শিল্পীর শ্রেষ্ঠত্ব

মুহম্মদ নূরুল হুদা | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ৮:৩১ অপরাহ্ন

border=0সম্রাজ্ঞী তিনি। আর অভিমানী। না, তিনি কোনো সম্রাটের ঘরনী নন। তিনি ফিরোজা বেগম। তিনি আমার দেখা নজরুল সঙ্গীতের অবিসম্বাদিত শ্রেষ্ঠ শিল্পী । আমি নজরুল সঙ্গীতের কিংবদন্তীর শিল্পী আঙুরবালা, ইন্দুবালা, যুথিকা রায়, কে মল্লিক, ধীরেন্দ্র চন্দ্র মিত্র বা আব্বাসউদ্দিন আহমদসহ আরো অনেককেই চাক্ষুষ দেখিনি। কিন্তু যাদের দেখেছি তাদের মধ্যে চলনে-বলনে-অর্জনে তাকেই সম্রাজ্ঞী বলে মেনে নিয়েছি। কেননা তার সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম দিন থেকেই বুঝেছি অন্য কারো মতো তিনি নন। তিনি কেবল নিজের মতো। আপন মুদ্রাদোষে বা মুদ্রাগুণে আপনি মহিয়সী এক শিল্পী : তিনি আপসহীনা, তুলনাহীনা। আর সবার ওপরে, অভিমানী। আর এসব মিলিয়েই শিল্পী হিসেবে তার শ্রেষ্ঠত্ব।

