গদ্য, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব, স্মরণ

সতত ডানার কবি সিকদার আমিনুল হক

sams_arefin | 17 May , 2014  

border=0বাংলা-কাব্যলক্ষী এ পর্যন্ত যে কবিদের জন্ম দিয়েছেন– তাদের মাঝে ভিন্ন এক স্বর সিকদার আমিনুল হক। জন্ম ১৯৪২ সালের ৬ ডিসেম্বর। মৃত্যু ১৭ মে ২০০৩। স্বাধীন বাংলাদেশে পঞ্চাশের যে দুই দিকপালের হাত ধরে বাংলা কবিতা কৈশোর অতিক্রম তারা নিশ্চই শামসুর রহমান ও আল মাহমুদ। একজন নাগরিক কবি; যিনি সময় ও স্বাধীনতার প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছেন। আরেকজন গ্রাম-বাংলাকে তুলে এনে প্রতিস্থাপন করেছেন বইয়ের পাতায়। কিন্তু কবিতার দীর্ঘ এই যাত্রায় কবিতায় বিমূর্তভাবনার বুননে দর্শনের ব্যবহার অবচেতন মনে এড়িয়ে গেছেন অনেকেই। গালিবীয় ভাবনায় বুদ হয়ে থেকে রুমির মৃত্যুচেতনা স্বার্থকভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন কবি সিকদার আমিনুল হক। যে কবি এই মহৎ কাজ করে বাংলাদেশের কবিতার আকাশে অন্য এক নক্ষত্র সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছেন তিনিই সিকদার আমিনুল হক। আবার তিনিই বিমূর্ত চিত্র ও নারী সৌন্দর্য বর্ণনায় আশ্রয় নিয়েছেন ফরাসি কবি র‌্যাঁবো’র বা ফরাসী কবিদের মতো বিরতিহীন প্রচেষ্টা। তাই নারী প্রসঙ্গে সতত ডানার মানুষ -এ বলেন, ‘আমার কবিতা দিয়ে হে রূপসী, যতই নিংড়ে নাও না কেন শান্তি আর ঘুমের / গৌরব- মনে রেখে আমি আছি তোমারই।’ এ যেনো গালিবের মতো উচ্চারণ– অনুকম্পা হলে ডেকে নিও আমায় যে কোন সময়/ আমি তো অতীতকাল নই যে ফিরে আসেত পারবো না কখনো।’

এমনকি সতত ডানার মানুষ -এর পঙক্তিবিন্যাস, স্বতন্ত্র কবিতার দীর্ঘ পরিসর, মুক্তছন্দে লেখার প্রবণতা অনেকটা র‌্যাঁবোর মতোই। মূলত র‌্যাঁবো থেকে উদ্ভুদ্ধ হয়ে বাংলা কবিতায় ফরাসি দর্শনের প্রতিস্থাপন করেছেন। কিন্তু দর্শনের এই প্রতিস্থাপন করতে গিয়ে কখনোই তা ক্লান্তিকর দুর্বোধ্যতা সৃষ্টি করেনি। এ কারনে তিনি পুরোপুরি র‌্যাঁবো নন, কারণ ফরাসি ও ফার্সির জৈবিক সম্মিলনে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সত্তা। কারণ র‌্যাঁবো’র নরকে এক ঋতুর প্রথম কবিতা যেমন শুরু হয় শিরোনামহীন; ঠিক তেমনি তিনিও সতত ডানার কবিতা শুরু করেছেন। তার স্বাতন্ত্রের কারণেই এখানে নারীকে ভিন্নরূপে উপস্থাপন করে বলতে পারেন, ‘ মমতা ছাড়া আজ পর্যন্ত জঙ্ঘার নিচের ওপর কাপড় তোলে নি। এমন কি গণিকার কাছেও নয়।… /আর তাই পৃথিবীতে একটি গণিকাও আমি দেখি নি।’ বা তিনিই যখন বলেন, ‘ বালিকা বয়স থেকে নিদ্রিত স্তন হয়ে ওঠে ওদের নৈরাশ্য এবং সম্পদের ভার! ’ তখন আমরা র‌্যাঁবোর দ্বারস্থ না হয়ে পারি না। কারণ তার ভাবাদর্শ– র‌্যাবো বলছেন,‘ একটু তাড়া করো। আছে কি অন্য কোন জীবন? ঐশ্বর্যে কে ঘুমাতে পারে? তা যে চিরকালের অনাবৃত স্তন।’ আবার একইভাবে র‌্যাঁবো যখন বলেন, ‘ যখন খুব ছোটো ছিলাম, ভালো লাগতো এক দুর্দম কয়েদীর কল্পনা/ কারাগারের দ্বার যাকে মুক্তি হতে দিলো না কোন দিন’। তিনি তখন র‌্যাঁবো থেকে আরও অগ্রসর হয়ে, র‌্যাঁবো থেকেও বেশি কল্পনাতীত হয়ে বলতে পারেন, ‘ ‘কতো একা ছিলাম আমি শৈশবে। বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত। কিছুই হারাইনি আমি সে পর্যন্ত;/ এমন যে দূরে নক্ষত্র, তারাও সারারাত্রি নীলিমার মধ্যস্থায় আমার সঙ্গে কথা বলতো।’
তিনি আস্তে আস্তে তার খোলশ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। স্বমহিমায় ভাস্বর হন নিজের কাব্যভাষায়। আর তখন সতত ডানার মাঝে কল্পনা বা ডিসকোর্সের বদলে এক ভয়াভহ দার্শনিক সত্যের মুখোমুখি হতে হয় পাঠককে। আর এই দার্শনিক সত্য অনেক সময় সমালোচকও বুঝতে পারেন না। পাঠককেও সময় নিয়ে বুঝতে হয়। তাই সে সময়টুক নিয়ে পড়ার যে কী আনন্দ, তা কবিতার ভাবনা বোঝার পরই পাঠক বুঝতে পারে। তাঁর কবিতা বুঝতে হলে একজন ভালো পাঠক হতে হবে।

