কি তাকে টানে? আমি বললাম তাহলে মেয়েটা কে? আমি তার সাথে কথা বলতে চাই। ওরা বললো কথা অবশ্যই বলা যাবে। তারা বললো আমাদের পার্টির মেয়ে নাম মনিকা। ঠিক আছে আমার সাথে দেখা করতে বলো। মনিকা এলো আমার সাথে দেখা করতে। তাকে বললাম দেখো, আমি পার্টি করি, সংসার দেখা ছেলেমেয়ে মানুষ করাসহ যাবতীয় ঝামেলা তোমাকে পোহাতে হবে। আমি এদিকে মাথা ঘামাতে পারবো না। মনিকা শুনে বললো– এসব আমি কিছু জানি না, আমার বড় ভাই আছে সে যদি অনুমতি দেয় আমার কোনো আপত্তি নেই। আমি আর কোনো কথা বললাম না। খানিক রাগ হলো। আমি যাকে বিয়ে করব সে বলে ভাইয়ের কথা। তার মানে সে আমাকে পছন্দ করে না। যাই হোক এভাবে আমাদের বিয়ে হলো। বিয়ের আগে আমাদের পরিচয় বা কোনো সম্পর্ক ছিল না। (মনিকা বলেন– আমি তাকে মাঝে মাঝে দেখতাম, কথা হতো না। তিনি তো তখন সিনিয়র লিডার। নাম শুনতাম ভাষা সৈনিক। এটুকুই।)

পলিয়ার : বিপ্লবীরা নাকি ভালো প্রেমিকও হন। আপনি কি কখনো কারো প্রেমে পড়েছেন? কিংবা আপনার প্রেমে কেউ?
ভাষাসৈনিক :
(মুখে সরল হাসির রেখা বুলিয়ে) একবার একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়ে। শেষ পর্যন্ত সম্পর্ক হয়নি। কারণ আমি আসলে ঘর সংসার করতে চাইনি। আমি সারা জীবনে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত সময় পার করেছি। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কম মেয়েই লেখাপড়া করতো। তার ভিতর থেকে একজন আমাকে পছন্দ করতো। সে আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় ছিল। তার সাথে মাঝে মাঝে দেখা হতো।

পলিয়ার : তার নামটা শুনতে পারি?
ভাষাসৈনিক :
তার নাম আমার নামের প্রথম অক্ষর দিয়ে শুরু। মালেকা। বিএ ক্লাসের ছাত্রী ছিল। প্রায় দু’তিন বছর আমার পিছনে লেগে ছিল। প্রেম-ট্রেম নিয়ে আবার ভাবার সময় কোথায়?

পলিয়ার : ২১ ফেব্রুয়ারি হলো ৮ই ফাল্গুন কিন্তু সেটা ভাষার জন্যে হলেও ইরেজিতে কেন আমারা এখনো ২১ ফেব্রুয়ারি হিসেবে পালন করি? এটা কি স্ববিরোধিতা নয়?
ভাসাসৈনিক :
হ্যাঁ, এটা তো অবশ্যই স্ববিরোধিতা। এটা নিয়ে অনেক বলা হলো, কিছুতেই কিছু হলো। দেখ, শাসক শ্রেণি দেশপ্রেমিক না হলে এমনই অবস্থা হয়। কারো কোনো দায়বোধ নেই। কারো কোনো জবাবদিহিতা নেই। যে যার মতো করে চালিয়ে নিচ্ছে নিজের স্বার্থের চাকা। এভাবে কি একটা দেশ চলতে পারে? কি আর করার! আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে। একদিন ঠিকই এই জাতির খেসারাত গুনতে হবে। নামমাত্র মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নিয়ে চলছে ব্যবসা। কাজের কাজ হয়নি কিছুই। বিনা চিকিৎিসায় মরে যাচ্ছে মানুষ। অনাহারে দিন কাটাচ্ছে অসংখ্য চোখ। সেখানে স্বাধীনতার সার্থকতা কোথায়? স্বাধীনতা হলো মানুষের মৌলিক চাহিদার যোগান দেয়অ আর অর্থনৈতিক মুক্তি দেয়অ।

