চিত্রকলা, প্রবন্ধ, ব্যক্তিত্ব

দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি

রাজু আলাউদ্দিন | 7 Apr , 2014  

tagore-rivera.jpgজানাতো দূরের কথা, আমাদের অনুমানেও কখনো এই ভাবনা আসেনি যে পৃথিবীর বিখ্যাত মুরাল শিল্পী দিয়েগো রিবেরাও তার এক শিল্পকর্মে রবীন্দ্রনাথকে একজন প্রধান চরিত্র হিসেবে গণ্য করতে পারেন। অনুমানে না আসার কারণ হয়তো এই যে রিবেরা ছিলেন রাজনীতি দ্বারা, বিশেষ করে বামপন্থি রাজনৈতিক আদর্শের দ্বারা প্রবলভাবে অনুপ্রাণিত এক শিল্পী। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের ভাবনার জগতটি রাজনীতি-বর্জিত ছিলো না বটে, কিন্তু বাম কিংবা ডান–কোনো রাজনৈতিক আদর্শেরই তিনি সক্রিয় লেখক ছিলেন না। বামপন্থি আদর্শের বিজয়ী দেশ রাশিয়া যে তাকে মুগ্ধ করেছিলো সেটুকু জানাটা আমাদেরকে কেবল এই নিশ্চয়তা দেয় যে বাম রাজনৈতিক আদর্শের ইতিবাচক দিকগুলোর প্রতি তিনি ছিলেন সহানুভূতিশীল। তবে রিবেরার ছবির প্রধান চরিত্র হিসেবে রবীন্দ্রনাথের এই সহানুভূতি যে কোনো ভূমিকা রাখেনি–সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। তাহলে কী এমন অভিন্ন বিষয় পরস্পরকে কাছে এনেছিলো? আমার ধারণা উভয়ের নৈকট্যের কিংবা নৈকট্যের মাধ্যমে বিরোধের ধারণাকে স্পষ্ট করার পেছনে সত্যিকারের ভূমিকাটি ছিলো মেহিকোর সে সময়ের উজ্জল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী হোসে বাসকনসেলোস। বাসকনসেলোস যদিও বাম রাজনৈতিক বা দর্শনের অনুরাগী ছিলেন না, তবে তার ব্যক্তিত্বের চুম্বকীয় শক্তি ছিলো এতই প্রবল যে ভিন্নমত ও পথের ব্যক্তিদেরকে তিনি একত্রিত করতে পারতেন অনায়াসেই। করেছিলেনও তিনি। আর তাই পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞা, গাব্রিয়েলা মিস্ত্রাল, দিয়েগো রিবেরা প্রমুখ লেখক শিল্পীদেরকে তিনি তাঁর শিক্ষা, শিল্প ও জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে পেরেছিলেন।
sabio.jpg
শিক্ষামন্ত্রী এবং সচিব থাকার সময় বাসকনসেলোসের বহুবিধ প্রকল্পের একটি ছিলো চিত্রকলা আর মুরালের মাধ্যমে জাতির মনকে নান্দনিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা। ১৯২২ সালের দিকে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে “বাসকনসেলোস দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফর শুরু করেন, সঙ্গে ছিলেন বুদ্ধিজীবীদের একটি দল যেখানে বাদ যাননি চিত্রশিল্পীরাও;”
(Raquel Tibol, Diego Rivera: Luces Y sombras, Lumen, Mexico. 2007, P-52)

