আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলি: ইডেন স্কুলে

sanjida_khatun | 27 Jan , 2014  

আমার চার বছরের বড়ো সেজদি আর আমি পড়তাম ইডেন স্কুলে। সেজদির সঙ্গেই পড়তেন লায়লাদি– লায়লা আরজুমান্দ বানু। কত রবীন্দ্রসঙ্গীত যে উনি জানতেন কী বলব। ‘কাঁদার সময় অল্প ওরে, ভোলার সময় বড়ো, খাবার দিনে শুকনো বকুল মিথ্যে করিস জড়ো’ গাইতেন বিদায় সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে। আরো এক গান ছিল ‘কেন রে এতই যাবার ত্বরা কেন?’

কারও মৃত্যু হলে শোকসভায় গাইতেন ‘কেন রে এই দুয়ারটুকু পার হতে সংশয়? জয় অজানার জয়’। এসব গান এখনো খুব একটা শুনি না। ওর কণ্ঠেই বোধহয় ‘সমুখে শান্তি পারাবার’ গানটি প্রথম শুনেছিলাম ।

ইডেন স্কুলে ক্লাস নাইনে ছিলেন তপতীদি– তপতী দাম। ওঁর গান ছিল দারুণ রাবীন্দ্রিক। মনে হয় অর্থ বুঝে গাইতেন। ওঁর কণ্ঠে ‘যায় দিন, শ্রাবণদিন যায়’ গানখানির রেকর্ড হয়েছিল পরে।

এবারে ইডেন স্কুলের বার্ষিক নাট্যাভিনয়ের কথা বলি। প্রথমে দেখেছিলাম ‘রাজা ও রানী’ এ নাটকটি রবীন্দ্রনাথ দুর্বল মনে করেই একই কাহিনি নিয়ে ফিরে লিখেছিলেন ‘তপতী’। ‘রাজা ও রানী’র উপসংহার দেখে দম বন্ধ হয়ে এসেছিল– এমনই মর্মান্তিক। যবনিকাপাতের আগে রানী সুমিত্রা থালায় করে ভাইয়ের কাটা মুন্ডু রাজাকে উপহার দিয়ে নিজেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। অর্থাৎ মেলোড্রামাটিক ‘পতন ও মৃত্যু’। বহুদিন পর্যন্ত ওই দৃশ্য ভুলতে পারিনি।। নাট্য রচনার উৎকর্ষের বিচার করবার ক্ষমতা ওই বয়সে হয়নি। ভয়াবহতার স্মৃতি তাড়িয়ে ফিরত। স্মৃতিটা বাস্তবিক বীভৎস।

পরের বছর আরো একটি ট্রাজেডির অভিনয় দেখেছিলাম–‘নটীর পূজা’। এ নাটক ভারি শিল্পিত ছিল। নটী হয়েছিলেন নবম শ্রেনীর নৃত্যপটীয়সী ব্রততীদি। পিছন দিকে লতার মতো বেঁকে পড়তে পারতেন ইনি। ‘সাধন হবে বাঁধনছেড়ার’ গানের ‘বজ্রভেরী’ অংশে ভেরী বাজাবার ভঙ্গিতে পিছনে হেলে পড়েছিলেন তিনি। বাড়ি ফিরে নাচগুলো অভ্যাস করতাম তখন। গান আর নাচ সবই মুখস্থ হয়ে যেত তো! বছরের ক্লাশ শেষ হয়ে যেত বলে প্লেশেড-এ ভিড় করে প্রতিদিনের মহড়া দেখতাম সকলে। শেষ নাচ ছিল ‘আমায় ক্ষমো হে ক্ষমো, নমো হে নমো’। বুদ্ধের চৈত্যের সাজনে নৃত্য করবার আদেশ পেয়েছিল নটী ‘শ্রীমতী’। ভক্ত শ্রীমতী গানের সঙ্গে সে নাচকে ভক্তি নৃত্যে পরিণত করে। শেষদিকে রাজপুরীর অলঙ্কার আর ঝলমলে পোষাক একে একে খুলে স্তূপের সামনে বিসর্জন দিয়ে ভিতরের সন্ন্যাসিনীর গৈরিক পোষাকে বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নে প্রণত হলো। রক্ষীরা রাজার আদেশ মতো শ্রীমতীর মস্তক ছিন্ন করে সন্ত্রস্ত হয় নটীর পায়ে প্রণাম করল। এ কাহিনি, এ নাটক আজ পর্যন্ত আমার অত্যন্ত প্রিয়। ইডেনের অভিনয় ছিল চোখ ধাঁধানো। সদরঘাটের ইডেন স্কুলে পড়বার শেষদিকে নীদ নিয়ে আমার লেখা কবিতাটি এবারে উল্লেখ করি। কবিতাটি ভালোই হয়েছে মনে হয়েছিলো সেই বয়সে।
‘অবাধ গতিতে চলেছ ছুটিয়া ওগো চঞ্চলা তটিনী,
তরলা, চপলা ভঙ্গিটি তব হেরি কবি ডাকে ‘নটিনী’!
চঞ্চলা তব শিথিল কবরী পড়েছে কখন খুলিয়া
আঁখি নেই তাতে, আপন মনেতে চলেছ হেলিয়া দুলিয়া।’

