অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 23 Sep , 2014  

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৫

যখন জলদস্যু ফ্রান্সিস ড্রেক ষোড়শ শতকে রিওআচা আক্রমণ করে তখন উরসুলা ইগুয়ারানের পরদাদী বিপদ ঘন্টা আর কামানের গোলার শব্দে দিশা হারিয়ে জ্বলন্ত উনুনের উপর বসে পড়েছিল। সেই আগুনের ক্ষত তাকে করে দিয়েছিল সারাজীবনের জন্য এক অকর্মা বউ। সম্পূর্ণভাবে বসতে পারত না, বসত এক পাশে ভর করে, বালিশের সাহায্যে। তার হাটাচলায় অজ্ঞাত কিছু একটা ছিলো, যেকারণে সে আর কখনোই জনসম্মুখে হাটেনি। গা থেকে পোড়া গন্ধ বের হয়–এমন বদ্ধমূল ধারণা থাকায় সব ধরনের সামাজিক কাজ থেকে সে বিরত থাকে। ভোরবেলাটা আঙ্গিনায় নির্ঘুম তাকে চমকে দিতো, কারন সে দুঃস্বপ্ন দেখত যে ইংরেজরা তাদের হিংস্র কুকুরসহ জানালা দিয়ে শোবার ঘরে ঢুকে উত্তপ্ত লাল লোহা তার ভেতর লজ্জাজনকভাবে ঢুকিয়ে অত্যাচার করছে। স্প্যানিশ ব্যবসায়ী যে-স্বামীর ঔরসে দুই সন্তান রয়েছে সে ঔষধপত্র আর আনন্দফূর্তির পেছনে দোকানের অর্ধেকটা ফতুর করে ফেলে স্ত্রীর ভয় কাটানোর জন্য। সবশেষে ব্যবসা লাটে তুলে তাকে নিয়ে গেল সমুদ্র থেকে দূরে পাহাড়ের পাদদেশে এক নিরীহ আদিবাসীদের লোকালয়ে, যেখানে বানালো স্ত্রীর জন্য এক শোবার ঘর, ওটাতে এমন কোনো জানালা ছিল না যাতে করে তার দুঃস্বপ্নের জলসদ্যুরা ঢুকতে পারে।
——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

