গ্যালারি কায়া, চিত্রকলা, প্রদর্শনী, সাক্ষাৎকার

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না

–মুতর্জা বশীর

রাজু আলাউদ্দিন | 20 Sep , 2014  

bashir.jpgগত ১২ সেপ্টেম্বর থেকে প্রবীণ শিল্পী মুর্তজা বশীর(জন্ম আগস্ট ১৭, ১৯৩২)-এর প্রদর্শনী শুরু হয়েছে উত্তরায়, গ্যালারিকায়ায়; প্রদর্শনী চলবে ২৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রদর্শনীতে শিল্পীর ওয়েল প্যাস্টেল অন ক্যানভাসে আঁকা ১৭টি, ওয়েল অন ক্যানভাসে আঁকা ২টি, ৯টি কোলাজ এবং ১৯৫৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে প্যাপারে আঁকা ১৮টি ড্রয়িংসহ মোট ৪৬টি শিল্পকর্ম স্থান পেয়েছে। বিষয়বৈচিত্রে যেমন, তেমনি শৈলী ও মাধ্যমের দিক থেকেও তার এবারের প্রদর্শনী দর্শকদের জন্য এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। শিল্পী বশীর পুরাণের সেই কাল্পনিক জীব প্রটিয়াসের মতো যিনি নিজেকে বদলে নিয়েছেন বারবার, কিন্তু বামপন্থী রাজনৈতিক বিশ্বাস আর গণমানুষের প্রতি অঙ্গীকারের জায়গায় তিনি নিজেকে রেখেছেন অপরিবর্তিত। চিরনতুন এই প্রবীণ শিল্পীর প্রদর্শনী উপলক্ষে সম্প্রতি তার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন কবি ও প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিন। সাক্ষাৎকারের পূর্ণ ভিডিওসহ লিখিত রূপটি এখানে প্রকাশ করা হলো। বি.স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল ২০১০ সালে। এরপর গত সপ্তাহে শুরু হলো। সময়টা বেশি নেওয়া হলো না?
মুর্তজা বশীর: না, খুব বেশি সময় নেওয়া হয়নি। ২০১০ সালে যখন আমার প্রদর্শনী উদ্বোধন করি তখনই বলেছিলাম আমার পরবর্তী প্রদর্শনীর কথা। আমার পরবর্তী প্রদর্শনী করার কথা ছিল ২০১২ সালে। ২০১০ সালের পরে ২০১২ সালে একটু গ্যাপ দিয়ে। তবে আমি আর `উইং’ করবো না, আমি ফিগারেটিভ কাজ নিয়ে আসবো।

রাজু আলাউদ্দিন: যেটা আপনি নাইনটি ওয়ানে শুরু করেছিলেন…
border=0‘চিত্র: ২০১০ সালে হাসান বিপুলের ক্যামেরায় শিল্পী মুর্তজা বশীর
মুর্তজা বশীর: না, আমি তো ফিগারেটিভ কাজ করেছি আগে। ১৯৬৬ সালে যখন আমার সমসাময়িক বন্ধু আমিনুল ইসলাম, মোহাম্মদ কিবরিয়া–এরা বিমূর্ত চিত্রকলা রচনা করা শুরু করলো। তখন আমার মধ্যে একটা হীনম্মন্যতা জন্মা যে আমি বোধহয় আউট অফ টাইম, সময়ের সঙ্গে চলতে পারছি না। কিন্তু আমার যে রাজনৈতিক দর্শন এবং যে জীবনবোধ সেখানে বিমূর্ত চিত্রকলা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ আমার যে রাজনৈতিক দীক্ষা, সেখান থেকে আমি মনে করি, এই সমাজের প্রতি আমার একটি দায়বদ্ধতা আছে এবং আমার কাজ হবে সমাজের সাধারণ মানুষের প্রেম, সুখ, দুঃখ চিত্রায়িত করা। কিন্তু আমি মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারছিলাম না যে বিমূর্ত আঁকবো। তখন আমি পাগলের মতো হয়ে গেলাম। উদভ্রান্ত যাকে বলে। এদের থেকে বা সময়ের থেকে বোধহয় আমি পিছিয়ে যাচ্ছি। আমার বন্ধুরা অ্যাবস্ট্রাক্ট করছে। অ্যাবস্ট্রাক্ট মানে হি ইজ আ মডার্ন। সেদিক থেকে আমি বোধহয় আধুনিক না। তখন বেগম বাজারে আমার পৈতৃক বাসায় থাকি। রিকসা করে নাজিমুদ্দিন রোড, জেলখানা রোড ধরে যখন বেগম বাজারে যেতাম, তখন জেলখানার পাঁচিলে দেখতাম পেরেক দিয়ে আঁচড়ের দাগ কিংবা পোস্টার সাঁটা, সেটা আবার ছিড়ে ফেলেছে কেউ। আলকাতরায় হাতের ছাপ। হয়তো কোনো বাচ্চার হাতে লেখা অ আ ক খ। এসব আমি দেখতাম। এগুলোকে আমি মনের মধ্যে গেঁথে নিয়ে, কখনও আমি পেন্সিল দিয়ে নোট করেছি, লিখেছি কী কী রং। আবার কখনও কল্পনা থেকে এঁকেছি। এর কারণ হলো সে সময় আইয়ুব খানের মার্শাল ল, একটা দমবন্ধকরা রাজনৈতিক অবস্থা এবং আর্থসামাজিক কারণে পিতা-পুত্র, স্ত্রী-কন্যাদের মধ্যে একটা কমিউনিকেশন গ্যাপ তৈরি হচ্ছে। সেই সময়ে আমি ‘দেয়াল’ বলে একটা চিত্র রচনা করি। আমি এই ‘দেয়াল’ শুরু করি ১৯৬৬ সালে ঢাকায়, ১৯৬৭ সালে মে জুন মাসে পাকিস্তান যাই সে দেশের সারগোটা, লাহোর, করাচিতে। সেইসময় আমি বেশ কয়েকটা ‘দেয়াল’ আঁকি। একাত্তর সালে দেশ থেকে পালিয়ে যাই ফ্রান্সে, সেখানে আমি কিছু কাজ করি। আমি ‘দেয়াল’ মোট করেছিলাম ৯২টা। এখন ব্যাপার হলো দেয়ালটা কী? আমি যদি নিজেকে প্রশ্ন করি, হোয়াট ইজ ওয়াল? ওয়াল যদি আমি ভিজুয়ালি দেখি এগুলো হলো টেক্সচার। টেক্সচার ছাড়া আর কিছু না। তো এই টেক্সচার আর কিছু না, কোথায়্ও একটু ইট উঁকি দিচ্ছে। এখন কথা হলো এই টেক্সচারটা যেহেতু আমি কল্পনার জগত থেকে করিনি, আমি বাস্তবের জগত দেখে করেছি, ফলে ৯২টা ছবি ৯২ রকম হয়েছিল। সাধারণত আমরা লক্ষ্য করি, যারা বিমূর্ত চিত্র রচনা করছেন কল্পনা থেকে, বেশ কিছু ছবির পরে কিন্তু আর মনে রাখা যায় না; তালগোল পাকিয়ে যায়। সব ছবিকে এক মনে হয়। যেহেতু আমি বাস্তবটাকে নিয়েছিলাম, প্রকৃতি থেকে নিয়েছিলাম, ফলে এগুলোর নাম দিয়েছি ‘ওয়াল’। এরপরে আমি করেছি ‘এপিটাফ ফর দ্য মার্টায়ারস’। আমি যুদ্ধের সময় সপরিবারে দেশ থেকে চলে গিয়েছিলাম। সে সময় রাস্তায় ফরাসি টেলিভিশনে দেখেছি, একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত দেহ, তার মুখে মাছি বসে আছে। আমার হৃদয়ে তখন রক্তক্ষরণ হতো এবং একটা অপরাধবোধ। ঢাকায় আমার গাড়ি ছিল, গাড়িতে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা নিয়ে ঘুরেছি।

