বইয়ের আলোচনা

একটি কবিতার বই এবং একখানি নিরীহ জিজ্ঞাসা

আলম খোরশেদ | 20 Dec , 2007  

johir_boi1.jpgবইটির নাম গোস্তের দোকানে। কবিতার বই। রচয়িতা জহির হাসান। তিনি নিজেই পাঠিয়েছেন বইখানির কিছু কপি আমাদের বিশদ বাঙলার বইঘরে রাখার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে এক কপি সৌজন্য সংখ্যা এই অধমের জন্যও। তার বিনীত প্রত্যাশা একটি পাঠ প্রতিক্রিয়া। এই লেখাটি মূলত বইখানি পড়ার পর বর্তমান লেখকের মনে যে বিশেষ প্রতিক্রিয়া ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে তারই বহিঃপ্রকাশ।

জহিরের কবিতা প্রথম পড়ি আন্তর্জালে। তারপর জাহিদ হাসান মাহমুদ সম্পাদিত কবিতামঞ্চ পত্রিকায়। একবার মুখোমুখি আলাপও হয়েছিল ব্রাত্য রাইসুর বরাতে। তার কবিতাকে প্রথম থেকেই আর সবার চেয়ে একটু আলাদা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু এবারে তার গোটা একটি বই পড়ে বোঝা গেল তিনি স্বতন্ত্র বটে; তবে তিনিও একটি ক্ষুদ্র অথচ ক্রমবর্ধমান গোষ্ঠী কিংবা ধারার প্রতিনিধিত্ব করেন।

বাংলাদেশের কবিতায় এই ধারাটির সূত্রপাত করেছিলেন ফরহাদ মজহার তার এবাদতনামা গ্রন্থে, তারপর সলিমুল্লাহ খান তাকে আরও কিছুদূর এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার অনূদিত কাব্যগ্রন্থ আল্লাহর বাদশাহী-তে। আকাশে কালিদাসের লগে মেগ দেখতেছি বইয়ে ব্রাত্য রাইসু তার পরম পরাকাষ্ঠা দেখান। এরা সবাই গত দুইশত বছরে গড়ে ওঠা প্রমিত বা মান বাংলা ভাষার পরিবর্তে নতুন এক ভাষারীতির ব্যবহার বা প্রচলনে উৎসাহী। এদের প্রস্তাবিত কিংবা অনুশীলিত ভাষাটির প্রধান প্রবণতাটি হচ্ছে পূর্ববঙ্গের আঞ্চলিক শব্দাবলি ও কথ্যরীতির প্রয়োগ, সেই সঙ্গে শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘরোয়া, আটপৌরে বাগবিধির ব্যবহার। জহির হাসান অবশ্য সাধুরীতি, তৎসম শব্দ, প্রাচীন বাংলার প্রকরণকৌশল ইত্যাদির ব্যবহারেও দ্বিধান্বিত নন তার কাব্যভাষায়। তার কবিতা থেকে কিছু দৃষ্টান্ত দেয়া যাক এই পর্যায়ে:

এক.
আর্কিটেক্ট ইউছুপ কী কয়?

আর্কিটেক্ট ইউছুপ কয়
সময় নাই
ধাক্কাবো না
আর তোগেরে

সময় নাই
যা কিছু পাই
ফালা য়ুরোপ
ছেড়া বাংলার

নকশি কাঁথা
ওডার মধ্যে
ঢোক।।
(গোস্তের দোকানে, ১০)

দুই.
আমি কুকুরের সামনে দু’কেজি গোস্ত ছুঁড়ে দিয়া
দূর থেকে দেখি—অপমানে—
সে তাকায়ে থাকে গোস্তের দোকানে
ঝুলন্ত গোস্তের টানে—
আমার গোস্তের পর মাথা রেখে ক্ষুধাপেটে
ঘুমিয়ে পড়েছে ঐ কুত্তা—
এই দৃশ্যদৃষ্টে কিবা করি ভ্যাবাচেকা আমি এইখানে—
পৃথিবীর ছোট্ট এই গোস্তের দোকানে!
(গোস্তের দোকানে, ২৯)

তিন.
কাঁকনদাসীর গত রাত্রির কাপড়
ধুয়ে দিচ্ছে অভাগী কাজলরেখা
ঠিক আছে, এই দৃশ্য তো থাকবে
কিন্তু সুচ রাজা বলবে যে,
সত্যের চাহিতে আমি ভালোবাসি ভালোবাসা
তোমাদের দুহজনে বাসিয়াছি যথেষ্ট সমান ভালো
কিন্তু লোকজন তা মানবে না
নাট্যকার বুঝাচ্ছে আমারে, আমার শালীকে
মেয়ে বউরে
সেই যে বউভাত খাইতে আসি কতদিন পর
রোকন হঠাৎ তোর সাথে দেখা হইলো চালাইয়া যা
তোর বাদবাকী পরিকল্পনা…
(বদরিকা, ২৯)

এই পঙ্‌ক্তিসমূহের মধ্যে অবশ্যই কবিতা আছে, আছে ইতিহাস, রাজনীতি এবং সর্বোপরি এক ধরনের গুরুতর জীবনবীক্ষাও। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন কবি তার প্রকাশে এই ভাষা, এই প্রকরণ আর এই ভঙ্গির আশ্রয় নিচ্ছেন কেন? এতে তার, কিংবা কবিতার, কিংবা সামগ্রিকভাবে বাংলা ভাষার কি কোনো উপকার হচ্ছে? এই অদ্ভুত এবং মজাদার (মজাদার বলছি এই জন্যে যে জহিরের কবিতার বইটি আমি যাদেরকেই পড়িয়েছি তারা সবাই প্রায় অবধারিত ভাবে মন্তব্য করেছেন, ‘বাহ্ বেশ মজার তো!’) ভাষায় জহিরের আগে, পরে ও সমসময়ে আরো যারা লিখছেন, যেমন শহীদুল জহির, এবাদুর রহমান, সাখাওয়াত টিপু, মারজুক রাসেল, শামীম রেজা, মুজিব ইরম, সকলের কাছেই আমাদের জিজ্ঞাসা এর মাধ্যমে তারা আসলে ঠিক কী অর্জন বা প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন?

