আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: সেগুনবাগানের বাড়ি

sanjida_khatun | 14 May , 2014  

সেগুনবাগানের বাড়ির দক্ষিণদিকের খোলা জমিতে ছোট কাকা কোদাল দিয়ে মাটি কুপিয়ে শীতের ফুলকপি আর বাঁধাকপির চারা লাগাতেন। কপি গাছের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা শিশিরের ছবি এখনও যেন দেখতে পাই। কোপানো মাটি আর শিশিরের মিশ্র একটা গন্ধ ভাসত বাতাসে।

বাগানে কত যে ফলের গাছ ছিল–কী বলব! গোটা তিনেক পেয়ারার গাছ। তার একটিতে বড় বড় কাশীর পেয়ারা ধরত। আমগাছ ছিল গোটা তিনেক, নারকেল গাছ দুটো। নারকেলের পাতায় কাক এসে বসলে যে-ছবি দেখতাম–বড় হয়ে সেই ছবি পেয়েছি জয়নুল আবেদীনের আঁকা ছবিতে। দক্ষিণ পশ্চিম কোণে ছিল একটা গোলাপজামের গাছ বড় হয়ে অনার্স ক্লাসে পড়বার সময়ে দেখেছি সেই গাছের নিচটাতে গোলাপজাম ফুলের সরু সরু পাপড়ি বিছিয়ে গোল হয়ে থাকত।

আরো ছিল পুব দিকের দেয়াল ঘেঁষে এক বেল গাছ। বাজারে যে বেল পাওয়া যায় তার চেয়ে বড় বড়। ও গাছ আমাদের গ্রামের বাড়ির বেলের চারা থেকে করা। আর ক্লাস ফাইভে থাকতে যুদ্ধের সময়ে গ্রামে গিয়ে দেখেছিলাম মস্তবড় সাইজের বেল। গাছটাও খুব উঁচু। ফল মাটিতে পড়লে একেবারে ভেঙে ছত্রখান হয়ে যেত। আবরণটা ছিল অত্যন্ত পাতলা। সেদিন আমার কাজের মেয়ে বলছিল ওদের রংপুরের বাসায় বড় বড় বেল হয়, সেগুলোর নাম আসলে সিরিফল। অর্থাৎ শ্রীফল। ভালো লাগল শুনে। অতবড় বেলকে ভিন্ন একটা ভারি নামে ডাকা হতো ঠিক!

বেলগাছটার দক্ষিণে ছিল দুটো কাঁঠাল গাছ। একটির ফল এই-আর-কী গোছের অর্থাৎ স্বাদে আহামরি কিছু নয়। অন্যটিতে পাঁচ থেকে সাতটার বেশি কাঁঠাল ধরত না। ভিতরে কোয়া বা কোষও বেশি হলে আটটি! কিন্তু কোয়াগুলো ল্যাতপেতে নরম নয়, কচকচে শক্তও নয়, অথচ মধুর রসে ভরা। কাঁঠালের ভুতির সঙ্গে থাকত অনেক চাপিলা। তার বিচি নেই বলে তুলে তুলে খেতে সুখ!

আমরা বড় হয়ে আঁশফলের গাছেও ফল ধরতে দেখেছি। আর নারকেল গাছে ফল ধরবার নামই ছিল না! একবার কার কাছ থেকে শুনে আম্মু গাছ দুটোর গোড়া ঘিরে খানিকটা দূরে গোল করে গর্ত খোঁড়ালেন। তাতে অনেক নুন দেওয়া হলো। সেখানে রোজ পানি ঢালা হতো। ওমা, সত্যি সত্যি কিছুদিন পরে দুটো গাছেই নারকেল ধরল! তবে সরুমতো বদখত চেহারা ফলগুলোর। সময় হলে পড়ে ছাল ছাড়িয়ে দেখা গেল নারকেলগুলো বেশ বড়ো! ভেতরে পুরু শাস আছে, আর মিষ্টিও খুব।

ছোটবেলায় উত্তর দিকের ভিতরের উঠোনে পশ্চিম দিকে একটা পেঁপে গাছে অজস্র পেঁপে ফলেছিল। তার কাছেই ছিল পুঁইমাচা। তার পাকা ফল পেড়ে চটকে চটকে হাতে রঙ করতাম আমরা।

