সৈয়দ হকের ‘বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা’: রক্তচক্ষু কোকিলের গান

মনির ইউসুফ | ২৭ december ২০১৩ ১:৫৮ অপরাহ্ন

বাংলাদেশের হাজার বছরের ঋতুবৈচিত্রকে উপলক্ষ করে, বসন্তের তীব্র সৌন্দর্যকে প্রকাশ করার আকুলতা প্রত্যক্ষ হয়ে উঠেছে বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালায়। পাঠকের মধ্যে এটি বিস্তার ঘটায় এক ধরনের কাব্যিকঘোর। যে ঘোরে পাঠক বিমোহিত হতে বাধ্য। এই বাধ্য করতে পারাটাই শিল্পের শক্তি। বাঙালি সংস্কৃতির সব কল্পনাকে চারিয়ে দিয়ে আধুনিকতার মৌল উপাদান ধরে রেখে, নিরন্তর পরিব্রাজক হয়ে তিনি নির্মাণ করেন নতুন ভাব-ভাষা ও বস্তুর পরিমন্ডল। কবি সৈয়দ হকের বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা পড়লে পাঠকের মনে এই বোধ সঞ্চারিত হয়।

মানুষের মুক্তি থেকে শুরু করে বিপ্লবের বাস্তবতাকে শিল্পীই উসকে দেন, সচেতন করে তোলেন। এটাই শিল্পীর কাজ। কবি বিপ্লবী হতে পারেন আবার নাও হতে পারেন কিন্তু মানুষের মুক্তির প্রশ্নে কবিকে সর্বপ্রথম এগিয়ে আসতে হয়। পৃথিবীর যত শিল্পীর কথা মানুষ জানে প্রায় সবাই পৃথিবীকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এক্ষেত্রে কবি হিসেবে সৈয়দ হকও সেই শিল্পীর ভূমিকাই পালন করেন।
যেমন:
আমারও সংসার হবে–
শিল্পের সংসার। চন্দ্রাবতী হবে বোন,
কালিঘাটে আত্মীয় আমার। আমি জানি
মনসার ক্রোধ মানে মানুষের জয়,

syed-hoque.jpgমানুষের এই জয়গানই যে কোনো শিল্পীকে জগতে মহৎ করে তোলে। কবি লোকমানুষের জয়কে সমগ্র মানবজাতির বিজয় বলে স্বীকার করে নেন। পাঠকের আর বুঝতে বাকি থাকে না কবির অভিষ্ট কী। তিনি কী চান! বাংলার লোকমানুষের দেবী মনসাকে প্রতীক করে মানুষের জয়ের কথা ঘোষণা করে নিজেকে জনমানুষের কাতারে নিয়ে আসেন। লোকসমাজের এই বিশ্বাসকে তিনি চারিয়ে দেন বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালায়।

কবিমাত্রেই দ্রষ্টা, ত্রিকালদর্শী। কবি যে স্রষ্টা, জগতদর্পী। এই গুণ কবিকে সমাজের গভীরের ক্ষত বুঝতে ও উপলব্ধির একটি নির্দিষ্ট সীমানায় পৌঁছাতে সহযোগিতা করে।
যেমন:

রাতের সমস্ত খড়কুটো জড়ো করে আমার দুটি হাত
সমর্পন করে স্বপ্নের আগুনে,
তখন যে নেচে ওঠে আকাশের তারা পর্যন্ত,
তা কিছু নতুন কথা নয়।
আমি যে ক্ষুধার সঙ্গে শুতে যাই,
সেই লেলিহান ক্ষুধাকে আমার রাস্তার পাশে
আলো থেকে অদূরে একটা বারান্দায় নিয়ে শুতে যাই,
তা কিছু নতুন কথা নয়।
… … … … … … … … … … …
আমার স্বপ্ন বা ক্ষুধা বা চৈতন্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া
বুকের মধ্যে বর্শা-বেধা অগণন ধর্ষণের স্মৃতি যে
শস্যকণা ভরে তোলে ফোঁটা ফোঁটা রক্তে,
তা কিছু নতুন কথা নয়।
আমার যে মৃত্যুতেও মৃত্যু নেই-আমাদের —
তাও নতুন কিছু নতুন কথা নয়।