ইডেন স্কুলের জীবনের কয়েকটি বিশেষ অভিজ্ঞতার কথা বলব এখন। প্রথমে আদর্শ এক শিক্ষকের কথা বলি। হিরণদি। এঁর দুটি উপদেশ আমার জীবনের গঠনে খুবই সহায়ক হয়েছিল। প্রথমটি, ‘তোমরা যখনই আয়নাতে নিজের মুখ দেখবে ভাববে–আমি দেখতে সুন্দর। এর একটা সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়বে জীবনে।’ বলেছিলেন সারা ক্লাশকে, কিন্তু আমার মনে হয়েছিল তিনি যেন একান্ত আমাকেই বললেন কথাগুলো। ছোট থেকে আমাকে চেহারা নিয়ে নানা কথা শুনতে হয়েছে। মেজদি আর রীনা তো আমাকে পেঁচি বলেই ডাকতেন। বড়দির বিয়ের পরে বড়ো দুলাভাই সুকুমার রায়ের সেই কবিতা শোনাতেন তার পাবনার ভাষায়–‘ফ্যাসা কয় ফ্যাঁসানী…’ ইত্যাদি। বিয়ের পরে হাসতে হাসতে একদিন বলেছিলেন ‘মিনুকে দেখে তো আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম–ওর বড়ো দিদিও বুঝি ওইরকমই কালো।’ আর আমি মানুষটা কেমন ছিলাম কে জানে। ওসব শুনে কোনো কষ্টই হতো না। তার ওপর হিরণদির উপদেশে মনটা চেহারার বিষয়ে পুরো নির্বিকার হয়ে গেল। ইউনিভার্সিটিতে পড়বার সময়ে একটা মেয়ে আমাকে নিয়ে খুব হাসাহাসি করেছিল। আমার তো কোনো বিকার হলোই না– উলটে মনে হলো ওমেয়ের মনটা খুব ছোট। নানা যে আমার জন্মের পরে একনজর তাকিয়েই বলেছিলেন–‘এঃ যে দেখি কয়লালতা।’ ওসব গল্প শুনেই মিটমিট করে হেসে বড়ো হয়েছি। গায়ে লাগত না তেমন। তারপর মানসিক বল আরো বেড়ে উঠল হিরণদির সেই উপদেশ শুনে।

