আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: প্রথম প্রেমের চিঠি

sanjida_khatun | 29 Mar , 2014  

আমরা ক্লাশ টেনে পড়বার কালে, ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ্ সাহেব ঢাকায় এসে তখনকার রেসকোর্সের ময়দান (এখনকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যান)-এর জনসভায় বক্তৃতা করেছিলেন। স্কুল থেকে আমাদের লাইন করিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে। মিছিল করে যাবার পথে স্কুলের শিক্ষক আক্তার আপা বলছেন– এই মেয়েরা, স্লোগান দাও’। কারোই গলা ওঠে না। অভ্যাস নেই তো! হঠাৎ আমিই জোরে স্লোগান দিয়ে উঠলাম। আক্তার আপা মহাখুশি ‘এই মেয়েই পারবে’। রেসকোর্স ময়দানে ভিড়ের মধ্যে পুলিশ মেয়েদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক ব্যবহার করেছিল বলে আক্তার আপা সেখানেও আমাকে দিয়ে স্লোগান দেওয়ালেন। ওদিকে জিন্নাহ্ সাহেব যে কী কথা বলে গেলেন তার কিছুই আমরা বুঝলাম না। আমরা যে সেকালে কীরকম অগা ছিলাম! আজকালকার দিনের মেয়েদের চোখ–কান অনেক খোলা।

আমি ক্লাশ টেনে থাকতেই ১১ সেপ্টেম্বর মারা যান জিন্নাহ সাহেব। রেডিওতে শোকের গান প্রচার হচ্ছিল ক্রমাগত। লায়লা আরজুমান্দ বানুর গানগুলো বেশ অন্তর স্পর্শ করেছিল। এক গান দুবার শুনলেই তখন সুরসমেত সবটা তুলে নিতে পারতাম। স্কুলের শোকসভাতে লায়লা আপার গাওয়া ‘মাটির দেহ মাটিতে যাক মিশে। খোদা, তোমারি ইচ্ছা পূর্ণ হোক’ গানটি আমি দরদ দিয়ে গেয়েছিলাম। পাকিস্তানের স্বরূপ আর জিন্নাহ্ সাহেবের ভূমিকা বিষয়ে কিছুই বুঝতাম না তখন।

সাম্প্রদায়িকতা-বিরোধী হলেও, ‘স্বাধীনতা’ কথাটির যে জাদু–তাতেই মজে সাতচল্লিশ সালে উদ্বেলিত হয়েছিলাম। স্বাধীনতা নিয়ে যত গান রচনা হতো সবই গাইতাম আবেগ দিয়ে। লতিফ ভাই (আব্দুল লতিফ) মুকুল ফৌজ–এ শিখিয়েছিলেন– ‘ভাঙিল জিন্দান টুটিল জিঞ্জির। আগে চল্, আগে চল্ আজাদ রাহগির’, ‘ঘুমন্ত মন উঠল জেগে আজ দিনের কলরোলে’, ‘কলিজার খুনে ওয়াতানের ধূলি করিয়া লাল’ ইত্যাদি। আমি তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে ঘরে বসে ছিলাম বলে আব্বুর অনুমতি নিয়ে ‘মুকুল ফৌজ’-এর দরদী-বোন হয়ে কাজ করছিলাম। ‘রমনা মুকুল ফৌজে’ যেতাম প্রতি বিকেলে। সেই সাতচল্লিশ-আটচল্লিশ সালে কবি গোলাম মোস্তফা (যাকে পরে কে যেন নাম দিয়েছিল ‘গোলমাল মোস্তফা’)-র লেখা ‘পাকিস্তানের গুলিস্তানে আমরা বুলবুলি’, ‘পাকিস্তানে অভাব কি’–এসব গানও গাইতাম পরমোৎসাহে। বাহান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের আগে পর্যন্ত পাকিস্তানের ফাঁকির কিছুই বুঝিনি! গোলাম মোস্তফাকে ‘গোলমাল মোস্তফা’ বলবার কারণ– তিনি দেশ স্বাধীন হলে বাংলা ভাষার ‘হিন্দুয়ানি’ নিয়ে লেখালিখি করেছিলেন।

