গদ্য, প্রবন্ধ, বইয়ের আলোচনা, বিশ্বসাহিত্য

যোগ্য সম্পাদনা ও প্রকাশনা সৌষ্ঠবে পূর্ণ বুদ্ধাবতার

রাজু আলাউদ্দিন | 30 Jan , 2014  

বুদ্ধদেব বসু আসার আগে পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের অর্ধেকটা সময় রঞ্জিত হয়ে আছে অনুবাদের নানান রঙে। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদার ভাষায় “১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে আজ পর্যন্ত বাংলা অনুবাদের বয়স ৫০০ বছরের মতো। এই কালপরিধি সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রায় অর্ধ-বয়সী।” (বুদ্ধদেব বসু অনুবাদ কাব্যসমগ্য, সম্পা: মুহম্মদ নূরুল হুদা, অবসর প্রকাশনী ২০১৩, পৃ: আঠার)
৫০০ বছর কম সময় নয়। আর এই দীর্ঘ সময়ের শুরু থেকেই অনুবাদ পাঠকের আনুকূল্য পেয়েছিলো বলেই তা ক্রমশঃ বেগবান স্রোতের রূপ ধারণ করে আজ আমাদের কালে এসে নানা শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পরেছে। কিন্তু লক্ষ্য করলেই দেখবো, অনুবাদ শাখাটি জনগ্রাহিতার মাধ্যমে বিস্তার লাভ করলেও, বুদ্ধদেব বসুর আগে পর্যন্ত সাহিত্যের অভিজাতদের দরবারে এ ছিলো অপাংক্তেয় ও উপেক্ষিত। বুদ্ধদেবের অপার নিষ্ঠা, অপরিমের পাণ্ডিত্য, বিশ্বমানের সাহিত্যরুচি আর সৃজনশীলতার যাদুকরী স্পর্শে অনুবাদ প্রথমবারের মতো আগ্রাসী চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হলো। এতটাই আগ্রাসী যে পরবর্তী কয়েকটি দশক তিনি যতটা না তার কবিতা দিয়ে, তার চেয়ে বেশি তার অনুবাদ কর্ম দিয়ে বাংলা কবিতার মাত্রচিত্রকে নিঃশব্দে বদলে দিয়েছিলেন। অপাংক্তেয় ও উপেক্ষিত অনুবাদকে তিনি একাই এমন এক মহিমায় ও মর্যাদায় দাঁড় করালেন যাকে অগ্রাহ্য করে আধুনিক বাংলা কবিতার আলোচনা আজ প্রায় অসম্ভব। আর অনুবাদের যাদুতে পঞ্চাশ, ষাট, এমনকি সত্তরেরও অনেক কবি আচ্ছন্ন থেকেছেন বহুদিন। ষাটের অগ্রগণ্য কবি ও অনুবাদক মুহম্মদ নূরুল হুদা এই আচ্ছন্নতার শক্তিমত্তা সম্পর্কে আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন তার স্মৃতিচারণের মাধ্যমে এভাবে:
“বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে গ্রামবাংলা থেকে ঢাকা শহরের নগরবাংলায় পা দিয়ে ন্যুমার্কেট থেকে বুদ্ধদেব বসু অনূদিত বোদলেয়ারের কবিতা কিনে তার ভূমিকা, অনুবাদ ও টীকা-ভাষ্য ইত্যাদি পাঠ করার পর যে মোহ আমাদের আনখাগ্র আচ্ছন্ন করেছিলো আজ পাঁচ দশক পরে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে পা দিয়েও সেই আচ্ছন্নতা থেকে আমি বা আমার সময়ের অনেকেই মুক্ত হতে পারিনি। এই সুদীর্ঘ সময়ে বাংলা-ইংরেজিতে বেশ কিছু অনূদিত গদ্য-পদ্য পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। বাংলা একাডেমীর অনুবাদ সেলে দীর্ঘ চার দশক কাজ করার সুবাদে এদেশের প্রখ্যাত সাহিত্যিকদের বহু অনূদিত পান্ডুলিপি পড়ার মওকা পেয়েছি, কিন্তু কোনোটিকেই বুদ্ধদেবের সঙ্গে তুলনীয় ভাববার অবকাশ পাইনি। একটি সর্বাঙ্গসুন্দর ও সর্বগ্রাসী কবিতা পাঠ করার পর পাঠক বা পাঠিকা যে নান্দনিক ঘোরের মধ্যে বন্দী হয়ে যায়, যেমনটি আমার হয়েছিলো জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’ পাঠ করার পর, ঠিক তেমনটি ঘটলো শার্ল বোদলেয়ার তার কবিতা পাঠ করার পরও।” (প্রাগুক্ত, পৃ: উনিশ)