দেশের প্রথম সারির চিত্রশিল্পীদেরকে দিয়ে তিনি চেয়েছিলেন গোটা দেশের ধর্মীয় স্থাপনা ও শিক্ষানিকেতনগুলোকে মুরালের রংয়ে রাঙিয়ে দিতে। কিন্তু কাজটা সহজ ছিলো না তার পক্ষে। কারণ প্রত্যেক শিল্পীর নিজস্ব একটা জগত আছে, আছে পছন্দ অপছন্দের দ্বন্দ্ব। আরও একটা বড় ঘটনা হলো এই যে ঐ সময়টাই রিবেরাসহ আরও কয়েকজন শিল্পী মেহিকোর কম্যুনিস্ট পার্টিতে (PCM) যোগ দিয়েছিলেন। রিবেরার বামপন্থা এতটাই তীব্রতায় ভরা ছিলো যে এক সময় তিনি মেহিকোরই আরেক বামপন্থি মুরাল শিল্পী দাবিদ আলফারো সিকেইরোসের সাথেও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সুতরাং বাসকনসেলোসের সাথে একটা সংঘাত যে অবশ্যম্ভাবী ছিলো তা, সহজ হিসেবেই অনুমান করা সম্ভব। এ ছিলো কেবল সময়ের ব্যাপার। রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য আর এই পার্থক্য থেকেই পরস্পরের মধ্যে শিল্পচিন্তার ক্ষেত্রেও দেখা দিতে শুরু করে রুচির ভিন্নতা। মূলত এই পার্থক্যগুলোই তাদের মধ্যেকার বিরোধকে ঘনীভূত করে তোলে। রিবেরা ছিলেন উন্মুক্ত তরবারির মতোই ঝকঝকে আর শানদার এক কম্যুনিস্ট, তার উপর স্বঘোষিত নাস্তিকতার আলো এসে পড়ায় তা হয়ে উঠেছিলো আরও বেশি চোখ ধাঁধানো ও বেপরোয়া। অন্যদিকে, বাসকনসেলোস ছিলেন তার উল্টো পিঠ, অক্তাবিও পাসের ভাষায়:
“তিনি চেয়েছিলেন লাতিন আমেরিকাকে বৈশ্বিক সংস্কৃতির এমন একটি ভিত্তি হিসেবে তৈরি করতে যেখানে পূর্ব ও পশ্চিমের শ্রেষ্ঠ উপাদানগুলোর মিলন ঘটবে। বিপরীতে, শিল্পী ও অন্যান্য বেশিরভাগ বুদ্ধিজীবী যখন মার্ক্সবাদের দিকে ছুটে গেছেন তখন এর প্রতি ঘৃণাবশত বাসকনসেলোস গেছেন ক্যাথলিকবাদের দিকে।” (Selden Rodman, Tongues of Fallen Angels, New Directions, USA, 1974, P-138)
border=0মার্ক্সবাদ নয়, বরং ক্যাথলিকবাদ বা ধর্মকেই কেন্দ্রে রেখে বাসকনসেলোস তার ভাবনার বিন্যাস ঘটিয়েছিলেন। তবে সে ধর্মবোধ কোনো গোড়ামিতে পূর্ণ ছিলো না, বরং তা অপরাপর ধর্মগুলোর মানবিক ধারণার সম্মিলনে ছিলো উদার। উদারতা সস্ত্বেও চরিত্র ও রুচির এই ভিন্নতাই পরস্পরকে বিরোধের দিকে নিয়ে গেছে। রিবেরা যদিও বাসকনসেলোসের আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছিলেন গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে, কিন্তু মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়ই রিবেরা আঁকলেন এমন এক মুরাল যা দুজনের সৌজন্যের সম্পর্কেই কেবল ছিন্ন করেনি, অধিকন্তু জন্ম দিয়েছিলো এক বিতর্কের। চিলেতে যেমন নেরুদা এবং বিসেন্তে উইদোব্রোর মধ্যে বিবাদ দেখা দিয়েছিলো রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে, এখানেও, রিবেরার ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্রটি রবীন্দ্রনাথ। যদিও রিবেরার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্য অবশ্য বাসকনসেলোসই ছিলেন। তবে বাসকনসেলোসকে আক্রমণ করতে গিয়ে তিনি লাতিন আমেরিকার সে সময়কার কয়েকজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথকেও আক্রমণের অংশভাগ করে তুলেছিলেন।