ক্লাস টেন-এ থাকতে, সম্ভবত স্কুলেই একটা বিজ্ঞপ্তি দেখে পুরোনো ঢাকার ‘সবুজ সংঘে’-র নানান্ প্রতিযোগিতায় যোগ দেবার জন্যে আব্বুর কাছে বায়না ধরেছিলাম। আমাকে আব্বু খুব একটা ফেরাতে পারতেন না। নিয়ে গেলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে, আবৃত্তিতে, গল্প বলায় প্রথম হলাম। অন্য গানেও কিছু হয়েছিলাম–অত আর মনে নেই এখন ছোট বোন লীনু (ফাহমিদ)-কে ঘরের দরজা বন্ধ করে গানের সঙ্গে নাচ শেখাতাম। ওকে নিয়ে গেলাম নাচের প্রতিযোগিতায় যোগ দিতে। ওখানে গিয়ে পোষাক পরিয়ে সাজিয়ে দিলে, সে ঘোষণা দিল– ‘আমি নাচব না’। ওরকম খেয়ালি স্বভাব ছিল তার। আবার বমি-ও করল। ভয়েই নিশ্চয়! তার পরে নাম ঘোষণা হলে দেখি দিব্বি নাচতে চলে গেল। মনে হয় একটা পুরস্কারও পেয়েছিল।

কামরুননেসাতে পড়বার সময়ে উদ্ভট এক কা- করেছিলাম। সত্যবাদিতার নিষ্ঠা থেকেই সে-কা-। তখন বুঝি ক্লাস নাইনে পড়ি। দেশ বিভাগের পরে আম্মুর কিছু আত্মীয় কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। স্কুল-ফিরতি ঘোড়ার গাড়িতে করে ফিরছিলাম। ফজলুল হক হলের গেট হাউসে থাকি তখন। আব্বু ছিলেন হলের হাউস-টিউটর। বাড়ির কাছাকাছি এসে দেখতে পেলাম আম্মুর এনসান মামু বাসার দিকে আসছেন। উনি মামু হলেও আবার বোনজামাইও ছিলেন আমার মায়ের। সঙ্গে একটি ছেলে আসছিল, তার মুখে সুন্দর একটা হাসি। দেখেই বেজায় ভালো লেগে গেল তাকে। বাসায় এলে শুনলাম এনসান নানার ছেলে সে। জানলাম, এদেশে এসে আর্মেনিটোলা হাই স্কুলে ভর্তি হয়েছে ক্লাস নাইনে। ওই স্কুলেই আমাদের ছোট ভাই নবাব (কাজী আনোয়ার হোসেন) আর নূর (কাজি মাহবুব হোসেন) পড়ত। আমাদের সেই কালে পুরুষ আত্মীয়ের সঙ্গে কথাবার্তা বলবার বাধা ছিল। সংকোচও বোধ হতো খুব। কয়েকবার দূর থেকে দেখাতেই মন উচাটন। নবাবকে ‘ওর’ কথা জিজ্ঞেস করি, সে কিছুই খবর রাখে না, স্কুলে তো কত ছেলে আসে যায়। শেষ পর্যন্ত ওই বয়সের ধর্মমাফিক প্রেমপত্র লিখে বসলাম। নবাবকেই ধরতে হলো সে-চিঠি পৌঁছে দেবার জন্য। আমাকে নবাবের সাথে ফিসফাস করতে দেখে নূরুর খুব কৌতুহল হলো। কী ব্যাপার জানতে চায় কেবল। বড্ড জিদ্দি ছিল নূরু। ওকে কথাটা বলতেই হলো। চিঠিতে কী লিখেছি সে-কথা বলতেই হবে নূরুকে, অথচ ও নিতান্ত ছেলে মানুষ বলে ওসব কথা বলা যায় না। ভয় দেখালাম, আম্মুকে বলে দিলে কিন্তু আমি বিষ খাব! কিন্তু নূরু ঘোষণা দিলÑ ও আব্বুকে বলে দেবে! আর তক্ষুনি চলে গেল বলতে।

