আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো:সেগুনবাগানে ছেলেবেলা

sanjida_khatun | 1 May , 2014  

স্কুলের দিনগুলোতে আমার স্বভাবটা বড্ড ভাবুক ছিল। এক একদিন ভরদুপুরে চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে মাঠে চলে যেতাম। সেগুনবাগিচার বাড়িতে থাকতাম তখন। আমাদের বাড়ির পশ্চিম দিকে তখন একটা বাড়ির পরে ওদিকে ঘরবাড়ি ছিল না বিশেষ। শিল্পকলা একাডেমীর বা দুর্নীতিদমন অফিসের কোনো চিহ্ন না থাকাতে ওদিকটায় কেবল মাঠ আর মাঠ! সেখানে গেলে উত্তর দিকে কাকরাইলের গির্জার মাথাটা দেখা যেত। আর গির্জার উপরের নীল আকাশে অনেক উঁচুতে শঙ্খচিল উড়তে দেখে উদাস হয়ে যেতাম। মনে হতো, বুঝি বিদেশী কোনো ছবি দেখছি। ওরকম বিদেশী ছবি আছে সত্যি সত্যি। পরেও দেখেছি। দুপুরবেলায় চিলের চিৎকারটা পরিবেশের সঙ্গে খুব মানাত।

সেগুনবাগানের বাড়ির পশ্চিম দিকের বাড়িটা তৈরি করেছিলেন কেদারেশ্বর ব্যানার্জি নামের ভদ্রলোক। ইট ভিজাবার জন্যে আমাদের লোহার গেটের বাইরে ওদের সীমানা ঘেঁষে মাটি খুঁড়ে একটা বড় চৌবাচ্চা করা হয়েছিল। তাতে ব্যাঙের বাচ্চা ছিল অনেক। আমি আর রীনা বাঙাচিগুলোকে মাছ ভেবে ধরতে চেষ্টা করতাম। ছোট ছোট ব্যাঙেরা আমাদের সাড়া পেলেই ধার থেকে চৌবাচ্চায় ঝাঁপ দিত। একবার আমি না রীনা কে যেন চৌবাচ্চায় পড়ে গিয়ে কী ভয় পেয়েছিলাম, এবার বাড়ি গিয়ে মার খেতে হবে! বাড়িটা আমাদের সামনেই দোতলা পর্যন্ত হয়ে গেল। গৃহ প্রবেশের নেমন্তন্নও খেয়েছিলাম, আবছা মনে পড়ে। দোতলার উত্তরদিকের বারান্দাতে পাতা পেড়ে খাবার আয়োজন হয়েছিল। এই বাড়িতেই পরে টী-বোর্ডের প্রধান হিসেবে শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন পাকিস্তান আমলে।

পাড়াটা ছিল হিন্দু প্রধান। আমরাই এক বাড়ি মুসলমান। আমাদের বাড়ি থেকে উত্তর-পশ্চিম কোণে খানিক দূরে ছিল ডাক্তার টি.পি. বোসদের বাড়ি। তার উত্তরে রসিক বাবুর বাড়ি ছিল শুনেছি। সেদিকে একবার ধূধূ আগুন জ্বলে আকাশ লাল হয়েছিল। শুনেছিলাম, ওটা রসিকবাবুরই চিতায় আগুন।

সেগুনবাগান পাড়ার দক্ষিণ দিকে বেশ কিছু বাড়ি ছিল। ইডেন স্কুলের কিছু ছাত্রী থাকত ওদিকে। দোলের সময় ওরা আবির নিয়ে এসে গুরুজনদের পায়ে আবির মাখিয়ে প্রণাম করে যেত। একবার কী মনে করে বালতি-ভরতি রঙ আর পিচকারি নিয়ে এসে বড়দি-মেজদিদের একবারে ভিজিয়ে দিয়ে গেল। বড়দিদের ঝোক চাপল–ওদেরকেও রঙ দিয়ে আসতে হবে। আব্বুর অনুমতি পাওয়া যায় না! বড়দি আবার ওঁর প্রথম আর আদরের সন্তান কিনা শেষে কী করে যেন রাজি করিয়ে ফেললেন আব্বুকে। রঙ-পিচকারি সব কিনিয়ে আনা হলো। বড়দিরা রঙের বালতিতে কিছু তোকমা ভিজিয়ে দিলেন। তাতে নাকি কাপড়ের রঙ ধুয়ে ফেলা কঠিন হয়ে। আমরা উৎসাহিত হয়ে উঠলেও ছোটদের যাবার হুকুম নেই।

ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকলাম। বড়দিরা মহা আনন্দে ওদের রঙ দিয়ে ফিরে এলেন হাসতে হাসতে। ওরা নাকি বলছিল– ‘এরাম! তোকমা দিয়ে কাপড়ের রঙ তো উঠবে না! বড়দিদের জয়টা দেখে খুব খুশি হয়েছিলাম। ওরা রঙ দিতে এলে আমরা ভয়ে লুকিয়ে পড়তাম।

সেগুনবাগান পাড়ার দক্ষিণ দিকেই সরু রাস্তাটার পুবধারের এক বাড়িতে ‘গোলাপ’ নামে ফরমার আর চওড়া কপালের এক মেয়ে থাকত। ‘নূপুর বেজে যায় রিনিরিনি’ নাচত নাকি স্কুলে। নজরুলের কী একটা গানের সঙ্গেও নাচত যেন। হ্যাঁ মনে পড়েছে, ‘চমকে চমকে ধীর ভীরু পায় পল্লীবালিকা বনপথে যায়, একেলা বনপথে যায়।’

আরো পুবের দিকে জে. কে. চক্রবর্তীর একতলা বাড়ি ছিল। বড়দিও বাড়িতে ব্যাডমিন্টন খেলতে যেতেন। শুনেছিলাম ও বাড়ির দেয়ালে শান্তিনিকেতনের এক শিল্পী অতি চমৎকার ফ্রেস্কো করেছিলেন। অনেক পরে শান্তিনিকেতনে পড়তে গিয়ে খুব নাম করেছিল চিত্রলেখা চৌধুরী। শুনেছিলাম ওর মা চিত্রনিভা ঢাকার সেগুনবাগানে আত্মীয়বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দেয়ালে ফ্রেস্কো করেছিলেন। চিত্রনিভা দিদিকেও দেখেছি শান্তিনিকেতনে থাকতে। সেবার জহরলাল নেহেরু এসেছিলেন ওখানে। তো বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করাবার জন্যে উত্তরায়ণে আমন্ত্রণ করা হয় আমাদের। সেখানে বেজায় রোগা, বেতের মতো শরীরের এক মহিলা বসে বসে নেহেরুর পোর্ট্রেট আঁকছিলেন। এত চমৎকার স্কেচ! অবাক হয়ে দেখছিলাম। পরে শুনি, উনিই সেই চিত্রনিভা চৌধুরী।

ওই বাড়িটি পরে হাতবদল হয়ে দোতলা না কি হয়, পুরোটা সংস্কার করার দরুন মূল্যবান ফ্রেসকোগুলো নাশ হয়ে গেছে।

সেগুনবাগানের বাড়ির উত্তর-পুবে খানিক দূরে ছিল বাসমাতিয়াদের ডেরা। বাসমাতিয়া আমাদের বাড়িতে দুধ দিতে আসত নিয়মিত। ওদের ভাষাটা ছিল একরকমের হিন্দি। আম্মু বলতেন ঠেট হিন্দি। বাসমাতিয়াদের আখের ক্ষেত ছিল। এক গিঁট থেকে আরেক গিঁট পর্যন্ত ছোট ছোট টুকরো করে এক টুকরি ভর্তি করে দিয়ে যেতে আমাদের জন্যে। আখগুলো তেমন পুষ্ট না করে দিয়ে যেত আমাদের জন্যে। আখগুলো তেমন পুষ্ট না হলেও, টুকরোগুলো ছাড়িয়ে খেতে ভারি সুবিধা ছিল। আব্বু এক বিকেলে আমাকে নিয়ে হাঁটতে বেরিয়ে চলে গেলেন ওই পাড়াতে। আম্মু ওই বস্তিকে বলতেন মাউড়াদের পাড়া। আব্বুকে দেখে তো ওরা হকচকিয়ে গেল– কোথায় বসতে দেবে, কী করবে! যা হোক আমাদের সঙ্গে ওদের কেউ আর এক টুকরি আখ মাথায় করে বয়ে এনে বাসায় দিয়ে গেল।

বাসমাতিয়ার মেয়েটি বড় হয়ে আমাদের দুধের জোগান দিত। ওর নাম ফুলবাসিয়া। আমার ভাষাজ্ঞান পোক্ত হলে ওদের নামের অর্থ লক্ষ করে অবাক হয়ে গেলাম। বাসমাতিয়া মানে বাসমতী আর ফুলবাসিয়া অর্থ ফুলবাস! এমন কাব্যিক নাম ওদের হতে পারে!! (চলবে)

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

কিস্তি-৮ স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.