জয়তু সৈয়দ শামসুল হক

মোস্তফা তারিকুল আহসান | ২৭ december ২০১৩ ৩:১৩ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের এবং একই সাথে বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা ও শক্তিমান লেখক সৈয়দ শামসুল হকের শুভ জন্মদিনে তাঁকে শুভেচ্ছা। প্রণতি এই লেখককে প্রধানত এই জন্য যে প্রায় অর্ধশত বছর যিনি বাংলা সাহিত্যকে অবিরাম সমৃদ্ধ করার ব্রত নিয়ে চলেছেন; বাংলা ভাষাভাষী সব পাঠকের পক্ষ থেকে তাঁকে অভিনন্দন।

সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তিনি লিখলেও আমি মনে করি তিনি প্রধানত কবি। কবিতার অসীম ব্যঞ্জনাময় সৃজনীক্ষমতাই তাঁকে অন্য সব শাখায়ও শক্তিমান করে তুলেছে। তাঁকে যে সব্যসাচী বলা হয় সেটা যথার্থ। বাংলাদেশে আরো অনেকেই বিভিন্ন শাখায় লেখেন তবে তাঁর মতো সব মৌলিক শাখায় দক্ষতা অর্জন করতে অন্য কেউ পারেননি। আব্দুল মান্নান সৈয়দের কথা এ প্রসঙ্গে আসতে পারে, তবে সৈয়দ হক সত্যিকার অর্থে অনন্য।

১৯৫৩ সালে একদা এক রাজ্যে কাব্য দিয়ে তাঁর যাত্রা শুরু যদি্ও তাস নামক গ্রন্থ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। তারপর অবিরাম লিখেছেন, প্রকারনগত কৌশল পাল্টেছেন, বিষয়বস্তুকে সূক্ষবোধের সাথে উত্তীর্ণ করেছেন আর হার্দিক গভীরতার সংবেদে যাবতীয় মানবপ্রত্যয়কে স্পর্শ করতে চেয়েছেন বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা, পরাণের গহীন ভেতর, নাভিমুলে ভস্মাধার, আমার শহর ঢাকা, বেজান শহরের জন্য কেরাম, বৃষ্টি ও জলের কবিতা— এসব গ্রন্থসহ তাঁর অজস্র কবিতায়। বৈশাখে রচিত সংক্তিমালায় তাঁর কবি হয়ে ওঠার প্রেক্ষিত বর্ণিত হয়েছে। টানা অক্ষরবৃত্তে লেখা এই কবিতা বাংলাদেশে সম্ভবত প্রথম দীর্ঘকবিতা। আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার প্রেরণায় প্রেম ও কামকে অন্বিত করে তিনি লিখলেন পরানের গহীন ভেতর। নবী মুনশীর সনেট নামে এটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। কবির নিরীক্ষাপ্রিয়তার এটি অন্যতম উদাহরণ। এই ধারা পরে অনেকে অনুকরণ করেছেন।

মূলত কাব্যনার্ট রচনা করার জন্য নিজের শক্তি ও সম্ভাবনার নিরীক্ষা করার জন্য পরানের গহীণ ভেতর রচিত হলেও সন্দেহ নেই এটি বাংলা কাব্যের অন্যতম প্রধান শক্তিশালী কাব্য। কাব্যনাট্য রচনায় তিনি ঈর্ষণীয় সফলতা পেয়েছেন এই অনুশীলনের ফলে। মৈমনসিংহ গীতিকার অনুপ্রেরণায় এবং টি.এস.এলিয়টের নাট্যকৌশলের মিশ্রনে তিনি বাংলাভাষায় অসাধারণ নাটকের ফর্ম তৈরি করলেন। আমি বুদ্ধদেব বসুর কথা ভুলে যাচ্ছি না। তিনি পৌরাণিক প্রেক্ষাপট নিয়ে যে নাটক লিখেছিলেন তা সত্যিকার অর্থে আধুনিক কাব্যনাট্য নয়। সৈয়দ হক বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, সামাজিক ইতিহাস ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা নিয়ে যে কটি কাব্যনাট্য লিখেছেন তা বিষয়বস্তু, প্রকরণ ও মঞ্চসাফল্যের বিবেচনায় সবার চেয়ে আলাদা। নূরলদীনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, গণনায়ক, ঈর্ষা ইত্যাদি নাটকে তাঁর প্রতিভার ছাপ লক্ষ করা যায়।

