মোশাররফ হোসেন ভূঞা-র গুচ্ছ কবিতা

মোশাররফ হোসেন ভূঞা | ২৯ december ২০১৩ ১:০০ পূর্বাহ্ন

তুলি ও তুমি

নীল জোছনার রাতে তুমি ক্যানভাস
নির্ঘুম মোহধার আমি এক তুলি
বাকি সব ঘুমঘোরে অনন্ত বিমূঢ়
শুধু জেগে তুমি আর আমি।

বাকি সব কুম্ভকর্ণ, আমি অর্জুন একা
ধরাতলে তুমি চাঁদ ঝলমলে আলোর রেখা
ক্যানভাসে যত আঁকি কালো কুন্তল
চোখ ভরে দেখি শুধু আলো ঝলমল।

এই মুখ গ্রীবাদেশ স্থলপদ্ম দু’টি
নাভির দুই পাশে বাঁকানো কটি
ছুঁয়ে দেই ঘসে দেই কপোলে কপোল
কাঁশফুলে গড়ে দেই দেহ তুলতুল।

শ্রোণীদেশে রেখে ঠোঁট দেখি কামশিলা
হলরেখা হায় হায় কি মধুর লীলা
থর থর করে কাঁপে এই দু’টি হাত
কথা বলে নীল চাঁদ কবিতার রাত।
najib-tareq.gif

কসম ভুলে

কবে থেকে জানি না- ইচ্ছেগুলো একটু একটু করে
হৃদয়ের গভীর আঙিনায় বেড়ে ওঠা লাল জবার
মতো একদিন স্বপ্ন হয়ে ব্যথার স্কন্ধে বসে
কম্পিত স্বরে বললো- শুধু একটুখানি ছুঁয়ে দেবো-
শীতের সকালে ভারী কুয়াশার চাদর ছিন্ন করে
সারাদেহে জেগে ওঠা কামদীপ্ত লাল সূর্যগুলো।

আমি কসম কেটে বলছি- একবার ছুঁয়ে দেবো শুধু
শীতের সকালে ঘন কুয়াশা ভেদ করে নরম ঘাসে
যেমন শিশিরের কণা উদিত সূর্যতাপে মিলে যায়
তারও অনেক আগে তৃপ্ত স্বপ্নগুলো লুকিয়ে নেবো
হৃদয়ের গভীর আঙিনায় বেড়ে ওঠা জবার ঠোঁটে।

কসম কেটে বলছি- জবার রঙে যদি হই লাল
ভেঙে যদি যায় হৃদয়ের সবকটি তক্তপোষ
খুলে দিও একবার, দেখি ঐ নরম দুটি কালো চোখ-
যেখানে রূপালী নদী হাসে জোছনার রং মেখে
অবিরাম শুধুই দেখে যাবো, সবকটি কসম ভুলে।

সব তুমি যাবে ভুলে

সব ক’টি জানালায় ঝিলিমিলি আঁটা, চেয়ে দেখছো
সূর্যালোকে কেঁপে কেঁপে ওঠা কুয়াশার ভারী মুখ
আরো দেখো জীবন্ত আমি মিশে যাই এক নিমিষেই
যেতে যেতে শুধু দেখি তোমার কালো দু’টি চোখ।

জানালায় ঝিলিমিলি আটা, হতে পারে পাষাণের দেহ
যদি মনভরে রাখি দু’টি চোখ– কি করে অন্য কেহ!
ভেঙে দিয়ে এসো সবুজ ঘাসের নরম গালিচা হবে
কখনো মেঘে শীতের কুয়াশায় হিমেল আদরে রবে।

তোমাকে শোনাব জোছনার গান– বেহালায় সুর তুলে
রূপালী নিশিথে ঝিল্লীর গান সব তুমি যাবে ভুলে।

কামরাঙা দেহ

যদি আস ভাঁদরের ভরা জোছনার রাতে
তৃষ্ণার্ত ঠোঁটের পরশে সারা অঙ্গে-
বিলাসে এঁকে দিতাম অবিনাশী কারুকাজ।
কুমোরের নিপুণ হাতে একের পর এক
মৃত্তিকার শিল্প গড়ে, সৌষ্ঠব শোভা
দেখে নক্ষত্র হাসতাম মুগ্ধ চোখে।

