আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: ইডেন স্কুলে

sanjida_khatun | 19 Jan , 2014  

এবারে তৃতীয় স্কুল, ইডেন বালিকা বিদ্যালয়ের পালা। ভর্তি হওয়া ছিল কঠিন। ইংরেজি, অঙ্ক, বাংলা তিন বিষয়েই পাস করতে হবে। আবার ইংরেজি আর অঙ্কের ফল অতি করুণ। মায়ের বিশ্বাস ছিল ‘একবার না পারিলে দেখ শতবার’। ভর্তির জন্যে পরীক্ষা দিতেই হতো। হয় না হয় না হয় না– শেষে ক্ষীরোদমনি দিদির বাংলা পরীক্ষায় রচনা লিখে তাঁর সন্তোষ অর্জন করা গেল। তিনি এতই খুশি হয়েছিলেন যে ইংরেজি আর অঙ্কে পাস না করেও বৈতরণী পার হতে পারলাম! ক্লাশেও সবার সামনে আমার রচনার সুখ্যাতি করেছিলেন ক্ষীরোদিদি। বাংলা ছাড়া সব বিষয়ে কাঁচা হয়েও কি করে যে ক্লাশের পরীক্ষায় পাস করে যেতাম জানি না। তবে ক্লাশ সেভেনে একবার ফেলও করেছিলাম। সারাক্ষণ কল্পনার রাজ্যে বিহার করলে হবে না? বাল্যের স্বরচিত ছড়াতে আমার সেই মানসিকতার ছবি আছে।

চাঁদনি রাতে ঠাকমা সাথে
গল্প শুনে ঘুমিয়ে পড়া।
বারান্দাতে শেজটি পেতে
তেপান্তরের স্বপ্নে ওড়া।

ভুলো-বাঘা মিনির সাথে
দিনের বেলা শুধুই খেলা।
জোটাই জল্পনা আর কল্পনাতে
স্বপনপুরে যাবার ঘোড়া।

দৈত্যবধের তরবারি
লুকিয়ে রাখি খাপের মাঝে,
বসে থাকি বিনিদ্ আঁখি
মারব, যবে আসবে সাঁঝে।।

এক ক্লাশে দুবার পড়তে গিয়েই বুঝি এবার পড়ায় মন দেবার মতি হলো। তাছাড়া আরও আকর্ষণ, কিছু সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। খেলাধুলার ঊষাদি বছরের শেষে গানের তালে তালে পিটি আর ড্রিল করাচ্ছিলেন মাঠে। গানটি ছিল দ্রুত দাদরায় দারুণ ছন্দোময়। ‘বসন্তে ফুল গাঁথল আমার জয়ের মালা’। গানের তালে তালে অতগুলো মেয়ের একসঙ্গে পর পর বিচিত্র ভঙ্গিমায় শরীরচালনা দেখতে যে কী ভালো লেগেছিল! কেডস-পায়ে ঊষাদি দক্ষতার সঙ্গে পুরোটা পরিচালনা করতেন। মহড়া দেখতে ভিড় জমাতাম আমরা।

খেলার ক্লাশে ঊষাদি আমাদের ভলিবল খেলা শিখিয়েছিলেন। এক একজন বল ছুঁড়ে যতবার সফল হতে পারত, ততবার ততক্ষণ পর্যন্তই তার পালা। তার পরেই সরে গিয়ে পরের জনকে সুযোগ দিতে হতো। নেটের দু ধারেই এমনি করে সরে সরে সকলে চান্স্ পেত। সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা। রোগাপট্কা আমারও এমনি আগ্রহ জন্মে গেল যে, শেষ লাইনের এক এক লাইনে জনা পাঁচ-ছয় নিয়ে অন্তত চার পাঁচটা লাইন হতো। শেষ প্রান্ত থেকে কিল দিয়ে দিব্বি নেটের ওপারে বল পাঠাতে পারলাম! সকলেই অবাক। দারুণ আনন্দ পেয়েছিলাম সেদিন।

করুণাকণা গুপ্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিলিয়ান্ট ছাত্রী ছিলেন। ইংরেজি পড়াতেন স্কুলে। গান গাইতেন রেডিওতে–রবীন্দ্রসঙ্গীত। স্কুলের অনুষ্ঠানেও গান গাইতেন। খবর পেলাম করুণাদি কলকাতা চলে যাচ্ছেন, তাঁর ফেয়ারওয়েল হবে পরদিন। কাব্যিরোগ তো ছিল খানিক, বেরিয়ে এলো–

চলে যাবে তুমি মোদেরে ফেলিয়া
মনে কি রহিবে না?
ব্যথা দিয়ে যাবে মোদের মরমে
ফিরে কি চাহিবে না?

মরমে মরমে যদি দিয়ে যাও
দুঃখ বেদনা এত,
সহিব কেমনে শিখাইয়া দিও
সহিব তোমারি মতো!