কবি সময়ের অগ্রগন্য মানুষ হিসেবে তা আগে আগে বুঝতে পারেন এবং সেভাবেই সমাজকে আলোর পথ দেখিয়ে দেন। সমাজ সেই পথে চলল কিনা সেটা কবির বিষয় নয়। কবির কাজ হচ্ছে পথের দিশা দেওয়া আর সমাজের দায়িত্ব হচ্ছে সেই পথের দিশা খুঁজে নেওয়া। কবি শুধু আলো জ্বালিয়ে দিতে পারেন।

বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ছয়টি ঋতু এ দেশকে হাজার বছরের পথপরিক্রমায় ঘিরে আছে। এই ঋতুকে নিয়ে বাঙালির সংসার-জীবনযাপন। বাঙালির জীবন যেমন সত্য তেমনিভাবে ঋতুগুলোও সমানসত্য। একেক ঋতু একেক রকমভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে দেয় বাংলার প্রকৃতি মানুষের মন-মেজাজ । বৈশাখ বাঙালিকে উজ্জ্বীবিত করে, মনকে রাঙিয়ে দেয়, সতেজ ও টাটকা করে তোলে। একটি সুখ ও শোকানূভুতি সৃষ্টিশীল মানুষদেরও স্থির থাকতে দেয় না। সেই অনূভূতির চূড়ান্ত প্রকাশই সৈয়দ হকের বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা

বৈশাখ কবিকে চূড়ান্ত ঘোরের মধ্যে নিমজ্জিত করে ফেলে। অক্ষরগুলো বেজে ওঠে চরণে চরণে, কার চরণে, নারী-নদী? মেঘের ফাটল থেকে চাঁদ হয়ে ঝরে টাটকা পূর্ণিমা? সময়কে উপলক্ষ্য করে সৈয়দ হক মানবিক সৌন্দর্যের নতুন দিগন্তের কাছে নিয়ে যান পাঠককে।
যেমন:
বহুদিন থেকে আমি লিখছি কবিতা,
বহুদিন থেকে আমি লিখি না কবিতা;
লিখিনি কবিতা পূর্ব, পরে, বর্তমানে?
তাহলে এক কি বলি? এই যা লিখছি
শোকগ্রস্ত জননীর মতো? বাক্যরোলে
শাসন বারণ নেই, কি তবে এগুলো?
কখনো পয়ার ছন্দে, কখনো ছড়ায়,
উচ্চকিত, দ্রুত, লঘু মন্থর পায়ে, চিত্রল,
কখনো অমর্ত্য গদ্যে, বলব কি তাকে?
সঙ্গীতবাহন চিত্র? প্রলাপ,প্রলাপ?

বুঝি না অক্ষরগুলো বলতে কি চায়?
কেন তারা বেজে ওঠে চরণে চরণে

কবিতা নিয়ে কবির দায় অনেক। কবিকে কেউ সহজভাবে নেয় না। কেন নেয় না তা সমাজও জানে না। কবিতার সরোবরে ফোটে অনেক কষ্ট, দ্বীর্ঘশ্বাস, ঝরে অনেক রক্ত, দহন ও ক্ষরণ। কবিকে কেউ আটকাতেও পারে না। কবি দারুণ স্বেচ্ছাচারী। দরিদ্র জীবনযাপন কবির যেন নিয়তিই। কবির এই কষ্টকেও ধরেছেন সৈয়দ হক। বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা বাংলাদেশের চিরায়ত বাস্তবতা ও ভাষা বোধের এক কাব্যিক দলিল। যে-দলিল তরুণ পাঠক ও কবিতার সঙ্গে যাদের সংসার তাদের পড়া জরুরি। কেন সৈয়দ শামসুল হক ভিন্ন ঘরনার তা আর বুঝতে বাকি থাকবে না পাঠকের।
যেমন:
এমন বিশ্বাস ছিল শুধু কবিতায়
প্রথমে করব জয় সুরূপা, বিরূপা;
তারপর পরিবার, যারা রোজ বলে,
‘কবিতার সরোবরে ফোটে অনাহার,
ছেঁড়া চটি, শস্তা মদ, আসক্তি বেশ্যায়’;
তারপর বাংলাদেশ এশিয়া আফ্রিকা;
ফর্মায় ফর্মায় ক্রমে বেড়ে উঠে হবে
কবিতার সংকলন খদ্দরে বাঁধানো,
যে কোনো ঋতুতে যে কোন উৎসবে
পাটভাঙ্গা পাঞ্জবীতে লম্বমান যুবা
পড়বে সে বই থেকে; বাংলার তারিখে
আমার জন্মের দিন হবে লাল ছুটি।