প্রথম সাক্ষাৎটি হয়েছিলো, যতদূর মনে পড়ে, তার বাসাতেই। তারই আমন্ত্রণে নজরুল ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে গিয়েছিলাম কালিন্দী অ্যাপার্টমেন্টে। প্রস্তুতি ছিলো গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার। কারণ লোকমুখে শুনেছি, তিনি দর্শনার্থীদের সঙ্গে একটু বিলম্বেই দেখা করতে আসেন। হয়তো তিনি বাসায় যে অবস্থায় থাকেন বা থাকতে পছন্দ করেন, সর্বজনসমক্ষে বা অন্যের সঙ্গে ভাববিনিময়ের মুহূর্তে সে-রকম ইনফরমাল থাকতে পছন্দ করতেন না। বিষয়টি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এ-কারণে যে, সচেতন শিল্পী বা স্রষ্টারা যা করেন, তার পেছনে বা অলক্ষে তাদের জীবনযাপনের একটি অন্যরকম দর্শন রেখায়িত থাকে। আবার একই ব্যক্তির ভিতরে আটপৌরে মানুষ ও শিল্পী মানুষ অবস্থান করলেও সবসময়ে অভিন্ন হয়ে থাকতে পারে না। ব্যতিক্রম যে নেই এমন নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্ববান ও সচেতন শিল্পীদের মধ্যে এ দুই সত্তার সযত্ন লালন একটি সহজাত প্রক্রিয়া। শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীতের এ-যাবৎকালের শ্রেষ্ঠ সাধক ফিরোজা বেগমের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। এর ফলে বাংলা ভাষাভাষী সঙ্গীতবোদ্ধাদের কাছে অসম্ভব জনপ্রিয় ও মনপ্রিয় শিল্পী হওয়া সত্বেও তার প্রকাশ্য বিচরণ বরাবরই সীমিত ছিল। আমি যতবার তার সঙ্গে কথা বলেছি, ততবার তার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্মুখী অভিমান প্রত্যক্ষ করেছি। তিনি মনে করতেন, নজরুলকে যেভাবে ব্যবহার করা প্রয়োজন, আমরা সেভাবে পারছি না। গলদটা আমাদের সাধ্যের নয়, বরং সাধের ও পরিকল্পনার। লক্ষ্যার্জনে সরকারি বেসরকারি কোনো মহলের উদ্যোগকেই পর্যাপ্ত মনে করতেন না তিনি। নজরুলকে নিয়ে এক ধরনের ব্যবসা চলছে, স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছেন নজরুল – ইত্যাকার ভাবনা তাকে নিরন্তর কষ্ট দিয়েছে। ঠিক একই কথা ভাবতেন নিজের সম্পর্কেও। এই উক্তি ও উপলব্ধিতে অবশ্যই সত্যতা আছে। কেননা যে কারণেই হোক, নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিসাধনার এই প্রত্যক্ষ সাক্ষীর কাছ থেকে যে-পরিমাণ সম্পদ আহরণ ও সংরক্ষণ করার কথা ছিল, আমরা তার ছিটেফোটাও সংগ্রহ করতে পারিনি। এই দায় আমাদের প্রায় সকলের, আমরা যারা নজরুলকে বাঙালির স্বাতন্ত্র্যসূচক স্বাধীন সত্তার ও ব্যতিক্রমী নান্দনিকতার প্রবক্তা বলে মনে করি।
firoza-1.jpg
চিত্র: ফিরোজা বেগমের গানে মুগ্ধ নজরুল
মুসলমান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করে সেই শৈশব-কৈশোরেই তিনি সঙ্গীতের তালিম নেন। আর তার পরপরই নজরুলের সান্নিধ্যে আসেন। অতঃপর আর পেছন ফেরা নেই। বিশশতকের সেই তিরিশের দশক থেকে শুরু করে মৃত্যুর পূর্ববর্তী সচেতন মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি প্রধানত নজরুল সঙ্গীতের চর্চা, সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ ও বিশুদ্ধায়নে সমর্পিত ছিলেন। জানা যায়, প্রায় ষোলো-শ নজরুল সঙ্গীত গেয়েছেন তিনি। এতো অধিক গান আর কোনো শিল্পী গেয়েছেন কিনা আমাদের জানা নেই। আবার এর অধিকাংশই রেকর্ড আকারে সংরক্ষিত। অর্থাৎ নজরুল বিরচিত, সুরারোপিত ও তার গীত প্রায় সব গানই তিনি কণ্ঠে ধারণ করেছেন এবং তার প্রামাণ্য রূপটি ধারণ করে রেখেছেন। ফলে তিনি নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। সামগ্রিক বিবেচনায় ফিরোজা বেগম ছিলেন নজরুল সঙ্গীতের জীবন্ত ও প্রামণ্য রেকর্ড । দেখা গেছে, গানের সুর বা বাণীর ক্ষেত্রে কোনো মতভেদ দেখা গেলে তিনিই সকলের কাছে গ্রাহ্য সমাধান। আর এ-কারণে নজরুল ইনস্টিটিউটে শুদ্ধ সুর ও বাণীতে নজরুল সঙ্গীত চর্চা ও প্রমিতকরণের জন্যে সরকার কর্তৃক নিযুক্ত যে কমিটি আছে, সুস্থ ও কর্মক্ষম অবস্থায় তিনিই ছিলেন তার সভাপ্রধান। তার তিরোধানের ফলে এই প্রমিতায়নের ক্ষেত্রে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো।
firoza-2.jpg
চিত্র: ১৯৫০ সালে বিয়ের পরে, স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও বন্ধুদের সাথে কমল দাশগুপ্ত (ডান দিক থেকে দ্বিতীয়)
নজরুলের গান কেবল কাব্যগীতি নয়, রাগ-শাসিতও বটে। তার গান গাইতে হলে গানের বাণী, মমার্র্থ ও সুরের মধ্যে যে ভারসাম্যময় আন্তসম্পর্ক বিরাজমান তাকে যথাসম্ভব ‍অনুধাবন প্রয়োজন। তার জন্যে আবশ্যক দীর্ঘ প্রস্তুতি। জানা যায়, কমল দাশগুপ্ত ও নজরুলের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কোনো কোনো গান পূর্ণাঙ্গভাবে রপ্ত করে পরিবেশন করতে তিনি মাসাধিক কাল সময়ও ব্যয় করেছেন। এই নিষ্ঠা ও সাধনা এ-কালে দুর্লক্ষ্য। তাই ফিরোজা বেগমকে নজরুলের আদর্শ শিল্পী হিসেবে নমস্য মানেন উত্তরপ্রজন্মের শিল্পীরা। যতদূর জানা আছে, নজরুল সঙ্গীতশিল্পীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা পথিকৃতের।
border=0
ফিরোজা বেগমের শিল্পীসত্তার আরেক উপাদান তার অনমনীয় ব্যক্তিত্ব। কোনো কিছুর সঙ্গে আপস করা তার স্বভাবজাত ছিল না। তাই নানা সময়ে তিনি ভুল বোঝাবুঝির শিকার হয়েছেন। কিন্তু ইতিবাচক দিকটি এই যে, সবকিছু সত্বেও তিনি সর্বমহলের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। বাংলাদেশের সমকালীন শিল্পীদের মধ্যে তার ক্ষেত্রেই সর্বাগ্রে সর্বজনশ্রদ্ধেয় অভিধাটি প্রযোজ্য বলে মনে করি। তাকে সম্মান জানিয়ে তার স্মৃতিতে এমন একটি পুরস্কার প্রবর্তন করা যায়, যা হবে নজরুল সঙ্গীতের জন্যে শ্রেষ্ঠ সম্মান ও স্বীকৃতি। একটি বিশদ ও সুসম্পাদিত স্মারকগ্রন্থে তার জীবন ও সাধনা দলিলায়িত করে রাখাও আমাদের জন্যে করণীয় হিসেবে গণ্য। তার জীবনের অনুদ্ঘাটিত তথ্য আহরণ ও তার শিল্পীসত্তার ইতিবাচকতাকে ব্যবহার করে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করার সুফল ভোগ করবো মূলত আমরাই।