তার কল্পনার সীমা পরিসীমা ও কাব্যিক ভাবের উচ্চারণ কবিদের কবির মতো। তার ভাষা বুঝতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয় সাধারণের। তাদের হয়তো জীবনানন্দের মতো কয়েক দশক অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে, সূর্য উদিত হওয়ার মতো কাব্যাকাশে তারা উদিত হয়। আর অতীতকে অস্বীকার করা নিয়ে নিদারুণ যৌক্তিক এক কাব্যভাষা। তাই তো আবুল হাসান যদি বলেন,‘ ঝিনুক নীরবে সহো,/ ভিনুক নীরবে সহে যাও/ ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্ত ফলাও!’ তখন কবি সিকদার আমিনুল হক জীবনের অপরাধ ক্ষমা করে স্বার্থকতার খাতিরে উচ্চারণ করেন,‘ আর স্বপ্নের জন্য পাতা বিছানায় একই সারিতে শুয়েছি আমরা সারারাত্রি।… কিন্তু জীবন আমাদের সরিয়ে দিলে। আবার কখনো তিনি বাংলার সুপুরুষ হলেও ফরাসী পুরুষের মতো হয়ে পরেন নারীপ্রেমী। আর বলতেন পারেন পৃথিবীর ‘… তাদের সৌভাগ্যের বসন্ত আমার প্রতিশ্রুতি/ অনাবৃত শরীর। তাই তো পৃথিবী এত নিস্তবদ্ধ ও কোমল।’ কারণ এই দয়িতাই তাকে দিয়েছে আপাদামস্তক মাদকতা। রাত্রির অন্যপ্রান্তে যে মিলনের ঝাঁঝালো গন্ধ তা-ই প্রমাণ করে তিনি ফ্রয়েডীয় ভাবধারা বুকে ধারণ করলেও তা প্রকাশে কতোটা শালীন। কেননা যৌনতাকে শৈল্পিকভাবে উপস্থাপন করার নামই শিল্প। তাই গ্রিল দেওয়া খাঁচায় জীবনের ব্যস্ততর মুহূর্তগুলোকে আটকে রেখে তিনি নির্মল ভালোবাসা পেতে চান। আর বলতেও পারেন, ‘ এর চেয়ে ভালো হতো– যদি থাকতো রাত্রির বাতাস;/ একটি বারান্দার গ্রিল দেয় খাঁচায় আমরা বসতাম মুখোমুখি’। এ যেন বাংলার বিরহী কোন কিশোরের আবেগঘন উচ্চারণ।

