সাহিত্যসংগ্রামী রাবেয়া খাতুন

আহমাদ মাযহার | ২৯ december ২০১৩ ৫:১৫ অপরাহ্ন

এ-কথা ঠিক যে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই প্রকৃতপক্ষে সংগ্রাম করে চলেন; অনাবিস্কৃত অনালোকিত ও অপ্রচল পথে চলতে গিয়ে সংগ্রাম তাঁকে করতেই হয়। সে অর্থে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রই সংগ্রামী। তা-সত্ত্বেও রাবেয়া খাতুনকে আলাদাভাবে ‘সাহিত্যসংগ্রামী’ বলার কারণ তিনি নারী বলে সৃষ্টিশীল মানুষমাত্রের অতিরিক্ত প্রতিকূলতা তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি আবার নিজেকে আলাদাভাবে নারীবাদী মনে করেন না। সামগ্রিক অর্থে স্বীয় সংগ্রামকে মানবিক সংগ্রামের নারী অবস্থান থেকে দেখেন। সেজন্যে পঞ্চাশের দশকের প্রায় অবরুদ্ধ বাঙালি মুসলমান সমাজের নারী প্রতিনিধি হিশেবে রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যসংগ্রামের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে তাঁর সাহিত্যিক জীবনকে সম্পন্ন ও সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করা যাবে না।

রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যযাত্রার সূচনাকালে বাঙালি মুসলিম সমাজের নারীরা দু-একজন করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছেন। বাইরের পেশা বলতে শিক্ষকতায় অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছিল। কিন্তু তাঁদের জীবন ঘরের ভেতরের সংসার সীমানাতেই কেটেছে প্রধানত। নারী পুরুষের মতো মুক্তভাবে নিজের জীবন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিজের মতো করে নিতে পেরেছে কমই। তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে বাবার বা স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি পাবার জন্য। সমাজের সাধারণ শ্রেয়বোধই ছিল এ-রকম যে নারীর ঘরের বাইরে তখনই যাওয়া দরকার যখন সংসারে তার বাইরে যাবার মতো অবকাশ সৃষ্টি হবে, কিংবা তার বাইরে যাওয়ার দরকার পড়বে নিতান্তই সংসারের প্রয়োজনের খাতিরে। এমনকি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও নারীর বাইরে বেরিয়ে আসাটাকে সাধারণভাবে ততটুকুই গ্রহণ করতে চেয়েছে যতটুকুতে সে পুরুষের সহযেগী মাত্র। বাংলাদেশের উদার মধ্যবিত্ত সমাজও এরচেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। প্রসঙ্গত তাঁর সমসাময়িককালে রচিত আকিকুন্নেসা আহমদের আধুনিকা স্ত্রী বইয়ের কথা স্মরণ করতে পারি যাতে এই মনোভঙ্গিই ছিল প্রকাশিত। অভিজাত মধ্যবিত্ত পরিবারে বইটি জনপ্রিয়ও হয়েছিল এ-কারণে।
rabea-khatun.gif
রাবেয়া খাতুন কিশোরী বয়সে পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছিলেন বলে পরিবারে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছিল। বয়োজ্যেষ্ঠরা মনে করেছিলেন একটি মেয়ের হাতের লেখা সংসারের বাইরের পুরুষদের দেখা অসামাজিক কাজের তুল্য। অনুভব করা যাচ্ছে নারী হিশেবে কীরকম অবরুদ্ধ সমাজের বাসিন্দা ছিলেন তিনি। এই রকম পরিপ্রেক্ষিতে কথাসাহিত্য সৃষ্টির মতো ব্যাপক জীবনাভিজ্ঞতার পরিচয় সম্পন্ন কাজের চেষ্টাকে বড় সংগ্রাম হিশেবে না দেখার সুযোগ নেই! একজন নারীর এই ধরনের অভিযানকে বিবেচনা করতে হবে মূল সংগ্রাম শুরু হবার আগের যুদ্ধ হিশেবে। এতে প্রাথমিকভাবে জয়ী না হয়ে একজন নারীর পক্ষে মূল রণক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবারই সুযোগই তখন ছিল না!