পশ্চিম দেয়ালের ধারে একটি গন্ধরাজ আর একটি টগর ফুলের গাছ ছিল। দুটি ফুলেরই সুগন্ধের কথা ভোলা যায় না। আর গন্ধরাজ ফুল ফুটত বড় জোর চারটি বা পাঁচটি। বড় বড় ফুলগুলোর গঠন সৌকর্য চেয়ে চেয়ে দেখবার মতো। অনেক গাছে গুচ্ছের গন্ধরাজ ফুটতে দেখেছি, তার গন্ধও আছে, কিন্তু গড়ন সুষম সুন্দর নয়। একটি ফুলের গাছ ছিল– তার নাম জানা নেই। সে গাছে একই সঙ্গে সাদা আর বেগুনি ফুল ফুটত। হালকা সুগন্ধও ছিল ফুলে। নয়নতারা ফুলটি দুচক্ষে দেখতে পারতাম না। ফুল ছিড়লেই বিটকেল গন্ধ হতো হাতে। ওর শুধু শোভা। শিউলি আর বেলি ফুলও ফুটত খুব।

নারী শিক্ষামন্দিরে ক্লাস টু/থ্রিতে পড়বার সময়ে আম্মুর তাড়নায় আব্বু বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসা নিলেন। নীলক্ষেতের সেই লালরঙের একতলা বাড়িগুলো আজ আর নেই। রেলরাইনের পুব দিকে বোধ হয় দুই সারিতে তিনটি তিনটি ছয়টি বাড়ি ছিল তখন। আমাদের উত্তর দিকের বাড়িটাতে থাকতেন আসামের বোরাহ্ সাহেব। হঠাৎ করে মারা যান তিনি। মোহিতলাল মুজুমদার, ডাক্তার সুরেশ মিত্তিররা থাকতেন দুখানি বাড়িতে। সব কথা মনে থাকবার মতো বয়স হয়নি আমার তখনো।

বাড়িতে কামরা ছিল অনেকগুলো। আর সামনের ডান দিকে বড়সড় মাঠ। আমাদের বাসাটা রেললাইন সংলগ্ন ছিল না, ছিল পিছনের সারিতে। অনেক পরে একটি লাল বাড়িতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টোর ছিল দেখেছি। খুব জীর্ণ দশা হয়ে গিয়েছিল দালানের।

নীলক্ষেতের বাড়ির মাঠে খুব ছুটাছুটি আর খেলা করতাম আমি আর রীনা। কিন্তু সন্ধ্যা হলেই যেমন সেগুনবাগানের বাড়িতে, তেমনি, এখানেও শেয়ালের ডাক শোনা যেত। এখানে থাকতেই আব্বু সন্ধ্যাবেলায় সময় পেলেই আমাকে কোলে বসিয়ে হাসান হোসেনের গল্প বলতেন। গোধুলির লালিমা দেখিয়ে বলতেন– ওই দ্যাখো হোসেনের রক্ত। কোনো কোনোদিন আকাশের তারা চেনাতেন। সপ্তার্ষিমন্ডল দেখতে পেতাম, কিন্তু ধ্রুবতারা খুঁজে পেতাম না কিছুতেই। অতোবড়ো আকাশের দিকে চেয়ে দিশেহারা লাগত।

ওঃ এই বাড়িতেই, বিকেলে চুল বাঁধা (বিনুনি করা) না হলে আম্মু রাত্রে দরজা খুলে বাইরে বার করে দিতেন। শেয়ালের ভয়ে হাপুস নয়নে কাঁদতাম। খানিক পরে নানি আম্মুকে বকেঝকে দরজা খুলে ঘরে টেনে নিয়ে বিনুনি বেঁধে দিতেন। নিয়মের বাইরে চলবার উপায় ছিল না আম্মুর কড়া শাসনে। যতই কষ্ট হোক, ওই শাসনেই চলার আর কাজের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শিখেছি–আজ তা বুঝতে পারি।

এ বাড়িতে ফুলের গাছ কী ছিল মনে পড়ে না। তবে সিঁড়ির পাশে জুঁই ফুলের লতা যেন ছিল মনে হয়।

এ বাড়ি থেকে আমরা চলে যাই বিশ্ববিদ্যালয় গেইট হাউজের বাসায়। এখনকার মেডিক্যাল কলেজের আউটডোর দিককার গেইট হাউসে।

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

কিস্তি-৯স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.