যদি আস কোনো এক শীতের মধ্যরাতে
দেহের সবটুকু উষ্ণতা ঢেলে বলতাম-
কুয়াশার চাঁদরে ডুবে থাকতে বাঁধা নেই।
যেমন নদীকে টেনে নেয় তৃষিত সাগর
উপোসী ধারার মতো নিঃশব্দে নিতাম-
টেনে রহস্য ঘেরা ঐ কামরাঙা দেহ।

আঁতকে উঠতে চাই

এই রাতে কালো অক্ষরগুলো তোমার কথা বলছে
কবিতা নয়, গল্প নয়, শিশুকালে পড়া ছড়াও না
ঘুমের ঘোরে বা জেগে জেগে দেখা কোনো স্বপ্নও নয়
জলজ্যান্ত মানবী, চারপাশে সুগন্ধি ছড়াচ্ছ।

তারাদের সাথে কথা বলে আনমনা হই শতবার
চেয়ে দেখি ওরা সব জ্বলে উঠে নির্ঘুম দুটি চোখে
আঁধারের রূপ দেখে যতই তন্ময় হতে চেয়েছি
উষ্ণ কপালে শীতল স্পর্শে বার বার আঁত্কে উঠি।

তুমি কি একবার বসবে না সেগুনের তক্তপোষে!
ঘরময় আলো জ্বেলে দেখি রজনীগন্ধার গতর-
তীর ভাঙ্গা দুটি চোখ জুড়ে জ্বলছে আকাশের তারা,
এক নিমেষে আলো হয়ে উঠছে কালো অক্ষরগুলো।

আমার কালো অক্ষরগুলো শুধু তোমার কথা বলে
তুমি কি একবার বসবে না সেগুনের তক্তপোষে!
যতই আনমনা হই বা কথা বলি তারাদের সাথে
আমি বার বার আঁত্কে উঠতে চাই- তুমি কি জানো না!

ভালোবাসা না পেয়ে

যদি দাও ঘাসফুল-নিংড়ানো এক কণা জল
আমি উপচে দেবো সবটুকু অশান্ত সাগর।
তুমি কি জানো, সাগরে একটিও হাঙ্গর নেই
শুধু পোষমানা ডলফিন, তেমনি তোমাকে চাই
অনাগতকাল শুধুই বেড়াবে বুক ভরা জলে।

গোলাপের বুক থেকে পরাগের বিন্দু পরশ
তোমার ঠোঁটে লেপে যদি দাও হিমার্ত আদর,
শুধু মুহূর্তকালের এক লক্ষাংশ ক্ষণ-
আমি দেবো ঘন সবুজের সবটুকু ভালোবাসা।

তুমিতো জানো, ভালোবাসা না পেয়ে আমি মরবো না।

প্রথম দেখার উলুধ্বনি

প্রথম তোমাকে দেখি নিকষিত অঙ্গে চন্দ্র-সূর্যের
দূরন্ত খেলা, অজান্তে ভেবেছিলাম চন্দ্র ও সূর্য
একসাথে হাসে এমন মহুয়ার মেলা আর কি দেখা যাবে-
কখনো কোনদিন সকাল-সন্ধ্যা বা ক্লান্ত দুপুর বেলা,
নির্ঘুম নিশিথে অথবা জনমের কোনো মধু প্রান্তরে!

দেখেই হেঁটেছি জলন্ত অগ্নিগিরির লাভাধারা পথে
ক্লান্তিহীনভাবে কতদিন কত সহস্র মাইল পথ,
দেখেছি পাথরের চূড়ায় বরফের মুখে সূর্যের হাসি
সবুজ ধানের ক্ষেতে বাতাসের দোলায় গাছের কোলাকুলি
শ্রাবণের রাতে চাক্ চাক্ মেঘের ওপর চাঁদীমার রূপ
সকাল সন্ধ্যায় সাগর জলে লাল সূর্য– আরো কত কি!

