অনুবাদ, উপন্যাস, বিশ্বসাহিত্য

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:

নিঃসঙ্গতার একশ বছর

anis_uzzaman | 6 Sep , 2014  

border=0বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে নিঃসঙ্গতার একশ বছর-এর মতো আর কোনো উপন্যাস প্রকাশের পরপরই এতটা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে কিনা সন্দেহ। জনপ্রিয়তার বিচারে যেমন, তেমনি শিল্পকুশলতা আর শিল্পমুক্তির ক্ষেত্রেও এটি হয়ে উঠেছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। কেবল স্প্যানিশ সাহিত্যেই নয়, গোটা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসেই একটি মাত্র উপন্যাসে ইতিহাস, আখ্যান, সংস্কার, কুসংস্কার, জনশ্রুতি, বাস্তব, অবাস্তব, কল্পনা, ফ্যান্টাসি, যৌন-অযাচার ও স্বপ্ন– সবকিছুর এমন স্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য সহাবস্থান আগে কখনও দেখা যায়নি।
ঠিক এই কারণে মারিও বার্গাস যোসা এটিকে বলেছিলেন এক সামগ্রিক উপন্যাস (Novela Total), আর পাবলো নেরুদা একে বলেছিলেন, “সের্বান্তেসের ডন কিহোতের পর স্প্যানিশ ভাষায় সম্ভবত মহত্তম উন্মোচন (“perhaps the greatest revelation in the Spanish language since Don Quixote of Cervantes.”)
বাংলাদেশে এখনও পর্যন্ত কিংবদন্তিতুল্য এই উপন্যাসটি মূলভাষা থেকে অনূদিত হয়নি। এই প্রথম এটি আনিসুজ্জামানের অনুবাদে মূল থেকে ধারাবাহিক অনূদিত হচ্ছে। বি. স.

অনুবাদ: আনিসুজ্জামান

———————————————————————————
ধারাবাহিক উপন্যাস । কিস্তি ৩

যাতে করে পৃথিবীর সবাই চলে যায় তাঁবুতে, আর এক সেন্টের বিনিময়ে দেখতে পায় বলিরেখাহীন, নতুন ঝকমকে দাঁতসহ এক যুবক মেলকিয়াদেসকে। স্কার্ভিতে ক্ষয়ে যাওয়া দাঁত, তোবরানো গাল আর চুপসে যাওয়া ঠোঁটের কথা যাদের মনে ছিল ভয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় তারা জিপসীর অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতা দেখে। এই ভয় আতংকে পরিণত হয় যখন মেলকিয়াদেস তার মাড়ি সংলগ্ন অক্ষয় দাঁতগুলোকে বের করে দর্শকদের দেখায় মুহুর্তের জন্য–আর তাৎক্ষনিকভাবে সে রূপান্তারিত হয় আগের বছরগুলোতে দেখা একই লোকে। ওগুলোকে সে আবার লাগিয়ে যৌবনকে ফিরিয়ে এনে নতুন করে কর্তৃত্বময় হাসি আসে। স্বয়ং হোসে আর্কাদিও বুয়েনদিয়া মনে করে মেলকিয়াদেসের জ্ঞান অসহ্য রকমের চরম অবস্থায় পৌঁছে গেছে, কিন্তু যখন জিপসী লোকটা তার সঙ্গে একাকী নকল দাঁতের কারিগরি খুলে বলে তখন অনুভব করে এক পরিপূর্ণ প্রসন্নতা। এটা তার কাছে একই সঙ্গে এতই সহজ আবার জ্ঞানময় মনে হয় যে আলকেমি নিয়ে গবেষণা করার সমস্ত আকর্ষণ তার রাতারাতি উবে যায়; নতুন করে সে ভোগে বদমেজাজে, আর সময় মত না খেয়ে সাড়া বাড়িময় ঘুরে বেড়িয়ে দিন কাটায়। “পৃথিবীতে অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটে চলছে” বলে উরসুলাকে, “ঐখানে, নদীর অপর পাড়ে আছে সব রকমের যাদুকরী যন্ত্রপাতি আর আমরা কিনা দিন কাটাচ্ছি গাধার মত”। যারা ওকে মাকোন্দোর পত্তনের সময় থেকে চিনত তারা আশ্চর্য হতো এটা দেখে যে মেলকিয়াদেসের প্রভাবে সে কতই না বদলে গেছে।