১৯২৮ সালে আঁকা রিবেবার ‘জ্ঞানীরা’ (Los sabios) নামের এই শিল্পকর্মটিতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির কথা আমাদের জানা ছিলো না। এর কথা আমি প্রথম জানতে পারি মেহিকোর কবি কার্লোস পেইয়িসেরকে ১৯২৭-২৮ সালে লেখা রিবেবারই বন্ধু ও সহপাঠী শিল্পী রবের্তো মন্তেনেগ্রোর একটি চিঠি পড়তে গিয়ে। মন্তেনেগ্রো চিঠির এক জায়গায় বলছেন:
“শেষ পর্যন্ত গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কিছু প্যালেন আঁকা হয়েছে, যেখানে রবীন্দ্রনাথের সামনে হাতির উপর বসা লিসেনসিয়াদোর( এখানে ‘লিসেনসিয়াদো’ বলতে হোসে বাসকনসেলোসকে বোঝানো হচ্ছে) পেছনদিকটা দেখা যাচ্ছে আর তার হাতের পালক-কলমটি একটা সুন্দর ফুলে রূপান্তরিত হয়ে আছে। এটা তোমাকে মজার বিষয় হিসেবে বলছি না, বরং ঘটনা হিসেবে বলছি।”
মন্তেনেগ্রোর চিঠিতে ‘মজার’ এবং ‘ঘটনা’ শব্দ দুটিকে আলাদা করে বুঝতে গিয়েই এই চিঠির পাদটীকায় আমার চোখ আটকে যায়। চিঠিগুলোর সম্পাদক বলেছেন এই ছবিটি দিয়েগো রিবেবার আঁকা। বিরেরা রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছিলেন এটা নিশ্চয়ই কেবল মজার ব্যাপারই নয়, একটা ঘটনাই বটে। কিন্তু রিবেরার মতো পাড় কম্যুনিষ্ট কোন কৌতূহল থেকে রবীন্দ্রনাথকে বেছে নিয়েছিলেন সেটা না জানলে এই ছবিতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির আসল রহস্যটি বোঝা যাবে না।
border=0রিবেরার এই ছবিতে মোট পাঁচটি প্রধান চরিত্র রয়েছে, আর এদের পেছনেই রয়েছে আরও পাঁচটি গৌণ চরিত্র যারা কৌতূহলী সাধারণ মানুষ। পাঁচটি প্রধান চরিত্রের মধ্যে আছেন এসেকিয়েল আদেওদাতো চাবেস (১৯ সেপ্টেম্বর ১৮৬৮-২ ডিসেম্বর ১৯৪৬)। এসেকিয়েল দুবার র‌্যাক্টর হয়েছিলেন মেহিকোর প্রধান বিশ্ববিদ্যালয় উনাম (UNAM)-এর। উনামকে তিনি ইউরোপ ও আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমতুল্য করতে চেয়েছিলেন তার কাজের মাধ্যমে। মেহিকোর আগুয়াস কালিয়েন্তেস রাজ্যে গভর্নর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি।

border=0দ্বিতীয় চরিত্র হিসেবে উপস্থিত আছেন মেহিকোর আধুনিক ধারার কবিতার প্রধান পুরুষ হোসে হুয়ান তাবলাদা (৩ এপ্রিল ১৮৭১-২ অগাস্ট ১৯৪৫)। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, চিত্রসমালোচক, সাংবাদিক এবং কূটনীতিক। মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে জাপান, ফ্রান্স, একুয়াদর, কেলোম্বিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে তিনি বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। স্পানঞল সাহিত্যে তিনি হাইকু রীতির প্রবর্তক। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের গুরুত্বপূর্ণ বহু লেখক সম্পর্কে যেমন লিখেছেন তেমনি অনুবাদও করেছেন। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধারার নন্দনতত্ত্বের মিশ্রণের ফলে তার কবিতা হয়ে উঠেছিলো নতুন ধরনের প্রকাশ। গিয়োম এপোলেনিয়ারের পাশাপাশি সময়েই তিনি স্পানঞল কবিতায় ইডিওগ্রামেরও প্রবর্তক। সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতিভাবান এই কবি জীবদ্দশায়ই হয়ে উঠেছিলেন তুমুল আলোচিত এক ব্যক্তিত্ব।

border=0তৃতীয় চরিত্র হিসেবে রয়েছেন রুশ বংশোদ্ভুত আর্হেন্তিনীয় অভিনেত্রী ও আবৃত্তিশিল্পী বের্তা সিনহের্মান। গোটা লাতিন আমেরিকাতেই বের্তা তখন জননন্দিত এক শিল্পী। স্পানঞলভাষী বহু কবির কবিতা আবৃত্তির কারণে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিলো গোটা মহাদেশে।

চতুর্থ চরিত্র বাসকনসেলোস । তাঁর পরিচয় আগেই দেয়া হয়েছে। এই চরিত্রটিকে কেন্দ্র করেই রিবেরা তার ছবি’র অন্য সব চরিত্রগুলোকে জড়ো করেছেন।

পঞ্চম চরিত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কিন্তু আশ্চর্য এই, রবীন্দ্রনাথকেই তিনি বসিয়েছেন অন্য সবার কেন্দ্রে। ছবিটি দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রবীন্দ্রনাথকে ঘিরেই বিশিষ্ট চার ব্যক্তিত্বের উপস্থিতি।