শেষ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের বক্তৃতার পর, ১১ কি ১২ তারিখে আমার নেতৃত্বে ‘স্বা ধী ন তা’ লেখা বড় চারটা প্ল্যাকার্ড হাতে সামনে চারটা মেয়েকে নিয়ে শহীদ মিনার থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত মিছিল নিয়ে গেছি। সে মিছিলে জয়নুল আবেদীন, কবি সুফিয়া কামাল ছিলেন। কিন্তু কথা হলো তখন বঙ্গবন্ধু ইয়াহিয়ার সঙ্গে নেগোসিয়েশন করছে। ইয়াহিয়া তো বলেই বসল, বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এখন কথা হচ্ছে, তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী হয়েই যেতেন তাহলো তো আমাকে ফাঁসির কাঠে ঝুলতে হতো তখন। কারণ আমি ‘স্বাধীনতা’ বলে রাস্তায় মিছিল বের করেছি।
img_3862.jpg
‘চিত্র: ২০১৪ সালে গ্যালারিকায়ায় প্রদর্শনীর উদ্বোধনীর দিন আসিফ মাহমুদ অভির ক্যামেরায়।
যাই হোক, টেলিভিশনে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতাম তখন আমার মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করতো। আমার মনে হতো এই মুক্তিযোদ্ধাদের কথা কেউ বলবে না। বলবে না এইজন্যেই, সবাই চেষ্টা করবে দলবাজির। তখন তো মাত্র দুটো ছাত্র সংগঠন ছিল। একটি হলো ছাত্র ইউনিয়ন, অপরটি হলো ছাত্রলীগ। কিন্তু আমাদের দেশের সব মানুষ তো আর ছাত্র ইউনিয়ন আর ছাত্রলীগের ছায়াতলে নেই। বিশেষ করে আমি যেটা মনে করি, মেজরিটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রামের যুবক। কারণ ছাত্ররা কিছু ছিল, কিন্তু বেশিরভাগই তো কলকাতায় চলে গেছে। নেতারা চলে গেছে। এই গ্রামের কৃষকরাই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। আর তাদের তো ফেরার কোনো পথ ছিল না। কারণ তাদের একদিকে বঙ্গোপসাগর। অপরদিকে ভারত আর মায়ানমারের সীমানা। এই যে ইসরায়েল আজ এতো শক্তিশালী। তাদের দেখুন, হয় ভূমধ্যসাগরে ডুবতে হবে নয়তো লড়াই করে বাঁচতে হবে। বাংলাদেশের অবস্থাও তখন ঠিক তাই। হয় তাকে লড়াই করে জিততে হবে, নয়তো বঙ্গোপসাগরে ডুবতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে ‘এপিটাফ ফর দ্য মার্টায়ারস’ আমি শুরু করি। ১৯৭২ সালে প্যারিসেই এটা শুরু করেছিলাম। ফ্রান্সে বাসার উঠোনে যাতে কাদা না হয় তার জন্য পাথর বিছানো হতো। ওই পাথরের একটা একদিন আমার জুতোয় ঠোকর খেয়ে উল্টে গেলো। আমি দেখলাম অনেকদিন ধরে ঘষে ঘষে সেগুলো মানব দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মতো হয় গেছে। হাতে নিয়ে দেখলাম ভেতর থেকে একধরণের রং বেরুচ্ছে। আমি তখন সেগুলো হাতে নিয়ে একজন রেনেসাঁ শিল্পীর চোখ দিয়ে তার ডিটেইল ও বাস্তবতা এবং একজন ইম্প্রেশনিস্ট চিত্রকরের মানসিকতা নিয়ে চিত্র রচনা করলাম। আমি এই দুটোর সমন্বয় করে আঁকা শুরু করলাম। ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত চলে সেটা। সেই সময়ই ‘এপিটফ ফর দ্য মার্টায়রস’-এর প্রদর্শনী হয়েছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমিতে। সেই প্রদর্শনীতে আমি বলেছিলাম– ‘দৈনিক বাংলা’র প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছিল ‘পাপবোধ থেকে যে শিল্পকর্মের সৃষ্টি’। কারণ আমার পাপবোধই তো হয়েছিল। জীবনকে ভালোবাসি দেখেই তো পালালাম। কিন্তু এরা তো জীবনকে উৎসর্গ করেছে। এইটা একটা বিরাট উৎসর্গ। সেই সময় মানে ১৯৭৬ সালে মুক্তিযুদ্ধের কথা আমি বলেছি, লোকজন কিন্তু তা তেমনভাবে উচ্চারণ করছে না তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। ওই ‘ওয়াল’-এর সময়ে আমি কোনো ফিগারেটিভ করিনি। ‘ওয়াল’-এর সময় একটি ফিগারেটিভ করেছিলাম, সারগোদায় একটি মেয়ের ফিগার এঁকেছিলাম। আর ‘এপিটাফ’-এর সময় আমি আরও একটা ফিগারেটিভ করেছিলাম। তারপরে আর আমি কিন্তু কোনও ফিগারেটিভ করিনি। কল্পনা থেকে না। সে সব পাথর আমার কালেকশনে আছে। পাথর কালেকশনের কারণ হলো, আমার তখন মনে হচ্ছে এই যে বেনামী অজানা মুক্তিযোদ্ধা, এদেরকে উৎসর্গ করে আমি কী আঁকতে পারি। প্রাগৈতিহাসিক যুগে একজন যোদ্ধা মারা গেলে তার কবরের সামনে একটা পাথর রাখা হতো। যার আর্টিস্টিক নাম হলো ‘মেনহির’। কথা হলো তখন পাথরটা আর পাথর থাকতো না, তখন এটা প্রতীক হয়ে যেতো উন্মুক্ত আত্মার (ওপেন সৌল)।
এপিটাফের পরে যখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হলো তখন আমি গাড়ী মেরামতের গ্যারেজে গিয়ে গাড়ীর ডেন্টিং করা দেখতে লাগলাম। ব্লু ল্যাম্প দিয়ে পুড়িয়েছে, সিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষেছে, আস্তর লাগিয়েছে– এগুলো আমি ফটোগ্রাফ করা শুরু করলাম। ফটোগ্রাফ করে আমি আঁকলাম। এটাকে আমার মনে হয়েছে একটা ভলকানিজ ফোর্স। তারপরে ১৯৯৮ সালে, যখন পত্রিকা খুললেই দেখা যায় হত্যা, ধর্ষণ, ফেন্সিডিলের নানা খবর। মানুষ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। আর আমার যে রাজনৈতিক শিক্ষা, বিশ্বাস, সেখানে তো আমি জীবনের জয়গান গাচ্ছি, আগামীতে একটা সুন্দর জীবন আসবে–এটা তো আমাকে বলতে হবে। তখন আমার হঠাৎ মনে হলো এই যে একটা প্রজাপতির জীবন, একটা ছন্দ, একটা জীবন্ত ভাইব্রেশন। তার যে কালারের দ্যুতি, তখন আমি প্রজাপতির একটি খন্ডিত অংশ ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে দেখে আঁকা শুরু করি ওই রেনেসাঁ শিল্পীর দৃষ্টি দিয়ে। কারণ আমি নিজেকে মনে করি একজন বাস্তববাদী শিল্পী হিসেবে। যে কারণে আমি নিজের কাজকে ক্লেইম করি বিমূর্ত বাস্তবতা বা অ্যাবস্ট্রাক্ট রিয়েলিজম। পৃথিবীর ইতিহাসে কিন্তু অ্যাবস্ট্রাক্ট রিয়েলিজম বলতে কোনও কিছু নেই। শব্দটা আমিই উদ্ভাবন করেছি।

একটা কথা আমি বলতে চাই, এই অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজের সূত্রপাত তো আমেরিকাতে। আমেরিকাতে হওয়ার কারণ কী? ফ্রান্সেও হয়নি, ইটালিতেও হয়নি, বিলেতেও হয়নি। বিলেতে শুরু হয়েছিল, যাকে অ্যাকশন পেইন্টিং বলা হয়েছিল। কিছু ওই যে রং দিয়ে কিন্তু ব্যপকভাবে শুরু হয়েছিল আমেরিকাতে। কারণ কী? জ্যাকসন পোলাক প্রথম করলো। এর কারণটা হলো একটা ব্রেকওয়ে ফ্যামিলি। পিতা চলে গেছে, স্ত্রী চলে গেছে। এই সে সময়ে কিন্তু সাহিত্যে ‘বিট জেনারেশন’ জন্মাল। জ্যাক কেরুয়াক…
রাজু আলাউদ্দিন : অ্যালেন গিন্সবার্গ।
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, অ্যালেন গিন্সবার্গ। এই জ্যাক কেরুয়াককেই তো বলা হয় বিট জেনারেশনের জন্মদাতা। অন দ্য রোড বলে তার বইটাকে বেইজ করেই তাকে জন্মদাতা বলা হয়। তার পাশাপাশি আরও অনেকেই লিখল। কিন্তু কথাটা হলো। পুরোপুরি বিচ্ছিন হয়ে গেছিল সে। কিন্তু আমাদের সমাজে, আমাদের বাংলাদেশে এখন সেই শিল্পীরা কোথায়? এখনও তো একান্নবর্তী পরিবার। এখানে যিনি অ্যাবস্ট্রাক্ট করছেন তার ভাই কিংবা বোন অথবা স্ত্রীর দিক থেকেই কোনো আত্মীয়ের বাড়িতেই তো থাকে। পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন কোথায় তারা? সে কোথায় থেকে আসছে, কেনো?