অনন্য গায়কী ও পরিবেশনভঙ্গির অধিকারী ফিরোজা বেগমের অবদানকে নিজেদের মতো ব্যবহার করার মাধ্যমেই উত্তরপ্রজন্মের নজরুল-সাধকরা তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। ‘আমায় নহে গো, ভালোবাসো মোর গান’। না, আমরা অভিমানী সম্রাজ্ঞীর এই অভিমানকে মান্য করবো না। আমরা যুগপৎ ভালোবাসবো তাকেও, তার গানকেও। আমরা বলবো, তোমার শ্রেষ্ঠ কীর্তি তোমার গান; আর তুমি যথার্থই তোমার কীর্তির সমান।
১১.০৯.২০১৪

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন manik boiragi — সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৪ @ ১১:৩৯ অপরাহ্ন

      মুহম্মদ নুরুল হুদার এ নিব্ন্ধটি আমাকে অনেক বিষয় জানা হলো,নজরুল আকাশে ফিরুজা বেগমই শ্রেষ্ট।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন manir yousuf — সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৪ @ ১১:৪৬ অপরাহ্ন

      কবি মুহম্মদ নুরূল হুদা কবিতায় যেমন শক্তির পরিচয় দেন, তেমনিভাবে গদ্যেও, উনার থেকে অনেক কিছু শিখেছি জীবনে্। গদ্য লেখা থেকে শুরু করে, কবিতার বয়ন ও বুননসহ অনেক কিছু। যাপনের ভেতর কবিতাকে কিভাবে শিল্প করে তোলতে হয়; তাও শিখেছি উনার থেকে। এ গদ্য থেকেও শিখলাম, জানলাম অনেককিছু।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আজম মাহমুদ — সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৪ @ ৮:৩৬ পূর্বাহ্ন

      ‘আমরা অভিমানী সম্রাজ্ঞীর এই অভিমানকে মান্য করবো না। আমরা যুগপৎ ভালোবাসবো তাকেও, তার গানকেও।’ এর চেয়ে সুন্দর কথা আর কি হতে পারে, যখন আমরা এমন গানের পাখীকে হারিয়ে ফেলি। উনি ছিলেন আমাদের মানসে, মননে নজরুলের ছায়া হয়ে। আমরা উনাকেও হারালাম প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে।

      হৃদয়ে গেঁথে রাখা ছাড়া আমাদের আর কিছু করবার নেই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Maya Rahman — সেপ্টেম্বর ১৩, ২০১৪ @ ১২:৫৬ পূর্বাহ্ন

      ফিরোজা বেগম না থাকলে নজরুল সংগীত কেমন হওয়া উচিত তাই-ই হয়তো জানতাম না। উনি নজরুল সংগীতকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।

      লেখকের প্রতিবেদনে বলা আছে ফিরোজা বেগম প্রায় ১৫০০ গান গেয়েছেন। কোথাও এক জায়গায় এই গানগুলো পাওয়া যাবে?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prangbasak — সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৪ @ ৯:৪৫ অপরাহ্ন

      lekhati khub valo laglo…ebong anek kichu jante parlam..aamora shigdho holam..

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Abu Raihan — সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৪ @ ৮:০০ অপরাহ্ন

      Ami Firoza Begam-er Nazrul sangeet er bhakta shrota, pratibedak sathik bhabe likhechen, tanr moto darad diye, anyo kono shilpi emon kore hriday chuye joa gaan gaite pareni.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com