আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো:পারিবারিক শোক আর গৃহের আনন্দ

sanjida_khatun | 23 Jun , 2014  

বিশ্ববিদ্যালয় গেটহাউসের বাড়িগুলো নিতান্ত গেটহাউসই ছিল। এলাকায় ঢুকবার পথের দুপাশের বাড়ির দু অংশ খাড়া দাঁড়ানো। উত্তর দিকের একতলা কোনো ব্যবহারেই আসত না। দক্ষিণের গেটে থাকবার সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র সরদার ফজলুল করিমকে সুলতান-নবাব-নূরুর গৃহশিক্ষক হিসেবে রাস্তার ওপরের উত্তরের ঘরটিতে থাকতে দেন আব্বু। উনি আমাদের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ট হয়ে উঠলেন। সুলতানের মৃত্যুতে খুব কাতর হয়ে একটি কবিতা লিখেছিলেন তিনি। আরম্ভটা এই রকম:

ওরে ভাই সুলতান
কাঁদায়ে মোদের প্রাণ
কোন্ পথে কার কাছে গেলি?
সেদিনও সকালবেলা
একত্রে করিনু খেলা
লুকোচুরি, কত ঠেলাঠেলি।’

সুলতানরা ওঁকে ‘ভাইয়া’ বলে ডাকত। আর আব্বুকে উনি ‘আব্বু’ বলেই ডাকতেন।

সুলতানের মৃত্যুর দিনে বিজয়াদশমী ছিল। এইদিনে আব্বু বরাবর দশহরার লাড্ডু কিনে বাসায় ফিরতেন। সেদিনও পুরোনো ঢাকার কালাচাঁদ গন্ধবণিকের দোকানে ঢুকছিলেন উনি মিষ্টি কিনতে। সেই সময়ে কেউ গিয়ে তাঁকে সঙ্গে করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গেল। সেখানে সুলতানের শ্বাসপ্রশ্বাস চালু করবার চেষ্টা চলছিল তখন। ডাক্তাররা অবশ্য হতাশ হয়ে গিয়েছিলেন ততক্ষণে। আব্বুকে সন্তানের মৃতদেহ নিয়েই ফিরতে হলো ঘরে। বাড়িতেও লাশে প্রাণ সঞ্চারের নানারকম চেষ্টা চলল বহুক্ষণ। আব্বু আম্মুর এটি দ্বিতীয় মৃত্যুশোক। এর আগে ভাইয়া মারা গেছিলেন ম্যাট্রিকের টেস্ট পরীক্ষার আগে আগে। ভাইয়া মারা যান উত্তর দিকের গেটহাউসে। আব্বু-আম্মুর সেই প্রথম পুত্রশোক।

আম্মু দাঁতে-দাঁত লেগে অজ্ঞান হয়ে যেতে লাগলেন, ভাইয়ার সময়েও যেমন। সেজদি আর রীণা তখন গ্লানিবোধে পীড়িত। ওরা দোতলার পশ্চিম দিকের জানালার সম্মুখে বসে লুডো খেলছিল। খেলার নেশায় বাইরের দিকে চেয়ে দেখেনি একবারও। শোরগোল কানে আসতে তাকিয়ে দেখতে পেল পুকুর ধারে কাকে যেন মাথায় করে ঘুরানো হচ্ছে। ততক্ষণে বাসাতে খবর হয়ে গেছে।

ভাইয়া আর সুলতানের মৃত্যুর পরে তখন আমরা নয় ভাইবোন, আর আম্মু-আব্বু-নানী হয়রহ। তখন আমরা ইউনিভার্সিটি গেটহাউস ছেড়ে ফজলুল হক হলের গেটহাউসে চলে গেছি।

যাক সে সব। এখন আমাদের বাড়ির আর এক আনন্দোৎসবের কথা বলি। তখনকার দিনে খুব শিলাবৃষ্টি হতো। শব্দ করে প্রচুর শিলা পড়ত সত্যেন দত্তের সেই কবিতার লাইনের মতো– ‘কড়োমড়ো রব যেন উড়ের বুলি’! আমাদের সে কী ধুম শিল কুড়ানোর! কে কত কুড়াতে পারে তার প্রতিযোগিতা। আম্মু আর বড়দিকে খুশি করবার জন্যে খানিক ভিজেও ছোটাছুটি করতাম। ভিজলে বকুনিও খেতে হতো বেদম। আম্মুর গরমের অনুভুতি ছিল প্রবল। ঘরে ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা তো ছিল না! তাই বরফ আর শিলার প্রতি অত আকর্ষণ। বড়দি আবার কুড়ানো শিল নিয়ে বসে যেতেন কুলপি বরফ বানাতে। একটা যন্ত্র ছিল বাড়িতে। বডি কাঠের আর তার মাঝখানে লোহার গোল একটা লম্বা পাত্র। কুলপি রবফের জন্যে প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘর করা হতো, তাতে পরিমাণ মতো চিনি মিশিয়ে লোহার পাত্রটিতে ঢালা হতো। দুধের সঙ্গে পেস্তা বাদামও মেশানো হতো বেঁটে। লোহার পাত্র আর যন্ত্রের কাঠের আবরণের মাঝখানের ফাঁকে শিলগুলো ভরে দেওয়া হতো দফায় দফায়। লোহার পাত্রের সঙ্গে লাগানো একটা হাতল কাঠামোর বাইরে বেরিয়ে থাকত। ঘড়ি ধরে ঘন্টা খানেক পরে পরে হাতলটা ঘুরাতে হতো। যাতে একটু জমে যাওয়া দুধ একবার নাড়া খেয়ে ভালো করে জমবার সুযোগ পায়। কাঠের যন্ত্রটির বাইরে ছালার চট জড়িয়ে বরফের ঠান্ডা ধরে রাখবার চেষ্টা হতো। বড়দি সেই কেক বানানোর সময়ের মতন কিঞ্চিৎ উচ্চাসন অর্থাৎ একটা মোড়াতে বসে কাজের তত্ত্বাবধান করতেন। বেশ অনেকটা সময় লাগত কুলপি বরফ জমতে। তারপরে আমাদের জনবহুল পরিবারের সকলের দু-এক চামক করে চাখবার সুযোগ আসত।

ওই শিলকুড়ানো থেকে শুরু করে কুলপি বরফ বানানোর যে মহোৎসব হতো তার তুলনা নেই। সেকালে কোথায় ছিল কেক তৈরির ওভেন, কোথায় বা ছিল আইসক্রিম তৈরির পাউডার আর ফ্রিজ। আমরা অন্যভাবে ওসব করে খেয়ে যে আনন্দ পেয়েছি, সে আজকালকার বালক-বালিকারা পাবে না। সে দিন গেছে। কেবল শিলাবৃষ্টি হয় আজো, আর ছোটদের শিল কুড়াবার জন্যে অন্তত ফ্ল্যাটবাড়ির ছাদ রয়েছে এখনো!
Flag Counter

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

কিস্তি-৯স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

কিস্তি-১০ স্কুলের দিনগুলো: সেগুনবাগানের বাড়ি

কিস্তি-১১ স্কুলের দিনগুলো: সেই যে দিনগুলি

কিস্তি-১২ স্কুলের দিনগুলো: পারিবারিক আনন্দ-বিষাদ


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.