অর্থাৎ প্রবলভাবে সৃষ্টিশীল ‘বনলতা সেন’ -এর মতো একটি মৌলিক কবিতার পাশে বুদ্ধদেব বসুর বোদলেয়ারের অনুবাদ কতটা অপ্রতিরোধ্য ও অজেয় প্রতিদ্বন্ধী হয়ে উঠেছিলো সেটা এই স্মৃতিচারণমূলক মূল্যায়ন থেকেই আমরা বুঝতে পারি।

আমরা আজ কৌতুহল উসকে দিয়ে যদি এই প্রশ্ন করি বুদ্ধদেবের আগেও তো অনেকে অনুবাদ করেছিলেন, যেমন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, তার অনুবাদও প্রাচ্যুর্য, মান ও ছন্দোস্পন্দে কম আকর্ষণীয় ছিলো না। তারপরেও কেন তিনি আমাদের মনোজগতে কোনো স্থায়ী স্বাক্ষর রেখে যেতে পারেননি? এর কারণ বোধহয় কবিতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার রুচির বিক্ষিপ্ততা, সুশৃঙ্খল কোনো পূর্ণ অবয়ব তৈরি না করতে পারা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই যে, অনূদিত কবিতাগুলোর মর্মোদ্ধারী বিশ্লেষণপূর্ণ গদ্যভাষ্য ও প্রয়োজনীয় টাকা টিপ্পনীর অভাব। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন এই ক্ষেত্রে পুরোপুরি ব্যতিক্রম।
buddhadev-2.gif
বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদের একটি বড় গুন এই যে তিনি যখনই যে কবির কবিতা অনুবাদ করেছেন তখন তার প্রতিনিধিত্বশীল কবিতাগুলোকে নির্বাচন করতে ভুল করেননি। হয়তো গৌন কবিতাও তাতে যুক্ত হয়েছে, কিন্তু সেও কেবল একটি পূর্ণ অবয়ব তৈরি করার লক্ষ্যেই। নির্বাচিত কবি ও কবিতাগুচ্ছের জন্ম ও গুরুত্বকে তিনি নির্নয় করেছেন একই সঙ্গে আঞ্চলিক ও বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষিতে। আর তা নির্ণয় করেছেন এমন এক দক্ষতা, পাণ্ডিত্য ও স্পর্শময় গদ্যভঙ্গি দিয়ে যে তা পাঠক হৃদয়কে অভিভূত করে ফেলে সঙ্গে সঙ্গে। আমার ধারণা কেবল কবিতার অনুবাদের মাধ্যমে তিনি এই প্রভাব ও প্রতিপত্তি তিনি অর্জন করতে পারতেন না যদি না তার সঙ্গে ভাষ্যের হ্যামিলনীয় বংশিবাদকের সুরটি যুক্ত হতো।

তাঁর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদগ্রন্থ সাকুল্যে পাঁচটি। সংস্কৃত, ফরাসি, জার্মান ও রুশ ভাষার পাঁচজন কবিই ছিলেন এই পাঁচটি গ্রন্থের নায়ক: কালিদাস, বোদলেয়ার, হোন্ডারলিন, রিলকে, বরিস পাস্তেরনাক। এছাড়া আরও বেশ কয়েকজন বিদেশী কবি আছেন যাদের প্রত্যেকেরই একটি দুটি করে কবিতা অনুবাদ করেছিলেন তিনি। তবে বাঙালি পাঠকদের রুচির জগতে প্রবল ঘূর্ণি তুলেছিলেন মূলত ঐ পাঁচ কবির কবিতাগুলো অনুবাদের মাধ্যমেই।