jahir hasan…….
জহির হাসান, ছবি. ইফতেখার ওয়াহিদ ইফতি
………
আমরা জানি এরা প্রত্যেকেই অত্যন্ত শক্তিশালী, বুদ্ধিদীপ্ত, শিক্ষিত, সচেতন ও সংবেদনশীল লেখক। তারা যখন সবাই মিলে এমন একটি কাণ্ড করছেন তার পেছনে নিশ্চয়ই জোরালো কোনো যুক্তি, কারণ কিংবা অনুসন্ধান রয়েছে। আমরা তাদের সেই অন্বেষণ কিংবা অবস্থানের প্রকৃত স্বরূপটুকু বুঝতে চাই। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা কিংবা সাক্ষাৎকারে, এমনকি আড্ডায় ও আলোচনায় বিচ্ছিন্নভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করেছেন অনেকেই কিন্তু কেউই যেন প্রকৃত সত্যটিকে স্পষ্ট করে স্পর্শ করতে পারেন নি কিংবা চান নি। কেউ কেউ আভাসে ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যে ব্যবহৃত বাংলা ভাষা থেকে পৃথক ও স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত একটি ভাষা নির্মাণে তারা আগ্রহী, কেউ বলেছেন গণমানুষের মুখের বুলিকে সাহিত্যে তুলে এনে তারা তাকে আমজনতার আরো কাছাকাছি নিয়ে যেতে চান, কেউবা তাকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন উত্তরাধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে।

কিন্তু আমরা যারা সাহিত্যের নিপাট, নির্ভেজাল ও নিরপেক্ষ অনুরাগী, বিশেষ করে বাংলা ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্যে আস্থাশীল তারা যেন ঠিক এইসব ভূ-রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক বাহাস বিতর্কে পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারছি না। তাই আমাদের বিনীত অনুরোধ, আলোচ্য গ্রন্থ গোস্তের দোকানের রচয়িতা জহির হাসান, কিংবা এই নিবন্ধে উল্লেখিত অপরাপর লেখকেরা অথবা তাদের হয়ে আর কেউ, আমাদের এই নিরীহ জিজ্ঞাসার উত্তরে, সহজ সরল ভাষায়, প্যাঁচঘোচহীন যুক্তিতে তাদের অবস্থানটুকু ব্যাখ্যা করুন। কে জানে তারই সূত্র ধরে বিভিন্ন লেখক/পাঠকের অংশগ্রহণে একটি প্রাণবন্ত বিতর্কও জমে উঠতে পারে এখানে, যার উপসংহারে হয়তবা আমরা পেয়ে যাব আমাদের জিজ্ঞাসার উত্তর, ঘুচে যাবে আমাদের অনেকের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি। বাংলা সাহিত্য ও বাংলা ভাষার স্বার্থে এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লেখক ও আগ্রহী পাঠকদের অংশগ্রহণে এই রকম একটি খোলামেলা, মুক্ত আলোচনার প্রয়োজনকে অস্বীকার করা যায় না। সেই সুযোগের সূত্রমুখ খুলে দেয়ার জন্য গোস্তের দোকানের কবি জহির হাসানকে ধন্যবাদ।
———
গোস্তের দোকানে। জহির হাসান। বেড়াল প্রকাশনা। ফেব্রুয়ারি ২০০৭। প্রচ্ছদ, জহির হাসান। ৯৬ পৃষ্ঠা। ১০০ টাকা। পরিবেশক, ঋতিক, আজিজ সুপার মার্কেট, দ্বিতীয় তলা, শাহবাগ, ঢাকা।

purbapashchim@yahoo.com


3 Responses

  1. Mashooq Salehin says:

    ধন্যবাদ লেখককে।

    একই প্রশ্ন আমারও। এই কবি-কুলের কাছে আমারও একই বিনীত জিজ্ঞাসা।

    কবিতার উদ্দেশ্য যদি হয়, আম-জনতার কাছে যাওয়া, তাহলে শুধু কবিতাই কেন? সকল শিল্পমাধ্যমের উদ্দেশ্যই কি এক হওয়া উচিত নয়? কিন্তু, প্রকৃত অর্থে, শিল্পের কি এটা কোনো উদ্দেশ্য হতে পারে?

    হয়তো পারে, আমরা যারা জানি না, তাদেরকে জানানোর জন্য অনুরোধ রাখলাম।

  2. সুমন রহমান says:

    “কিন্তু আমরা যারা সাহিত্যের নিপাট, নির্ভেজাল ও নিরপেক্ষ অনুরাগী, বিশেষ করে বাংলা ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্যে আস্থাশীল তারা যেন ঠিক এইসব ভূ-রাজনৈতিক, তাত্ত্বিক বাহাস বিতর্কে পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারছি না।”
    ……….
    “গোস্তের দোকান”এর মালিকেরা আলম খোরশেদ-এর এই “নির্ভেজাল ও নিরপেক্ষ” অনুরাগের জবাবে আওয়াজ দিবেন কবে? সময় যে বহিয়া যায়!!

  3. ধূপছায়া says:

    আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সাহিত্যের সার্বজনীন ভাষাটার তাহলে কী হবে?
    …ইংরেজি সাহিত্য কি তার আঞ্চলিক, জগাখিচুড়ি ভাষা নিয়ে আমাদের কাছে পঠিত?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.