পলিয়ার : এখনো বাংলাদেশে সর্বপর্যায়ে বাংলাভাষা চালু হয়নি। আপনার অভিমন কি?
ভাষাসৈনিক :
সেটাতো আগের প্রশ্নের সাথে জড়িত। ভাষার জন্যে লড়াই হলো, জীবন গেল, রক্ত গেল, অথচ তার মূল বিষয়টাই রাজনীতিবিদরা এড়িয়ে চলেন। ভাষাশহীদের স্মৃতি নিয়ে কোনো ধরণের উন্নতি লক্ষ্য করা যায়নি। তাদের নামে যে যাদুঘর আছে তা একেবারে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। তাদের বাবা মাকে রাষ্ট্র যেভাবে দেখার কথা সে দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার।

পলিয়ার : কমরেড আবদুল মতিন আর ভাষাসৈনিক আবদুল মতিনের মধ্যে পার্থক্য কি?
ভাষাসৈনিক :
এটা তো তুমি এখন পার্থক্য করতে পারো। আমার কাছে যারা এসেছে তারাই এর পার্থক্য করতে পারবে। আমি নিজেকে কিভাবে পার্থক্য করবো। তবে কমরেড আবদুল মতিন এখনো মনেপ্রাণে একজন কর্মীমাত্র। আর ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন মাতৃভাষার প্রেমে গর্জে ওঠা সংগ্রামী এক তরুণ। নিজের ভাষার জন্য যে জীবন বাজি ধরে আন্দোলন করে গেছে।

পলিয়ার : বর্তমান রাজনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবার উপায় কি বলে আপনার মনে হয়?
ভাষাসৈনিক :
আন্দোলন সংগ্রাম ছাড়া কোনো জাতির ভাগ্য বদল হয় না। আমরা আন্দোলন সংগ্রাম ভুলে যাচ্ছি। যে যেভাবে ইচ্ছা আমাদের শোষণ করছে। নিজেদের স্বার্থের ভয়ে আমরা পথে নামি না। নেতারা দেশপ্রেমিক না হলে এ গুলো আমাদের সাফার করতে হবে। সৎসাহসী মানুষের বড় অভাব সমাজে।

পলিয়ার : আপনার প্রিয় একটি বাক্য বলুন?
ভাষাসৈনিক :
এ সমাজে যেন মানুষের কোন মূল্য নেই। অনেকের কাছে মানুষ যেন মূল্যহীন। কিন্তু আমার কাছে মানুষই সবচেয়ে প্রিয়।

পলিয়ার : মৃত্যু নিয়ে আপনার কোন ভীতি কাজ করে?
ভাষাসৈনিক :
পরকাল আছে কি নেই, এ ভাবনা ভাবার কি দরকার? মৃত্যু সেটা তো স্বাভাবিক ঘটনা– অনিবার্য। মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো ভীতি নেই। আমি লোক দেখানের জন্য কিছু করি না। আমি তুচ্ছ কারণে হাসি। মানুষ মাত্রই আমার ভালো লাগে। শেষ বয়সে এসে বুঝি মানুষের গোটা জীবনটাই উপভোগ্য। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা-রেষারেষি বোকামী। যখন সমাজে ধর্মই প্রধান হয় তখন এমনটা ঘটে। আমাদের বুদ্ধি আছে জ্ঞান নেই– জ্ঞানহীন বুদ্ধি কোনো কাজে লাগে না।

পলিয়ার : এখন সময় কাটে কিভাবে?
ভাষাসৈনিক :
সময় তো সময়ের মতো কেটে নিয়ে যাচ্ছে জীবন। আমরা আছি সময়ের গতরে বিষফোঁড়া হয়ে। খাই দাই ঘুমাই। গল্প করি। নাতনি আছে ওর সাথে খেলা করি, গল্প করি। চোখে দেখি, কানে শুনি, তাই বই পড়ি পত্রিকা পড়ি। এভাবে সময় চলে যাচ্ছে। সে তো যাবার জিনিস চলেই যাবে। তাকে আর আটকায় কে।