কবি দ্রষ্টা বলে তার দেখা বিষয়গুলো অনুভূতির গভীর-গভীরতর সৌন্দর্যে কবিতা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, মগজের অনুরণনে ছড়ায় এক ধরনের ভাল লাগার আবেশ। রোদ্দুরও ঝিমোতে পারে পল্টুর দাদার মতো। কী অসাধার বীক্ষণ। সংবেদনশীলতা কত গভীর হলে এই রকম সাধারণ বিষয়কে এমন অসাধারণত্বে ধরা সম্ভব। নিজের জীবনের বেড়ে ওঠার সঙ্গে কালের লাটিমের যে সম্পর্ক তাকেও সনাক্ত করে নেন কবি।
যেমন:
সারাদিন ইস্টিশানে ট্রেন পড়ে পড়ে
পল্টুর দাদার মতো ঝিমোয় রোদ্দুরে।
হলদে দাঁত জাপানিরা এলে এতে করে
পালাবে শহর। তবে যেতাম রংপুর
যেখানে বদলি হয়ে গেছে দেবদাস
ও বছর বাবা মার সাথে, দিয়ে গেছে
কালের লাটিম। সে লাটিম ঘোরে আজো।
ত্রিকালের পথে পথে পাগলা মেহের।

কঠিন ইস্পাতকে নোয়াতে পারে মানুষ। কবিতা কিন্তু অন্য বিষয়, কবিতাকে কোন কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। কেউ কেউ কবিতার সাথে নদীর তুলনা দিয়ে থাকলেও তা নিছকই স্বপ্ন। এই ভাগিরথী জল ধরে না। শস্য মানে সম্ভাবনা, শস্য প্রাণপ্রাচুর্য। একটি বীজ মানে নতুন অঙ্কুর উদগম, কচিপাতা গজানো, বাতাসের দোলায়-দোলায় আন্দোলিত হওয়া। সেই দোলায় শির-শির কাঁপনের সৌন্দর্যই পৃথিবীতে মানুষের ভাল লাগাকে সার্থক করে তোলে। সেটাই আমোদিত করে মানুষকে

যেমন:

সরল রৈখিক নীল কঠিন ইস্পাত
হয়ত নোয়াত পারো। বিন্তু কবিতার
সাথে নদীর তুলনা কেউ কেউ দিয়ে
থাকলেও আসলে সে স্বপ্ন-ভাগিরথী
শরীরে ধরে না জল। তরল হীরক
প্রতিভার সরোবরে থেকে কলকণ্ঠে
নেমে আসে পিঙ্গল জটায়, পৃথিবীকে
শস্যের সংবাদ দিয়ে অর্ন্তগত হয়
লোকে লোকে স্মৃতির সাগরে। একাডেমি,
বিশ্ববিদ্যালয়ে, ত্রৈমাসিক পত্রে, গিল্ডে,
খদ্দের জামার ভেলইকতে কবিতার
তারা কি করবে? বানরের হাড় ওঠে
ইড়ে চড়ে, মাংস লাগে, প্রাণ ফিরে পায়।
যে পারে সে পারে। উজ্জ্বল অক্ষর ফোটে
নক্ষত্রের মতো দুঃখের অমাবস্যায়।
অন্ধকার বড় ভয় করত আমার।
পিতা বলতেন,‘যা কিছু প্রোজ্জ্বল সব
আসে অন্ধকার থেকে।’ আরো বলতেন,
‘আলোর অভাব মানে অন্ধকার নয়,
অন্ধকার তার সুনিশ্চিত সম্ভাবনা।’

