পশ্চিমে ঝড় তোলা ‘দেশ’ আর আকরাম খানের কথা

সেরীন ফেরদৌস | ২৩ december ২০১৩ ৭:৩২ অপরাহ্ন

জ্বলন্ত হ্যারিকেন নিয়ে রাতের অন্ধকার মঞ্চে কিছু একটা খুঁজতে খুঁজতে প্রবেশ করেন আকরাম খান, নাচ আর কোরিওগ্রাফিকে যিনি বিশ্বের দরবারে হাজির করেছেন অপার বিস্ময়ে! কি খুঁজছেন তিনি‍! কাকে খুঁজছেন! একটি ছোট্ট জায়গায় আলো স্থির হয়ে আছে, কবরের মতো একটি স্থাপনা, মাঝখানের গোল অংশে একটি ছোট্ট গাছ, দু’একটি পাতামাত্র সেখানে। পাশে রাখা বড় হাতুড়িটি নিয়ে ঢং ঢং ঢং করে বাড়ি দিয়ে চলেন আকরাম। মাথা ঝালাপালা করা শব্দে দশদিক হলঘর থরথর কেঁপে ওঠে! কি খুঁড়ছেন! স্মৃতি, অতীত, সংস্কৃতি অথবা শেকড়! না-কি ফেলে আসা পূর্বপুরুষের ‘দেশ’কেই জাগাতে চাচ্ছেন তিনি! মাথা-কান ঝিমঝিম করতে থাকে দর্শক-শ্রোতার। আহ, থামে না কেন!

পরক্ষণেই মঞ্চে একটি ব্যস্ত চলমান শহরের মিউজিক (মানুষের কথা, রিকশার টুংটাং, গাড়ির ভেঁপু, ধোঁয়া, ধুলা, চানাচুরওয়ালার কণ্ঠ…ইত্যাদি) আর দৃশ্যকল্প ভেসে ওঠে। আকরাম খান কানাডার রাজধানী অটোয়ার হল ভর্তি দর্শকদের ধপ করে ফেলে দেন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। তারপর নৃত্যের মুদ্রায় আর অঙ্গভঙ্গীতে জাগিয়ে তোলেন পুরো দেশকে। সুন্দরবন, বনবিবি, মাছ-কুমির, আর দক্ষিণরায়ের গল্পের ভেতর দিয়ে হেঁটে যান তিনি। বারবার একটি ছোট বালকের শরীর ঘুরে ফিরে আসে, বালকের স্বপ্ন আর আকাংঙ্ক্ষার টুকরো গল্প উঠে আসে। বালকটি ডাক শুনতে পায় দেশের নানা কোণ থেকে। আকরাম সেই বালক হয়ে বৃষ্টিতে আমূল ভিজে যান, ভিজে ভিজে শিশু হয়ে যেন আবার জন্মান বাংলার জলে-মাটিতে! অত্যাধুনিক কম্পিউটার আর আলোকরশ্মির প্রক্ষেপনের সাথে গান ভেসে আসে নেপথ্য থেকে, ‘জলে ভাসা পদ্ম আমি…।‘

“আকরাম, আকরাম!” মঞ্চে অদৃশ্য পিতার বজ্রকণ্ঠের বিপরীতে দাঁড়ানো সদ্যতরুণ আকরামের গোঁয়ার্তুমি উত্তর শোনা যায় পিনপতন নিস্তব্ধ হলঘরে! দু’প্রজন্মের ভেতরের দ্বন্দ্বের লড়াই আর পরভূমে শেকড় গাড়ার তুমুল অন্তর্দ্বন্দ্ব মনে-শরীরে নিয়ে দুই পুরুষ মুখোমুখি! একই আকরাম পিতা ও পুত্রের ভূমিকায় নৃত্যাভিনয়ে মত্ত। পাশাপাশি শোনা যায় তাঁর ভাগ্নী ছোট্ট ঈশিতার কচি কণ্ঠে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রশ্ন। আকরাম চিৎকার করে জানতে চায় “আম্মা, তুমি কি ঈশিতারে আবারো হিস্টিরি শুনাইছো!”