পলিয়ার : আপনার ছেলে-মেয়ে কয়জন? তারা কোথায় কি করছে?
ভাষাসৈনিক :
আমাদের কোনো ছেলে নেই। মেয়ে আছে দুই জন। দুজনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। একজন আমাদের কাছে থাকে। বড় মেয়ে মাতিয়া বানু শুকু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে বের হয়ে নাটক লেখে ও পরিচালনা করে। উত্তরা ওদের বাসা। মাঝে মাঝে আসে বেড়াতে। আসতে না পারলে ফোনে আমার খবর রাখে। ওর তিন ছেলে। জামাই নাট্যকার নূরুল আলম আতিক। আর ছোট মালিহা শোভন। সানিডেল নামে একটা বেসরকারি স্কুলে টিচার হিসেবে আছে। ওর একটা মেয়ে। ওরা দুজনে একত্রে স্কুলে যায়। ওরা আমাদের সাথে থাকে। জামাই সাভারে একটা ব্যবসা করে। ও আমাদের ছেলের মতো। এখন সবকিছু ওই দেখাশুনা করে।

পলিয়ার : আপনার জীবনে মনিকার অবদান কতটুকু?
ভাষাসৈনিক :
(খানিক ক্ষণ নিরবতা পালন করে এবং মনিকার দিকে দীর্ঘ দৃষ্টি দিয়ে) মনিকাই তো আমার সবকিছু আগলে রেখেছে। দুজনই একসাথে পার্টি করেছি। তাকে তো বলেই ছিলাম যে সংসার-ধর্ম তাকে দেখতে হবে, সে তার দায়িত্ব পালন করেছে। তার কোন ত্রুটি আমি দেখিনি কখনো। এই দেখছো না আমাকে কেমন শিশুর মতো আগলে রেখেছে। নারীরা তো শীতল ছায়ার মতো। তাছাড়া একজন মানুষকে নিয়ে দু’এক কথা বলে শেষ করা যায় না। মনিকার কথা মনেই থাক। মনিকা তো মনিকাই। জীবনে যে নারীরা এতো কষ্ট করতে পারে তা মনিকাকে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। আমি তো জেলে গেলে তার অনেক কষ্টে ছেলে মেয়ে মানুষ করতে হয়েছে।

পলিয়ার : আপনার নাকি অনেকগুলো ডাকনাম আছে। একটা মানুষের অনেক ডাকনামের রহস্য কি?
ভাষাসৈনিক :
আমার বাবা আমাকে আদর করে ডাকতো ‘গেদু’ বলে। মামাবাড়িতে ‘রাব্বানী’ বলে ঢাকা হতো। দার্জিলিং হাইস্কুলে সবাই ডাকতো ‘মার্টিন’ নামে। পরে আমার বাবা এক সময় ব্যবসা করতে গিয়ে সে প্রতিষ্ঠানের নাম দেন ‘মার্টিন ব্রাদার্স’। পাবনায় পরিচিত ছিলাম ‘ছাত্র মতিন’ নামে। আরা সারা দেশের মানুষ তো চেনে ভাষা-মতিন নামে। আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনে পার্টির কমরেডরা ‘দিঘু’ নামে ডাকতেন। জেলখানা থেকে বউ এর কাছে চিঠি লিখতাম ‘পিরু, ছন্ম নামে। এ সব ছন্মনাম তো ইচ্ছে করে দিইনি। সময়ের প্রয়োজনে তৈরি হয়ে গেছে।

