কবিতা

তুষার গায়েনের দুটি কবিতা

tusar_gayen | 16 Mar , 2014  

ক্রিস্টাল কন্যার দেশে ক্রিসমাস আসে

জলও যে এত অগলনপ্রিয়, ক্রিস্টালকঠিন হতে পারে তা
এই হিমঋতু, হিমায়নের আগে বুঝি নি কখনো !
এই তো প্রথম নয়, অবধূত দেখেছি তোমাকে সাদারূপে
বহুযুগ নিঃশব্দ প্রপাতে ঝরে যেতে যেতে — আর কোনো রঙ নয়
শুধুই সাদার বিস্ময়ে অন্ধকার রাত প্লাবিত হৃদয়
ভোর হলে পায়ে পায়ে কাদা হয়ে গেছে সাদা আর কালো মিলে মিশে
মানুষের কাজ নয় সৌন্দর্য অক্ষত রেখে দেয়া
তাই দাঁতে দাঁত চেপে এইবার আদি রূপে
জলের স্বচ্ছতা নিয়ে তুষারবৃষ্টির যৌথ ঐক্যতান —
যেভাবে গাছের ডালগুলো জলভারানত সেভাবেই বন্দী হ’ল
হিমাঙ্কের নিচে বরফক্রিস্টালে সারি সারি সুন্দরীর মাথার মুকুট
লাস্যময়ী হাসির ঝঙ্কারে মাথাটা দোলাতে গিয়ে ভেঙে পড়া
মাইল মাইল বিদ্যুতের তারে আর তাতেই অন্যথা যত
নিদ্রাহীন নগরীর অহংকার ধুলায় লুটাল !

এবার ঘুমাও সকলেই ক্রিস্টাল কন্যার দেশে
হি হি কাঁপা হিমরাতে শত শত বর্ষ ধরে যত
শক্তি তরঙ্গ রেখেছ বন্দী করে হাতের মুঠোয়,
ফুৎকারে নিভিয়ে দিয়েছে বরফ মন্ত্রণা যত
ছাদের কিনার থেকে কোটি কোটি নিষ্পলক ছুরির সন্ত্রাস
সাদার অধিক অন্তর্গত স্বচ্ছতার ধার নিমিষেই দিতে পারে
গেঁথে সাবধানী পথিকের ঘাড় !

ক্রিসমাস,ক্রিসমাস …
দ্বি-সহস্র বর্ষ আগে জন্ম নিয়েছিল আর ক্রুশকাঠে বিদ্ধ
হয়েছিল উজ্জ্বল যিসাস ! ঘূর্ণাবর্তে আবারও অন্ধকার …
কারো প্রয়োজন খুব, কেউ কী জন্ম নেবে এই অন্ধকারে আর?
najib-t.gif
রাতের মহল্লা

জ্যামিতি কঠিন এই বাস্তবৃক্ষ খোপ খোপ ভরা ঘর শূন্যতার
অনেক উঁচুতে উঠে যাওয়া আকাশের তারা ছুঁতে চাওয়া
অহঙ্কার! নিস্তব্ধ রাতের হু হু হাওয়া ঘুম ঘুম মানুষের অনন্ত প্রহর
অবশ্য ঘুমও নেই বেশি কী যে তাড়না নির্ঘুম … নিঝুম মারিজুয়ানা
বিষাদে নিঃশেষ হ’ল শেষে দ্রুতগামী সড়কের পাশে
মানুষের উল্লম্ব গোত্রের বাঁধা ছক …

সব কিছু যদি শান দিয়ে বাঁধা তবে সে কোথায় ফোটে ফুল
সব যদি মানুষের হ’ল পাখিরা বসবে কোন কূলে
তাই কিছু গাছ আর তরুলতা আদেশে বানানো হ’ল
যেন তারা বাতাসে নির্ভুল দোলে আর সঙ্গী কুকুরের ছানা
প্রজননকেন্দ্র থেকে গ্রুম করে আনা, অনুগত অধীর ব্যাকুল
বুদ্ধির বিচ্যুতি নেই মানুষের মত … রাত জাগো রাত জাগো
জাগো রাত নিশাচর, হাঁটো নেশা চুর চুর অলিন্দে হাশিশ
এত যে উচ্ছেদ হ’ল, হুলস্থুল করে কোথা থেকে এল তবু
বসন্ত বাতাস নাচে ঘূর্ণি তুলে, ঝরাপাতা, ফ্রকপরা সহাস্য বালিকা
ওঠে নাই কিশোরের গোঁফরেখা একে বেঁকে সাইকেলে
রাত্রি মাত করে, ঢিল ছুঁড়ে মারে ঝন্‌ঝন্‌ ভাঙে কাঁচের জানালা
অন্ধকারে কী যে সাদা সাদা উরু আর সুগোল বুকের উঁচু
বঙ্কিম রেখার চাপ, তীব্র ফুলগন্ধ, বসন্ত বিলাস
নিতম্ব দুলিয়ে যায় … বাতাস প্রপঞ্চময় তারে কেউ বাঁধে না রে
নাড়িতে যে পারে কেউ, ঘেউ ঘেউ ডাকিল সে কাহার কুকুর
পুরুষের থেকে বিশ্বস্ত সে প্রিয়, ছেড়ে দিয়ে কাছে টানা যায়
অনায়াস গলার চেইন … চেইন স্মোকার এক ক্লিন হেড
দীর্ঘদেহী, তীক্ষ নাক ইলেকট্রিক থামের মত দাঁড়িয়ে থাকে
চুমুকে চুমুকে করে কফি পান আর কী সব নির্দেশ দেয়
সেল ফোনে অদৃশ্য জগত সব মাটির তলায়, দেখে হাসে
পতিতা পাবনী এক জিহ্বায় রূপালী বল মেহন আশ্বাস
সাদা পিঠ জুড়ে উল্কি, গ্রাফিত্তি উল্লাস হাতে পায়ে স্তনের বিভায়
কাছে আয়, কাছে আয়—এত যে প্রযুক্তি যোগ, তবু কেন
দূরে দূরে বিযুক্তি বিস্বাদ, কাছে আয়, ওই দেখ এক জোড়া
ভূত যায় টলমল পায়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ
মরণসঙ্গী এ দুনিয়ায়, ছেলে নেই মেয়ে নেই
নেশা খায় সন্ধ্যা থেকে সোনালী বিয়ার
কাছে আয় কাছে আয় …
রাতের ভিতরে রাত, আরো রাত
নরকের ভিতরে প্রবিষ্ট স্বর্গের আস্বাদ
বাতাস যে বয়ে যায় পাতায় পাতায়
জন্মান্তর ভেদ করে আসা ছায়া ছায়া কত যে অতীত
চুপিসারে কথা বলে মানুষের অগম্য ভাষায় …