রিবেরার আঁকা ‘জ্ঞানীরা’ নামক মুরালের এই প্যালেনটি যে তিনি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এঁকেছিলেন তাঁর প্রমাণ পাওয়া যাবে মানুয়েল আগিলার-মোরেনো এবং এরিকা কাব্রেরার লেখা দিয়েগোর জীবনীর একটি অংশে:
“‘জ্ঞানীরা’ এবং ‘ধনীদের রাত’ শীর্ষক প্যানেল দুটোয় রিবেরা সেইসব বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের এঁকেছেন যারা, তাঁর মতে, মেহিকোর বাস্তবতা সম্পর্কে অসচেতন। তাঁরা হলেন দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ হোসে বাসকনসেলোস, তার তখনকার বান্ধবী লেখিকা আন্তোনিয়েতা রিবাস মের্কাদো, কবি হোসে হুয়ান তাবলাদা, শিক্ষা-উপসচিব এসেকিয়েল চাবেস, বিখ্যাত ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাসকনসেলোসকে আঁকা হয়েছে সাদা এক হাতির উপর বসা অবস্থায়, যে-হাতিটি প্রতিনিধিত্ব করছে তাঁর ভাববাদী প্রকল্পগুলোর–বসে আছেন দর্শকের দিকে পিঠ দিয়ে। বাসকনসেলোস ছিলেন নেতৃস্থানীয় সেই সব ব্যক্তিত্বদের একজন যিনি মেহিকোতে গনশিক্ষা কার্যক্রম এবং মুরাল আন্দোলনের কৃতিত্বের অধিকারী। বাসকনসেলোসের অর্থানুকূল্যে গঠিত এই মুরালসমুহের কমিশনে রিবেরাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, কিন্তু রিবেরা এখানে তাকে একজন রক্ষণশীল ও হৃতসম্মান এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছিলেন ”
( Manuel Aguilar-Moreno and Erika Cabrera, Diego Rivera: A Biography, Greenwood, 2011, P-39)

সর্বহারা শ্রেণীর স্বপ্নের রাজত্ব কায়েম করার জন্য দিয়েগো বাম রাজনৈতিক আদর্শের দ্বারা তীব্রভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে শিল্প সাহিত্যকেও তার সহযোগী শক্তি হিসেবে আশা করতেন, যেমনটা এক সময় রাশিয়ায় সর্বহারাদের উদ্ধারের নামে গড়ে উঠেছিলো দলীয় সাহিত্য(Party Literature)। রিবেরা তার নিজের চিত্রকলা ও মুরালে শ্রমজীবী ও সর্বহারা শ্রেণীর স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার এক রূপকার ছিলেন। যারা এই স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার রূপকার নন, কিংবা নন সর্বহারা শ্রেণির পক্ষে উচ্চকিত তাঁরা যে রিবেরার কাছে বুর্জোয়া লেখক-বুদ্ধিজীবী হিসেবে বিবেচিত হবেন–এটাই ছিলো স্বাভাবিক।

রিবেরার এই ছবিটি ছিলো মেহিকোর গোটা ‘বুর্জোয়া’ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি এক তীব্র সমালোচনা। আর এই সমালোচনার শিকার হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথও।