প্রথম দিকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ছিল তরুণ গোত্রপতি ধাঁচের, যে চাষাবাসের শিক্ষা দিত, বাচ্চাকাচ্চা আর জীবজন্তু লালন পালনের উপদেশ দিত, সর্বক্ষেত্রেই সাহায্য করত–এমনকি শারিরীক ভাবেও —গোত্রের অগ্রগতির জন্য। যেহেতু প্রথম থেকেই তার বাড়িটা ছিল গাঁয়ের সেরা, তাই অন্য বাড়িগুলোও তৈরি হয়েছিল তারই আদলে এবং একই রকমে। বসার ঘরটা ছিল বেশ বড় এবং আলোময়, উঠোনের মত খাবার ঘর আনন্দময় রংয়ের ফুল দিয়ে সাজানো, দুটো শোবার ঘর, বিশাল চেষ্টনাট গাছসহ এক উঠোন, সাজানো ফলমূলের বাগান আর শান্তিতে এক সঙ্গে বসবাসরত ছাগল, শুয়োর আর মুরগীর খোয়াড়। শুধু তার বাড়িতেই নয়, সমস্ত গ্রামেই, যেটা এক মাত্র নিষিদ্ধ প্রাণী ছিল, সেটা হলো লড়াইয়ের মোরগ।

স্বামীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করার ক্ষমতা ছিল উরসুলার। কর্মঠ, ছোটখাটো, কঠোর, যে মেয়েটা ছিল অবিনাশী স্নায়ুশক্তির অধিকারী, জীবনে কেউ তাকে গান গাইতে শোনেনি, তার উপস্থিতি ছিল সব সময় ডাচ্ লিনেনের স্কার্টের মৃদ্যু খসখসানীসহ সকাল থেকে রাত পর্যন্ত। পেটানো মাটির মেঝে, চুনকালিবিহীন কাদার দেয়াল, নিজেদের তৈরি করা সাদামাটা আসবাবপত্র ছিল সব সময় পরিস্কার। আর যে পুরোনো সিন্ধুকে কাপড়চোপড় রাখা ছিলো, সেখান থেকে বের হতো তুলসী পাতার মৃদু গন্ধ।
হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ছিল গায়ের সবচেয়ে উদ্যমী লোক, ওরকম উদ্যামী লোক গ্রামে আর কখনই দেখা যাবে না। বাড়িগুলোকে সে এমনভাবে বসিয়েছিল যে সব বাড়ি থেকেই নদীতে আসতে পারত সবাই এবং পানি নিতে পারত একই পরিশ্রমে। রাস্তাগুলোকে সে এমনভাবে সারি করেছিল যাতে গরমের সময় কোন বাড়িই একটার চেয়ে অপরটা বেশী রোদ না পায়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে, তিন শ’ অধিবাসীর মাকন্দো ছিল যে কোন চেনাজানা গ্রামের চেয়ে অনেক বেশি সাজানো এবং শ্রমসাধ্য। সত্যিকার অর্থে ছিল এক সুখী গ্রাম। যেখানে কারোর বয়স তিরিশের বেশী ছিল না এবং কেউ মারা যায়নি।

বসতি স্থাপনের সময় থেকেই হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বানাতো ফাঁদ আর খাঁচা। অচিরেই সে টুর্পিয়াল, ক্যানারি, আসুলেহোস আর পেতিররোহোস পাখি দিয়ে শুধু নিজের বাড়িই নয়, পুরো গ্রামটাই ভরে ফেললো। এতসব পাখির সমবেত গান এতই হতবুদ্ধিরকর হয়ে ওঠে যে উরসুলা মোম দিয়ে কান বন্ধ করে রাখতো যাতে সে বাস্তববোধ হারিয়ে না ফেলে। মেলকিয়াদেসের গোষ্ঠিটা যখন প্রথমবার এসে মাথাব্যাথা সারানোর কাঁচের গুলি বিক্রি করলো তখন সবাই অবাক হয়েছিল যে কি করে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন জলাভূমিতে হারিয়ে যাওয়া এই গ্রামটাকে ওরা খুঁজে পেয়েছে আর জিপসীরা জানালো যে পাখীর কলতান শুনেই তারা দিক খুঁজে পেয়েছে।

