আত্মজীবনী

স্কুলের দিনগুলো: আনন্দময়ী স্কুলে

sanjida_khatun | 10 Jan , 2014  

নারীশিক্ষামন্দিরের পরে মা আমাদের দু বোনকে ভর্তি করালেন আনন্দময়ী গার্লস স্কুলে। যতদূর মনে হয় এ স্কুলে এসেছিলাম ক্লাস ফাইভে। নারীশিক্ষার মতো এখানেও স্কুলের ব্যবস্থা-করা ঘোড়ার গাড়িতে আসা-যাওয়া। আরমানিটোলা ময়দানের সামনে পৌঁছাবার আগে আগে ডানদিকে আনন্দ রায়ের বিশাল ভবন রায় হাউজ, আর বামদিকে লাল ইটের বাড়িটা ছিল উৎপলা ঘোষ সেনের বাপের বাড়ি। আনন্দ রায়ই নাকি আনন্দময়ী স্কুল করেছেন শুনেছি। দেশভাগের পরে আনন্দ রায়ের বাড়িটা কিনে নেন বড় পুলিশ অফিসার দাহার সাহেব। তখন দালানের নাম তাঁর স্ত্রীর নামে হয়ে যায়–‘হাসিনা হাউজ’।

আরমানিটোলা মাঠের উত্তর দিকের রাস্তায় পড়ে বাঁয়ে ঘুরে সোজা গেলেই মোড়ের মাথায় ‘আনন্দময়ী স্কুল’। এখানে তখন বাবার বন্ধু ফনী মিত্তিরের স্ত্রী নলিনী মিত্তির ছিলেন প্রধান শিক্ষক। এঁদের একমাত্র পুত্রই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ (এককালের অর্থমন্ত্রীও) অশোক মিত্র। নলিনীদি অঙ্ক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময়ে বাবার কাছে আসতেন পড়তে। মায়ের তাঁকে পছন্দ ছিল বলেই হয়তো আমাকে আর রীণাকে আনন্দময়ী স্কুলে ভর্তি করেছিলেন। কিন্তু লেখাপড়াতে আমাদের মন ছিল না। ছিলাম গানের পাগল।

তেতাল্লিশ সালের দিকে মহা যুদ্ধের খবর শুনবার জন্যে বাবা ফিলিপ কোম্পানির রেডিও কিনেছিলেন। তখন থেকেই হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘হে নিরুপমা’ ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’ ‘প্রাঙ্গণে মোর শিরীষ শাখায়’ এসব গানে বিভোর হয়ে আছি। আনন্দময়ীতে পড়বার সময়ে গানের রেণুদি রীণার গান খুব পছন্দ করলেন। গান, এমনকী নাচেও তাকে নেওয়া হতো অনুষ্ঠানের সময়ে। আমার গান চলত গুন্ গুন্ করে, বান্ধবীদের সঙ্গে। সংস্কৃতিমান বাহাউদ্দিন চৌধুরীর ছোট বোন সুফিয়ার সঙ্গে সিনেমাতে গাওয়া কানন দেবীর গানের চর্চা হতো। ‘ফেলে যাবে চলে জানি জানি’, ‘যদি আপনার মনে মাধূরী মিশায়ে’, ‘আমি বনফুল গো’ আকাশে হেলান দিয়ে’ এই সমস্ত।

আমার অধ্যাপক বাবার ‘মুকুল’ (পরে নাম বদলে ‘আজাদ’) সিনেমা হলের শেয়ার থাকলেও আমাদের সিনেমা দেখতে দিতে তাঁর কোনোই অভিলাষ ছিল না। সায়গল অভিনীত কি একটা সিনেমা আর বিনতা রায় অভিনীত ‘উদয়ের পথে’ এই দুটি দেখবার সুযোগ হয়েছিল স্কুলে থাকতে। ঘোড়ার গাড়ি বোঝাই হয়ে সিনেমা দেখতে গিয়ে ছিলাম সকলে। ওদিকে বান্ধবী সুফিয়া কানন দেবীর অভিনয় করা ছবির পোকা ছিল। বাড়িতে কোনো বাধা ছিল না। গান তো গাইতই, চোখ বড়ো বড়ো করে কানে কানে সিনেমার গল্প শোনাত আমাকে।