সেনোবিয়া-হিমেনেথ, হোসে বাসকনসেলোস, বিক্তোরিয়া ওকাম্পো প্রমুখদের আনুকূল্য, চর্চা ও অনুবাদে বিশের দশকে শুধু মেহিকোতেই নয়, গোটা লাতিন আমেরিকাতেই আইকনিক (Iconic) ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বহু লেখক ও সাধারণ পাঠকের কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন এক অনুকরনীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে অবস্থান করছিলেন। রিবেরা এসব ঠিকই লক্ষ্য করেছিলেন। তা না হলে আর কোনো বিদেশি লেখক নন, রিবেরা কেন বেছে নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথকেই উক্ত চার প্রতিভার মাঝখানে? খোদ মেহিকোতেই সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় বাসকনসেলোসের প্রকল্পের অধীনেই রবীন্দ্রনাথের চারটি বইয়ের একটি সংকলন বেরিয়েছিলো। এটি ছাড়াও বেরিয়েছিলো ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্ম’ নামে আরও একটি বই। আর এই সব প্রকাশনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন পেদ্রো এনরিকেস উরেনঞার মতো সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। মেহিকোর বাইরে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও রবীন্দ্রনাথের কাল্ট-ফিগার হয়ে ওঠার সংবাদও তিনি নিশ্চয়ই জানতেন। এই জানার কারণেই হয়তো তার একচোখা বামপন্থি মন তিতিয়ে উঠে থাকতে পারে। রবীন্দ্রনাথকে বাসকনসেলোস তাদের জাতির মনোগঠনের ক্ষেত্রে অনুকূল মনে করলেও, রিবেরা তাকে দেখেছেন ঠিক বিপরীত অবস্থান থেকে। আর এই কারণেই রিবেরা বাসকনসেলোসকে নিধনের পাশাপাশি তাঁর অন্যতম আদর্শ রবীন্দ্রনাথকেও নিধন করেছেন। শুধু নিধনই নয়, এমনকি হাস্যকর দেখবার লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথের মাথায় তিনি একটি ফানেলও বসিয়ে দিয়েছেন। রিবেরার অসহিষ্ণু মন থেকে রেহাই পাননি তারই এক সময়কার পৃষ্ঠপোষক বাসকনসেলোসের ভাবমূর্তিটিও। দর্শকের দিকে বাসকনসেলোসের পৃষ্ঠদেশ এঁকে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সর্বহারা শ্রেণির ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষার ঠিক বিপরীতে তার অবস্থান। এমনকি অপমানজনকভাবে চিত্রায়িত করার জন্য তিনি পালকের একটি কলম তার হাতে তুলে দিলেও সেটির মুখ রয়েছে দোয়াতের পরিবর্তে একটি মলপাত্রের দিকে। রেহাই দেননি তিনি এসেকিয়েল চাবেসকেও। আসন হিসেবে ব্যবহৃত বইগুলোর মাধ্যমে রিবেরা এটাই বোঝাতে চাইছেন যে দেশের সত্যিকারের সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসেকিয়েলের জন্য বইপত্র কোনো বাধা হয়ে উঠছে না। ঠিক একই দৃষ্টি কোন থেকে, অনেকটা তীব্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোন থেকেই এঁকেছেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুরাগী লায়ার-বাদনে মগ্ন কবি হোসে হুয়ান তাবলাদাকে নিজের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এক চরিত্র হিসেবে। বেচারী বের্তাও রিবেরা-রোষ থেকে মুক্তি পাননি, কারণ তিনি ‘বুর্জোয়া’ কবিদের কবিতার আবৃত্তিকার হিসেবে লাতিন আমেরিকায় তখন জনপ্রিয় এক শিল্পী। সেনোবিয়া-হিমেনেথের অনুবাদে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতাও আবৃত্তি করেছিলেন বলে জানা যায়।

যত সমালোচনা, নিন্দা আর নিধনকাণ্ডই এর বিষয় হোক না কেন, লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্র-উত্থান ও ভোগের আনুপূর্বিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবেও যে এই ছবির বহুমুখী তাৎপর্য রয়েছে তা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। প্রথম তাৎপর্য হচ্ছে, এই ছবির মাধ্যমে রিবেরা প্রথম প্রকাশ্যে সমালোচনা করলেন বা এক রকম যুদ্ধই ঘোষণা করলেন তাদের বিরুদ্ধে যাদেরকে মার্ক্সবাদের ক্লিশে ও ধুসর পরিভাষায় ‘শ্রেণি শত্রু’ বলে গণ্য করা হতো। রবীন্দ্রনাথ যেন এই শত্রুদেরই একজন। দ্বিতীয় তাৎপর্য হচ্ছে বাসকনসেলোস ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রবল অনুরাগী। মূলত তার উৎসাহ ও উদ্যোগের ফলেই রবীন্দ্রনাথ প্রথমত মেহিকো এবং পরে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েন। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তার পক্ষপাত ও প্রীতির কথা সবিস্তারে লিখিতভাবে জানিয়েওছিলেন তিনি বিভিন্ন লেখায়। রবীন্দ্রনাথের এই প্রসার ও প্রীতিকে রিবেরার বামাচ্ছন্ন মন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। রবীন্দ্রনাথকে তিনি সম্ভবত ভাববাদী এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখতেন বলেই এই বিরূপতা । ছবিটিতে তিনি রবীন্দ্রনাথকে এঁকেছেন এক সন্তের আদলে। এ থেকেই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথকে তিনি কী ধারণায় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হয়তো আশংকা করতেন রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় ভাবমূর্তি লাতিন আমেরিকার জনগণকে আরও বেশি ধর্মমুখী করে তুলবে। রিবেরার প্রবলভাবে একমুখী মন হয়তো রবীন্দ্রনাথকে তলিয়ে দেখার কোনো সুযোগই পায়নি যে লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্র-প্রসারের মূল কারণ তার ধর্মবোধ ততটা নয়, বরং ভাবনা ও কল্পনার উদারীকরনের পাশাপাশি বিশ্বমানব সম্পর্কে এক সার্বজনীন আকাঙ্ক্ষার কাব্যময় প্রকাশই ছিল মূল কারণ। আর তাই, লেখক বুদ্ধিজীবী থেকে শুরু করে একেবারে সাধারণ মানুষকেও যে তিনি আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন তার একটা বড় কারণ রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণীয় অভিব্যক্তি। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের এই আবেদনই তাকে লাতিন আমেরিকায় দ্রুত জনপ্রিয় করে তুলেছিল। রিবেরা এই আবেদনের মর্মে প্রবেশ না করলেও রবীন্দ্রনাথের জনগ্রাহী ভাবমূর্তির খবরটা জানতেন বলেই হয়তো তার ছবিতে রবীন্দ্রনাথকে প্রতিপক্ষের এক চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন।