শুধু দেখি নাই আর একটিবার ফুটন্ত বাগান খানি,
হয়তো এতোদিনে তোমার মধুবনে কামাতুর চোখ মেলে-
অজস্র মধুকর পলকহীনভাবে চেয়ে চেয়ে ধুঁকছে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Arif Nazrul — december ২৯, ২০১৩ @ ১:০৯ অপরাহ্ন

      তোমাকে শোনাব জোছনার গান– বেহালায় সুর তুলে
      রূপালী নিশিথে ঝিল্লীর গান সব তুমি যাবে ভুলে।

      osadharon

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন matin bairagi — december ২৯, ২০১৩ @ ৬:৩৬ অপরাহ্ন

      নীল জোছনার রাতে তুমি ক্যানভাস/নির্ঘুম মোহধার আমি এক তুলি/বাকি সব ঘুমঘোরে অনন্ত বিমূঢ়/শুধু জেগে তুমি আর আমি। এই চমৎকার পঙক্তিমালা কবি মোশাররফ হোসেন ভুঞার । তিনি কবিতা লেখেন সেটা আমার আগে জানা ছিলনা। হঠাৎই পরিচয়. এই কবিতাই পরিচয়ের দরোজা। মানুষ হিসেবেও তিনি চমৎকার পরিচ্ছন্ন এক মানুষ । বিডি নিউজ মোট ৭ টি কবিতা এই পর্বে ছেপেছেন, সামান্য সময়ের মধ্যে পাঠক সংখ্যা আমাকে খানিকটা ঈর্ষান্বিতই করে। তবু কি আর করা-কবিতো আমাদের আপনজনই। রোমান্টিক কবি তিনি, ভালো লেখেন এবং কথা সাহিত্যে তাঁর দক্ষতাও সমান। তার ট্রিলজির প্রথম পর্ব ‌‌’কোন এক গাঁয়ের কথা’ প্রকাশিত হয়েছে ইতোমধ্যে। উল্লেখিত কবিতাগুলোর মধ্যে আরো চমৎকার পঙক্তি আছে। আমি আশা কবি তিনি নিয়মিত লিখবেনএবং আমাদের পড়ার সুযোগ করে দেবেন। কবিকে অসংখ্য ধন্যবাদ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — december ৩০, ২০১৩ @ ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার লিখেছেন মোশাররফ ভাই, আপনাকে অভিনন্দন।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন jhoneey — december ৩০, ২০১৩ @ ৪:৫৭ অপরাহ্ন

      ভোলো লেগেছে সাতটি কবিতা। কবিকে অভিনন্দন। ভবিষ্যতে আরও পড়ার ইচ্ছা রইলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ali Habib — december ৩১, ২০১৩ @ ৫:২৮ অপরাহ্ন

      নীল জোছনার ক্যানভাসে যিনি ছবি আঁকেন, তিনি তো শিল্পিত মনেরই মানুষ। তঁঅর হৃদয়ের গভীর আঙিনায় লাল জবা বেড়ে উঠবে_এটাই তো স্বাভাবিক। হ্যাঁ অশান্ত সাগর উপচানো জল দেওয়ার ক্ষমতাও তিনি রাখেন। যিনি পাথরের চূড়ায় বরফের মুখে সূর্যের হাসি দেখেন, শ্রাবণের চাঁদনি তাঁকে মুগ্ধ করবে।
      সুখপাঠ্য কবিতাগুচ্ছ উপহার দেওয়ার জন্য আপনাকে অভিনন্দন কবি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসনান — december ৩১, ২০১৩ @ ৫:৩৭ অপরাহ্ন

      “তোমাকে শোনাব জোছনার গান– বেহালায় সুর তুলে
      রূপালী নিশিথে ঝিল্লীর গান সব তুমি যাবে ভুলে।”
      জীবনের চলার পথে এই সত্য সবাই মেনে চলে, খুব সুন্দর কবিতা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mosarrof Hossain Bhuiyan — জানুয়ারি ৭, ২০১৪ @ ১১:০০ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ সবাইকে। আপনাদের প্রতিক্রিয়ার চমতকারিত্বে আমার কাব্যের বেহালা নতুন সুর পাবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শফিকুল বারী শিপন — ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৪ @ ১২:৫৮ অপরাহ্ন

      পূর্নাঙ্গ কবিতা বলতে যা বোঝায় তা খুঁজে পা্ওয়া গেল কবিতাগুলোতে। ভাষা সংগ্রামের এই মহতী সময়ে শুধু এটুকুই উপলব্দি হচ্ছে; শফিক -সালাম- জব্বর ভাইয়েরা-আমার; এক সাগর রক্ত দিয়ে কি সম্পদই না আমাদের জন্য অর্জন করে রেখে গেছেন!যার দ্বারা সৃষ্ঠি হয় এমন ছন্দ কবিতা। জয়তু একুশ- জয়তু-মাতৃভাষা ।
      —শফিকুল বারী শিপন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com