হিরণদির অপর উপদেশ ছিল– রাত্রে বিছানায় শুয়ে সারাদিনের কাজগুলো ভেবে দেখবে কোনটা ভুল হয়েছে কোনটা ঠিক। নিজের কাজের এই পর্যালোচনায় ভালো কাজের জন্যে সন্তোষ আর খারাপ কাজের জন্যে গ্লানি হতো। এভাবে আত্মসমালোচনা করে মানসিক উন্নতির পথ তৈরি হয়েছিল। এর চেয়ে মূল্যবান শিক্ষা আর কী হতে পারে। দেশ বিভাগের পরে হিরণদি কোথায় চলে গেলেন কে জানে। কিন্তু আমার মনে তার প্রতিশ্রদ্ধা চিরকাল উজ্বল হয়ে জেগে রয়েছে।

ক্ষীরোদদি আমার বাংলা লেখার মূল্য দিয়েছিলেন। সম্ভবত আমি ক্লাস এইটে থাকতে হিরণদিও আমার বাংলা রচনার প্রভূত প্রশংসা করেছিলেন। লতিকাদি পড়াতেন ইংরেজি। তিনি ক্লাসে এসে হিরণদির প্রশংসার কথা বললে লজ্জা বোধ করেছিলাম, কেবল বিনয়ে নয়, মনে হয়েছিল এর পাশে ইংরেজি যে কিছুই পারি না সে কথাটাও উহ্য রয়েছে। অবশ্য প্রশংসা পাবার আনন্দে এই সময় থেকে লেখাপড়াতে কিছুটা মন বসল।

ইডেন স্কুলের গানবাবুর কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে আমার কৈশোর জীবনের কথা। মূল ভবন থেকে বেশ খানিকটা আগে, প্রবেশ পথ ধরে কিছুটা এগোলে ডান হাতে একটি টানা লম্বা শেড ছিল। তারই একটি ঘর ছিল গানের ক্লাশের জন্যে নির্দিষ্ট। উদাস-দৃষ্টির সুভদ্র ভালোমা গান বাবু (তাঁর নাম মনে নেই) সে ঘরের নিচু টেবিলে হার্মোনিয়ম রেখে চেয়ারে বসে ক্লাস নিতেন। আমাদের ক্লাসের অনিমার ছিল সাধা গলা। গানে সেই সবসময়ে প্রথম হতো। গলা চড়ত অনেক উপর পর্যন্ত। শুধু রবীন্দ্র সঙ্গীত শেখানো হতো আমাদের। ‘জাগ জাগরে জাগ সঙ্গীত’, ‘আমার সুরে লাগে তোমার হাসি, তোমার কাছে শান্তি চাব না’, ‘সে কোন বনের হরিণ ছিল আমার মনে’, ‘এবার অবগুণ্ঠন খোল–এসব গান। আমার খুব ভালো লাগত এই ক্লাশ আর গানবাবুকে। গলা বেশি উঁচুতে উঠত না বলে একবার একা ‘এবার অবগুণ্ঠন খোল’ স্যারকে শোনাতে গিয়ে উপরের দিকে আমার গলা ভেঙে গেলে সবাই হেসে উঠল। কিন্তু গানবাবু আমার দিকে স্নেহভরা চোখে চেয়ে সান্ত্বনার দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। সেই স্নেহদৃষ্টিতে আমার মনটা শান্ত হয়ে গেল।

ভদ্র আর শান্ত গানবাবুকে নিয়ে অনেকে হাসাহাসি করত। বড়দিও ইডেনের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর কাছে শুনেছি স্যার একদিন ওদের ক্লাসে সঙ্গীত কাকে বলে তা বোঝাচ্ছিলেন। শেষে বললেন অর্থাৎ যা কিছু গভীর, তাই সঙ্গীত। শুনেই এক দুষ্ট উঠে দাঁড়িয়ে বলল ‘স্যার, আমাদের বাড়ির কুয়োটাও তো গভীর’। পুরোক্লাস হেসে উঠল। স্যার শান্তভাবে চেয়ে রইলেন। দারুণ সংযম ছিল তার মনে।