তৃতীয় একটি তাৎপর্য হচ্ছে এই যে লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সংঘাতের, যে সংঘাতের মূলে রয়েছে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মতাদর্শ, তারই ঘুর্ণিপাকে আবর্তিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অথচ রবীন্দ্রনাথ বরাবরই ফ্যাসিবাদী ও পুঁজিবাদী সমাজ কাঠামোর শোষণ-প্রক্রিয়ার নিন্দা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের এই পরিচয়ের সঙ্গে রিবেরা পুরোপুরি অপরিচিত ছিলেন বলেই ছবিতে তাকে বিতর্কিত এবং প্রতিক্রিয়াশীল একটি চরিত্র হিসেবে তুলে ধরেন। রিবেরার এই চিত্র আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় সমাজতান্ত্রিক চীনে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতির সেই সময়টাকে যখন ভুল বোঝাবুঝির এক অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ আরও একবার সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে ভুল বোঝাবুঝির শিকার হলেন সুদূর লাতিন আমেরিকায়। আর হলেন এমন এক ব্যক্তির দ্বারা যিনি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মুরাল শিল্পীদের একজন।
Flag Counter


8 Responses

  1. iqbal hasnu says:

    ধন্যবাদ রাজু আলাউদ্দিনকে অতি চমৎকার বিশ্লেষণী নিবন্ধ উপহার দেওয়ার জন্য। সাহিত্য ও শিল্প সম্পর্কে বাম মতাদর্শের অনমনীয় বা একচোখা অনুরাগী দিয়েগো রিভেরা কতটুকু ট্রটস্কির শিল্প-বিচার ধারণা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন সে-সম্পর্কে কোনো তথ্যানুসন্ধানের অবকাশ ছিল কিনা জানার অপেক্ষায় থাকলাম।

  2. “দিয়েগো রিবেরার রবীন্দ্রনাথ: প্রতিপক্ষের প্রতিকৃতি” পড়ে ততকালীল লাতিন আমেরিকায় রবীন্দ্রপ্রীতি ও রবীন্দ্রভীতি সম্পর্কে ভালো ধারণা পাওয়া গেলো। রাজু আলাউদ্দিন বলেন, রিবেরা চিত্রের মাধ্যমে নিধন করেছেন তাঁর “ভাবনা-গরু” রবীন্দ্রনাথকে। এতোকাল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে “গুরু” শব্দটির অঙ্গাঙ্গি অধিষ্ঠান জেনে এসেছি। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে “গরু”র সামীপ্য এই প্রথম দেখলাম। এটি রাজুর সাহিত্যিক ও ভাষিক রসবোধের পরিচায়ক নিঃসন্দেহে। কিন্তু সাবধান! এতে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হতে পারে। রবীন্দ্রপাঠকভক্তকুল বিরক্ত ও বিমুখ হতে পারেন। “গরু” শব্দটি আমাদের সংস্কৃতিতে অত্যন্ত নেতিবাচক কনোটেশন ধারণ করে। জগতগুরু আমাদের সহায় হোন!