পলিয়ার : আটবছর বয়সে আপনার মা অ্যাকলেমশিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের কোনো স্মৃতি আপনাকে ব্যাকুল করে।
ভাষাসৈনিক :
নক্ষত্র পতনের মতো মা চলে গেলেন। আমরা পাঁচ-পাঁচটি অবুঝ ভাই-বোন। মা যখন মরে গেলেন তখন ছোটভাই পটুর বয়স মাত্র সাত দিন। এক নেপালী দাইমা তাকে ছয়মাস লালন পালন করে কিন্তু পটুর অকাল মৃত্যু হয়। মা মারার পর কোনো দিন টিফিন খেতে পারিনি। এমনকি একটা চিনাবাদামও না। স্কুল থেকে ফিরে নিজে আটা দিয়ে রুটি তৈরি করে খেতাম। বাবার চাকরী জীবনে প্রথম দিকে তিনবেলা খাবার জুটতো না। প্রতিদিন পেয়াজ ভাজা দিয়ে ভাত খেতে হতো।

পলিয়ার : আপনি নাকি সৎ মাকে মা বলে ডাকতেন না?
ভাষাসৈনিক : সৎ মাকে মা ডাকলে আমার আপন মায়ের মুখচ্ছবি মনের পর্দায় ভেসে উঠতো। একদিন বাবা বিষয়টা খেয়াল করে আমাকে হুঁকোর নল দিয়ে পেটালেন। আমি খুব জেদি আর একরোখা ছিলাম। একফোঁটা পানিও চোখ দিয়ে বের হয়নি। একটু আহ উহু শব্দও করিনি। পরে অবশ্যই সৎ মায়ের সঙ্গে আমার আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এরপর কখনো কোনো ধরনের মনোমানিল্য হয়নি।

পলিয়ার : ১৯৩০ সালে যমুনায় আপনাদের বাড়িঘর নদীতে চলে যায় তখন আপনার পিতা দার্জিলিং চলে যান কিন্তু সেই সব ভাঙ্গনের স্মৃতি মনে আছে?
ভাষাসৈনিক :
মনে আছে। যেবার আমাদের ঘরবাড়ি ভেঙ্গে গেল নদীর জলে তখন আমার বয়স মাত্র চার বছর। কিছু কিছু মনে তো আছেই। কয়েকবার সেখানে গিয়েছি। আর দীর্ঘশ্বাস জমা রেখে এসেছি। কি আর করা, নদী তো আর কারো শাসন-বারণ মানে না। সে তো তার নিজের গতিতে চলবে। তাই না। তবে হ্যাঁ, জীবনে কিছু ট্র্যাজিডির দরকার। যাদের ঘর নদীতে ভাঙ্গেনি তাকে কি কখনো নদী ভাঙ্গনের কথা বলে বোঝানো যাবে? অভিজ্ঞতা এক ভিন্ন জগত।

পলিয়ার : আপনার শৈশব ও লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছে শিলিগুড়ি। সেখানের কোনো স্মৃতি আপনার অতীতকে টানে?
ভাষাসৈনিক :
হ্যাঁ টানবে না কেন। অতীত স্মৃতি কেউ কি ভুলে যায়। ওখানেই তো আমার জীবনের শুরু। বাড়িঘর হারা আমার বাবা তখন দিশেহারা। একটু মাথা গুজার ঠাই পেয়েই তো আমাদের নতুন করে জীবন শুরু করতে হয়েছে। আমার বাবা দার্জিলিং জলাপাহার ক্যান্টনমেন্ট এলেন। সেখানে ইংরেজ সৈন্যরা থাকতো। সেখানে একটি ফ্যামিলি ব্যারাক ছিল। ব্যারাকের পাশে বড় একটা মনোরম ফুলের বাগান ছিল। ১৯৩২ সালে ফেব্রয়ারি মাসের দিকে আমি মা বোন-ভাইসহ দেশ থেকে গিয়ে সেখানে উঠেছিলাম। এর কয়েকদিন পর ৩ মার্চ দার্জিলিং শহরের (ছেলেদের ফোর পর্যন্ত পড়ানো) একটা গার্লস হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম তা এখনো মনে আছে। সেসব মনোরম পরিবেশের কথা এখনো মনে পড়ে। দার্জিলিং-এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোনো তুলনা নেই। বাবার সাথে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখতে যেতাম। বাসা থেকে মাঠের মধ্যে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্য চিকচিক করতো। কী অপূর্ব দৃশ্য! শীতকালে দাজিংলিয়ে গরম পানি ছাড়া গোসল করা যেত না।