তিনি কোরানিক মিথের চমৎকার ব্যবহার করেছেন কবিতায় । হযরত আদম ও হাওয়া যখন স্রষ্টার নিষেধ অমান্য করে কথিত ফল খেলেন তখন তারা অনাবৃত হয়ে পড়ে। সেই পোষাকহীন অবস্থায় ‘হাওয়া’ নারীর আর ‘আদম’ প্রথম পুরুষের পোশাক পরে। সেই থেকে নাকি কবির মতে, ‘ আরও ভালো হয় যদি বলি, আমার পোশাক হলো কর্কশ ও অহঙ্কারের/ আর তার আচ্ছাদন কোমল, ক্রীতদাসীর– আর সেই জন্যই হয়তো কান্নার।’ এখানে মিথ ও ক্যাটেসট্রফির অবতারণা করে কবি এক চিরন্তন সত্য বর্ণনা করেছেন। যে সত্যকে আমার দর্শন বলে জানি। যার স্পর্শে নীতি নৈতিকতা আমাদের জেগে ওঠে। কারণ স্রষ্টার আদেশ অমান্য করার ফলে যে বিপর্যয় আসলো তা হলো দুজনকেই স্বর্গ থেকে এই মর্তলোকে পাঠানো। তারপর থেকেই নারী ক্রীতদাসীর ভূমিকায় কখনো মা হয়ে, কখনো চাকরাণী হয়ে, কখনো পত্নী হয়ে, কখনো উপপত্নী হয়ে কান্নার পোশাক পরিধান করলো । এই মিথ বা বাস্তবতা বর্ণনা করে, সাধারণ ঘটনাকে দর্শন করে তোলা বা অনাকাঙ্ক্ষিত সত্য বলতে পারাই একজন মহৎ কবির গুণ।

মহৎ কবিদের কবিতায় একটি বিশাল অংশ ‘Personification’। কেউ মৃত্যুকে, কেউ সন্ধ্যাকে, কেউ কোন বিমূর্ত বস্তুকে ব্যক্তি হিসেবে সন্মোধন করেছেন। কিন্তু তিনি এত সুন্দরভাবে কবিতাকে পার্সনিফিকেশন করেছেন, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তিনি বলেছেন, ‘কবিতাকে থাকতে দাও একা স্পষ্ট আর পরস্ত্রীর মতো পবিত্র’। কারণ কবি বিশ্বাস করেন কবিতাকে খুঁজে পাওয়ার জন্যই তো কবিকে সাধারণ জীবনের পরিসমাপ্তি টানতে হয়। আর যদি কারো এরূপ কবিতা মানে স্ত্রী বা প্রেমিকা না থাকে তবে সে কোথায় কবিতা খুঁজবে। কবিতা খুঁজতে তাঁকে যেতে হবে না মাঠে-ঘাটে। কারণ পরবর্তী পঙক্তিতে কবি বলেছেন, ‘কবিতা সে থাকুক কামনাদাত্রীর ওষ্ঠে, বগলের নিচে ছোট অন্ধকারে/ এবং যার প্রণয়িনী নেই, পানশালায় তার শেষ পাত্রে’। এর চেয়ে সুন্দর অনুভূতি নারী বা কবিতা নিয়ে বাংলাদেশের কোন কবি সম্ভবত লিখেননি। কারণ এইখানে একজন তরুণ কবির কবিতার উৎসের বর্ণনা অতি সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। প্রেমের কবিতা লিখলে যেমন প্রেম করতে হবে, ঠিক তেমনি বিরহের কবিতা লিখতে হলেও বিরহভার সহ্য করতে হবে। ত্যাগ বা শ্রম না দিয়ে কোন কিছুই অর্জন হয় না। তাই সে কবিতা খুঁজতে কখনো কবিকে কামনাদাত্রীর ওষ্ঠে যেতে হয়। তারপরও যদি কোন তরুণ কবি নারী সঙ্গ লাভে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে অবশ্যই বিরহভার সহ্য করতে পানশালার শেষ মদের গ্লাসটির প্রতি ঝুঁকতে হবে। দর্শনের আড়ালে আড়ালে কবিতা পুতে দেওয়ার এই এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। যেমন করে কৃষক মাটির আড়ালো রোপন করে শস্যের বীজ।