ইডেন স্কুলে আমার এক আনন্দ ছিল বাৎসরিক স্পোর্টস। খেলাধুলা ভালোবাসতাম তো খুব। ভালো দৌড়াতে পারতাম আর এক সহপাঠী ফজিলাতুননেসাও খুব দ্রুত ছুটতে পারত। আমি ছুটতাম পায়ের আঙ্গুলের দিকে ভর দিয়ে, ফজিলাতুন পুরো পা মাটিতে রেখে। দুরকম স্টাইল। দিদিরা আমারটাই পছন্দ করতেন। তবে ওর দৌড় খুবই দ্রুত ছিল। ওকে হারানো কঠিন। একবার রিলে রেস-এ দুদলের নেতৃত্বে আমরা দুইজনে ছিলাম। চারপাশ থেকে উৎসাহের হল্লার ভিতরে আমিই আগে পৌঁছলাম। কিন্তু দিদিদের ধরে থাকা দড়ি পর্যন্ত না গিয়ে খুশিমনে থেমে গেলাম। ফজিলাতুন পরে এসেও দড়ি পর্যন্ত যাওয়াতে ফার্স্ট হয়ে গেল। সেই দুঃখ ভোলা যায়?

ইডেনে ক্লাস সেভেনে পড়বার সময়ে নতুন শিক্ষক জেবুন্নেসা আপা পড়াতে এসেছিলেন। মহিলা বেজায় মোটা। ক্লাসে এসে অন্যমনস্ক হয়ে থাকতেন। প্রায়ই তাঁর চোখ জলে ভরে যেত। শুনেছিলাম–ওর স্বামী গত হবার পর চাকরিতে ঢুকেছেন। কীরকম যেন ছিলেন। সুন্দর মেয়েদের দিকে সারাক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে থাকতেন। আমাদের ক্লাশের বীথিকাকে তাঁর পছন্দ ছিল বলে ওর দিকে তাকিয়েই পড়াতেন। দমকে দমকে জোর দিয়ে কথা বলতেন। একদিন বীথিকাকে বললেন have you got a rubber? ’ উদ্ভট অ্যাকসেন্টের জন্যে বুঝতে না পেরে বীথিকা লাফ দিয়ে উঠে বলল ‘অ্যা। লাভার!’ উনি ড্যাবড্যাব করে চেয়ে বসে পা নাড়াতে থাকতেন। ওই পা নাড়িয়ে যাবার বদভ্যাস ছিল তাঁর। সমস্ত ক্লাশে তখন চাপা হাসি চলছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে আবার বললেন–‘Rubber!’ বেজায় হাসাহাসি চলত তাঁকে নিয়ে।
(চলবে)

তৃতীয় কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন: স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

দ্বিতীয় কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন: স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

প্রথম কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন : আমার প্রথম স্কুল

Flag Counter


4 Responses

  1. goutam says:

    She reminds us how beautiful is our past! We All have to dedicate ourselves to be better and do the right things, to make a better today and for perpetuity!

  2. Uttam Kumar says:

    apnar life story pore onek nari ujjibito habe bale asa kori. sabai jano apnar moto mohiosi nari hoi. apnar moto ekjon guni ma jano hoi. apnar konthe rabindra sangeet ridoy chua jai. Apnake nijer mair moto bhabte ki je bholo lage ta bhasai bojano jaina. Apnar srbangin mongal kamona kori. phone no. dile sarasori katha bolte chai.

  3. উদ্যোগটি চোখে পড়েছে ……পড়লাম আজকে।
    জানা-বোঝার কাল থেকে আমরা ছায়ানটের এই মানুষটিকে জানি। সেই মানুষটির আত্মজীবনী জানতে পারা –বাহ বাহ।

    গান গাওয়া সে কালে কেন, এই সেদিন ১৯৭৮-৭৯ সালে আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা মনে পড়লো।

    সেখানে মাহবুব ভাই কবর কবিতা পাঠ করতেন…মাথাল মাথায়…কাহিনীটির ভেতর দিয়ে আমরা সে কালটাকেও পাবো।

  4. sharat says:

    Onek onek shroddha . Ekhono aponader moto lok achhen bole deshta pakistan hoyni. Aponar dirshayo o suswasthyo kamona korchhi.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.