বুদ্ধদেবের রচনা আজ যদিও বিভিন্ন খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে, কিন্তু উভয় বাংলায়ই তার অনুবাদ সমগ্রের কোনো একক খণ্ডের অস্তিত্ব বছর খানেক আগেও ছিলো না। সুখের সংবাদ এই যে ষাটের গুরুত্বপূর্ণ কবি ও অনুবাদক মুহম্মদ নূরুল হুদার সম্পাদনায় অবসর প্রকাশনী থেকে গত বছর বুদ্ধদেবের অনুবাদ সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। বইটির গুরুত্ব একক খণ্ডে বুদ্ধদেবের সমগ্র অনুবাদকে পাওয়ার মধ্যে যেমন, তেমনি এর সম্পাদকীয় দীর্ঘ ভূমিকার কারণেও। নূরুল হুদা কেবল আমাদের শীর্ষস্থানীয় কবিই নন, তিনি এক অসামান্য অনুবাদকও। তুরস্কের মরমী কবি ইউনুস এমরের অনুবাদে তিনি যে দক্ষতা ও মূলানুগতার দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন তা অসাধারণ। সফল অনুবাদের কলাকৌশল সম্পর্কে তাত্তিক ও প্রায়োগিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদ নিয়ে আলোচনা করেছেন। অনুবাদক বুদ্ধদেব বসুকে নিয়ে এত গভীর, সুক্ষ্ণাতাতিসুক্ষ্ণ ও বিস্তৃত আলোচনা এর আগে আর কেউ করেছেন বলে মনে হয় না। প্রায় একাডেমিক পদ্ধতিতে অনুবাদের নানান কলাকৌশলের পরিপ্রেক্ষিতে বুদ্ধদেবের অনুবাদের বৈশিষ্ট্য ও সাফল্য নির্ধারণ করতে গিয়ে সম্পাদক তার ভাষার সাবলীলতা ও চিন্তার স্বচ্ছতা দিয়া পাঠককে অমেয় প্রান্তির আনন্দে তৃপ্ত করে তোলেন। বুদ্ধদেবের অনুবাদের কুশলতার পাশাপাশি এতে রয়েছে অনূদিত কবিতার ছন্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচার। বিশেষ করে কালিদাসের মেঘদূত অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক মন্দাক্রান্তা ছন্দের ব্যবহার করলেও তা যে চলনে সত্যেন দত্তের চেয়ে আলাদা সে বিষয়েও নূরুল হুদা আমাদেরকে সজাগ করে দিয়েছেন এই দীর্ঘ ভূমিকাটিতে। সুক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণধর্মী এই ভূমিকাটি অনুবাদক বুদ্ধদেব সম্পর্কেই কেবল আমাদের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে না, বরং একই সঙ্গে অনুবাদ সম্পর্কে গভীরভাবে কৌতুহলী পাঠকদের ধারণাকেও তা সমৃদ্ধ করে তোলে।

প্রকাশনার মান, বাধাই আর কাগজের ক্ষেত্রে অবসরের উচ্চতা নিয়ে নতুন করে কিছুই বলার নেই। কারণ এটা এতই সুবিদিত যে এ নিয়ে আবারও বলা মানে পুনরুক্তির পীড়ন বলে মনে হবে পাঠকদের কাছে। তবে সবশেষে কৌতুহলী ও গবেষণা-প্রবণ পাঠকদের জন্য আমি এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত কয়েকটি খুঁটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ করতে চাই যা তাদের সাহায্য আসতে পারে।

১. পুস্তকাকারে বুদ্ধদেব বসু প্রতিটি অনুবাদগ্রন্থে যা কিছু অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন তার সবই এখানে আছে। এমন কি চিত্রকর্মগুলোও অন্তর্ভুক্ত করতে ভোলেন নি সম্পাদক ও প্রকাশক।
২. বইয়ের শেষে ‘গ্রন্থপঞ্জি’ অংশে রয়েছে বুদ্ধদেব রচিত গ্রন্থসমূহের পূর্ণ তালিকা।
৭২৮ পৃষ্ঠার এই বইটির দাম ৭৫০ টাকা রেখে অবসর প্রকাশনী দামের ক্ষেত্র পাঠক-বান্ধব দৃষ্টান্তকে এখনও সমুন্নত রেখেছেন। অসামান্য এই বইয়ের প্রকাশনার জন্য সম্পাদক মুহম্মদ নূরুল হুদার মেধা ও পরিশ্রমকে যেমন কৃতজ্ঞতা জানাই, তেমনি প্রকাশক আলমগীর রহমানকেও জানাই কৃতজ্ঞতা তার সুরুচিপূর্ণ প্রকাশনার মানের জন্যে।

Flag Counter


4 Responses

  1. shams Hoque says:

    প্রাবন্ধিক রাজু আলাউদ্দিনকে আন্তরিক ধন্যবাদ অনুবাদ সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ইতিহাস নিয়ে একটি সমৃদ্ধ প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য। আমার ভাল লেগেছে যত পর নাস্তি। ধন্যবাদ রাজুভাই!

  2. ফজলুল কবিরী says:

    গুরুত্বপূর্ণ লেখা। পাঠ করে ঠকি নাই। ধন্যবাদ জানিয়ে রাখলাম লেখককে।
    ফজলুল কবিরী।

  3. asma sultana shapla says:

    বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদের উপর এমন চমৎকার আলোচনা । খুব ভালো লেগেছে রাজুভাই।
    ‘‘কেবল কবিতার অনুবাদের মাধ্যমে তিনি এই প্রভাব ও প্রতিপত্তি অর্জন করতে পারতেন না যদি না তার সঙ্গে ভাষ্যের হ্যামিলনীয় বংশিবাদকের সুরটি যুক্ত হতো।’’ কথাটি একেবারে অকাট্য। ধন্যবাদ। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে।

  4. জাকিয়া এস আরা says:

    আলোচনাটা মনোগ্রাহী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.