ধীরে ঘর ছেড়ে নামে সন্ধ্যাবধির তরুণী এক
দেহকোষে কোষে তার পাথরের নীরবতা
হাঁটে এক পা, দু’পা, থামে; পুনরায় হাঁটে জড়বৎ
বাকহীন সাদা পাথরের দেবী, প্রাণপাখি উড়ে গেছে কবে তার
এখন যে দেহখানি আছে, পিঠ থেকে মেরুদণ্ড খুলে নিয়ে গেছে কেউ
হঠাৎ জলপ্রপাত নামে চোখে … কাঁদে একা একা
সুনসান বাতাসের পাতা নাড়া, পাতা নাড়া
জল ডাকে, “আয় অন্তঃসলিলা” … মাটির অতলে নল
বেয়ে আসে সহস্র উচ্ছ্রিত ধারা, উল্লম্ব ও আনুভূমে
ভিজিয়ে ভিজিয়ে দিতে এ গাছপালা, লতাপাতা সব …

Flag Counter


3 Responses

  1. prokash says:

    সময়াভাবে একবার মাত্র পাঠ। কিন্তু তাতেই তন্ত্রীতে দোলা। সাধু…সাধু।

  2. Narayan Chandra Das says:

    দুটি কবিতাই সাম্প্রতিক উত্তর-আমেরিকা মহাদেশের দুর্যোগের প্রেক্ষাপটে লেখা । দুটি কবিতাতেই আছে ‘হিমঋতু’র কথা, ‘অবধূত সাদারূপ অগলনপ্রিয় তুষারের আর তুষার-ঝড়ের’ কথা , ‘নিদ্রাহীন নগরীর’ ভাঙনের ও ধূলিধুসরিত হবার কথা, ‘কোটি কোটি নিষ্পলক’ ঝুরিঝুরি ‘ছুরি-সন্ত্রাসের’ কথা, ‘জ্যামিতি-কঠিন বাস্তুবৃক্ষের খোপের শূন্যতার’ কথা, বরফ-কঠিন ঔদ্ধত্য আর অহঙ্কারের কথা, ‘নরকে প্রবিষ্ট স্বর্গের আস্বাদের’ কথা, ‘বাকহীন’ শুভ্র ‘সন্ধ্যাবধির’ ‘পাথরের দেবী’র মত তরুণীর’ কথা, প্রযুক্তি-যোগ থাকা সত্ত্বেও বিযুক্তি-বিস্বাদের প্রবল উপস্থিতির কথা, জলপ্রপতের কথা, ‘দ্বিসহস্র বর্ষ আগে যীশুখৃষ্টের আবির্ভাবের’ কথা ইত্যাদি । আরো আছে পাতা-নড়া জলের জলদ্গম্ভীর আহ্বানের কথা – “আয় অন্তঃসলিলা… ‘মাটির অতল থেকে সহস্র উচ্ছ্রিত ধারায়’ উঠে আসা জল, তুমি, ভিজিয়ে ভাসিয়ে দাও ভূপৃষ্ঠে ওতপ্রোত জড়িয়ে থাকা অস্তিত্বসমূহ । আর সবশেষে আছে কবি তুষার গায়েনের অন্তিম প্রশ্ন – …”ঘূর্ণাবর্তে … কেউ কী জন্ম নেবে এই অন্ধকারে আর ?”
    পয়ার-সমৃদ্ধ দুটি কবিতাই অনবদ্য । ইতিহাস, সমাজ ও রাজনীতির চেতনায় ঋদ্ধ কবি তুষার-কে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই এমন কবিতা সৃষ্ট ও পরিবেশনার জন্য ।

  3. Tushar Gayen says:

    অনেক ধন্যবাদ পাঠকদের, যারা কবিতা দুটো পড়েছেন এবং বিভিন্ন দেশের পতাকায় সেই সংখ্যা উৎকীর্ণ করেছেন। যারা মন্তব্য করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা !

    নারায়ণ চন্দ্র দাসকে আমার বিশেষ ধন্যবাদ এই জন্য যে তিনি কবিতা দু’টোর স্তর ভেঙে ভেঙে যেভাবে তাদের অন্তরাত্মা ও চেতনাধারকে উন্মোচন করে পাঠকদের সামনে মেলে ধরেছেন তা আমার কাছে প্রেরণাদায়ক এবং আনন্দময় অভিজ্ঞতার অংশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.