  3. razualauddin says:

    প্রিয় ইকবাল হাসনু, না ভাই, “রিভেরা কতটুকু ট্রটস্কির শিল্প-বিচার ধারণা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন”–এ বিষয়ে আমার কোনো অনুসন্ধান নেই বলে কিছুই বলতে পারছি না । ভবিষ্যতে যদি কিছু জানতে পারি তাহলে অবশ্যই জানাবো। লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ। প্রিয় বিনয়,
    দুঃখজনক হলো এই যে আমি ‘ভাবনা-গরু’ বলতে চাইনি, বলতে চেয়েছি ভাবনা- ‍গুরু, প্রমাদবশত এই বিপর্যয়। আমার অজান্তেই যদি “সাহিত্যিক ও ভাষিক রসবোধের” কোনো পরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে থাকে তার কৃতিত্ব মোটেই আমার নয়, বরং আপনার। কারণ আপনিই বিষয়টিকে ওভাবে দেখছেন । ভুলটি সংশোধন করে দেয়া হলো। ধন্যবাদ বিনয়।

  4. গৌতম চৌধুরী says:

    সুলিখিত এই নিবন্ধটি পড়ে বিগত শতকের ২য়-৩য় দশকে মেহিকোর শিল্পসাহিত্য আন্দোলনের নানা বিপ্রতীপ মেরু আর তার উপর রবীন্দ্রনাথের ইতি-নেতি প্রভাব নিয়ে অনেক জরুরি তথ্য জানতে পারলাম। লেখক রাজু আলাউদ্দিনকে অনেক ধন্যবাদ।

  5. shilling says:

    Something is better then nothing

  6. razualauddin says:

    প্রিয় কবি গৌতম চৌধুরী, আপনার মন্তব্যের জন্য বহুত শুকরিয়া ।

  7. তাপস গায়েন says:

    রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে প্রতীচ্যের অনেক মনীষীর মূল্যায়ন পড়ে আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁদের সত্যদর্শন অনেকটা অন্ধের হস্তীদর্শনের মতোই । রবীন্দ্রনাথ অন্তত সমগ্র মানবের ইতিহাসকেই এই পৃথিবীর ইতিহাস বলে জেনেছেন, প্রতীচ্যের মহান এবং সুবিরাট দার্শনিকদের পশ্চিমের ইতিহাসকে সমগ্র মানবের ইতিহাস বলে দাবি করে ভ্রান্ত দর্শনের জন্ম দেন নি । রবীন্দ্রনাথকে তাঁরা “ভাবের ঠাকুর” ভেবে যেমন খন্ডিত দর্শনের জন্ম দিয়েছেন, তেমনি ভাবের ঠাকুরকে হত্যা করতেও দ্বিধা করেন নি, বরং উদ্যতই হয়েছেন । মূরাল শিল্পী রিভেরাও এই ভ্রান্তি থেকে দূরে নন । রাজু আলাউদ্দিনের এই সুলিখিত প্রবন্ধ আমাদের চিন্তাকে যেমন উদ্দীপ্ত করে, তেমনি জগত জুড়ে বিভিন্ন্ মনীষীর চিন্তার ব্যাপ্তি এবং ভ্রান্তি, দুই-ই দেখিয়ে দেয় । তিনি যে সাহিত্য সাধনায় ব্রতী হয়েছেন, তার ধারা এই বাংলাদেশে আরও বেগবান হোক ।

  8. রাজু আলাউদ্দিন says:

    প্রিয় তাপস গায়েন, আপনি ঠিকই বলেছেন–“রবীন্দ্রনাথ অন্তত সমগ্র মানবের ইতিহাসকেই এই পৃথিবীর ইতিহাস বলে জেনেছেন”। এই ব্যাপ্তি এবং সামগ্রিকতার বোধ ইউরোপে্ও খুব কম মনীষার মধ্যে দেখা যায়। আমার দুঃখ হয় এটা দেখে যে মহান কম্যুনিস্ট লেখক বুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ সর্বহারাদের প্রতি মানবিক হতে গিয়ে এই সামগ্রিকবোধ থেকে সরে আসেন। আপনার পর্যবেক্ষণ এবং মন্তব্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.