শুধু কি তাই তিনি কবিতার সমালোচনা কারা করবে তাও স্পষ্ট করে দিয়েছেন কবিতার ভাষায়। কারণ কবিতার কাঠখোট্টা সমালোচনা তারাই করে যারা বস্তুত কবিতা বুঝে না। তাই কবি সেই সমালোচকদের দিকে তাক করে ‘অতিপ্রগলভ শতাব্দীর কবিতা’য় বলেছেন ‘কবিতা তুমি তো সম্রাট! তোমাকে নিয়ে গল্প করবে ক্ষত-বিক্ষত সৈনিক,/ যারা তোমাকে দ্যাখে না। তুমি সেই কিশোরীর অন্তর্বাস, বৃদ্ধেরা যার রং পর্যন্ত আঁচ করতে পারে না।’ কবিতাটি খুবই সহজ কিন্তু তার ব্যখ্যা দেয়া একটু সময়সাপেক্ষ। এখানে কবি বুঝাতে চেয়েছেন আসলে কবিতা নিয়ে যুদ্ধ করে মূলত কিছু পন্ডিত শ্রেণির লোক। যাদের কবিতা হয় না। তারা হয়তো কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা সমাজের কোন আমলা । যিনি জীবন বাজি রেখে হলেও কবিখ্যাতির জন্য লালায়িত। আর তাদের জন্য সত্য হল কবির মতে কবিতার সেই সম্রাটকে কবিতার তথাকথিত সৈনিকরা জীবনেও দেখে না। কারণ এই তথাকথিতরা কখনো কবিতাই লেখতে পারে না। তার শুধু কাঙালের মতো কবিখ্যাতি চায়। তারপরও মাঝে মাঝে তিনি ঘুরে ফেরেন ফরাসি ভাবার্দাশে। কারণ রাঁবো তাঁকে সবসময়ই আচ্ছন্ন করে রাখে। তাই র‌্যাঁবোর উত্তরসূরী হয়ে বলেন, ‘…অনুসরণ করি সুঠাম নারীর নগ্ন কোমরের রক্তচক্ষু ভর্ৎসনা। চোখ দিয়ে আমি রাতে শরীর দেখবো, আমার আঙুল সেই/ সন্ধ্যার প্রহর থেকে আদ্র।..’ ।

কিন্তু র‌্যাঁবোর নারীরা ততোটা ক্ষমতাবান নয় যতটা সিকদার আমিনুল হকের নারী। নারীর প্রতি বিনর্ম শ্রদ্ধায় তার যেমন শির নত হয়, তেমনি কামনার আগুনে তিনি পুড়ে ছাই হয়ে যান। আর তাই স্বভাবতই তিনি প্রকাশ করেন তার ক্ষমতা এই বলে, ‘… কী প্রচণ্ড সজীব এই দাসীর ভোরের দেহরেখা। রাত্রির চরিতার্থ স্বপ্নের ঘ্রাণ পর্যন্ত সে/ টেবিলে এনে হাজির করে অত্যন্ত অনুগত ভঙ্গিতে। হায়রে! দরিদ্র মেয়েটি ভালোভাবেই জানে এ/ জন্য আমি তাকে বেতনের অতিরিক্ত একটি কপর্দকও দেবো না’। এখানে কবি প্রতিদিন ভোরে ঢাকার উচ্চবিত্ত সমাজে যেই মেয়েটি চা দেয় তার বাড়ির মালিককে তার প্রতি কেমন অনুভূতি প্রকাশ করে তা সহজেই তুলে ধরেছেন ‘ Monologue ’ অর্থাৎ ঢাকার সব ধনী চায় রাতে বাসার আলুথালু কাজের মেয়েটিকে একান্তে কাছে পেতে। আবার সেই কাজের মেয়েটি যখন বিপদে পড়ে তখন সাহায্যের জন্য সামান্য হাত বাড়িয়ে দিতে তাদের মানবিকতা জেগে ওঠে না। যেমনটা শেক্সপিয়রের ‘ওথেলো’ তে আমরা লক্ষ্য করি। যেখানে নায়ক একান্তে অনেক কিছুই ভাবেন কিন্তু তা আর তার তেমন করা হয় না। এখানেও কবি ঢাকার প্রেক্ষাপটে বুঝাতে চেয়েছেন উচ্চমধ্যবিত্ত বা ধনীদের এমন লজ্জাজনক আচরণ কায়িক শ্রমের পাশাপাশি গৃহপরিচারিকার প্রতি। কিন্তু সেই আনন্দের জন্য তিনি ন্যূনতম সমবেদনা প্রকাশ করতে রাজি না। এখানে তার কবিতা শুধু বিমূর্ত ভাবনাকে উপস্থাপন করেনি, বরং বাস্তবতার চোখ দিয়ে চিত্রায়িত করেছে অনাবিল শব্দের উপস্থাপনায়। আর দর্শনের সুতোয় এইভাবে সাধারণ শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রকাশ করাই মূলত সিকদার আমিনুল হকের কাব্যভাষার মূল আকর্ষণ।

Flag Counter


1 Response

  1. Shoriful Islam says:

    I think there is an attempt to compare Shikder Aminul Haque with Rabo but why the headline is Shototo Danar Kobi

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.