সেই গোপন লোকালয়ে অনেক আগে থেকে বাস করতো দন হোসে আর্কাদি্ও বুয়েন্দিয়া নামের এক আদিবাসী তামাক চাষী যার সঙ্গে উরসুলার দাদীর বাবা এমন এক লাভজনক অংশীদারি ব্যবসা গড়ে তোলে যে কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের ভাগ্য ফেরে।
কয়েক শতাব্দী পর সেই আদিবাসীর নাতির নাতি বিয়ে করে স্প্যানিশ নাতনীর নাতনিকে। এর ফলে, প্রতিবার যখন স্বামীর পাগলামী উরসুলাকে ক্ষিপ্ত করত তখন সে তিনশ বছরের ঘটনাচক্রের উপর ঝাপিয়ে পরতো, শাপান্ত করত ফ্রান্সিস ড্রেকের রিওআচা আক্রমণের সময়টিকে। এটা ছিল শুধুমাত্রই মনের ভার লাঘবের একটা উপায়, কারণ আসল কথা হচ্ছে ওরা ছিল আমৃত্যু ভালবাসার চেয়েও শক্ত, অভিন্ন এক বিবেকদংশনে বাধা। ওরা ছিল জ্ঞাতি ভাই বোন। ওদের পূর্বপুরুষদের শ্রম আর প্রথা দিয়ে একসঙ্গে বেড়ে ওঠা প্রাচীন লোকালয়কে প্রদেশের সবচেয়ে ভালো গ্রামগুলোর একটিতে পরিণত করেছিলো। যদিও যখন ওরা এই পৃথিবীতে আসে তখন থেকেই ওদের বিয়ে ছিল পূর্ব-নির্ধারিত। কিন্তু যখন ওরা পরস্পর বিয়ের ইচ্ছে প্রকাশ করে তখন ওদের নিজেদের আত্মীয়রাই তাতে বাধা দেয়। ওদের ভয় ছিল যে দুই বংশের এই স্বাস্থ্যবান জুটি বংশ পরস্পরায় নিজেদের মধ্যে উপর্যুপরি সংকরের ফলে ইগুয়ানার ন্যায় সন্তান জন্ম দিয়ে লজ্জা পেতে পারে। এরকম একটা ভয়ংকর উদাহরণ আগে থেকেই ছিল। উরসুলার এক খালার বিয়ে হয়েছিল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার এক চাচার সঙ্গে, জন্ম দিয়েছিল এমন এক ছেলের যে সারা জীবন ফুলানো ও ঢিলে প্যান্ট পরত আর মারা গিয়েছিল বিয়াল্লিশ বছর বয়সে রক্তপাত হয়ে চিরকুমার অবস্থায়। কারন জন্ম নিয়েছিল আর বেড়ে উঠেছিল কোমলস্থির এক কুন্ডলীপাকানো লেজ নিয়ে যার ডগায় ছিল বুরুষসদৃশ একগোছা চুল। শুকরের এক লেজ যা কিনা কখনোই কোন মেয়েকে দেখতে দেয়নি। আর এই লেজের জন্য নিজের জীবন দিতে হয়েছে কারণ যখন এক কসাই বন্ধু অনুগ্রহ করে হাড় কাটার কুঠোর দিয়ে কেটে দিয়েছিল সেটি। লঘুমনস্ক উনিশ বছরের হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এই সমস্যার সমাধান করে দিলো একটি মাত্র বাক্যে “শুয়োরের ছানা হলেও কিছু আসে যায় না, যদি নাকি শুধু কথা বলতে পারে।” এভাবেই বিয়ে করল তিন দিনব্যাপী গানবাজনা আর আতশবাজীপূর্ণ উৎসবের মধ্য দিয়ে । উরসুলার মা যদি সবসময় ওদের অনাগত সন্তানের ব্যাপারে অশুভ ভবিষ্যৎবানী না করতো, এমনকি ওদের সহবাস না করার উপদেশ দেয়ার মত চরম পর্যায়ে না যেত তাহলে ওরা সুখেই থাকত। শক্ত সামর্থ, স্বেচ্ছাচারী স্বামী ঘুমের মাঝে ধর্ষণ করতে পারে–এই ভয়ে উরসুলা শোবার সময় ওর মার হাতে তৈরি প্রাচীনকালের প্যান্ট পড়তো যেটাকে মজবুত করা হয়েছিলো এক ধরনের ফিতে আড়াআড়ি তার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে যেটা বন্ধ করা যেত সামনের দিক থেকে খুব মোটা লোহার বক্লেস দিয়ে। এভাবেই কাটালো কয়েক মাস। দিনের বেলাটা কাটতো লড়াইয়ের মোরগগুলো দেখাশুনা করে আর মায়ের সঙ্গে ফ্রেমে এমব্রয়েডারি করে। আর রাতের বেলা কাটাত ঘন্টা কয়েক ব্যগ্র, তীব্র উত্তেজনাময় জোরাজুরি করে যেন সেটা ছিল যৌনমিলনের বিকল্প। এই অবস্থা চলতে থাকে যতক্ষন না জনপ্রিয় স্বজ্ঞা গন্ধ পেয়ে যায় যে অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটছে আর গুজব ছড়িয়ে পরে যে বিয়ের এক বছর পরও উরসুলা হচ্ছে কুমারী, কারণ তার স্বামী একটা নপুংসক। গুজবটা সর্বশেষ যে ব্যক্তির কানে গিয়ে পৌঁছোয় সে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া।
–দেখছিস উরসুলা, লোকজন কী বলছে,–স্ত্রীকে বলল খুব শান্তভাবে।
–ওদের বলতে দাও– উত্তর দিল–আমরা জানি ওটা সত্য নয়।–
অবস্থাটা এরকম থাকলো আরও ছয় মাস, অবশেষে এক করুণ রোববারে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া জেতে এক মোরগ লড়াই প্রুদেন্সিও আগিলারের সঙ্গে। ক্রোধনোমত্ত, পাশবিক উত্তেজনায় হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার কাছ থেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিলো নিজেকে যাতে সমস্ত গ্যালারি শুনতে পায় যা সে বলতে চায়।
–তোকে অভিনন্দন-চিৎকার করল,– দেখা যাক শেষ পর্যন্ত এই মোরগ তোর বউয়ের কাজে লাগে কিনা। শান্ত হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া নিজের মোরগটা তুলে নিল। “এখনই ফিরে আসছি” সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো। পরে প্রুদেন্সিও আগিলারকে লক্ষ করে বলে: “আর তুই বাড়ি যা, অস্ত্র নিয়ে তৈরি হ, কারণ তোকে মেরে ফেলবো।” মিনিট দশেক পর দাদার ধারালো বল্লম নিয়ে সে ফিরে আসে। মোরগ লড়াইয়ের যে-জায়গাটায় গ্রামের অর্ধেক লোক জড়ো হয়েছিলো, প্রুদেনসিও আগিলার সেখানেই অপেক্ষা করছিল। আত্মক্ষার সময়ও পেল না, প্রথম আ্রউলিয়ানো বুয়েন্দিয়া যে-নিশানা দিয়ে এলাকার বাঘগুলিকে শেষ করেছিলো ঠিক সেই রকম নিশানা আর ষাড়ের মত শক্তি দিয়ে বল্লমটাকে সে এমনভাবে ছুঁড়ে মারলো যে তা গলা ভেদ করে বেড়িয়ে গেল। সেই রাতে যখন মোরগ লড়াইয়ের জায়গায় লাশটার অন্তেষ্টিক্রিয়া হচ্ছে, হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ঢুকল শোবার ঘরে, ওর বউ তখন শাস্তির প্যান্টটি পরছে । “ওটা খোলা”, আদেশ করল। উরসুলা স্বামীর সিদ্ধান্তে কোন সন্দেহ প্রকাশ করল না।-যা ঘটবে তার জন্য তুমি দায়ী থাকবে। ফিসফিস করলো। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বল্লমটা মাটিতে পুতলো।
যদি উগুয়ানারই জন্ম দা্ও, ইগুয়ানাই লালন করব- বলল -কিন্তু তোমার দোষে এই গ্রামে আর কেউ মারা যাবে না।
এটা ছিল জুনের এক সুন্দর চাঁদে ভরা ঠান্ডা রাত, জেগেছিল সকাল হওয়া পর্যন্ত বিছানায় লুটোপুটি করে আর অন্যদিকে যে বাতাস বয়ে যাচ্ছিল শোবার ঘরের ভিতর দিয়ে তা ছিল প্রুদেন্সিও আগিলারের আত্মীয়দের কান্নায় ভারী।

