আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: ইডেন বিল্ডিংসের ইডেন স্কুলে

sanjida_khatun | 10 Feb , 2014  

দেশভাগের আগেই সদরঘাট থেকে ইডেন স্কুল আর কলেজ ইডেন বিল্ডিংস (বর্তমান সচিবালয়)-এ চলে এসেছিল। সে ভবন পুরো শেষ হয়নি তখনো। কয়েকটি উইং শেষ হলেই আমাদের ওবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে গিয়ে দেখি ভিতর দিকের মাঠ অসংখ্য আলকাতরার টিন দিয়ে বোঝাই।

ফুল বাগন আর বড় বড় গাছে সুশোভিত খোলামেলা বড় কাঠের ভবন ছেড়ে এসে মন-খারাপ হয়ে গেলো। ক্লাসের কী একটা রচনাতে সে নিয়ে লিখেছিলাম যে আলকাতরার দিনগুলো বুকের ওপর চেপে বসে যেন দম বন্ধ করে আনছে! আর সদরঘাটের স্কুলে বড়ো বড়ো পাতার বিশাল বাদাম গাছে শীতকালে লাল লাল পাতা থাকত। ও গাছের দিকে চেয়ে চেয়েই ক্লাস ওয়ার্কের সেই ‘পাখী’ কবিতাটা লিখেছিলাম। সে-গাছে সত্যি সত্যিই একটি পাখী এসে বসেছিল। আম, লিচু, সপেটা, ডেউয়া ফলের গাছও যে ছিল কত! বাহারি সাইজের গাছে অশোক, পলাশ আর পারিজাত ফুল ফুটত। আমরা ‘পারিজাত’ বললেও ওটার নাম বোধ হয় ছিল ব্রাউনিয়া। ঢাকা ইউনিভার্সিটির আর্টস্ বিল্ডিংয়ের উত্তর–পূর্ব কোনে এ গাছ আছে এখানো। ডঃ নওয়াজেশ আহমদ দেখে বলেছিলেন– ও ফুল পাহাড়ে হয়। তাই নাম দিয়েছিলেন ‘গিরিকমল’। ময়মনসিংহের শালিজেও দেখেছি এ ফুল। সেখানে ব্রাউনিয়া নামই লাগানো ছিল গাছের গায়ে। একটা সময়ে এগাছে যেমন অশোকগাছেও তেমনি সুকুমার কোমাল তরুণ লালচে পল্লব লম্বা হয়ে ঝুলে থাকে। ক্রমে সেগুলো ঘন সবুজ হয়ে যায়।

প্রতি শীতকালে স্কুলের ঘেরা দেওয়া বাগানে ডালিয়া, চন্দ্র মল্লিকা, কসমস, সুইট পী, রাক্ষস ফুল–এসব মওসুমি ফলের সঙ্গে নানান ধরনের গাঁদা ফুটে বাগান আলো হয়ে থাকত। ছিল গোলাপও। সবই ছিল আমাদের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে। দেখবার আনন্দটুকু পেতাম শুধু। খেলার মাঠ ছাড়া পুকুরও ছিল। দোতলায় উঠলে বুড়িগঙ্গা নদীও দেখতে পাওয়া যেত। এসব ছেড়ে এসে মন খারাপ হবারই কথা।

ইডেন বিল্ডিংসে গিয়ে নানা ধরনের কাজের ঝোঁক চেপেছিল আমার। যেমন মেয়েদের ব্যায়াম করানো। একটা সময়ে মাঠে জড়ো হয়ে কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করাতাম। ক্লাস সেভেনে পড়বার সময়ে আব্বু একদিন ‘ইলাসট্রেটেড ইউকলি অব ইন্ডিয়া’ খুলে মেয়েদের ব্যায়ামের ছবি দেখিয়ে বলেছিলেন–‘এইসব এক্সারসাইজ করবে’। নিরীহ বাধ্য কন্যা আমি তখন থেকে এক্সারসাইজ করেছি বরাবর। এবার স্কুলে সেই বিদ্যা জাহির করা গেল। সব শেষে, বোধ করি ভাইদের কাছ থেকে শেখা একটা কসরৎ করতাম। দুহাত সটান উঁচু করে পিছন দিকে উলটে পড়ে হাত দিয়ে মাটি ছুঁতাম। এটা সবাই পারত না। বাড়ি থেকে একটা ছোট কার্টনে তুলো-ব্যান্ডেজ -ডেটল নিয়ে যেতাম রোজ রোজ। আমার কাণ্ড দেখে সেয়ানা মেয়েরা চোখ টেপাটিপি করে হাসাহাসি করত। দলের মেয়েদের বোঝাতাম পথে ঘাটে মেয়েদের নানা বিপদ ঘটে, তাই প্রতিরোধ করবার জন্যে শরীরটাকে সচল আর তৎপর রাখতে ব্যায়াম করাটা জরুরি।