ঔপন্যাসিক সৈয়দ হক সাহসী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা, প্রগতি ও আধুনিকতার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী। পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি উপন্যাস লেখা শুরু করেন। তিনি শুরু করেন তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায়-নতুনত্ব যার প্রধান চরিত্র। অচিন্ত্য পূর্ণিমা দিয়ে তাঁর যাত্রা হয়। তিনি লিখেছেন পঞ্চাশাটির মতো উপন্যাস এবং এই ধারা এখনও বহমান। এক মহিলার ছবি, দেয়ালের দেশ, স্তব্দতার অনুবাদ, এক যুবকের ছায়াপথ, মহাশুন্যে পরানমাস্টার, তুমি সেই তরবারী, নিষিদ্ধ লোবান, খেলারাম খেলে যা, টানটান, দ্বিতীয় দিনের কাহিনী, অর্ন্তগত, এক মুঠো জন্মভূমি, শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ, বাস্তবতার দাঁত ও করাত, বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ প্রভৃতি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধ ব্যক্তিগত সংবেদন-জৈবিক রীরংসাজাত প্রত্যয় ও সামাজিক-মানবিক প্রসঙ্গ তাঁর মূল উপজীব্য। নগর তাঁর উপন্যাসের মূল ভূগোল হলেও উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক জীবন ও ভাষা তার কথাসাহিত্যে উজ্জ্বলভাবে উপস্থিত। তাকে যারা শুধু খেলারাম খেলে যার লেখক ভাবেন তারা তার অন্য রচনা পড়েছেন বলে মনে হয় না। তিনি বাংলাদেশে প্রথম যৌনতাকে সাহসের সাথে উপস্থাপন করেছেন-সেই হিসেবে তার হাতেই বাংলাদেশের উপন্যাসে আধুনিকতার সূত্রপাত। তিনি নারীকে আধুনিক ও শক্তিমান মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কবিতার ফর্মে উপন্যাস লিখেছেন, বিরতীহীন গদ্যে লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস দ্বিতীয় দিনের কাহিনী। তিনি সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহকে বাংলা ভাষার অন্যতম প্রতিনিধিত্বকারী উপন্যাসিক মনে করতেন। এ থেকে তার রুচি ও মান বোঝা যায়।

তিনি মহাকাব্যিক পটভূমিকায় বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ নামে দীর্ঘ উপন্যাস যেমন লিখেছেন তেমনি ছোট্ট আকারের আলোর জন্য উপন্যাস লিখেছেন। কবি হলেও কাব্যাক্রান্ত উপন্যাস তিনি লিখতে চাননি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে তিনি তাৎপর্যময় করে তুলেছেন তার উপন্যাসে। তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমূলে তুলে এনেছেন। আমি বাসি, তুমি বাসো তো গ্রন্থে তার এই চেতনার স্বরূপ আরো মূর্ত হয়ে উঠেছে।

সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক জীবনজিজ্ঞাসা তার লেখায় মূর্ত হয়ে ওঠে, তবে ছোটগল্পে তিনি উত্তরাঞ্চলের নিরীহ হতদরিদ্র মানুষের জীবনের মর্মন্তুদ ছবি একেঁছেন। ক্ষুধা, মারী, দুর্ভিক্ষে নিপতিত মানুষ কী অবর্ননীয় কষ্টে দিনযাপন করে সে চিত্র পাওয়া যায় তার ছোটগল্পে। জলেশ্বরী নামক কাল্পনিক জনপদ আসলে কুড়িগ্রাম–তার জন্মভুমি। সে অঞ্চলের মাটি, মানুষ, প্রকৃতি ও নানাবিধ সামাজিক সংকটের গভীর চিত্র রয়েছে তার ছোটগল্পে। এখানেও গল্পের টেকনিক নিয়ে নিরীক্ষা করেছেন তার মতো করে। তার নিরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি কথা বলা বাঞ্ছনীয় যে তিনি নিরীক্ষা করার সময় সৃজনশীলতার বৈশিষ্ট্যকে অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে সামান্য শিথিলতা যে চোখে পড়ে না তা নয়। লেখক হিসেবে তিনি সব সময় সিরিয়াস ও পেশাদার বলেই তিনি সচেতন সে কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। গল্পের কলক্বজা নামক গ্রন্থে তিনি ছোটগল্প রচনার কৃৎকৌশল নিয়ে কথাবার্তা বলেছেন তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় এই ফর্ম নিয়ে কত গভীরভাবে অনুশীলন করেছেন।

কলামজাতীয় লেখা যে কত আকর্ষণীয় ও শৈল্পিক হতে পারে সেটা সৈয়দ হকের হৃৎকলমের টানে পড়লে বোঝা যায়। ব্যক্তিগত উপলব্ধির আলোয় সমাজ সংস্কৃতি সাহিত্য শিল্প ইতিহাস নিয়ে দেশীয় ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রনে সৈয়দ হক অনুভববেদ্য কলাম লিখেছেন। বাংলা ভাষা যে কত শক্তিশালী সেটা এই লেখা পড়লে বোঝা যাবে। বাংলার মুখ সারা বাংলাদেশের চালচিত্র নিয়ে লেখা তার আরো একটি গ্রন্থ যেখানে ক্রমপরিবর্তনশীল বাংলাদেশের ছবি এঁকেছেন গভীর পর্ববেক্ষণসহ। প্রণীত জীবন তার আত্মজীবনীমূলক রচনা, এর পরতে পরতে রয়েছে তার বাবা-মা থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবনের নানা আখ্যান, বিশেষত কবি-বা লেখক হিসেবে তিনি নিজেকে যেভাবে নির্মাণ করেছেন তার নেপথ্যকাহিনী বর্ণিত হয়েছে এখানে।

অনুবাদক, চিত্রনাট্যকার, শিশুসাহিত্যিক, গীতিকার ইত্যাদি শিল্পশাখায়্ও সৈয়দ হক এক সফল ব্যক্তিত্ব। তার বেলায় যেটা সবচেয়ে সত্য তা হলো তিনি আজো লিখে চলেছেন তরুণের মতো। বয়সের ছাপ তার লেখায় পড়েনি। তার সমসাময়িক অনেক কবি জীবদ্দশায় ফুরিয়ে গিয়েছিলেন, কেউ মৃত্যুর ভয়ে, কবরের আযাবের ভয়ে বিকারগ্রস্থ হয়ে কবিতাও লিখেছিলেন। সৈয়দ হক সেখানে নির্ভিক সৈনিক। তাঁর মানবিক বোধ ও প্রত্যয় এখনো সক্রিয় প্রথম দিনের মতো, এখনো সবগুলো শাখায় তিনি শক্তিমান হিসেবেই লিখে চলেছেন। এই বিস্ময়কর অনুপ্রেরণা তিনি কোথা থেকে পেয়েছেন জানি না তবে শিল্পের কাছে সত্যিকার অর্থে সমর্পিত বলেই তিনি এটা করতে পারেন বলে আমার ধারণা। বাংলা ভাষার এই অসাধারণ লেখকের কলম চলতে থাকুক প্রবহমান নদীর মতো। তাঁর জয় হোক।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর — december ৩০, ২০১৩ @ ৭:৪৭ পূর্বাহ্ন

      ভালো লাগল। সংক্ষেপ, তবে পরিচিতিমূলক লেখা।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com