গত ১৬ নভেম্বর কানাডার রাজধানী অটোয়ার ন্যাশনাল আর্ট সেন্টারে বাঙালি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক আকরাম খান তাঁর একক পরিবেশনা ‘দেশ’ উপস্থাপন করেন। এ পরিবেশনায় তিনি শেকড়ের সন্ধান করেছেন, দেশের সঙ্গে অভিবাসী মানুষের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন। চলতি সময়ে তিনি দেশ থেকে দেশে ছুটে বেড়াচ্ছেন তাঁর এই একক পরিবেশনা নিয়ে।

আকরাম খানের সঙ্গে আলাপচারিতা হয় লেখক ও গণিতজ্ঞ ড: মীজান রহমানের অটোয়ার বাড়িতে। অটোয়ার তিনদিনের পরিবেশনার শেষদিন শো-শেষে তিনি এই আতিথ্য গ্রহণ করেন। ঘরের ভেতর সাদামাটা চেহারায় তাঁকে দেখে ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না একটু আগের দেখা তুখোড় শিল্পীটি ইনিই ছিলেন কি না! কবি ফেরদৌস নাহার প্রশ্ন করেন, দেশকে আমরা মায়ের মতো দেখতেই অভ্যস্ত, কিন্তু আপনার ‘দেশ’-এ ‘দেশ-মা’কে খুঁজে পেলাম না কেন? আকরাম যেন প্রস্তুতই ছিলেন প্রশ্নটার জন্য। “দেশ-এর পুরো আয়োজনটা প্রথমে সাজানো হয়েছিলো মা’কে ঘিরেই। চারমাস সে অনুযায়ী রিহার্সাল করার পর কেন জানি মনে হতে থাকে, নাতো, দেশ আমার কাছে পিতার মতো, ঠিক মাতা নয়। ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর তড়িঘড়ি করে পুরো স্ক্রীপ্ট থেকে মায়ের অংশ বাদ দিয়ে পিতার অংশ জুড়ে দেয়। মঞ্চে আনুষ্ঠানিক উপস্থাপনের মাত্র তিন সপ্তাহ আগে তা করা হয়। ফলে মঞ্চের বাইরেও খুব টেনশন আর নাটকীয় ছিলো ব্যাপারটা।”
akram-2.gif
ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে আমাদের কথপোকথন শুরু হয় কোনোরকম বাধা, দ্বিধা আর জড়তা ছাড়াই। আকরাম বলে যায়, “দেশ নিয়ে আমাদের পুরো টিম প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করেছি। প্রথম বছর কেটেছে কনসেপচুয়ালাইজ করতে। এসময়টায় আমরা বাংলাদেশের যেকোনো কিছু বা বলা চলে প্রায় সবকিছু নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করেছি। টিমসহ দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে গিয়েছি, হৃদয় আর মন দিয়ে দেশকে বুঝতে আর ধরতে চেষ্টা করেছি। দ্বিতীয় বছরের প্রথম দুই মাস স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্টুডিওতে কাজ শুরু করি। তার আগে দীর্ঘদিন ধরে আমি পর্যবেক্ষণ করেছি ছোট শিশুর শরীর, অঙ্গভঙ্গী আর মন নিয়ে। মাঝেমাঝে শিশুদেরকে স্টুডিওতে আনিয়েছি তাদের মতামত, কল্পনা ইত্যাদি জানতে। তাদের সঙ্গে খেলাধুলা করেছি, খেলতে খেলতে কাজ করেছি। মাথার টাকে বাবার চেহারা আঁকার আইডিয়াটা ওদের কাছেই পেয়েছি। পরের চারমাস টিমের স্প্যানিশ ডান্সারের নিবিড় তত্ত্বাবধানে “দেশ” নৃত্যনাট্যের অবয়ব গড়ে ওঠে। “মঞ্চে যে শিশুটির অবয়ব এনেছেন বারবার তার ধারণা কোত্থেকে পেলেন?”- প্রশ্ন ছুড়েঁ দেন মনিরুল ইসলাম। “এই শিশুটি আমার মনে দাগ কেটেছে শিল্পী রশীদ তালুকদারের একটি আলোকচিত্র দেখে যেখানে একটি মিছিলের পুরোভাগে একটি কংকালসার ছোট্ট ছেলে খালি গায়ে হাত উঁচিয়ে শ্লোগান দিচ্ছিল।”