আনন্দময়ী স্কুলে ডাকাতের মতো অর্থাৎ কিনা বিরাট দেহধারী এক সহপাঠিনী ছিল–রোকেয়া খান। ছাত্রীজীবনে সংস্কৃত ভাষা শিখবার সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়েছিল রোকেয়ার প্রবল বাধায়। ওদের খান পরিবার থেকে মুসলমান মেয়েদের সংস্কৃত পড়াবার বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তখন আমরা ক্লাস সিক্সের ছাত্রী। সংস্কৃত ক্লাসের সময়ে সেই রোকেয়া চেপে ধরল আমার হাত ‘ওই ক্লাসে যাবি না একদম’। হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল স্কুলের মাঠে। তার প্রবল স্বভাবের সামনে কোঁচা হয়ে গেলাম। মনে পড়ছে টিচাররা বেজায় রেগে গিয়েছিলেন আমাদের ওপর। সংস্কৃতের বদলে বিশেষ বাংলা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বেশ কঠিন ভাষায় কঠিন প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল। রোকেয়া পরীক্ষাতে কেমন করেছিল মনে নেই, আমার বাংলার ওপরে মোটামুটি দখল থাকাতে আমি টায় টায় উতরে গিয়েছিলাম যাহোক। কিন্তু সংস্কৃত শিখবার ওই সুবিধাটা মারা পড়েছিল। পরে ইডেন স্কুলে ভর্তি হয়ে সংস্কৃত, আরবি, ফারসি থেকে যে-কোনো একটা ভাষা নেবার সময়ে বাবা আমাকে ফারসি পড়তে বলেছিলেন। কিন্তু মৌলবি সাহেবরা চেষ্টা করুন আর না-ই করুন সে ভাষাশিক্ষার সুবিধেও হয়নি কোনো।

ক্লাস সিক্সে পড়বার সময়ে মধ্যবয়সী এক স্যার ভুগোল পড়িয়ে আমাদের মন জয় করেছিলেন। পরীক্ষার আগে পরমোৎসাহে ভুগোল পড়লাম। মুখস্থ বিদ্যার চর্চা করিনি কখনো, বুঝে পড়তাম। প্রশ্ন হাতে নিয়ে দেখি সবই পারি। তখন যেটা সবচেয়ে ভালো লিখতে পারব সেটি দিয়েই শুরু করলাম। লিখে গেলাম ভালো-পারবার ক্রম অনুযায়ী। ফল বেরুলে দেখি ‘বাণী’ আমার চেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে। স্যারের কাছে অনুযোগ করে কারণ জানতে চাইলাম। বললেন ‘দ্যাখো, দুজনেই ভালো লিখেছ। কিন্তু বানীর এত ভালো জানা ছিল যে, ও এক নম্বর প্রশ্ন থেকে শুরু করে পর পর উত্তর দিয়েছে বলেই ওকে বেশি নম্বর দিয়েছি। শুনে মনে প্রবোধ হলো, বলতে পারি না।

ওই বাণীই আবার ‘বিসর্জন’ নাটকে ‘রঘুপতি’র ভুমিকায় অভিনয় করে মাত করে দিয়েছিল। প্রবল ব্যক্তিত্বের অধিকারী রঘুপতির ভূমিকা চমৎকার ফুটিয়ে তুলেছিল সে। আনন্দময়ী স্কুলের ‘বিসর্জন’ খুব নাড়া দিয়েছিল আমাকে। এমনকী বহু পরে শান্তিনিকেতনের পাঠভবনের (স্কুল) ‘বিসর্জন’ দেখে মনে হয়েছিল, আমার ছোটবেলার স্কুল এর চেয়ে অনেক উন্নত মানের ‘বিসর্জন’ মঞ্চস্থ করেছিল। আমাদের নৃত্যশিল্পী মিলি ভদ্রের করা নক্ষত্ররায়ের ল্যাগবেগে স্বভাবটির পরিচয় ও খুব সার্থক ভাবে রূপায়িত করেছিল। হাত-পা বাঁকিয়ে ন্যাকা ন্যাকা সুরে বলা সংলাপ চরিত্রটির ওপরে উচিত-মতো ঘন্না ধরিয়ে দিয়েছিল একেবারে। আনন্দময়ী স্কুলের নাট্য আয়োজনে বিমোহিত হয়েছিলাম, সন্দেহ নেই।

পরবর্তী স্কুলের নাটকগুলিও বেজায় নাড়া দিয়েছিল আমাকে। নাটক অত্যন্ত শক্তিশালী মাধ্যম বলেই বোধ করি ভালো লাগবার অবধি থাকত না। আর শৈশবের কাদা-কাদা মনে এগুলো বাস্তবিক গভীর হয়ে মুদ্রিত হয়ে গেছিল। অবশ্য এই বয়সে (৮১-চলছে) -ও ভালো নাটক দেখে অভিভূত হই না, তা নয়। তবে শৈশব স্মৃতি অনেক বেশি মায়াবী বটে।