শুধু কবিতা লিখেই হলো না, সুরও বসালাম তাতে। মনের বাসনা ছিল, সুযোগ পেলেই অনুষ্ঠানে গেয়ে দেব! তা, কে আর আমাকে সে সুযোগটা দেবে!! আশ্চর্য এই, সুরসুদ্ধ কবিতাটা মনে রয়েছে এখনো!

ক্লাস সেভেনেই একবার এক দিদিমণি ক্লাসে এসে সবাইকে একটি কবিতা লিখতে বলেছিলেন। বছর শেষের পরীক্ষা হয়ে যাবার পরেই হবে। সে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করতে থাকলেও এই ফেলকুমারী আমিই জানালার বাইরে চেয়ে থেকে থেকে লিখে ফেললাম–

পাখি পাখি, তব এই বিচিত্র পাখা
বৃক্ষশাখে বারে বারে কেন দেয় দেখা?
আর কোথা তব বুঝি নাই ঠাঁই,
এ বৃক্ষশাখে পুন দেখা পাই।

মোর এ কুঞ্জদ্বারে তব দেখা বারে বারে
পেয়ে মোর সাধ জাগে হই তব সাথি,
পাখি!
সমস্ত ক্লাশের মধ্যে একমাত্র আমার লেখাটাই নাকি কবিতা-কবিতা হয়েছিল! বাসায় ফিরে এতেও সুর বসিয়েছিলাম সেদিন। শেষটায় ‘সাথি’ আর ‘পাখি’-তে মিল হয় না বলেও, আমার প্রশংসা করেছিলেন সেই দিদিমনি! ফলে উদ্বেলিত চিত্তে সুর লাগাতে গিয়ে মনে হলো ‘মোর এ কুঞ্জদ্বারে’ থেকে কীর্তনের মতন তালফেরতা করে সুর দিলে ঠিক হবে। হলো একটা কিছু!

ইডেন স্কুলে থাকতেই মনে হয়, একবার ‘ভগবান’ নিয়ে গরুগম্ভীর এক উপদেশ গাথা রচনা করেছিলাম। সেইটিই ছিল জীবনের প্রথম কবিতা। বিপদে আপদে ‘তিনি’ই আমাদের ‘সাথি’ হলেও আমরা কেন তাঁর ‘প্রভা-র উজ্জ্বল ‘ভাতি’ বুঝি না? আর যে যা-ই বলুক আমরা তাঁকে ভুলব না। আর অবশ্যই তাঁর ‘উপাসনা’ করব। ভুলিও না তাঁরে, কহিতেছি, তাই।– এই বাণী ছিল শেষে।

এ হচ্ছে আমার নিরীহ ভালোমানুষ স্বভাবের প্রকাশ। আর ‘পাখি’ কবিতার পরে বেশ একটা ভাবুকতাতেই পেয়ে বসল। ক্লাশের সুলেখা একদিন বলল-চল্ ঠাকুরমার জন্যে পূজার ফুল নিয়ে আসি। চললাম ওর সঙ্গে। বুড়িগঙ্গার দিকে ইস্কুলের দেয়ালের কাছে ছিল এক পুকুর। তার ঢালু পাড়ির বড় বড় ঘাসের ওপর পলাশফুল বিছিয়ে রয়েছে। দেখে মনটা ভালো লাগায় ভরে উঠল। যে সব ফুল মাটি ছোঁয়নি, সেগুলো সুলেখা টপটপ কুড়িয়ে নিল। বলল—মাটিতে পড়ে থাকা ফুলে নাকি পূজা হয় না। এই পলাশ ফুল নিয়েও কবিতা লিখে ফেলেছিলাম সেদিন ক্লাশের পিছনের বেঞ্চে বসে।

বন্ধু রত্নার সঙ্গে প্রণয়কলহেও বেরিয়েছিল এক কবিতা, তার দ্বিতীয় লাইনের শেষেই ‘চিতচোর’ সম্বোধন ছিল। বাকি কবিত্বের কথা থাক্, কেবল শেষ দুটো লাইন বলি।
আজি এই নববর্ষের প্রথম প্রভাতে তুমি কি করিবে না মোর ক্ষমা?
পড়িয়াছি ট্রানশ্লেষন বইয়ে ‘বন্ধুর ত্রুটি বন্ধুই করে মার্জনা’!
বেশ মডার্ন হয়েছিল না শেষটা? অবশ্য তত পছন্দ হয়নি বলে বদলে লিখেছিলাম–
‘করিবে কি? বলো বলো ওগো মোর প্রিয়তমা?’
গাঢ় প্রণয় বলে একেই!

(চলবে)
দ্বিতীয় কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন: স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে
প্রথম কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন : আমার প্রথম স্কুল

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.