রাজু আলাউদ্দিন: এটাকে কী আরোপিত মনে হয় আপনার?
মুর্তজা বশীর: আরোপিত এবং আধুনিক হওয়ার জন্যই এসব করা। হ্যাঁ, কেউ কেউ করেছে। আমিনুল ইসলাম করেছে। সে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। কিবরিয়া করেছিল, কারণ কী? কিবরিয়ার বাড়ি বীরভূমে, সে এলো এদেশে। তার কোনও আত্মীয়-স্বজন নেই। আজিমপুর কলোনীতে থাকে। একরুম নিয়ে। সেই বাড়িতে সিউরির (কিবরিয়ার বাড়ি সিউরিতে) আরেকটা ছেলে থাকে। দুজন একটা রুমে থাকতো তারা। আমি গিয়েছি সেখানে। খাট তো ছিল না, চৌকিতে ঘুমাতো তারা। কিবরিয়া মাটিতে বসে ছবি আঁকতো, ড্রয়িং মাস্টারি করে। তার জীবনটা কী? তার জীবনটা ক্ষত-বিক্ষত, এটাই তো একটা টেক্সচার। সেই টেক্সচারগুলোকে সে কী করছে, সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে একটা পরিধির মধ্য সুন্দরভাবে রংয়ের প্রলেপ লাগাচ্ছে। হুইচ হি ড্রিমস। সে স্বপ্ন দেখে সুন্দর রংয়ের। যদি আমি কিবরিয়ার সাইকোএনালিসিস করি– এটাই কিন্তু মূল কারণ।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনাদের দুজনার একটা ব্যাপারে কিন্তু মিল আছে সেটা হচ্ছে দুজনের বাড়িই কিন্তু ওই পারে। আপনারা দুজনেই কিন্তু ছিন্ন হয়ে ঢাকায় চলে এসেছেন..
মুর্তজা বশীর: আমার জন্ম কিন্তু ঢাকায়। আমি বড় হয়েছি ঢাকায়।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আপনার পূর্ব-পুরুষতো সেখানে।
মুর্তজা বশীর: আমার পূর্বপুরুষ ওই পারের। আমি কলকাতায় আশুতোষ মিউজিয়ামে যখন পড়তে গেলাম, আমার এক সহপাঠিনী আমাকে তখন বলেছিল, আরে আপনি তো হাফ ঘটি। মানে পুরোপুরি ঘটি না। জন্মসূত্রে আপনি বাঙ্গাল, কিন্তু আপনি হাফ ঘটি। কথা হলো কিবরিয়ার চিত্র যদি অ্যানালিসিস করি ওইটাই তাকে অ্যাবস্ট্রাক্টের দিকে নিয়ে গেলো।

রাজু আলাউদ্দিন: অন্যদের কথা, আমিনুল ইসলাম?
মুর্তজা বশীর: আমিনুল ইসলামের স্ত্রী তাকে রেখে জামার্নি চলে গেছে। তার দুই মেয়েকেও নিয়ে গেছে তার স্ত্রী। সেই জন্যে সে খুব একা। সে বাড়িতে থাকে কিন্তু বাবা-মার সঙ্গে তেমন সর্ম্পক নেই। তো সে সম্পূর্ণ একা। ফলে তার পক্ষে অ্যাবস্ট্রাক্ট আঁকা খুব স্বাভাবিক।

রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আপনিও অ্যাবস্ট্রাক্ট করলেন..
মুর্তজা বশীর: আমি অ্যাবস্ট্রাক্ট করলাম না তো। আমি অ্যাবস্ট্রাক্ট রিয়েলিজম করেছি। এটা করার কারণও বললাম কিন্তু। একটা হীনম্ম্যনতা জন্ম নিয়েছিল আমার মধ্যে যে আমি আধুনিক না। কিন্তু আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো এসব বিশ্বাস করি না।

রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু আপনি এই ছবিগুলো, যখন কয়েন করলেন ‘অ্যাবস্ট্রাক্ট রিয়েলিজম’ শব্দটি–একটা হীনম্ম্যনতা থেকে করলেন। কিন্তু সেখান থেকে বেরিয়ে এসে আপনি এখন কী ভাবছেন?
মুর্তজা বশীর: আমার তথাকথিত অ্যাবস্ট্রাক্ট কাজগুলো কিন্তু শতভাগ বাস্তবভিত্তিক। আমার কাছে সমস্ত ডকুমেন্ট আছে কী দেখে আমি করেছি।

রাজু আলাউদ্দিন: সেটা ঠিক আছে, কিন্তু আপনি যতোই বাস্তবভিত্তিক উপাদান নিয়ে ছবি আঁকেন না কেন তার মধ্যেও তো একটা ইমাজিনেশনের প্লে থাকে নিশ্চয়ই?
মুর্তজা বশীর: না, এখানে আমার কোনও ইমাজিনেশন নেই। এখানে যে ইসথেটিকস কাজ করেছে তা হলো ইম্প্রেশনিস্টদের মন-মানসিকতা। যেমন ধরো পাথরের রং হলো হলুদ। রেনেসাঁর কাজও একটা হলুদই দেয়। কিন্তু ইম্প্রেশনিস্টরা তাদের কাজে নানা গ্রেডের হলুদ দিচ্ছে। এই হলো ইম্প্রেশনিস্টদের ব্যাপার। এখন ধরো এই যে এতো রং, মুখেতো এত রং হয় না। তাই না?

