গীতবিতানে তিরিশ মিনিট

আলতাফ হোসেন | ১১ মে ২০১৪ ৯:০১ পূর্বাহ্ন

দিনটা কেমন মেঘলা মেঘলা। গ্রীষ্মের দিনে এমনটা তো বেশ। তবু স্বস্তি বিশেষ নেই কোনোদিকে। সারা পৃথিবীরই কত দিকে কত অস্থিরতা। তবু কি আপনমনে গান গাইব না সকালবেলা আধঘণ্টাটাক অন্তত গলা সাধার ছলে, যেমনটা করি রোজ, ঘরে থেকে থেকে! গান মানেই তো রাগরাগিণী, বেহাগ, দেশ, বাগেশ্রী, দুর্গা ঘিরেই থাকে, ইমন এসে পড়ে, বা, গলায় আসছে কিন্তু কোন্‌ রাগটি ঠিক মনে পড়ছে না এমনটাই হয় বেশি, কিন্তু তাতে সামান্য সময় যেতে-না-যেতেই দেখি যে গীতবিতানের পাতা খুলছি, যেমন আজই করা হল একটু আগে, এবং বিষাদাচ্ছন্ন গানটি পপ আউট করে এল সামনে—

মেঘছায়ে সজল বায়ে মন আমার
উতলা করে সারাবেলা কার লুপ্ত হাসি, সুপ্ত বেদনা হায় রে
কোন বসন্তের নিশীথে যে বকুলমালাখানি পরালে
তার দলগুলি গেছে ঝরে, শুধু গন্ধ ভাসে প্রাণে

কী আর গাইব।কে আর তেমন করে গাইবে,গাইবে নিজেরই জন্য।কার লুপ্ত হাসি,সুপ্ত বেদনা…কী বলা যায় এমন এক অনুভূতি প্রকাশিত হওয়ার পর। আপ্লুত, আচ্ছন্ন, বসে থাকি কিছুক্ষণ। যে শোনেনি,সে তো শোনেনি,সান্ত্বনা পাওয়া যায় না কিন্তু ভাই। গল্প কার সঙ্গে হবে তবে।সমাজ, সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব।যখন কলেজে পড়ি তখন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ভাই তাঁর ‘কণ্ঠস্বর’-এর জন্য চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে লেখা, আর আমার আবেগ লাগামছাড়া হয়ে গেল লেখায়, সে লেখা আবার গেল তাঁর সম্পাদিত এক গদ্য-সংকলনেও। তখন তো লজ্জা লেগেছিল খুব। কত লোকের চোখে পড়বে। কী ভাববেন তাঁরা? তখন না হয় বয়স ছিল কম, উচ্ছ্বাস ছিল প্রাণভরা, কিন্তু এখন? এখনো কেন রবীন্দ্রগান গাইতে বা পড়তে গিয়ে কথায় বাকরুদ্ধ ভেসে যাই?

শুধু গন্ধ ভাসে প্রাণে…

একেকটি গান দিয়ে শুরু করে সামনের দিকে এগোই। তবে আজকের এ গানেই যে রয়েছে আরও চিরকালের কথা। হেথা রহি না ক্ষণকাল।

জানি ফিরিবে না, আর ফিরিবে না, জানি তব পথ গেছে সুদূরে

পথ তো যাবেই সুদূরে। প্রকৃতি তো তেমনটাই চায়। তবে যে বোঝে সে তো বোঝে, সব মেনে নিয়ে তাই বলতে পারে,

পারিলে না তবু পারিলে না চিরশূন্য করিতে এ ভুবন মম

তবে, কারণও তো রয়েছে তার—

তুমি নিয়ে গেছে মোর বাঁশিখানি, দিয়ে গেছ তোমার গান।।

পরের যে গানটি বেশি শোনা হয়েছে বলে সুর সবটা জানা সেটি ‘উদাসিনী বেশে বিদেশিনী কে সে নাইবা তাহারে জানি, রঙে রঙে লিখা…ইত্যাদি। এ গানেও রয়েছে জগৎ বিষয়ে গভীর এ কথা—

মুগ্ধ আলসে গণি একা বসে পলাতকা যত ঢেউ।
যারা চলে যায় ফেরে না তো হায় পিছু-পানে আর কেউ।

কেন বলছি এসব কথা? এসব বাণী কি ব্যবহৃত ব্যবহৃত হয়ে শূয়ারের মাংস হয়ে যায়নি? না, যায়নি। জানি অনেকেই আমরা তবু মানতে পারি না যে, যে গেছে সে গেছে চিরতরেই। আমাদের পথ চেয়ে যে কেটে গেল কত দিনে রাতে। তবে বেজায় শান্তি ও সান্ত্বনা দিতে পারেন এই ভদ্রলোক। এই রবিবাবু। দেখুন না।

মনে জানি কারো নাগাল পাব না—তবু যদি মোর উদাসী ভাবনা
কোনো বাসা পায় সেই দুরাশায় গাঁথি সাহানায় বাণী।

পরের যে গানটির চার-লাইন বারবার গাইতে ইচ্ছা করে—

বিধুর বিকল হয়ে হয়ে খেপা পবনে
ফাগুন করিছে হা-হা ফুলের বনে।
আমি যত বলি ‘তবে এবার যে যেতে হবে’
দুয়ারে দাঁড়ায়ে বলে, ‘না, না, না।’

পরের কয়েকটি গান একটু পচাই লাগে, সত্যি বলতে। ‘মান অভিমান ভাসিয়ে দিয়ে…’ উঁহু চলবে না। তারপর ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা…’ ন্যাকা ন্যাকা। যদিও বিখ্যাত খুব। রবীন্দ্রভক্ত শিক্ষকদের খুব প্রিয়। পরেরটিও, ‘যদি বারণ করো তবে গাহিব না/যদি শরম লাগে মুখে চাহিব না’ ইত্যাদি।

তবে, ‘আমার লতার প্রথম মুকুল চেয়ে আছে মোর পানে’ দেখলেই গুনগুনানি এসে পড়েই। তারপর ‘একদিন চিনে নেবে তারে, তারে চিনে নেবে’ দেখা বা শোনামাত্রই গাইতে ইচ্ছা করে।

এক সকালের শেষের গানটি ছিল তবু মনে রেখো। সবচেয়ে টানল, টানে যে অংশটি—

যদি জল আসে আঁখিপাতে,
একদিন খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
তবু মনে রেখো।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — মে ১১, ২০১৪ @ ৬:০২ অপরাহ্ন

      বাহ্। দারুন একটা ভ্রমণ হলো। দারুণ এক চালকের ভূমিকা নিয়েছেন এখানে কবি আলতাফ হোসেন। অভিনন্দন ও শ্রদ্ধা কবির জন্য।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com