পলিয়ার : আপনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যাওয়ার জন্যে ট্র্রেনিং নিতে গিয়েছিলেন ভারতে কিন্তু যুদ্ধে আর যেতে পারেননি, সে সম্পর্কে কিছু শুনতে চাই।
ভাষাসৈনিক :
হ্যাঁ, আমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে ট্রেনিংও করেছিলাম। তখন আমি রাজশাহী কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। এক বন্ধু আর আমি আর্মি ক্যাম্পের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম। এক আর্মি আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলো এখানে কি করতে এসেছো। বলালাম বেড়াতে। তিনি বললেন তুমি তো বেশ মরদ। ইচ্ছে করলে ট্রেনিং এ যেতে পারো। আমি সায় দিলাম। তারা আমার মাপ নিলো। প্রাথমিকভাবে আমাকে বাছাই করে কলকাতা পাঠিয়ে দেয়া হলো। আমাকে বললে একা একা যেতে হবে। তুমি যেতে পারবে তো? আমি বললাম আমি পারবো। আমাকে ঠিকানা দেয়া হলো। সেখানে গিয়ে শুনি যুদ্ধ নাকি শেষ। তারা আমাকে বললো এসেছো যখন ঘুরে যাও কিছুদিন। তারা আমাকে তখনকার দিনে ৬০ হাজার টাকা দিলো। আমি অবাক হয়ে বললাম, এতো টাকা কেন? তারা বলল এটা দিয়ে তুমি ভারতে ঘুরবা আর বাড়ি যাবার খরচ লাগবে না। আমি তো সারা ভারত ঘুরলাম। বোম্বে, দিল্লি, তাজমহল, খাজা মইনউদ্দিন চিশতীর আজমীর শরীফ এসব ঘুরে ঘুরে দেখলাম। তারপর চলে আসি দেশে। আমাকে তারা একটি সার্টিফিকেট দিয়েছিল।

পলিয়ার : শুনেছি আপনি সরকারী চাকুরী পেয়েছিলেন কিন্তু করেন নি কেন?
ভাষাসৈনিক :
প্রলোভনে পড়ে বৃত্তি নিয়ে বা সিভিল সার্জনে চাকরীতে জয়েন করলে ভাষা আন্দোলনের মতো মহান আন্দোলনের অংশীদার হয়ে যেটুকু ভূমিকা পালন করেছি, তা থেকে বঞ্চিত হতাম। চাকরী দিয়ে শুধু নিজের জীবন গোছানো যায়, অন্যের ভাবনা ভাববো কখন? সরকারী চাকরী করলে কোনো আন্দোলন সংগঠন করা যায় না। চাকর হওয়া কি সবার পক্ষে সম্ভব? নিজের জন্য করে কি আনন্দ পাওয়া যায়? যারা পায় তারা পাক। তাছাড়া চাকরী দিয়ে নিজের ভাগ্য বদল করা যায় জাতির ভাগ্য বদল করা যায় না। একটাইতো জীবন। সংগ্রাম না থাকলে সে জীবনের কোনো মূল্য আছে? অন্যের কাছে থাকতে পারে, আমার কাছে তার কোনো মূল্য নেই।