রাজু আলাউদ্দিন: এই ছবিগুলো দেখে কেউ যদি বলে, প্রবল বাস্তব উপাদানের উপর ভিত্তি করে ছবি আঁকলেন। কিন্তু এই যে ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে রংয়ের ব্যবহার– এসব কি আপনার কল্পনার জায়গা থেকে করা না?
মুর্তজা বশীর: না, ব্যাখ্যা করি– আমি যখন ফিগারেটিভ করব চিন্তা করলাম, সময়টা ১৯৯১ সাল। তখন আমি দেখলাম যে এখানকার ছবির স্বাক্ষর মুছে ফেললে বোঝা যায় না ছবিটা কার। এর দেশই বা কোথায়? আমি নিজেও পাশ্চাত্যঘেঁষা ছিলাম। আমি মনে মনে নিজেকে ইউরোপিয়ান মনে করতাম, সংস্কারমুক্ত ভাবতাম। কেন করতাম? আমি যে সময়ের কথা বলছি, ওই সময়ে বাঙ্গালি মুসলিম সমাজ ছিল অত্যন্ত সংকীর্নমনা। কোনও দিকে দম ফেলার অবকাশ নেই। সেখান থেকে বেরিয়ে পরা, সেটাকে অস্বীকার করলাম। আমি ১৯৮০ সালের দিকে জাপানে গেলাম। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও মিনিস্ট্রি অফ কালচার আমাকে পাঠালো। ফুকুওয়াতে গেলাম আমি একটা আর্ট এক্সিবিশনে। আমার যে দোভাষী মেয়েটি পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়স, তার দিকে যখন আমি হাত বাড়িয়ে দিলাম সে কিন্তু আমার সঙ্গে করমর্দন করল না। সে তাদের প্রথা অনুযায়ী মাথা নুইয়ে আমাকে অভিবাদন জানালো। বিশ্বাস করো আমার তখন মনে হলো চাবুক মারল সে আমাকে। এই যে আধুনিক মেয়ে মিনি স্কার্ট পড়া, চোখে রংয়ের প্রলেপ দেওয়া। আমার তখন মনে পড়ল ঈশপের একটা গল্প। একটা কাক ময়ূর হতে চেয়েছিল। যে পালকে রং মেখে শেষে কাক বা ময়ূর কোনটাই হতে পারল না। তখন আমার মনে হলো যে আমি কে? আমি কোত্থেকে এসেছি? আমি বাংলাদেশের হলেও বাংলাদেশতো একটা দ্বীপ না, উপমহাদেশেরই একটা অঙ্গ। অতএব আমি এই উপমহাদেশের সংস্কৃতির উত্তরাধীকারী। তবে এখানকার একটা আঞ্চলিক সংস্কৃতি আমার মধ্যে মিক্স হয়েছে। তখন নিজেকে জানার জন্য আমার ছবি আঁকা বন্ধ হয়ে গেল ১৯৮০ সালে। তারপর আমি ১৯৮৩-৮৪ সালের দিকে এঁকেছি বিক্রির জন্য। কারণ যে বেতন পেতাম তাতে আমার সংসার চলে না। এদিকে আমি বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা, ইলাস্ট্রেশন বা পয়সার বিনিময়ে পোর্ট্রটে আঁকার মতো কর্মাশিয়াল কাজ করি না। আমি বেতনের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলাম। আর এখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যে বেতন পায়, তখন তো আর সে বেতন ছিল না আমাদের। সেইসময় আমি পড়া শুরু করলাম। এই উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাস, অর্থনীতির ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস। শুধু তাই নয়, এদেশের যে ধর্ম — হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মের বই পড়া শুরু করলাম। বেদ পড়লাম, উপনিষদ পড়লাম, বৌদ্ধদের মহাবর্গ কুলাবগ্গ্য, ধম্মপদ ও জাতক রচনা পড়লাম। এদের ধর্মশাস্ত্র যেগুলো, যেমন ধরো মনু, নারদ, বৃহস্পতি, বিষ্ণু, আবার এদিকে হলো সুদ্ধবিভঙ্গ, থের গাথা, ভিক্ষুনীবিভঙ্গ ইত্যাদি। সবগুলো বই আছে এখনও আমার বইয়ের সেলফে। আমাকে খোঁজার জন্য আমি এসব পড়া শুরু করলাম। আবশ্যিকভাবে তখন আমার ছবি আঁকা বন্ধ। পড়া শেষে আবার শুরু হলো ছবি আঁকা। আমি তখন দেখলাম আমার দেশের চিত্রকলার ঐতিহ্য কী। আমার দেশের চিত্রকলার ইতিহাস হলো– কালিঘাট, বাকুড়ার পট, অজন্তা, রাজপূত, বাসুলী, কাংরা। মুঘলরা না, কারণ তারা বাইরে থেকে এসেছে। যারা এই মাটির তাদের চিত্রকলা আমি দেখা শুরু করলাম। এসময়েই পাল যুগের চিত্রকলা দেখলাম। অবশ্য আমার দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, পালরা বাংলার রাজা। কারণ পালরা তো বাংলায় রাজত্ব করেছে। আমার এখনকার বোধ হচ্ছে পালরা এক পুরুষ বাঙ্গালি ছিল। সে হলো গোপাল। তার ছেলে ধর্মপাল বাঙ্গালি। অবশ্য ধর্মপাল বিয়ে করেন দাক্ষিণাত্যের প্রসিদ্ধ রাষ্ট্রকূট বংশীয় রাজকন্যা রন্নাদেবীকে। পাল চিত্রকলার উপর ১৯৮৭ সালে ব্রিটিশ কাউন্সিলের ফেলোশীপে লন্ডন ও ১৯৮৮ সালে ভারতের আইসি.সি আর-এর ফেলোশীপে ভারতের বেনারস ও কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি ও আমাদের রাজশাহীর বরেন্দ্র মিউজিয়ামে গবেষণা করে আমার দৃঢ়ভাবে ধারণা জন্মায় যে, পালযুগের চিত্রকলা ভারতের অজন্তাগুহার চিত্রাবলী মিনিয়েচর ভার্সান, বাঙ্গলার শিল্পকলার ঐতিহ্য নয়। কিন্তু তার পরে আর কেউ বাঙ্গালি না। কারণ তারপরেই কিন্তু ‘ইন্টার ম্যারেজ’ শুরু হয়ে গেছে। আর শেষদিকে তারা মগধে মানে বিহারের দিকে চলে গেলো। এক পুরুষ বাঙ্গালি, এরপর থেকেই তারা কিন্তু হাফ ব্লাড হয়ে গেছে। তখন এগুলো পড়ে আমি দেখলাম, আমাদের যে ঐতিহ্য এটা সেইসময় পাকিস্তান সরকার বলছে এগুলো হিন্দুয়ানি শিল্পচর্চা। পাকিস্তান সরকার হিন্দুয়ানি শিল্পকে কিন্তু উৎসাহিত করছে না। আমাদের আর্ট ইন্সটিটিউটে পশ্চিমের ইতিহাস যেমন পড়ানো হয় এখনও সে তুলনায় আমাদের যে ওরিয়েন্টাল আর্ট এই বার্মায় কী হচ্ছে, জাপানে কী হচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ায় কী হচ্ছে এসব কিন্তু আমরা জানি না। এটা কিন্তু আমাদের জন্য অত্যন্ত লজ্জার বিষয় আমার ইউরোপ নিয়ে এতো মাতামাতি করছি। দরকার নেই তো তার। রেঁনেসা থেকে পোস্ট-মার্ডানিজম, তারপর জাম্প করে আসো। মাঝখানে যেইসব ছোট ছোট আন্দোলন হয়েছে, আমি মনে করি ওইগুলো টাচ করবে, কিন্তু এতো বিস্তারিত পড়ানোর কোনও প্রয়োজন নেই। ফলে হলো কী, আমি যেদিন আমার শিল্পকলার ঐতিহ্য নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলাম, আমি দেখলাম আমার সামনে দুটি পাহাড়। কারণ আমি পেলাম কালিঘাট, বাকুড়া থেকে। তো পাহাড় দুটি হলো একজন যামীনী রায়, অন্যজন কামরুল হাসান। কারণ তারা কালিঘাট, বাকুড়ার পটচিত্র থেকেই নিয়েছে তাদের প্রেরণা। আমি খুব সমস্যায়ই পড়ে গেলাম। তাদের ডিঙিয়ে যাওয়ার মতো প্রতিভাবান আমি না। পিকাসো কিউবিজম করার পর যে কেউ কিউবিজম করেছে তারা পিকাসোর গন্ধ কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না, তার ছায়া থেকেই যায়। এটা কোনও আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন শিল্পীর জন্য শ্লাঘার বিষয় নয় (!) যে তার কাজ কারো না কারো কথা মনে করিয়ে দেয়। মহাস্খান, ময়নামতী, পাহাড়পুর,বাসুবিবিহারের চিত্রাবলীর টেরাকোটা ও বাংলার মন্দিরের পোড়ামাটি ফলকে বাংলার শিল্পকলার ঐতিহ্য পেলাম, আর তখন আমি করলাম কী, আমার ঐতিহ্য ও পাশ্চাত্যের শিক্ষাকে সংমিশ্রণ করলাম।



রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এটাও তো সত্য, এমন কোনো শিল্পী বা লেখক নেই যে তার পূর্বসূরী দ্বারা প্রভাবিত না। আমি বলতে চাচ্ছি, মৌলিকতা এমন একটা ব্যাপার প্রভাবের বাইরে গিয়ে সেটা অর্জন করা যায় না।
মুর্তজা বশীর: আমি এখানে ডিফার করি। অনুকরণ করো না, অনুপ্রাণিত হও। ধরো আমার এই কাজে যামীনী রায়রা নেই কিন্তু.. কোলাজগুলো অন্য..
b-m.jpg
‘চিত্র: বায়ে শিল্পী বত্তিচেল্লির আঁকা ‘ভেনাসের জন্ম’, ডানে শিল্পী মুর্তজা বশীরের আঁকা ‘ভেনাসের জন্ম’।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, যেমন ধরা যাক এই ছবিটা বত্তিচেল্লির ‘দ্য বার্থ অফ ভেনাস’-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার এটায় একই সঙ্গে একটু পপ একটা টেম্পারমেন্টও আছে।
মুর্তজা বশীর: পুরো কম্পোজিশন, মানে নদীর বাঁকটাক সব কিন্তু ঐ বত্তিচেল্লির মতোই। তবে আমি এটার একটা মর্ডান ইন্টারপ্রিটেশন করলাম । এখানে ছিল ভেনাস। এপাশে অরিজিনালি কী ছিল, দুজন কাপড় নিয়ে তাকে ঢাকতে যাচ্ছে। এখানে হলো স্বর্গীয় দেব-দেবী তাকে ফুল দিচ্ছে। এখানে মর্ডান ইন্টারপ্রিটেশন হলো এই যে, চোখ ঢেকে দেওয়া। একই কথা যে তাকে দেখবো না। এটা তো আমি মডার্ন ইন্টারপ্রিটেশন করলাম। এটার কথা আমার মাথায় এসেছিল ১৯৫৯ সালে। আমি যখন ইটালি থেকে ফিরলাম, সে সময় টাইম ম্যাগাজিনে হ্যামলেটের একটা ছবি দেখেছিলাম। ব্রডওয়ের একটা নাটকের। সে সময় বিট জেনারেশন শুরু হয়ে গেছে। হিপ্পিরা তাদের আরও পরে এলো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কালো চামড়ার জ্যাকেট পরিহিত, চোখে চশমা, একজন মোটর সাইকেল আরোহী একটা দিকনির্দেশনা-পোস্টের নিচে দাড়িয়ে উপরে দেখছে একদিকে লেখা টু বি আরেকদিকে লেখা নট টু বি। এই যে মডার্ন ইন্টারপ্রিটেশন, আমি এটাকে মডার্ন ইন্টারপ্রিটেশন বলেছি।

রাজু আলাউদ্দিন: সেই জন্যে এটা কিন্তু আলাদা হয়ে গেছে। এটা তো আমাদের একধরণের হীনম্মন্যতা যে আমরা কারো দ্বারা প্রভাবিত হতে চাই না। কিন্তু আপনি চান বা না চান আপনি প্রভাবিত হবেন। আসলে আপনি যা দেখবেন যা পাঠ করবেন তা কোনো না কোনোভাবে আপনার মস্তিষ্কে জমা হয়ে থাকবে। আপনি যখন নতুন কোনও কাজ করতে যাবেন তখন সেই প্রবাহটা কিন্তু চলে আসে।
মুর্তজা বশীর: না, আমি তোমার সঙ্গে একমত না। আমি ওদের থেকে নেবো না।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার এখনকার কাজে, দেখেন বাইজেন্টাইন প্রভাব আছে।
মুর্তজা বশীর: কিন্তু বাইজেন্টাইন তো না।

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আমিও তাই বলতে চাইছি।
মুর্তজা বশীর: আমি একটা কথা বলি, বমির একটা চরিত্র আছে। যদি তোমার হজম করার শক্তি থাকে পেটে, তাহলে তোমার বমি থেকে মাছ, গোশ কিছুই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে না। পিকাসো যেটা করেছে, সে খেয়ে হজম করে ফেলেছে। আমিও হজম করে ফেলেছি। আমি যার জন্য বলি তোমাকে অনুপ্রাণিত করবে। কিন্তু তার অনুকরণ করবে না।

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, অনুকরণ করা তো শিল্প না।
মুর্তজা বশীর: কিন্তু হচ্ছে তো।

রাজু আলাউদ্দিন: আমিও তাই বলতে চাইছি। প্রভাবিত হওয়ার মধ্যে কোনও হীনম্মন্যতা নেই..
মুর্তজা বশীর: কিন্তু আমার কাজ দেখে আমি ঠিক করলাম। আমার সামনে যামীনী রায় আর কামরুল হাসান। কিন্তু আমার কাজ দেখো, যামীনী রায় কিংবা কামরুল হাসান কোনোটাই না। আমার কাজ কিন্তু কালিঘাটও না বা অন্যকিছুই না। তুমি রংয়ের কথা বলছো। এই রংগুলো আমি নিয়েছি কেনো বলি– আমি তো পাল যুগ নিয়ে কাজ করেছি দুবার। পাল যুগের চিত্রকলা যদি তুমি দেখো, পাল যুগের চিত্রকলার একটা লিমিটেশন আছে। তার পটভূমিতে কিন্তু চারটে কালার। নীল, সবুজ, লাল, হলুদ। আমি সেটাই মাথায় রেখে কাজ করেছি। কিন্তু কালারগুলো আমি নিয়েছি কালীঘাট থেকে। কালীঘাটের চিত্রকলার কালার। যেমন এই পাখাটা আমি হুবহু এঁকেছি। এটার পাখা একদম ওইখানে আছে। আমি যেটা করেছি, আমার ড্রয়িংগুলো ফোক না। এগুলো আমার যে একাডেমিক শিক্ষা সে শিক্ষা অনুযায়ী আমি করেছি। এখানে একাডেমিক না করলে…
রাজু আলাউদ্দিন: কোনো ফোক টোনই নেই কিন্তু।
মুর্তজা বশীর: এখানে ফোক-এর আউটলাইন, বড়বড় চোখ। কিন্তু ড্রয়িংটা একাডেমিক।

রাজু আলাউদ্দিন: সম্ভবত ১৯৯৩ সালে এরকম ফিগারেটিভ কাজ করেছিলেন। সেখানে হাই সোসাইটির মেয়েদের অসার অবস্থাকে হাইলাইট করেছিলেন।
মুর্তজা বশীর: চোখে মাশকারা দেওয়া, জামার ভিতর দিয়ে অর্ন্তবাস দেখা যাচ্ছে..

রাজু আলাউদ্দিন: ওদের সেই ক্যারেক্টারিস্টিকস নিয়ে এলেন। এবার যে ফিগারগুলো আঁকলেন সেখানে আপনি হয় অন্ত্যজশ্রেণী বা মধ্যবিত্তশ্রেণী বলা যায় বা আপার ক্লাস থাকলেও..
মুর্তজা বশীর: আপার ক্লাস নেই একেবারে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তদের ছবিই বলা যায়। আমার স্ত্রী একটা ছবি দেখে বলে– এটাতো মেইড সার্ভেন্টদের মতো হয়েছে। শাড়ী পরিহিত টিপিক্যাল লুক দেখেছে আমার স্ত্রী।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ক্লাস(শ্রেণী)-এর কথা ভাবলে আপনি নিচের দিকে চলে এলেন পরের কাজগুলোয়। প্রথম কাজগুলোর মাধ্যমে আপনি কী সাজেশন দিয়েছিলেন আর এখন আপনি কী সাজেশন দিচ্ছেন?
মুর্তজা বশীর: শোন, আমি ৫৪ সাল থেকে ফিগারেটিভ কাজ শুরু করি। সমাজের যারা নিম্নস্তরের সাধারণ মানুষ, তাদের হাসিখুশি, প্রেম, ভালোবাসা, বিনোদন, অবসর–এসব আমি এঁকেছি। আপার সোসাইটি তাতে রাখিনি। আমি ইটালিতে গেলাম ৫৬ সালে, সেখানে ফ্লোরেন্সের নিসর্গ এতো সুন্দর, কিন্তু আমি সেসব আঁকিনি। আমি রাজনৈতিক দীক্ষার কারণে ফ্লোরেন্সের রাস্তায় বৃদ্ধা মহিলা লেবু বিক্রি করছে, কিংবা একজন বৃদ্ধা রমনীর সঙ্গে এক কিশোরী–তার নাতনী হতে পারে বা তার মেয়েও হতে পারে–বাজার করে ফিরছে। কিংবা একটা জীপসী রাস্তায় খাঁচার মধ্যে পাখি নিয়ে আছে। হয়তো নিম্নশ্রেনীর একটা মহিলা, তার সাথে একটা বাচ্চা ছেলে সেই পাখিটা ছুঁয়ে দেখছে। কিংবা একোর্ডিয়ান বাজিয়ে ভিক্ষা করছে–এরা ছিলো সাধারণ মানুষ। এরাই ছিলো আমার ছবির বিষয়। ইটালি থেকে ফিরে আসলাম ১৯৫৯ সালে। তখন আমি আঁকলাম মধ্যবিত্ত জীবন; টয়লেট, ঘরে মহিলারা চুল আঁচড়াচ্ছে। মানে মধ্যবিত্তদের ঘরে যা যা দেখেছি। আবার কিছু নিম্নবিত্তদের ছবিও এঁকেছি। ধান কুটছে, আবার মধ্যবিত্ত ঘরের মধ্যে আছে, গালে হাত দিয়ে মোড়ায় বসে আছে। আয়নার সামনে চুল আঁচড়াচ্ছে। এগুলো আমি আঁকলাম। কিন্তু যখন আমি ১৯৯৩ তে ওগুলো আঁকলাম তখন আমার মনে হলো– ওই উচ্চবিত্ত শ্রেণীর নারীদের যে অসারতা, অসহায়তা তা তুলে ধরলাম। আমি ঢাকা ক্লাবে যেতাম তখন, আমি দেখতাম ওখানে বিত্তবান যেসব রমনী, তাদের অর্থের কোনো অভাব নেই। কিন্তু কেমন একটা বিমর্ষতা। আমাকে সাংবাদিক ফয়েজ ভাই জিজ্ঞেস করেছিল, বশীর, তোমার ছবির মেয়েদের চোখে এতো ব্যাথা কেনো? আমি বললাম পরনির্ভরতা। এইখানে দেখ, প্রত্যেকটা ছবিতে প্যাথোজ আছে। বেদ-এ আছে একজন রমণী প্রথমে তার পিতার উপর নির্ভরশীল, এরপর সে তার স্বামীর উপর, তারপর তার সন্তানের উপর নির্ভরশীল। সে স্বাধীন না কখনও। ফলে প্রচুর প্রাচুর্য্য আছে, অর্থের কোনো শেষ নেই, তারপরও কিন্তু চোখে কোথায় যেনো একটা ব্যাথা। এইটা জীবন দিয়ে আমি উপলদ্ধি করেছি। তুমি দেখো এখানে প্রত্যেকটা মেয়ের চোখে করুণ-রস আছে।

