গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, স্মরণ

নরোত্তম কবি উত্তম দাশ

ফরিদ আহমদ দুলাল | 14 Jun , 2014  

uttam.gifআমরা যখন কবির পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছি; তখন এই দুঃসংবাদ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে নেমে এলো মস্তকে। কবিতাবাংলার সর্ববৃহৎ আয়োজন ‘দরিয়ানগর কবিতামেলা ২০১৪’ ডিসেম্বরে বাস্তবায়ন হবে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায়। ঢাকা থেকে আমরা দীর্ঘ কবিতাযাত্রা করে পৌঁছে যাবো দরিয়ানগরে। আমাদের সাথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের কবিরা সহযাত্রী হবেন। আমাদের সে কবিতাযাত্রায় যাঁরা থাকবেন তাঁদের অন্যতম কবি উত্তম দাশ এবং ড: মালবিকা দাশ। বিভিন্ন বৈঠকে আমাদের আলোচনা এভাবেই পল্লবিত হচ্ছিল। দরিয়ানগর কবিতামেলায়ই আমরা উদযাপন করবো ছান্দসিক-গবেষক, কবি ও কাব্যকোবিদ ড: উত্তম দাশ-এর পঁচাত্তরতম জন্মবার্ষিকী। আগামী ১১ ডিসেম্বর কবি উত্তম দাশ-এর জন্মদিন; সেদিন তিনি তাঁর যাপিত জীবনের ৭৫ বছর পূর্ণ করবেন। আমাদের প্রত্যাশাগুলোকে অকার্যকর করে দিয়ে জুনের ১৩ তারিখ প্রথম প্রহরে পরোলোকের পথে যাত্রা করলেন তিনি। পড়ে থাকলো তাঁর পদ্মপুকুর-বারইপুরের বিশাল বাড়ির সব বর্ণাঢ্য আয়োজন; পড়ে থাকলো তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘মহাদিগন্ত’; প্রিয় নাতনী, লন্ডন প্রবাসী একমাত্র কন্যা, একমাত্র পুত্র ময়ুখ দাশ; প্রিয়পত্নী মালবিকা দাশ যিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে লড়াই করে জয়ী হয়েছেন মাত্র ক’বছর আগে। মালবিকা বৌদির সে লড়াইয়ে উত্তম দাশ ছিলেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী। ঠাকুর পুকুরের ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে বসে লেখা কবি উত্তম দাশ-এর ‘ঠাকুরপুকুর থেকে’ শিরোনামের সিরিজ কবিতার কথা মনে পড়ছে; যেটি গ্রন্থাকারেও প্রকাশিত হয়েছে অনেক আগে। পরিব্রাজক কবি উত্তম দাশ, যিনি সব সময় সদলবলে চলতে অভ্যস্ত, তিনি আজ অনন্তের পথে যাত্রা করলেন একা। তাঁর আজকের একাকীত্বের পাঠপ্রক্রিয়া আমার জানা নেই বটে; কিন্তু তাঁর এ পথপরিক্রমণের সূচনায় আমরা প্রার্থনা করতে পারি। প্রার্থনা করতে পারি তাঁর সুকৃতি আর ঔদার্যকে স্মরণ করে, শ্রদ্ধাবনত হতে পারি তাঁর মহত্তম বিশালত্বের সামনে। যদিও মানি নিজের ক্ষুদ্রতা দিয়ে তাঁর মতো বড় মাপের একজন শিল্পীকে আবিষ্কার দুর্লঙ্ঘ, তারপরও আজকের এই শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রয়াস।