পলিয়ার : এতো ব্যস্ততা সংগ্রামের মধ্যেও আপনি অনেকগুলো বই লিখেছেন। লেখক আবদুল মতিনের সৃষ্টি হলো কিভাবে?
ভাষাসৈনিক :
আমি যখন ভাষা আন্দোলন করলাম পরক্ষণে আমার মনে হলো এসব বিষয় লিখে রাখা বোধ হয় খুব বেশি দরকার। একটা জাতির মুক্তির জন্যে তো আগে সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রয়োজন। আমার তা এখনো পারিনি। বিদেশী সংস্কৃতি আমাদের ঘরে বাইরে এমনভাবে জেঁকে বসেছে যে আমরা এখন সংস্কৃতির অভাবে দৈউলিয়া হতে বসেছি। এতো নোংরামী দেখতে হবে জীবনে তা ভাবতে পারিনি। প্রগতি মানে বেহায়া না। গতি মানে অবক্ষয় না। নিজেদের শিকড় ভুলে গেলে সে জাতির দুর্ভাগ্য বড়ই শোচনীয়। আমাদের সংস্কৃতি মুক্তির দরকার। লিখেছি আমার জীবন নিয়ে ‘জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে।’ এছাড়া আরোও অনেক বই আছে। গণ চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ও দায়িত্ব প্রথা, ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য, আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক, বাঙালী জাতির উৎস সন্ধান ও ভাষা আন্দোলন ইত্যাদি।

পলিয়ার : আপনি কি কখনো কবিতা লিখেছেন? কিংবা ছড়া?
ভাষাসৈনিক :
একটি কবিতা লিখেছিলাম তার নাম ‘বাস্তবতা মহান শিক্ষক’ আর দুটি ছড়া আছে লেখা। একটি ছড়ার নাম ‘লেখাপড়া’ আর ১৯৪৭ সালে জেলখানায় বসে বড় মেয়ে মাতিয়া বানু শুকুকে উদ্দেশ্য করে ‘কোকো মণি’ নামে একটা ছড়া লিখেছিলাম। লেখাটি স্ত্রী মনিকা অনুলিপি করে রেখেছেন আজও।

পলিয়ার : আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও ভালোবাসা। লাল সালাম কমরেড লাল সালাম।
ভাষাসৈনিক :
(চোখ দিয়ে জল ফেলতে ফেলতে) লাল সালাম কমরেড।

(কোথাও প্রকাশিত হয়নি জানিয়ে সাক্ষাৎকারগ্রহীতা এটি আর্টস.bdnews24.com-এ প্রকাশের জন্য দিয়েছিলেন। তার দাবি সত্য নয় জানার পর আমরা শিরোনাম সংশোধন করে দিলাম। তার দাবি যাচাইয়ে যথাযথ সতর্ক হতে না পারার জন্য আন্তরিকভাবে দুঃখিত।)
Flag Counter


6 Responses

  1. নওশাদ জামিল says:

    শ্রদ্ধেয় ভাষা-মতিন সম্পর্কে অজানা কিছু তথ্য জানতে পারলাম। পলিয়ার ওয়াহিদকে ধন্যবাদ।

  2. Mahfuz says:

    Jotodin bangla vasa robe, hridoye theke jabe vasa-motiner nam .

  3. দানিয়াল says:

    আমার বাবার বন্ধু ছিলেন, ভাষা আন্দোলন করেছেন এক সংগে।।।বাবার কথা উনি স্মরণ করেছেন তাই এই সাক্ষাৎকার এর কথা বাবাকে জানাবো। আমার বাবাও এই বন্ধুকে স্মরন করেন।।।

  4. Md.Abdus Salam says:

    স্টুডেন্ট মতিন-এর জীবনী পড়ে খুব ভালো লাগলো, তাকে আমার লাল সালাম জানাই। তিনি আমাদের দেশের একজন গর্ব। তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া উচিৎ ছিলো। আমরা তার এই সাহসীকতার কথা জীবনে ভুলব না। আল্লাহ তাকে বেহস্ত নসিব করুক।

  5. মাহবুব রোকন says:

    লাল সালাম কমরেড, লাল সালাম..

  6. fihir says:

    Good Poli da…valu laglu…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.