এই স্কুলের প্লে-সেইড-এ বান্ধবী আফজালুন (পরবর্তীকালের অ্যানাসথেশিয়ার প্রফেসর) আমার গলা জড়িয়ে পায়চারি করত আর তার বদরুল ভাই-এর কথা বলত মৃদু কণ্ঠে। ছোটবেলা থেকেই ওই বদরুল ভাই ওকে মন দিয়ে লেখাপড়া করবার জন্যে উৎসাহ দিতেন। আফজালুন আর আমি দুজনেই তখন ইংরেজি আর অঙ্কে কাঁচা ছিলাম। একটু বড়ো হয়ে আফজালুনের অধ্যবসায় দেখেছি। সেই ব্যোপদেবকে হার মানায়। খাতার পরে খাতা অঙ্ক করে ভরে ফেলত। ইংরেজিতেও রীতিমতো উন্নতি করে ফেলল! ওর বদরুল ভাই-ই বাহান্ন সালের প্রথম শহিদ মিনারের নকশা করেছিলেন। ওরা দুজনেই ডাক্তারি পাশ করে সুখী দাম্পত্য জীবন কাটিয়েছে।

এই নতুন ভবনে থাকতে সেজদি আর আমি ঘোড়ারগাড়ির সেকেন্ড ট্রিপে বাড়ি ফিরতাম। একদিন ছুটির পরে সেজদিকে খুঁজতে গিয়ে দেখি, একতলার বাঁ ধারের একটা অন্ধকার ঘরে বসে সেজদি একমনে বই পড়ছেন। অন্ধকারের কারণ, ঘরের সমস্ত জানালা বন্ধ আর দরজার মোটে একটা পাট অর্ধেক খোলা। সেই থেকে আমিও বই পড়া শুরু করলাম ওই ঘরে বসে। সেজদি বলেছিলেন, ও ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল, বইয়ের আলমারির তালাও ছিল খোলা। আসলে নতুন ভবনে গিয়ে লাইব্রেরি গুছিয়ে তোলা হয়নি তখনো। সুযোগ পেয়ে ওখান থেকে আমি ‘মিসমিদের কবচ’ আর ‘ছায়া কালো কালো’ পড়তে পেরেছিলাম। সেজদি কীসব পড়েছিল-সে জানি না। একদিন ফার্স্ট ট্রিপ নামিয়ে এসে দাই ‘খোরশেদা, ও খোরশেদা’ ডাকতে ডাকতে দরজার ওই খোলা পাটের কাছে এসে আমাদের দেখে ফেলে ভয় দেখাল–‘রাখো, আমি কইয়া দিমু!’। দাই কী করেছিল জানি না, পরদিন থেকে দরজায় তালা পড়ে গিয়েছিল। তবে আমাদের কোনো বকুনি খেতে হয়নি।

নতুন ভবনে আমাদের দীর্ঘকাল থাকা সম্ভভ হলো না। দেশ ভাগ হবার পরে ওখানে সরকারি সেক্রেটারিয়েট হলো। আমাদের মহা দুর্গতি শুরু হলো তখন। বকশীবাজারের নবকুমার ইনস্টিট্যুটে ক্লাস চলল। শেষতক ইডেন আর কামরুনেসার স্কুল এক সাথে মিলে গিয়ে কামরুননেসা স্কুল হলো। ইডেন আর কামরুননেসার কলেজ অংশ মিলে হলো ইডেন কলেজ। মনঃক্ষুন্ন হলেও ইডেন স্কুলের গর্বিত ছাত্রী আমরা তখন নিরুপায় হয়ে কামরুননেসা স্কুল থেকেই ম্যাট্রিকুলেশন ক্লাসের পরীক্ষার্থী হলাম।
কিস্তি-১ আমার প্রথম স্কুল

কিস্তি-২ স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

কিস্তি-৩ স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

কিস্তি-৪ স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

Flag Counter


1 Response

  1. তৃষা says:

    অসাধারণ স্মৃতিচারণ! গল্প-উপন্যাসে পড়েছি এমন স্কুল, পাশে গাছপালা, নদী এসবের বর্ণনা, এখনকার ঢাকা শহর দেখে আপনার কেমন লাগে? খুব ইচ্ছে করে এরকম শহর দেখতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.