উত্তম দাশকে আমি স্মরণ করতে চাই তাঁর কাব্যকৃতির জন্য, স্মরণ করতে চাই তাঁর ঋদ্ধ গদ্যের জন্য, সম্পাদনা কর্মের জন্য, স্মরণ করতে চাই বাগ্মি উত্তম দাশকে এবং সর্বপোরি মহৎপ্রাণ মানুষ হিসেবে তাঁর প্রতি জানাতে চাই গভীর শ্রদ্ধা। উত্তম দাশ-এর প্রথম কাব্য প্রকাশিত হয় ১৯৬৬ তে যখন গোধুলি। কিছুটা বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় কাব্য লৌকিক অলৌকিক প্রকাশিত হয় ১৯৭৫-এ। এরপর পর্যায়ক্রমে জ্বালামুখে কবিতার(১৯৮০), এ জন্মের প্রত্যাহার চাই(১৯৮৩), রুনুকে (১৯৮৩), ‘ভুল ভারতবর্ষ’ (১৯৮৫), ‘নির্মাণে এসেছি’ (১৯৯০), ‘রাত্রির স্থাপত্য’ (১৯৯২), ভ্রমণের দাগ (১৯৯৫), কাব্যনাট্য ও কবিতা(১৯৯৯), এক ভারতীয় কবির ডায়েরি থেকে (১৯৯৯), কেদার ভাদুড়ী: তোমার জন্য (২০০৫), এ কালের মঙ্গলকাব্য (২০০৩), প্রকীর্ণ কবিতা (২০০৭), ঠাকুরপুকুর থেকে (২০১২) এবং অন্যান্য। উত্তম দাশ-এর কাব্য পাঠে একদিকে যেমন ভারতভূমি, বঙ্গভূমি, ভারতীয় পুরাণ, প্রেম-শরীর-কাম এবং মগ্নতা পাই, পাশাপাশি পাই বিশ্বপুরাণও। দেশান্তর হবার আক্ষেপ আছে তাঁর অসংখ্য কবিতায়। উত্তম দাশ-এর প্রবন্ধ গ্রন্থের মধ্যে ‘বাংলা সাহিত্যের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ (১৯৬৫), বাংলা সাহিত্যের সনেট (১৯৭৩), কবিতার সেতুবন্ধন (১৯৮০), বাংলা ছন্দের কূটস্থান (১৯৮৫), হ্যাংরি শ্রুতি ও শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন (১৯৮৬), বাংলা কাব্যনাট্য (১৯৮৯), বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি (১৯৯২), ক্ষুধিত প্রজন্ম ও অন্যান্য প্রবন্ধ (১৯৯৭), কবিতার ছন্দ, কবির ছন্দ (২০০৭), কবি বুদ্ধদেব বসু (২০০৮), বাংলাকবিতার চার ভুবন (২০১৩) ইত্যাদি শিরোনামের গ্রন্থ ছাড়াও তাঁর সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থের ভূমিকা হিসেবে লেখা গদ্যগুলো যে কোনো আগ্রহী পাঠকের তৃষ্ণা নিবারণে সামর্থ রাখে। বিশেষ করে উত্তম দাশ সম্পাদিত বিশ্ববাংলা কবিতা সংকলনের ভূমিকায় তিনি যে প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার ভূমিকাটি লিখেছেন, সেটি পড়লে বোঝা যায় বাংলা কবিতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা কতটা স্বচ্ছ। উত্তম দাশ সম্পাদিত গ্রন্থ সমূহের মধ্যে কবিতা: ষাটসত্তর (১৯৮২), গল্প: ষাটসত্তর (১৯৮৭), আঞ্চলিক ভাষার কবিতা (১৯৯০),
আধুনিক প্রজন্মের কবিতা (১৯৯১), শতবর্ষের আলোকে জীবনানন্দ (২০০০), শতাব্দীর বাংলা কবিতা (২০০১), শতবর্ষের আলোকে বুদ্ধদেব (২০০৮) এবং বিশ্ববাংলা কবিতা (২০১৩) উল্লেখযোগ্য। ‘মহাদিগন্ত’ নামে সাহিত্য পত্রিকার প্রায় একশটি সংকলন সম্পাদনা করেছেন কবি উত্তম দাশ। তাঁর মহাদিগন্ত পত্রিকার পক্ষ থেকে সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য ২০০০ থেকে প্রদান করেছেন মহাদিগন্ত পুরস্কার। বাংলাদেশের সৈয়দ শামসুল হক, কবি নির্মলেন্দু গুণ, মুহম্মদ নূরুল হুদা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, কাজী রোজী, তপন বাগচী, মাহমুদ কামাল, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মাহবুব সাদিক প্রমুখের সাথে বর্তমান নিবন্ধকারও এ পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন।

ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপনা পেশার সাথে যুক্ত ছিলেন সারাজীবন, সঙ্গত কারণেই বক্তৃতা দেয়াটাই এক অর্থে ছিলো তাঁর পেশা। কিন্তু শ্রেণিকক্ষের বাইরে সাহিত্য আসরে বিভিন্ন বিষয়ে তুখোড় বক্তৃতা দিয়ে দর্শক- শ্রোতাদের মোহাবিষ্ট করে রাখতে একজন বাগ্মির যতো ধরণের কারিশমা রপ্ত করা প্রয়োজন তার সবই ছিলো উত্তম দাশ-এর মধ্যে। ময়মনসিংহে, টাঙ্গাইলে, ঢাকায়, কক্সবাজারে, দুর্গাপুরে, কলকাতায়, বারইপুরে, শান্তি নিকেতনে তাঁর অসংখ্য বক্তৃতা শোনার সুযোগ আমার হয়েছে; শান্তিযাত্রায় মানবতার সপক্ষে তাঁর বক্তৃতা শুনেছি; এক কথায় অসাধারণ। যেমন বাক্যের গাঁথুনি, তেমন শব্দচয়ন এবং বিন্যাস, প্রতিটি ক্ষেত্রেই উত্তম দাশ অনন্য। নির্ভর করার মতো বক্তা যাকে বলে তিনি উত্তম দাশ।

উত্তম দাশ-এর কোনো রচনা থেকে একবর্ণ উদ্ধৃতি না দিয়ে তাঁর একটা ভাষাচিত্র তৈরি করা গেল বটে, কিন্তু মানুষ উত্তম দাশকে বর্ণনা করা দুর্লঙ্ঘ নয় বরং অসম্ভব। উত্তম দা আমাদের আমন্ত্রণে বারবার বাংলাদেশে এসেছেন, আমরা তাঁর আতিথেয়তা করার সুযোগ পেয়েছি; কিন্তু আমরা যার আমন্ত্রণেই ভারতে গেছি উত্তম দার আতিথেয়তাকে পাশ কেটে যেতে পারিনি। নিজের গাড়িতে করে নিয়ে গেছেন তাঁর বারইপুরের বাড়িতে। দুদিন-তিনদিন আটকে রেখেছেন। আর তাঁর আপ্যায়নের ফিরিস্তি বলে শেষ করা কঠিন; বিশেষ করে আমি, মাহমুদ কামাল আর হুদাভাই; আমরা ছিলাম তাঁর সোদরপ্রতীম। নিজে বাজারে যেতেন; সন্ধ্যায় বসতো কবিতার আসর, গভীর রাত অবধি চলতো কবিতা পাঠ, মাঝে বৌদি এসে শরীক হতেন আমাদের সাথে। সময় পাওয়া গেলে আমাদের নিয়ে চলে গেলেন শান্তি নিকেতনে, ডায়মন্ড হার্বারে। একবার শান্তি নিকেতন থেকে ফেরার পথে আমাদের গাড়ি বিকল হয়ে গেল। গেরেজ একটা পাওয়া গেল বটে, কিন্তু পরদিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। হাই ওয়ের পাশে একটা নির্মাণাধীন হোটেল পাওয়া গেল যেখানে আপাত একটা মাত্র খাট; মানুষ আমরা ছয়জন; আমি, মুহম্মদ নূরুল হুদা, মাহবুব সাদিক, মাহমুদ কামাল, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এবং উত্তম দাশ। বয়সে উত্তম দা আমাদের সবার বড়, কিন্তু কিছুতেই তাকে ঘরে পাঠাতে পারলাম না। গাড়িতেই কাটালেন সারারাত। পরদিন সকালে গাড়ি ঠিক করে ফিরলাম কলকাকাতায়। আমরা কলকাতায় যা কিছু দেখার সুযোগ পেয়েছি তার প্রায় সবই উত্তম দার কল্যাণে। অনেক শিখেছি-জেনেছি এবং নিজের অক্ষমতার কারণে অনেক কিছুই শেখা হয়ে ওঠেনি। আজ উত্তম দার মহাপ্রয়াণের পর আফসোস হচ্ছে নিজের জন্যে সময় থাকতে অমন উত্তম মানিকের কাছে চেয়ে রাখতে পারিনি তাঁর অমূল্য সম্পদ। ভারত-পাকিস্তান জন্মের পর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উত্তম দাশকে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে। সাত-আট বছরের একজন বালক সেই যে দেশান্তরি হলেন সে বেদনা তিনি বুকে লালন করেছেন আমৃত্যু।

উত্তম দা ছিলেন সবার মধ্যে পুরুষোত্তম, অনন্যসাধারণ নরোত্তম উত্তম দাশকে জানাই বিদায় শ্রদ্ধা।

১৩ জুন ২০১৪,
Flag Counter


1 Response

  1. Ferdaushi Queen says:

    Vison vison bhalolagay monta vore gelo.tar sathr matro 2 bar dekha hoechhe,akhon mone hoschhe aro kotha kenon bolini!hahakarta roe gelo mone.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.