মঞ্চের দৃশ্য মনে পড়ে, শুনতে পাই মিছিলের বজ্রধ্বনি, “রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়”। যেনবা আকরামের প্রতিটি মাংশপেশী ভেদ করে শব্দগুচ্ছ উচ্চারিত হচ্ছে আর অন্যদিকে চিকন ধারালো প্রতিরোধে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যাচ্ছে তাঁর স্নায়ুতন্ত্র!‍ দেখা যাচ্ছে আকীর্ণ জঙ্গলে উল্টো হয়ে ঝুলছেন আকরাম, ঝুলন্ত মাথা মাটি ছুঁই ছুঁই, নাচের মুদ্রায় মাটি হাড়তে চলেছেন, সামনে-পেছনে-চতুর্দিকে দমকে দমকে উঠছে শতকণ্ঠের সোচ্চার শ্লোগান, “গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরতন্ত্র নিপাত যাক”। স্পিনের মতো বোঁ বোঁ করে ঘুরছেন তিনি… “তোমাকে পাবার জন্য হে স্বাধীনতা, আর কতকাল ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়,”। পাকিস্তানি সৈন্য গাঁয়ের নিরীহ বাঙালির দু’পায়ের তলা বেয়নেট দিয়ে চিরে দিয়েছে; আকরাম যখন মঞ্চে মোচড়াতে থাকেন দরদরে রক্তাক্ত পায়ের যন্ত্রণায়, দর্শকসারিতে বসে থাকা আমাদের শরীরও তিরতির কাঁপতে থকে তখন! কিন্তু সেই আকরাম আবার, ফের, বারবার, উঠে দাঁড়াবার শক্তি সঞ্চয় করেন এবং প্রবল বিক্রমে উঠে দাঁড়ান। পতন থেকে প্রতিবার উঠে দাঁড়াবার এই দৃশ্য তখন আর শুধু বাঙালিরই থাকে না, সমস্ত পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষের প্রতীক হয়ে যায়!

আকরাম জানান, তাঁর এ গল্পটাতে ‘মাল্টিপল বটম লাইন” রয়েছে, মানে বিষয়বস্তুর মাল্টিলেয়ার আছে। অস্তিত্বানুসন্ধান, পরিচয়সংকট, আধ্যাত্মিকতা, রাজনীতি, একাকীত্ব, আনন্দ…সবকিছু আছে ‘দেশ’-এ। কেউ কেউ হয়তো ভিন্নতর কিছুও খুঁজে পাবেন। তিনি বলেন, “পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে কোনো একটা ঘটনা ঘটা মানে কমবেশি সেটা সবাইকেই স্পর্শ করবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘটনাও ব্যতিক্রম কিছু নয়। তবে নূর হোসেনের স্পিরিটটা সত্যি সত্যি আমায় ভাবিয়েছে, বাংলাদেশ গোয়িং থ্রু হিউজ ট্রান্সফরমেশন!” তাঁর মতে, “আমি সবসময়ই বাংলাদেশের এমন একট গল্প ধরতে চেয়েছি যেখানে ট্রাজেডি আর কমেডি পাশাপাশি রয়েছে। বাংলাদেশের মানুষতো নিরন্তর তাঁদের জীবন গড়ছেন আর ভাঙছেন।”

দুটো বড় চেয়ারকে আনা হয়েছিলো মঞ্চে। বড় চেয়ারটি নিয়ে যাদু-বাস্তবতার জগত তৈরি করছে শিশু আকরাম আর ছোট চেয়ারটি নিয়ে অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বাস্তব আর পরিণত আকরাম। দুটি চেয়ারকে ব্যবহার করে বোধের দুই জগতে মসৃণ আসা-যাওয়া করেছেন তিনি। একটি থেকে অন্যটিকে খুজেঁ বেরিয়েছেন বাস্তব পিতাকে, যাদু-বাস্তবতার পিতাকে। “স্পিরিচুয়ালিটি আমার প্রিয় বিষয়। ব্যাখার অতীত কিছু সবসময়ই আমাকে টানে। এ কারণে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মবোধ আমায় আক্রান্ত করে না, কিন্তু আমি তাকে এড়াতেও পারি না। কত্থক নাচের মাধ্যমে নাচের জগতে আমার হাতেখড়ি হয়। কত্থক নাচের ভেতরে হিন্দু ধর্মের প্রবল সমীকরণ থাকলেও তাই মুসলমান হিসেবে তা আমার জন্য কোনো প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায় নি।”

