আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: আমার সেজদির কথা

sanjida_khatun | 6 Jul , 2014  

ফজলুল হক হলের গেটহাউসে থাকতে আমার খুব গানের নেশা হয়েছিল। ওদিকে গলার কী সমস্যা হয়েছিল, একটু ভাঙাভাঙা কণ্ঠস্বর সারাবার জন্যে গলার মহা তোয়াজ করতাম। বারবার করে গড়গড়া করা চলত গরম পানি দিয়ে। গলায় একটা কমফর্টার জড়িয়ে রাখতাম সারাক্ষণ। রীণার জন্যে গানের শিক্ষক ছিলেন। ওর গান শেখার সময়ে পাশে বসে থেকে সব গান তুলে নিতাম আমি। আম্মু তাই দেখে শিক্ষককে বলেছিলেন-ছোটটার গান শুনে দেখুন তো! উনি চোখ কাত করে আমাকে দেখে বললেন-‘গাও তো দেখি’। ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’ শুনিয়ে দিয়েছিলাম। উনি অবহেলাভরে বললেন–‘ভালো। তবে এর কোনোদিন গান হবে না’। শুনেই বোধ হয় জেদ চেপে গিয়েছিল।

চলতে ফিরতে গানও চলত সারাদিন আর থেকে থেকে গারগল করা। গলা সাধতামও খুব। ফলে ফজলুল হক হলের ছাত্ররা মহা খেপাল! সন্ধ্যায় গলা সাধতে বসলেই রব উঠত-‘আ আ চাই না’ আমি তো নিজেকে থামাতেও পারি না, অল্প বয়সের নেশা তো! একদিন ছেলেরা দল বেঁধে নালিশ দিতে এল আব্বুর কাছে। তাদের নাকি লেখাপড়ার ক্ষতি হচ্ছে। আব্বু ওদের হাউস টিউটর তো! আব্বু মন দিয়ে ওদের কথা শুনে ঘরে এলেন। ভয়ে ভয়ে রইলাম–এই বুঝি বকুনি খেতে হবে। আশ্চর্যের বিষয়–ঘরে এসে আব্বু টুঁ শব্দটি করলেন না। আর আমার গান-গলাসাধা থামায় কে?

সর্দার ভাই তখন ওই হলেই থাকতেন। এ গল্প করেছিলেন ওঁর প্রিয়বন্ধু রবি গুহ-র বাসায় গিয়ে। বাগেরহাট কলেজে পড়াবার সময় রবিদা আবার এ গল্প করেছিলেন শিক্ষার্থীদের কাছে। আমাকে তুলে ধরেছিলেন এক প্রতিবাদী চরিত্র হিসেবে। সে কথা বুঝেছি সেই কলেজের কিছু মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে দল বেঁধে এসেছিল আমাকে দেখতে। আর এসে বোকা বনে গিয়েছিল আমার মতন মুখচোরা এক কালো মেয়েকে দেখে। অবাক-বিস্ময় প্রকাশও করেছিল ভাবে ভঙ্গিতে। আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি সদ্য।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেবার পরে ফল প্রকাশের আগেকার অলস সময়ে সেজদির সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়েছিল। সেজদির, তার কিছু আগে ক্লাশ টেনে থাকতেই বিয়ে হয়ে গেছে। লেখাপড়ায় একান্ত মনোযোগী সেজদি বিয়েটা খুব মেনে নিতে পারেননি। ইনটারমিডিয়েট পরীক্ষার চৌদ্দ দিন আগে সেজদির ছেলে জন্মাল। তখনকার দিনে দুবেলা দুবিষয়ের পরীক্ষা হতো। এখনকার সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিঙের ইডেন কলেজ-ভবনে পরীক্ষা দিতে যেতেন সেজদি। ওঁর টিফিন আর শিশুটিকে নিয়ে আমরা দুপুরে সেখানে যেতাম। ছেলেকে দুধ খাওয়াতে খাওয়াতে সেজদি টিফিন খেয়ে নিতেন।

ম্যাট্রিক পরীক্ষা হয়ে গেলে আমি তখন সোহরাব ভাইয়ের কাছে গান শিখতে শুরু করেছি। সেজদিরও শখ হলো, উনিও গান শিখতে বসতেন। গানের ঝোঁক ছিল তাঁর আগে থেকেই। কলকাতা বেতারের রেকর্ডের গানগুলো উনি একটা খাতাতে খুব তাড়াতাড়ি লিখে নিতেন। তাতে পরীক্ষায় দ্রুত লিখবার ভালো অভ্যাস হয়ে যেত। সেজদির খাতা দেখেই আমরা রেডিওর গানের সঙ্গে গেয়ে গেয়ে গানগুলো শিখে ফেলতাম। পাকিস্তান আলম তখন রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে রেডিওতে যে-সব কথিকা প্রচার হতো, সবই আমি আর সেজদি হাঁ করে গিলতাম। আর জয়ন্তীগুলোতে কোথায় কোন বক্তৃতা বা অনুষ্ঠান হচ্ছে খবর নিয়ে সেজদি আর আমি শুনতে যেতাম। কোথায় পুরোনো ঢাকাতে কিংবা পলাশী ব্যারাকে। সেজদির সঙ্গে আমি হাজির! পুরোনো ঢাকাতে বক্তৃতা করতেন ত্রিপুরা শঙ্কর সেন শাস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ পঞ্চতীর্থ, আব্বু-আরো কারা কারা। অজিত গুহ, সৈয়দ আলী আহ্সানদের বক্তৃতাও শুনেছি। পুরোনো শহরের রবীন্দ্রজয়ন্তীতে কোথায় একবার এক মহিলার গান শুনেছিলাম-‘ফুল বলে, ধন্য আমি-ধন্য আমি মাটির পরে’। সুরেলা সেই গানের সঙ্গে মহিলা নিজেকে যেন সম্পূর্ণ মিশিয়ে ঢেলে দিচ্ছিলেন। এমন নরম তাঁর সুর উচ্চারণ! এ গান আর কখনো কারো কাছে এমন শুনিনি।

কার বক্তৃতা কেমন হলো, গানই বা কেমন হলো তা নিয়ে আলোচনা হতো সেজদির সঙ্গে। খুব সখ্য হয়েছিল এমন করে। সেই সেজদি বি. এ. অনার্স পড়বার সময়ে তাঁর অসুখী দাম্পত্যজীবন শেষ করে দেবার জন্যে আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করলেন।

Flag Counter

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

কিস্তি-৯স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

কিস্তি-১০ স্কুলের দিনগুলো: সেগুনবাগানের বাড়ি

কিস্তি-১১ স্কুলের দিনগুলো: সেই যে দিনগুলি

কিস্তি-১২ স্কুলের দিনগুলো: পারিবারিক আনন্দ-বিষাদ

কিস্তি-১৩ স্কুলের দিনগুলো:পারিবারিক শোক আর গৃহের আনন্দ


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.