তার সেই সামাজিক উদ্দীপনা অল্প সময়ের মধ্যেই উবে যায় চুম্বকের মোহ, জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ, পদার্থ রূপান্তরের স্বপ্ন, আর বিশ্বের অত্যাশ্চর্যকে জানার তাড়নায়। উদ্যমী আর পরিচ্ছন্ন এক লোক থেকে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া পরিণত হয় এক অলস, পোশাকে অমোনযোগী, আর এমনই বুনো দাড়িওয়ালা এক লোকে যে দাড়িগুলো উরসুলা রান্না ঘরের ছুরি দিয়ে অতি কষ্টে একটা আকার দিয়ে দেয়। এমন কেউ ছিল না যে তাকে আজব কোন যাদুমন্ত্রের শিকার বলে মনে করতো না। তার পাগলামির ব্যাপারে সুনিশ্চিত লোকজন পর্যন্ত কাজ আর সংসার ছেড়ে দিয়ে তাকে অনুসরন করে। সে কাঁধে তুলে নিল তার বিশ্লেষণ করার যন্ত্রপাতিগুলো এবং যোগ দিতে বলল সবাইকে এক রাস্তা খোলার জন্য যা নাকি মাকন্দোকে সংযুক্ত করে দেবে বড় সব আবিস্কারের সঙ্গে।
ঐ এলাকার ভৌগলিক অবস্থান সম্বন্ধে হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া ছিল পুরোপুরি অজ্ঞ। জানতো যে পূব দিকে ছিল এক দুর্গম পর্বতমালা, আর পর্বতমালার অপর দিকে প্রাচীন শহর রিয়োহাচা, যেখানে, ওর দাদা প্রথম আউরেলিয়ানো বুয়েন্দিয়ার ভাষ্যমতে, প্রাচীনকালে স্যার ফ্রান্সিস ড্রেক বিশাল কুমীর শিকার করেছিল কামান দেগে বিনোদনের জন্য আর পরে ক্ষতস্থান জোড়া দিয়ে ওতে খড় ভরা হতো রাণী ইসাবেলের কাছে নেয়ার জন্য। যৌবনে, সে এবং সমস্ত পুরুষ, মহিলা, বাচ্চাকাচ্চা, পশু আর ঘরোয়া জিনিসপত্রসহ পর্বত পাড়ি দিয়েছিল সাগরে যাওয়ার পথ খুঁজতে এবং ছাব্বিশ মাস পর সে চেষ্টায় ক্ষান্তি দিয়ে মাকন্দোয় পত্তনি গড়ে তোলে যাতে করে আবার ফেরার রাস্তা পাড়ি দিতে না হয়। ওটা ছিল এমন এক রাস্তা যাতে তার কোন আগ্রহ ছিল না, কারণ ওটা নিয়ে যেতে পারতো কেবল অতীতের দিকে। দক্ষিণে ছিল সীমাহীন জলজ উদ্ভিদে ঢাকা জলাভূমি আর জিপসীদের কথানুযায়ী এই বিশাল জলাভূমির বিপুল বিশ্বের কোনো সীমা-পরিসীমা ছিল না। ভুল করে মনে হতো বিশাল পশ্চিমের জলভূমিটা দিগন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে ছিল নারীর শরীর, মাথা, আর কোমল চামড়াসহ তিমিজাতীয় প্রাণী যাদের বিশাল স্তনের মোহে পড়ে নাবিকরা দিক হারাতো। জিপসীরা ছয় মাস এই পথ ধরে নৌচালনা করে এক ফালি শক্ত জমিতে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত, যেখান দিয়ে ডাক-বওয়া খচ্চরগুলো চলাচল করে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার হিসাব মতে সভ্যজগতের সংস্পর্শে আসার একমাত্র সম্ভাব্য রাস্তা ছিল উত্তরে। সুতরাং সে জঙ্গল কাটার ও শিকারের যন্ত্রপাতি তুলে দেয় তাদের হাতে যারা মাকন্দোর স্থাপনার সময় থেকে তার সঙ্গী। একটা থলির মধ্যে নির্দেশনার যন্ত্র আর মানচিত্রগুলো ভরে আরম্ভ হলো সেই দুঃসাহসী অভিযাত্রা।

——————————-

আর্হেন্তিনার বুয়েনোস আইরেস-এর
এদিতোরিয়াল সুদামেরিকানা প্রকাশনী থেকে
প্রকাশিত ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ উপন্যাসের
প্রথম সংস্করণের প্রচ্ছদ