রাজু আলাউদ্দিন: এবারের প্রদর্শনীর মেয়েদের চোখের গড়ন কোথাও কোথাও ভিন্ন মনে হচ্ছে কিন্তু একটা জায়গায় ঐক্য আছে। সেই ঐক্যটা ধরতে পারছিলাম না। আপনি বলার পরে বুঝতে পারলাম ঐক্যটা কোথায়। কোথায় যেনো একই রকমের মেসেজ দেওয়া আছে..
মুর্তজা বশীর: ওইটা আমি দিয়েছি। তুমি দেখো বাঙালি মেয়েদের চোখে কিন্তু খুব ব্যাথা।
রাজু আলাউদ্দিন: ইউরোপের নারীদের চোখ যে রকম নাচে, যেমন ভাষাময়, যেমন কথা বলে, যে রকম অভিব্যাক্তি নানান রকমের তাদের..
মুর্তজা বশীর: প্রচুর অর্থময় তাদের চোখ। অর্থের যেন শেষ নেই। কিন্তু আমি ঢাকা ক্লাবে সেটা খুঁজে পাইনি।
রাজু আলাউদ্দিন: চোখ যেন লাফাচ্ছে, চোখের অভিব্যাক্তির মধ্যে লম্ফন আছে..
মুর্তজা বশীর: গ্লিটারিং আছে…
রাজু আলাউদ্দিন: চোখের ভাষায় উল্লাস আছে, আনন্দ আছে। কিন্তু বাঙ্গালির চোখের মধ্যে কিন্তু ওইটা নেই।
মুর্তজা বশীর: পরনির্ভরতা। একটা ব্যাথা।

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, এই চোখটা একটু অন্যরকম। আমি জানি না, আমি ভুল বুঝছি কিনা। এটা হলো ‘রিভিউ ফোর’। এটার মধ্যে ব্যাথার এক্সপ্রেশনটা কম মনে হচ্ছে। বিষাদটা কম মনে হচ্ছে।
মুর্তজা বশীর: এটাতে নিসঃঙ্গতার এক্সপ্রেশনটা আছে। পুরো ব্যাপারটায় সে কিন্তু একা। তুমি আরেকটা জিনিস দেখবে। পেইন্টারদের মধ্যে যারা ফিগার এঁকেছেন যামীনী রায়, ফার্নান্দ লেজার হোক, আমাদের মকবুল ফিদা হোসেন, কামরুল হাসান, জয়নুল আবেদীন, আধুনিককালের কাইয়ুম চৌধুরী– যেই হোক, সবার চেহারা কিন্তু এক। কারণ একটা ফরমেটে ফেলে দেয় তারা। যার ফলে সব চেহারা এক হয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এর কারণটা কী?
মুর্তজা বশীর: ঐ যে ফর্মেটে ফেলে দেয়, ফলে সব চেহারা এক হয়ে যায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কী উদ্ভাবনী বোধের অভাব, কল্পনাশক্তির অভাব?
মুর্তজা বশীর: না, না, এটা একটা ফর্মায় ফেলে দেওয়া হয়। তারা মনে করে শিল্প হলো বিশ্বজনীন। এই রমনী বিশ্বজনীন রমনী–এরা মনে করে। কিন্তু আমি মনে করি এবং পিকাসোও তাই বলতো ‘নো, এভরি ওমেন ইজ আ ইনডিভিজুয়াল ওমেন, নট আ ইউনিভার্সাল ওমেন’। তা না হলে তার সব ফিগার এক হলো না কেন?

রাজু আলাউদ্দিন: ডোরা মার, থেরেসা, …
মুর্তজা বশীর: অ্যাঙ্গুলার, ফ্রাঁসোয়া জিলোটের আলাদা, মারিয়া থেরেসা ওয়াল্টার আলাদা। পিকাসো যেটা করেছে,… আমি যখন সর্বপ্রথম ফিগারের মধ্যে যাবো,… বিটিসি আমাকে একটা ক্যালেন্ডার করতে দিয়েছিলো। বাংলা সাহিত্যের বারোজন রমনীকে নিয়ে। আনোয়ারা, পদ্মা নদীর মাঝি, আব্দুল্লাহ, লালসালু, জোহরা, তিতাস একটি নদীর নাম ইত্যাদি। তুমি দেখনি ওগুলো? এই বারটার মধ্যে ৫/৬টা প্রথম আলোতে বেরিয়েছিলো। সেগুলোর সঙ্গে আমার একটা লেখাও বেরিয়েছিলো।
রাজু আলাউদ্দিন: ও গুলো কি সব বিক্রি হয়ে গেছে?
মুর্তজা বশীর: ও গুলোতো ওরাই (বিটিসি) নিয়ে গেছে।