নারী হিশেবে সংগ্রামশীল বলে রাবেয়া খাতুনের সৃষ্ট সাহিত্যকর্মকে বাড়তি অনুকম্পার চোখে দেখার দরকার নেই। কারণ জীবনকে পর্যবেক্ষণ করার যোগ্যতায় তিনি যথার্থই সামর্থ্যবান! লক্ষণীয় যে, বাংলা সাহিত্য চর্চায় সাতচল্লিশোত্তর ঢাকাকেন্দ্রিক যে ধারার সূচনা তাকে যে দু-একজন নিরলস কথাসাহিত্যিক ক্রমাগত ও ধারাবাহিকভাবে পুষ্ট করে তুলেছেন রাবেয়া খাতুন তাঁদের অন্যতম। এই সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রভাবে আমাদের সমাজে যে বিবর্তন ঘটে চলেছে তাকে কতটা অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন তার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে তাঁর বিচিত্র কথাসাহিত্যকর্মে তথা গল্পে, উপন্যাসে ও ভ্রমণসাহিত্যে–এমনকি শিশুসাহিত্যের অভিযাত্রায়ও! সমসাময়িকদের মধ্যে তাঁর মতো এতটা জীবনব্যাপী সক্রিয় ও নিমগ্ন লেখক দু-একজনের বেশি পাওয়া যাবে না।

ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে সক্রিয় থাকায় তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো। পঞ্চাশেরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা বলে ঔপন্যাসিক হিশেবেই হয়তো বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। চারশো ছোটগল্পের রচয়িতা হিশেবে দেখলে তাঁকে প্রধানত গল্পকার হিশেবেই চেনা যাবে। আবার যদি বলি ভ্রমণসাহিত্যের লেখক হিশেবেও তিনি রয়েছেন অগ্রবর্তী তাহলেও দ্বিমত করার অবকাশ থাকবে না। বাংলাদেশের সাহিত্যের অঙ্গনে সৃষ্টিশীল অনুপ্রেরণায় রচিত তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের কথা সংখ্যাপ্রাচুর্য ও স্বাতন্ত্র্যের কারণে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এদিকে তিনি সামনের সারিতেই থাকেন শিশুসাহিত্যের স্রষ্টা হিশেবেও। স্মৃতিকথামূলক রচনাও পরিমাণে কম নয়। সব মিলিয়ে রাবেয়া খাতুন তাঁর সৃষ্টিশীল বিচিত্র সংরূপের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজমানসের অন্তর্গত স্রোতকেই পাঠকদের অনুভবের সীমানায় এনে দেন। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনোপলব্ধি ও কল্পনাপ্রতিভার সমন্বয়। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার বিবেচনায় রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক অবদানকে এ-কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে।

আমাদের সমালোচনাসাহিত্য যথেষ্ট বিস্তৃতপরিসর ও অগ্রসর নয় বলে তাঁর মতো একজন লেখককে যথেষ্ট বিচার ও মূল্যায়ন করে দেখা হয় নি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্মের সামান্য গভীরে যাবার প্রয়াস নিলেই দেখা যাবে অপসৃয়মান গ্রামীণ জীবনবোধের সঙ্গে বহমান ও প্রতিসরমাণ নগর জীবনের জটিলতাকে কী করে তিনি নভেলার অনতিবিস্তৃতপরিসরে ও ছোটগল্পের মিতায়তনে পেরেছেন সম্পন্নভাবে ধারণ করতে। নিজে সংবেদী নারী বলে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনে নারী মনস্তত্ত্বের স্বাতন্ত্র্যকেও তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এই দিকটিকেও আরো অভিনিবেশের সঙ্গে বিচার করে দেখা জরুরি। বাংলাদেশের যুগপৎ গ্রামীণ ও নগরিক জীবনপ্রবাহকে সন্ধিস্থল থেকে আটাত্তরউত্তীর্ণ কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন যেভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন তাকে গভীরতরভাবে অনুসন্ধান ও বিচার করে দেখা হবে এই প্রত্যাশা নিশ্চয়ই অতিকল্পনা নয়।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com