——————————-
border=0

প্রথম কয়েকদিন উল্লেখযোগ্য কোন বাঁধাই তারা পেল না। নদীর পাথুরে তীর ধরে নীচে নামতে নামতে চলে আসে তারা সেই জায়গায় যেখানে অনেক বছর আগে পাওয়া গিয়েছিল এক সৈনিকের বর্ম আর সেখানেই প্রবেশ করে বুনো কমলাবনের ভেতর এক পথ ধরে। প্রথম সপ্তাহ শেষ হওয়ার পর এক হরিণ শিকার করে আগুনে ঝলসায় তারা কিন্তু সন্তুষ্ট হয় শুধুমাত্র অর্ধেকটা খেয়ে বাকি অর্ধেক নুন মাখিয়ে ভবিষ্যতের দিনগুলোর জন্য রেখে দেয়। একই সতকর্তার কারণে বড় টিয়া পাখি খাওয়ার ধারণাটাও তারা বাদ দেয় যার নীল মাংশ ছিল আঁশটে আর সুগন্ধিময়। দশদিন ধরে তারা সূর্যের মুখ দেখতে পেল না। আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের মতো মাটি হয়ে এলো নরম আর স্যাঁতসেতে। বনজঙ্গল ক্রমাগত আরও বেশি প্রতারণাময় হয়ে উঠেছিলো, আর পাখির কলরব আর বানরের কোলাহলকে আরও দূরের মনে হচ্ছিলো। আর পৃথিবী চিরকালের জন্য হয়ে উঠল আরও বিষাদগ্রস্থ।
অভিযাত্রীরা ওদের আদি পাপেরও আগের, আদিতম স্মৃতির তাড়নায় সেই স্যাঁতসেতে স্বর্গে আর নির্জনতায় ডুবে যায় যেখানে জুতা দেবে যায় ধোয়াটে তেলের গর্তে আর দাগুলো ধ্বংস করে রক্তিম লিলিফুল আর সোনালি সালামান্দার।
এক সপ্তাহ ধরে প্রায় কথাবার্তা ছাড়া নিশাচরের মত, দমবন্ধ করা রক্তের গন্ধে ফুসফুস ভর্তি করে অগ্রসর হলো এক শোকাবহ বিশ্বের মধ্য দিয়ে যা কেবল আলোকিত হয়ে আছে আলোকদায়ী পোকামাকড় দ্বারা। ওরা আর ফিরতে পারত না কারন যে পথ তৈরি হয়েছিল অল্পক্ষণের মধ্যেই তা বন্ধ হয়ে আসছিল নতুন গাছপালায়, যেন এই মাত্র সেগুলো বেড়ে উঠছিল ওদের চোখের সামনে। “কিছু আসে যায় না,” বলতো হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া, “আসল কথা হচ্ছে দিক না হারানো”। সেই ভুতগ্রস্ত এলাকা থেকে বেরিয়ে আসার আগ পর্যন্ত সারাক্ষণ কম্পাসের দিকে লক্ষ রেখে পথ দেখিয়ে যাচ্ছিলো ওর লোকদের অদৃশ্য উত্তরের দিকে। সেটা ছিল নক্ষত্রবিহীন এক ঘন রাত কিন্তু অন্ধকার ভরা ছিল নতুন আর নির্মল বাতাসে। দীর্ঘ পথযাত্রায় অবসন্ন হয়ে ওরা হ্যামকে গভীর ঘুমে কাটিয়েছিলো দুই সপ্তাহ প্রথমবারের মত। যখন জেগে উঠল বিম্ময়ে আপ্লুত হয়ে গেল তারা, সূর্য তখনও মাথার উপরে। ওদের সামনে, তাল গাছ আর ফার্ন। সকালের শুভ্র সুক্ষ্ণকণার আলোয় বেষ্টিত নিঃস্তব্ধতায় দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল জাহাজ। ডান দিকে সামান্য কাত হয়ে থাকা জাহাজের অক্ষত মাস্তল থেকে ঝুলছিল দুভাগ হয়ে যাওয়া, দুর্বল, আকিও ফুলাংকিত পালের অংশ। পাথুরে মাটিতে শক্তভাবে গেথে থাকা খোলটি ঢাকা রয়েছে শিলীভূত উজ্জ্বল শামুক আর নরম শৈবালে। নিঃসঙ্গতা আর বিস্মৃতির জায়গা নিয়ে সমস্ত কাঠামোটা যেন দখল করে আছে এক নিজস্ব ব্যাপ্তি যা সময়ের কলুষ আর পাখপাখালির আচার আচরণে দুর্ভেদ্য। জাহাজের ভেতরে অভিযাত্রীরা গোপন উদ্দীপনায় যা খুঁজে পেল তা ফুলের এক নিবিড় বন ছাড়া বেশি কিছু না।