সবচেয়ে বিপদে পড়েছিলাম কাজী এমদাদুল হকের আব্দুল্লাহ করতে গিয়ে। এটাতে তো পুরুষকেন্দ্রিক নায়িকা। নায়িকা তিনবার আসে। প্রথমবার যখন দেখা হলো সে জায়নামাজে বসে, আরেকবার মোনাজাত করছে, শেষবারে তো সে মৃত। এটাকে আমি আঁকবো কীভাবে? আমার পক্ষে খুব কঠিন হয়ে গেলো। আমি প্রত্যেকটা উপন্যাস পড়েছি, সেই সঙ্গে তাদের আলোচনা পড়েছি বোঝার জন্যে। তখন আমি দেখলাম এই আব্দুল্লাহর নায়িকা সালেহা অন্তপুরবাসিনী, পর্দানশিন। স্বামীর সঙ্গেও দেখা করতে পারে না। আমি করলাম কী, খড়খড়িঅলা একটা দরজা যার খড়খড়িগুলো বন্ধ, তার শাড়ী চেক/খোপ কাটা মানে প্রিজনে বন্দী। জানালার ফাঁক দিয়ে জায়নামাজ দেখা যাচ্ছে। পেছনে একটা জানালা, বাইরে থেকে বাতাস আসছে। পর্দাটা দুলে উঠছে। উপরে আল্লাহ, মোহম্মদ (সাঃ) লেখা একটা কাবা শরীফের ছবি।
রাজু আলাউদ্দিন : একসিলেন্ট এক্সপেশন ।
মুর্তজা বশীর: আনোয়ারার আমি আঁকলাম কী– আনোয়ারা অ্যাম্ব্রয়ডারির কাজ করে পুরস্কার পেয়েছিল। তার স্বামী পাটের ব্যাবসা করে। আমি করেছি কী– বিয়ের রাতে সে স্বামী নরুল ইসলামকে কি দিচ্ছে? একটা ভেলভেট/রেশমী কাপড়ে মোড়ানো জুতা। জুতা দেখা যাচ্ছে না। নুরুল ইসলাম এ জুতা ফেলে চলে গিয়েছিল যখন তার জ্বর হয়েছিল। এইভাবে আমি একটার পর একটা ইন্টারপ্রেট করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: এর মধ্যে লালসালু ছিলো কী?
মুর্তজা বশীর: লালসালু করতে গিয়ে আমার মাথা খারাপ অবস্থা। লালসালু র প্রধান বিষয়টা কি, যে কুলসুম কবরের উপর পা তুলে দিয়েছে। কুলসুম যে কিনা পীরের বউ। আমি দেখলাম যে আমি যদি কবরের উপর পা তোলা দেখাই বিরাট সমালোচনা হয়ে যাবে। আমি করলাম কী, ঘরের ভিতরে একটা পার্টিশান, ঘরের ভিতর দিয়ে অন্যপাশ দেখা যাচ্ছে, সেখানে লালসালু আছে। কিন্তু পীরের বউ, সে তো পর্দানশীন হবে– কিন্তু তাকে আমি এমনভাবে এক্সপোজ করলাম যে তার সেক্সুুয়ালিটি নিয়ে এলাম, তার যে ব্রেস্ট আছে, চুল আচড়াচ্ছে বসে–এগুলো দেখানো হয়েছে। এখানে আমি রিভোল্ট(বিদ্রোহ)টা দেখালাম।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ওইটা দেখাতে পারলেন না কিন্তু প্রতিশোধ নিলেন এভাবে। মানে কবরে পা তোলা দেখাতে পারলেন না কিন্তু ওইটার প্রতিশোধ হিসেবে এভাবে আঁকলেন।
মুর্তজা বশীর: বিদ্রোহ।

রাজু আলাউদ্দিন: এটা কী ওর বিদ্রোহ? আপনার বিদ্রোহ না ?
মুর্তজা বশীর: না, আমার বিদ্রোহ মানে, আমি ওইভাবে দেখালাম। পীরের বউ তো খুব পর্দানশীন থাকবে। সে এরকম একটা ওপেন সেক্সুয়াল অ্যাপিল নিয়ে থাকবে কেন?

রাজু আলাউদ্দিন: আচ্ছা, এবারের প্রদর্শনীতে আপনার তিন ধরণের কাজ। একটা হলো অয়েল প্যাস্টেল, আরেকটা ছিল ড্রয়িং। অয়েল প্যস্টেলের কাজ কি এবারই প্রথম করলেন?
মুর্তজা বশীর: অয়েল প্যাস্টেলের কাজ আমি প্রথম করি কলকাতায় ১৯৫৪ সালে। আমি যখন এখান থেকে পাশ করার পরে এখানকারই অধীনে আশুতোষ মিউজিয়ামে টিচার ট্রেনিং সার্টিফিকেট কোর্স করতে যাই, সে সময় আমি অয়েল প্যাস্টেলে দুটো ‘সেল্ফ পোর্ট্রটে’ করেছিলাম। একটা মে মাসে, আরেকটা ডিসেম্বর মাসে। সে সময় দুই তিনটা পেইন্টিংও করেছিলাম। তারপরে আর অয়েল প্যাস্টেলে কখনও কাজ করিনি। এবার করার কারণ হলো ডাক্তার আমাকে এখনও তারপিন দিয়ে কাজ করতে নিষেধ করছে। কারণ আমার ফুসফুসে সেটা এফেক্ট করে। তো বড় কাজ করা নিষেধ। এখনও ওইভাবে করা যাবে না। তো আমার কাছে.. আমি তো খুব বিত্তবান না। নানা সাইজের কাজের পরে ওই টুকরা বেরিয়ে যায়.. ওই টুকরাগুলো না ফেলে জমিয়ে রেখেছিলাম। এতো ছোট কাজ কিন্তু আমি কোনোদিন করিনি। এই প্রথম কিন্তু ছোট ছোট কাজ, এতো ন্যারো। কারণটা হলো ওইটা। তারপরে এই জন্যে আমি অয়েল প্যাস্টেল করলাম। আমার পুত্রবধু রেজোয়ানা আমার জন্য অয়েল প্যাস্টেল নিয়ে আসল। ওইগুলো দিয়ে আমি করা শুরু করলাম।

রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা ব্যাপার কোলাজ অন বোর্ড, কোলাজ করেছেন, কিন্তু কোলাজ অন বোর্ড এটা আগে কখনও আমার চোখে পড়েনি।
মুর্তজা বশীর: আমি সর্বপ্রথম কোলাজ করেছি যখন ফ্রান্সে ছিলাম আমি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেগুলো বোধহয় কোলাজ অন বোর্ড ছিলো না।
মুর্তজা বশীর: না, বোর্ড, বোর্ড ছিলো, কিন্তু সেটা পিচ বোর্ডে ছিল। এগুলো মেসোনেটেড বোর্ডে করা। আরেকটা আছে ক্যানভাসে করা। ‘ওমেন ওয়ান’ ক্যানভাসে করা। বিকিনি পড়াটা ক্যানভাসে।
(এ পর্যন্ত ক্যামেরায় রেকর্ড করার পর চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় কথোপকথনের পরবর্তী অংশটি মোবাইল রেকর্ডারে ধারণ করা হয়। )
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো আর কবিতা লিখলেন না, মানে লেখার ধারাবাহিকতা রাখলেন না..
মুর্তজা বশীর: আমি ফ্রান্সে থাকাকালে কবিতা লিখলাম। আমি বললাম না, আমি জেলখানায় ছিলাম ১৯৫০ সালে। হাজং, তেলেঙ্গানা, কাকদ্বীপে লিবারেশন ওয়ার শুরু হয়েছে। সেই সময় জেলে বসে কিছু কবিতা লিখেছি কোরিয়া যুদ্ধের উপর। কোরিয়া জয় করছে। ওইগুলো সুকান্ত দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিল। সেই সময় যেহেতু বাম রাজনীতি করতাম, সেই সময় কতোগুলো বই আমার পড়তে হতো। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বই, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসুর বই।

রাজু আলাউদ্দিন: যারা বামপন্থী লেখক ছিলেন আর কি..
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, তাদের বইগুলো পড়তে হতো। তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সেই সময়ে আমি কবিতাগুলো লেখি। যার বেশীরভাগ ছিল..

রাজু আলাউদ্দিন: গোলাম কুদ্দুস, তাকে দেখেছেন কখনও?
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, তিনি আমার কলকাতার বাসায় এসেছেন। যাইহোক, পরে ওই পুরা খাতাই চুরি হয়ে গেছে। তারপরে আমার সর্বপ্রথম প্রকাশিত কবিতা হলো ‘পারবে না’ বলে একটা কবিতা। ভাষা আন্দোলনের সময় সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ছাপা হয়।

রাজু আলাউদ্দিন: পরিচয় মানে কী, সুধীন দত্ত সম্পাদিত?
মুর্তজা বশীর: হ্যাঁ, ওইটাই, সুধীনের পরে এসেছেন তিনি(সুভাষ মুখোপাধ্যায় )। ওইটাই কিন্তু পূর্বপাকিস্তান থেকে কোনও লেখকের ভাষা আন্দোলনের ওপর প্রকাশিত প্রথম লেখা। এটা জানলাম, আবুল আহসান চৌধুরীর একটা লেখা পড়ে।