ঘটনাটা বিবেচিত হয়েছিল সম্মান রক্ষার দ্বন্দযুদ্ধ হিসেবে, কিন্তু ওদের বিবেকের মধ্যে একটা অস্বস্তি থেকেই যায়। এক রাতে ঘুমুতে না পেরে, উরসুলা উঠোনে পানি পান করতে যায় আর দেখতে পায় প্রুদেন্সিও আগিলারকে কলশির পাশে। ওকে পান্ডুর দেখাচ্ছিলো, অভিব্যক্তি ছিল খুবই করুণ, গলার গর্তটাকে খড় দিয়ে বন্ধ করার চেষ্টা করছে। ওকে দেখে উরসুলার মনে ভয়ের বদলে করুণারই সৃষ্টি হলো। ঘরে ঢুকে স্বামীকে বলল যা দেখেছে, কিন্তু সে পাত্তা দিল না। “মৃতেরা বেরিয়ে আসে না” বলল, “ঘটনা হলো আমরা বিবেকের দংশন সহ্য করতে পারছি না।” দু’রাত পর, উরসুলা আবার দেখতে পেল প্রুদেন্সিও আগিলারকে গোসলখানায়; গলায় জমাট বাঁধা রক্ত পরিস্কার করছে খড় দিয়ে। আরেক রাতে দেখল বৃষ্টির মধ্যে সে হেঁটে বেড়াচ্ছে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বৌয়ের অলীকদর্শনে উত্যক্ত হয়ে বল্লম নিয়ে উঠোনে বের হলো। ওখানেই ছিল প্রুদেন্সিও আগিলার তার করুণ অভিব্যক্তি নিয়ে।
– জাহান্নামে যা – চিৎকার করল হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, –যতবার ফিরে আসবি ততবারই তোকে মেরে ফেলব।

Flag Counter

কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৩ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-৪ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর


9 Responses

  1. Hirok says:

    অসম্ভব সুন্দর লেখা। পড়তে দারুন লাগছে। ৫ম কিস্তি পড়ে অন্যকিস্তি পড়তে উদ্বুদ্ধ হলাম। অনুবাদক ও বিডিআর্টস সম্পাদককে ধন্যবাদ।

  2. anisuz zaman says:

    thanks Hirok.

  3. আশেক ইব্রাহীম says:

    আনিস ভাই, কিস্তিটা আরেকটু বড় করলে ভালো হয়।

  4. Hannan says:

    অসাধরন লাগছে।অনুবাদকের আর কী কী অনুবাদ আছে? জানালে খুশী হতাম।

  5. Shajahan says:

    এক টুকড়ো মার্কেস! কিস্তিগুলি আসলেই ছোট। আমিও আশেক ইব্রাহিমের সাথে একমত, একটু বেশী পেলে আরো একটু বেশী উপলব্ধ হত। যাই হোক, বিডিনিউজ ও অনুবাদককে অভিবাদন এই প্রয়াসটির জন্য। ৬ষ্ঠ কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম। – ধন্যবাদ

  6. Rahman says:

    পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন- “ম‌‌‌‌‌হত্তম উন্মোচন”, আসলেই তাই! মোট কত সংখ্যায় এটি সমাপ্ত হবে? আশা রাখি শেষ পর্যন্ত এর রঙ রূপ রস ও সুগন্ধ আরো তীব্র হবে। অনুবাদককে শুভেচ্ছা্। সম্ভবত এটি আপনার প্রথম অনুবাদ কিন্তু পড়ে মনে হচ্ছে অভিজ্ঞ প্রচেষ্টা। অনেক দূর পর্যন্ত আপনাকে দেখতে পাব আশা রাখি।

  7. Munir says:

    আনিস ভাই পড়লাম, ভাল লাগল। শুভ কামনা রইল পরের সংখ্যা গুলির জন্য।

  8. Mamun says:

    বরাবরের মত সাবলীল ও সুন্দর। সুন্দর প্রচেষ্টার জন্য জনাব আনিসকে অভিনন্দন।

  9. Zaman says:

    ভালই তো। একটু কঠিন যদিও। তবুও ভাল। ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.