ধারে কাছেই সমুদ্র থাকার ইঙ্গিত বহনকারী এই জাহাজ আবিস্কার হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়ার সমস্ত উৎসাহ ভেঙে দেয়। প্রচন্ড আত্মত্যাগ আর খেসারত দিয়ে খুঁজে না পেয়ে আর না-খুঁজেই রাস্তার মাঝখানে এক অমোঘ বাধা স্বরূপ সমুদ্রকে দেখতে পেয়ে নিজের দুষ্ট নিয়তিকে এক বিদ্রুপের মত মনে হয় তার কাছে। অনেক বছর পর কর্ণেল আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া আবার যখন এই জায়গাটা অতিক্রম করে তখন তা হয়ে গিয়েছিলো ডাক চলাচলের এক নিয়মিত রাস্তা আর জাহাজের একমাত্র যে জিনিসটা দেখতে পেয়েছিল তা হলো আফিম খেতের মাঝে এর পোড়া কাঠামোটা। আর তখনই সে নিশ্চিত হয় যে ওটা তার বাবার খামখেয়ালী কল্পনায় সৃষ্ট কোন গল্প নয়, আর নিজেই নিজেকে সে প্রশ্ন করে কিভাবে জাহাজটা কঠিন মাটিতে এতখানি ঢুকে গিয়েছে। কিন্তু আরও চারদিন ভ্রমণের পর জাহাজ থেকে সমুদ্রকে যখন বারো কিলোমিটার দূরত্বে পেল তখন হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া এ নিয়ে আর দুশ্চিন্তা করল না। তার এত আত্মত্যাগ আর ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানের, স্বপ্নের শেষ হলো এই ফেনিল, নোংরা, ছাইরঙা সমুদ্রের সামনে যা তার প্রাপ্য নয়।

(চলবে)
কিস্তি-১ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

কিস্তি-২ গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস:নিঃসঙ্গতার একশ বছর

Flag Counter


8 Responses

  1. Khaleda Khan Bithi says:

    বরাবরের মতই সুন্দর ও প্রানবন্ত! লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ

  2. prokash says:

    এত কঠিন যে দাঁত বসাতে পারছি না।

  3. monir hossain says:

    Thanks Thanks Thanks.

  4. Lima says:

    @ prokash, দুধ-দাঁত দিয়ে সিরিয়াস সাহিত্যে দাঁত বসাতে গেলে একটু কঠিনই মনে হবে! ক্লাসিক‌ রচনার সাবলীল অনুবাদ হচ্ছে বলেই আমি মনে করি। ভাই আনিসুজ্জামান- প্রতিক্রিয়ায় প্রভাবিত না হয়ে আপনি আপনার সাবলীলতা বজায় রাখবেন আশা রাখি।

  5. anisuz zaman says:

    Dear Lima, you made me laugh with your comments. Normally i don’t lough, thanks a lot. about the translation, I am trying my best to be loyal to Gabo and at the same time trying to make it simple. I shall not change my course. best regards.

  6. Mizanur Rahman says:

    তার এত আত্মত্যাগ আর ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানের, স্বপ্নের শেষ হলো এই ফেনিল, নোংরা, ছাইরঙা সমুদ্রের সামনে যা তার প্রাপ্য নয়।………. অপেক্ষায় আছি পরের কিস্তির।

  7. Lipu says:

    আমি নিজে পড়ুয়া নই, তবুও এই সিকোয়েল ভাল লাগছে। পরের অংশে কি আছে জানতে আগ্রহ তৈরী হয়, মনে হয় সামনে আরো দারুণ কিছু অপক্ষো করছে। আসলেই তাই! ধ্রুপদী এই সাহিত্যে আগ্রহ সৃষ্টি করার মত আকর্ষনীয় বঙ্গানুবাদের জন্য অনুবাদককে সশ্রদ্ধ সালাম!

  8. নুমান says:

    চমৎকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.