রাজু আলাউদ্দিন: শামসুর রাহমান কী বললেন এটা পড়ে?
মুর্তজা বশীর: শামসুর রাহমানকে আমি বললাম ১৯৬৯ সালের দিকে। তার একটা বই, ওইটা বোধহয় ১৯৭০ সালের দিকে নিজ বাসভূমে। ওইটা আমাকে দিয়ে প্রচ্ছদ করিয়েছিল সে। আমি সাধারণত প্রচ্ছদ করি না। যেমন আমি হাসান হাফিজুর রহমানের বিমুখ প্রান্তর করেছি। আলাউদ্দিন আল আজাদের সূর্য জ্বালার সোপান-এর প্রচ্ছদ করাবার জন্য সে চিঠি লিখলো। আমি পুরোটা না পড়েই দুমড়ে মুচড়ে ফেলে দিয়েছি। পরে আমার মনে হলো ‘পুনশ্চ’ দিয়ে কি যেনো লেখা ছিল। আমি আবার কুড়িয়ে দেখলাম। লেখা আছে– ‘আপনি শুনে খুশি হবেন আমার একটা সন্তান হয়েছে।’ আলাউদ্দিনের দীর্ঘদিন পরে সন্তান হয়। আমি এতো খুশি হয়েছি, আমার বন্ধুর অনেকদিন পর সন্তান হয়েছে।

আমি প্রচ্ছদ কখনো পয়সার বিনিময়ে করিনি। শুধু আমার বাবার কাছ থেকে পয়সা নিয়েছি, বাবার ‘বিদ্যাপতি শতক’ বইটার কভার করতে পয়সা নিয়েছিলাম। এটা ১৯৫৪ সালে বের হয়, বাবা বললেন প্রচ্ছদ করে দাও। আমি বললাম কতো পয়সা দিবেন? বাবা অবাক হয়ে বললেন, আমি তোমাকে পড়ালাম, তার জন্য পয়সা খরচ হয়নি? আমি বললাম আপনি আমাকে পড়িয়েছেন সেটা আপনার কর্তব্য। আমার বাবা তখন একশো টাকা দিয়ে কভার করাতেন। আমি বললাম আমাকে হাফ দেন। বাবা আমাকে তখন পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলেন। তো যাই হোক, শামসুর রাহমান কিন্তু আমাকে একটা বই উৎসর্গ করেন যেটা অনেকে জানে না। ‘খাজা ফরিদের কবিতা’। সিন্ধের মিস্টিক পোয়েটের কবিতার অনুবাদ । তার ওই বইটা কিন্তু আমাকে ডেডিকেট করা। ওই সময় আমি শামসুর রাহমানকে বললাম, অনেক সময় অনুভূতিতে গাছের পাতার মতো আসছে, মনের মধ্যে আলোড়ন উঠছে, একটা মেয়ে যাচ্ছে, বাতাসে তার চুল উড়ছে–এগুলো তো ছবিতে আঁকা যায় না। ছবি আঁকলেতো এটা ইলাস্ট্রেশন হয়ে যাবে। আমার কবিতা লেখার ইচ্ছা করে। বলে আরে রাখেন, ছবি আঁকার মধ্যে আবার কবিতা। শুনে মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। অপমানবোধ করলাম। ফ্রান্সে বসে কবিতা লিখলাম। ফিরে আসার পরে দেখা। আমাকে বললেন, আমার বাসায় আসেন। তো তিনি আমার পান্ডুলিপি পড়েন আর টিক চিহ্ন দেন। বললেন আপনি এই দুই তিনটা কবিতা আমাকে কপি করে দিয়েন আমি ‘গণসাহিত্য’ পত্রিকায় ছাপাবো। আমি বললাম গণসাহিত্যটা কী। বললেন ওই ‘পরিচয়’-এর মতো একটা। আবুল হাসনাত আর মফিদুল হকের। আমি বললাম ছাপবে তো? দেখি তার মুখচোখ লাল হয়ে গেছে। বললেন, আমি নিজে হাতে দিচ্ছি– ছাপবে না? আমি বললাম ও আচ্ছা, খাসির পাছায় সিল মেরে দিলেন–এক নম্বর না দুই নম্বর খাসি। শামসুর রাহমান কিন্তু প্রথম আমাকে বললো, আপনি এটা বই আকারে বের করেন। আমি ব্যাকপেইজ লিখে দেবো। তখন কিন্তু অনেকেই শামসুর রাহমানকে লিখতে বলতেন। তখন তো শামসুর রাহমান খ্যাতিমান। ১৯৭৫ সালের কথা বলছি । কিন্তু সে কারও জন্যেই লিখতো না। আমার বইতেই সে প্রথম লিখল।

রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে আপনি তো স্বীকৃত কবি। আপনি লেখেন না কেন?
মুর্তজা বশীর: আমি কবি না। আমার যে অনুভূতি, আমার যে চিন্তা সেটা নানা মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। যেমন প্যাস্টেলে করেছি। সেই রকম, সেটার জন্য যদি কবিতা প্রয়োজন হয় কবিতা লিখেছি। সেটার জন্য যদি উপন্যাস হয় উপন্যাস করেছি। সেটার জন্য যদি এচিং হয় এচিং করেছি। মূল হলো যে আমার অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করা। আমার এখন সেরকম অভিজ্ঞতা কিছু হয় না। ‘বিচিত্রা’য় একটা ইন্টারভিউ হয়েছিল সেটায় আমি বলেছিলাম যে আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না। আমার হৃদয়ে যখন রক্তক্ষরণ হয় তখনই আমি লিখি।

(সাক্ষাৎকারটির লিখিত রূপ শিল্পী কর্তৃক সংশোধিত।)

(শ্রুতিলিখন ও ভিডিওধারণ: চিন্তামন তুষার।)
Flag Counter


3 Responses

  1. তাপস গায়েন says:

    সাক্ষাৎকারটি শুনছিলাম, যা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে ! শিল্পী হিসেবে মুর্তজা বশীর এই বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের ঐতিহ্যকে ধারণ করে গণমানুষের জীবনগাথা এঁকেছেন ; সেইসূত্রে, যামিনী রায় এবং কামরুল হাসানের কাজের কথা এসেছে । যদিও প্রভাবহীন, তা যতই অনুচ্চারিত থাকুক না কেন, কোন সৃজন-প্রক্রিয়া নেই, সেই ব্যাপারটি শিল্পী মুর্তজা বশীর শেষাবধি মেনে নিয়েছেন ; কারণ, এইটি কবি-প্রাবন্ধিক-অনুবাদক রাজু আলাউদ্দিনের সাহিত্য-চিন্তার একটি প্রিয় অনুষঙ্গ । কবি রাজু আলাউদ্দিন এবং শিল্পী মুর্তজা বশীর শেষাবধি ঐক্যমতে এসেছেন । দেখে ভালো লাগল । প্রানবন্ত সাক্ষাৎকারটি আপলোডেড ভিডিওতে কি অপূর্ণ হয়ে আছে ? কারণ, ভিডিওটি হঠাৎ করে থেমে গেল । ধন্যবাদ কবি রাজু আলাউদ্দিন এবং শিল্পী মুর্তজা বশীরকে ।

  2. Anisuz Zaman says:

    my wife loved his paints and i loved paints and interview. thanks a lot for both.

  3. সৈকত রুশদী says:

    চমৎকার | চেনা মুর্তজা বশীরকে আবারও খুঁজে পাওয়া গেল তাঁর আপন ভুবনে বহুদিন পরে | বিস্তারিত সাক্ষাত্কার এবং তা’ ভিডিওতে ধারণের জন্য রাজু আলাউদ্দিনকে ধন্যবাদ |

    সাক্ষাতকারে বলা হয়েছে “শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই জুনের বক্তৃতার পর,”| ধারণা করছি উল্লিখিত শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতার ৭ই জুন তারিখটি সম্ভবত: ৭ই মার্চ ১৯৭১ হবে | যদি তাই হয়, তবে শিল্পীর সাথে কথা বলে তারিখটি সংশোধন করে দেওয়া প্রয়োজন | লেখা ও ভিডিও দুটোতেই | শেখ মুজিবুর রহমানের নামের বানানটিও সংশোধন করা দরকার | নাহলে ভবিষ্যতে এই তারিখ উল্লেখ এবং তা’ করার পিছনে মুর্তজা বশীরের উদ্দেশ্য খোঁজা হবে | তাঁর বয়স (৮৪) বিবেচনা না করে, একটি বা দু’টি ‘ভুল’ নিয়ে তাঁর পুরোটা জীবন ও অবদানকে মূল্যায়নের অপচেষ্টা করা হবে বলে আশংকা থেকেই যায়!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.