অনেকদিন ধরে কবিতায় পৃথিবীকে দেখছেন তিনি। নানান ভঙ্গিতে, নানান আঙ্গিকে। পৃথিবীর অঙ্গে অঙ্গে কাটছেন বিলি। কালবৈশাখীর ঝড়ঝাপটায় লণ্ডভণ্ড হতে দেখেছেন গ্রাম-জনপদ-শহর-নগর। ঝড়ের পরে সাদা কাফনের মতো শুয়ে থাকতে দেখেন তিনি এই দেশকে। এই দেখার বিষয়টিকে কাব্য করে তোলেন কবি সৈয়দ শামসুল হক। বহুদিন পর তিনি ওহি পাওয়ার মতো কবিতার সত্যকে যখন আবারও নতুন করে বীক্ষণ করেন তখন এইদেশে বিভিন্ন দিক দিয়ে বিপদের ঘনঘটা। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতি, সামাজিকভাবে ব্যাপক বদল ও অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। দেশীয় ক্ষমতাবান দেবপুত্রদের দখলে চলে যায় দেশ। এই নিয়ে গভীর কবির উৎকণ্ঠা।
যেমন:
বহুদিন থেকে আমি লিখছি কবিতা;
হঠাৎ দেখতে পাই কালবৈশাখের
ঝড় ফেটে পড়ে তীব্র আর্তনাদে,
বাতাসের হাহাকারে, নৌকোয় নৌকোয়
দোলে, ডেমরায় শন্শন্ ঘোরে, ওঠে
সাঁকো শূন্যমার্গে, বিহ্বল ছাগল গাধা
উড়ে যায় গ্রামের মাথায়। গর্ভে গর্ভে
অজাত শিশুর রোল শুনে পিতামহ
দ্রুত চড়ে মিনারে, মিনার ঈশ্বরের
পদাঘাতে পড়ে। যেন তীব্র বি¯েফারণে
তৈলচিত্র ছিন্নভিন্ন হয়। শূন্য ফ্রেম
দোলে।শব্দের বিকৃত শব শুয়ে থাকে
সাদা কাফনের মতো পাতায় পাতায়।

কবি ধ্যানী, ত্রিকালদর্শী । মানুষের এসব উল্লম্ফন কিংবা পতন নিয়ে ভাবেন গভীরভাবে। মুখে বলেন বহুদিন আমি কবিতা লিখি না, ভাবি না কিন্তু ভেতরে ভেতরে মনোজগতে আঁকা হয়ে যায় অবিছিন্ন এই সৃষ্টিসুন্দর। ক্ষয় হয়, লয় হয়, শীতল হয়, নক্ষত্রের পঙ্গপাল নষ্ট করে চোখ তবু কবিতা তার কাছে আরাধ্য। যদি সময়কে কিছু দিতে হয় তাহলে তিনি সাধবেন কবিতা এবং সত্যি সত্যি তিনি সময়ের হাতে তুলে দেন প্রকৃত কিছু কবিতা। সৈয়দ শামসুল হক বাংলাদেশের কবিতার এক অনন্য অধ্যায়। তাঁর এই বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা বাঙালি জনজীবনের সঙ্গে মিশে আছে নানান বাঁকে, নানান ভঙ্গিমায়। ভাব ও বস্তু বিশ্বে যা কোকিলের গান হয়ে বাজে।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Manik Mohammad Razzak — december ৩০, ২০১৩ @ ১০:৪৯ পূর্বাহ্ন

      চমৎকার লিখেছ মনির, তোমাকে অনেক ধন্যবাদ।

      মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আসাদ আল ইমরান — এপ্রিল ১৭, ২০১৭ @ ১০:১৩ পূর্বাহ্ন

      বেশ ভাল লাগল।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com