আনন্দময়ীতে পড়বার প্রথম দিকে একটি মেয়ের সঙ্গে আমার খুব মনের মিল হয়েছিল। ওর নাম রাবেয়া। কিন্তু, দুঃখ হলো এক ছুটির পরে সে আর স্কুলে এলো না। বহু পরে বড় হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ হলে তার সেই না আসবার কারণ জানতে পারি। জেনেছিলাম, ওরা থাকত পুরোনো ঢাকায়। সে এলাকা থেকে মেয়েদের পক্ষে স্কুলে পড়তে আসা ছিল মুশকিল। ওর বাবা অনেক কষ্টে ওই ফাইভ পর্যন্ত পড়িয়েছিলেন। তারপরে ওর বিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। রাবেয়া সেই বিয়ে মেনে নিতে পারেনি। কি-করে কি-করে সে দ্রোহ ঘোষণা করে নিজেকে ভালো ভাবে গড়ে তুলতে থাকে। কোনো একটা কাগজের অপিসে ওর যাওয়া-আসা ছিল। সেখানকার কারো সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সে মুক্তি অর্জন করে। আশ্চর্য এই এবারের বন্ধনই অতদিন পরে ওকে মুক্তি দিয়েছিল। সংস্কৃতিমনস্ক স্বামীর ঘরে গিয়ে রাবেয়া সুখী হয়। এ সেই রাবেয়া, যে গল্প-উপন্যাস লিখে প্রভূত সুনাম পেয়েছে।

আনন্দময়ী স্কুলে ঘোড়ার গাড়ির সেকেণ্ড ট্রিপে ফিরতে হলে দারুণ খুশি হতাম। কারণ ওই সময়টাতে গোল্লাছুট বা বন্দি কিংবা দাড়িচা দাড়িয়াবান্ধা খেলা যেত। তখন মনে হতো আমি সারাজীবনই খেলব। খুব ভালোবাসতাম খেলতে। খেলবার ইচ্ছেটা বজায় ছিল। বিয়ের পরেও ব্যাডমিন্টন আর অক্ষম পিংপং খেলা চালিয়ে গিয়েছি।
প্রথম কিস্তির লেখাটি পড়ার জন্য এখানে ক্লিক করুন: আমার প্রথম স্কুল
Flag Counter


4 Responses

  1. রঞ্জনা ব্যানার্জী says:

    অসাধারণ অপেক্ষায় থাকলাম পরবর্তী কিস্তির জন্য।

  2. Rajashree Chakraborty says:

    সনজীদা আপার কাছে গান শেখার সুযোগ হয়েছিল খুব ছোটবেলায় , যদিও তখন সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আপাকে প্রচন্ড ভয় পেতাম। মাঝেমাঝে বেশ বিরক্তও হতাম। একই সুর বারবার ধরছেন বলে। গানটা বেশি দূর হয়নি। কিন্তু আপার কথাগুলো মাঝে মাঝে এখনো কানে বাজে। আপার এই লেখাগুলো পড়ছি আর ভাবছি উনারা কত সমৃদ্ধ সময় দেখেছেন, কত ইতিহাস উনাদের সামনেই রচিত হয়েছে। আশা করি আজকের এই অন্ধকার সমাজে আবার আলোর মিছিলের নেতৃত্ব নিয়ে আসবেন আপনি, আপনাদের মত পন্ডিত বিজ্ঞ মানুষরা। যাঁরা সমাজ থেকে এই জঘন্য সাম্প্রদায়িকতা, রাজনীতি নামে ঘৃণ্য বস্তুটাকে দূর করতে পারেন।

  3. Shahidul Islam Swapon says:

    She is a great woman. I like her very much

  4. Faruque almagir. says:

    An extraordinary article of Prof. Sanjida Khatun that speaks of many
    happy and interesting memories along with some famed teachers.
    In my School days I used to go my school Dhaka collegiate walking
    through the road of Anondomoyee School and crossed the Armanitola
    maidan towards Zinda Bahar first lane and then Islampur road, Patuatuly
    and Sadarghat during 1965 to 1960.I tried to compare my those days with
    the descriptions of Sanjida Apa, I said “Apa” as I know her from 1964 when
    she was the lecturer of Eden College.
    I found in my days also the school girls going to school and get back home
    in horse-carts with the escort (dai) sitting at the rear.Glad to read many references
    of the teachers including the father of Ashok Mitra.It may be recalled this great man
    was the student of my school and later on Dhaka University.
    Faruque Alamgir.
    Poet, writer and one of the pioneers’ of Broadcast journalism and teacher and
    a former active member of the Film society Movement in Dhaka.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.