আমি মেজদির মেয়েদের (সব পিঠোপিঠি ) বোতলে ভরে দুধ খাওয়াচ্ছিলাম আর একজনের বোতল ভরে ঢেকে রাখলাম। ওই ঘরেই রাখা নাইজল নামে একটা শিশি (ডিস্ইনফেকট্যান্ট) হাতে নিলাম। ওটার গায়ে বড়ো বড়ো করে লেখা ছিল poison দুই ঢোক খেয়ে নিয়ে মনো হলো, আমি বলেছি ‘বিষ খাব’–বিষ খেয়ে মরব তো বলিনি। তাই ওখানেই ক্ষান্ত দিলাম। নবাবকে দেখতে পেয়ে বললাম–‘বিষ খেয়েছি’। ও ছুটল বড়দের কাছে বলতে। মেজদি আর আম্মু ছুটে এলেন। আব্বু তো বেশ কটা পাখার ডাঁটি মারলেন পিঠে, মেজদি আমাকে টেনে নিয়ে বারান্দার ধারে বসিয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করাতে লাগলেন। হুলুস্থুল লেগে গেল। ফজলুল হক হলের গেটের উলটো দিকে এক ডাক্তার ছিলেন, তাঁকে ডাকা হলো। তিনি এসে গম্ভীর মুখে দেখে-শুনে বললেন–হাসপাতালে নিয়ে যান, আমার কিছু করার নেই। তখনকার একমাত্র বাহন ঘোড়ারগাড়ি ডেকে আম্মু আমাকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে চললেন। পথে আমাকে বললেন– পুলিশ কেস হবে–তুই পুলিশকে বলবি ‘আম্মুর সঙ্গে অভিমান করে বিষ খেয়েছি’।

মিটফোর্ডই তখনকার ঢাকার একমাত্র হাসপাতাল তখন। সেখানকার এক ডাক্তার আম্মুকে ‘মা’ ডেকেছিলেন। ‘মমতাজ ভাই’ বলে ডাকতাম আমরা। উনি খবর পেয়ে ছুটে এলেন। আবার বমি করানো হলো। মমতাজ ভাই পুলিশকে ম্যানেজ করলেন। কি করে যেন খবরের কাগজেও খবর বেরিয়ে গিয়েছিল। মোটামুটি সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলাম। অনেক দিন পর্যন্ত মশলাছাড়া জাউ খেতে হয়েছিল। গলার ভেতরটা একেবারে পুড়ে গিয়েছিল কিনা!

পরে স্কুলে যেতেই ক্লাশের অমিয়া ভালো মানুষের মতন মুখ করে জিজ্ঞেস করল–‘কি হয়েছিল’ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলে কেন’? সরল বোকা মানুষ–কী জবাব দিয়েছিলাম তা আর মনে নেই। অমিয়া ক্লাসের মধ্যে বড় সড় মেয়ে ছিল। সবার সঙ্গে চোখ টেপাটিপি করে গুজগুজ ফুসফুস করতে লাগল। শুনেছিলাম–ওর দাদা মিটফোর্ডের ডাক্তার, সেই সূত্রেই সে খবর জেনেছে।
(চলবে )

কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৫ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৬ স্কুলের দিনগুলো: কামরুনসেসা স্কুলে

কিস্তি-৭ স্কুলের দিনগুলো: কামরুননেসা স্কুলের শিক্ষকদের কথা

Flag Counter


1 Response

  1. Ram Chandra Das says:

    enjoying

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.