আমরা শুনতে চাই তাঁর মায়ের গল্প, শৈশবের গল্প আর একজন শিল্পী আকরামের তৈরি হবার গল্প! মায়ের প্রসঙ্গ তুলতেই চোখজোড়া বার বার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তাঁর। জানান, মায়ের কারণেই এতদূর পথ পাড়ি দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি। এসময় পরিষ্কার বাংলায় কথা বলছিলেন তিনি। বাংলা বলা, পড়তে পারা, লিখতে পারা পুরোটাই হয়েছে মায়ের কল্যাণে। তাঁর মা কখনো তাঁর সঙ্গে ইংরেজিতে কথা বলেন নি। যদিও তিনি নিজে একজন স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন ইংল্যান্ডে। আকরাম বলেন, “আমার দশবছর বয়স পর্যন্ত মা কোনোদিন ইংরেজিতে কথা বলেনি। দশতম জন্মদিনে তিনি ইংরেজিতে বললেন, হ্যাপি বার্থ ডে!” তখন চমকিত-আনন্দিত ছোট্ট আকরাম স্কুল শিক্ষিকা মাকে প্রশংসা করে বলেছিলেন, “ও, তুমি তাহলে ইংরেজি জানো!”
akram-3.gif
নাচের জগতে আসার ইতিহাসটিই তো মজার। ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন বলে বাবা-মায়ের উদ্বেগের অন্ত ছিলো না। তাই এমন এক সময়ে মা তাঁর উপচে-পড়া চঞ্চলতাকে অন্যখাতে প্রবাহের পরিকল্পনা করেন। হাত ধরে দিয়ে আসেন কত্থক নাচের শিক্ষক শ্রী প্রতাপ পাওয়ারের এর কাছে। নাচ নিয়ে মায়ের সঙ্গে টানাপোড়েনও কম হয়নি তাঁর। ‘এ’- লেভেলে থাকাকালীন তিনি নাচের প্রতি প্যাশনেট থাকার কারণে পুরো একবছর স্কুলে যাননি। তার বাবা বাড়ির পেছনে গ্যারাজের ভিতরে নাচ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। প্রতিদিন স্কুল ড্রেস পরে বাড়ির সামনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে পেছনের বেড়া টপকে গ্যারেজে গিয়ে ঢুকতেন তিনি। একটানা ঘন্টাদশেক নাচ প্র্যাকটিস করে স্কুল ড্রেস পরে বাড়ি ফিরতেন। এভাবে প্রায় বছরখানেক পরে পুরো জানাজানি হয়ে যায়। ব্যাস, প্রথাগত স্কুলের পড়াশোনা সেখানেই খতম! তাঁর মা প্রথমদিকে খুব বিমর্ষ হয়ে পড়লেও খুব দ্রুতই বুঝে নেন যে, নাচের প্রতি গভীর কমিটমেন্ট না থাকলে এমন হয় না। পরবর্তীতে আকরাম মন্টফোর্ড কনটেম্পোরারি আর্ট স্কুল থেকে নাচের ডিগ্রি লাভ করেন। পরে লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত নর্দার্ণ স্কুল অফ কন্টেম্পরারি ডান্স থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ডিগ্রি পান তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সেটাই ছিলো সর্বোচ্চ নম্বর। ২০০৪ সালে তাঁকে “অনারারি ডক্টর অফ আর্টস” উপাধিতে সম্মানিত করা হয় মন্টফোর্ট স্কুল অফ কটেম্পরারি আর্টস থেকে।
২০১২ সালে লণ্ডনে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক খেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর নৃত্য প্রদর্শিত হয়। “সারাবিশ্ব যে ক্রিয়েটিভিটি দেখে মুগ্ধ তা কেন বাংলাদেশে দেখানো হচ্ছেনা” জানতে চান মীজান রহমান। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আকরাম বলেন, আমি এটা বাংলাদেশে নিতে চাই। কিন্তু স্টেজ ইনস্ট্রুমেন্ট, আলো, কম্পিউটার-মেশিনারি, এগুলো বর্তমানে যা আছে, তা বাংলাদেশে বয়ে নিতে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার খরচ হবে। সেগুলোর স্পন্সর পাওয়া খুব কঠিন। তার চাইতে বাংলাদেশে নতুন করে বানিয়ে নিলে খরচ অনেক কম পড়বে। ভবিষ্যতে সেটা করার পরিকল্পনা আছে। তাঁর বাবা-মাও বেজায় খুশি হবেন ‘দেশ’ বাংলাদেশে প্রদর্শিত হলে।

বিদায় নেবার সময় দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একটি গল্প শুনিয়ে যান তিনি। অস্ট্রেলিয়ায় সিডনি অপেরা হাউসে শো শেষে আকরাম ট্যাক্সি ধরতে রাস্তায় দাঁড়িয়েছেন আকরাম। ট্যাক্সির দরজা খুলতেই তাঁকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে এক শ্বেতাঙ্গ দম্পতি ভেতরে ঢুকে ট্যাক্সি নিয়ে কেটে পড়েন। অস্ট্রেলিয়ার মতো সভ্য সমাজে এমনটি হওয়ার কথা নয়! বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতে দ্বিতীয় ট্যাক্সিটি আকরামের সামনে দাঁড়ায়। ট্যাক্সিতে উঠে বসে আকরাম লন্ডনে তাঁর বাবাকে ফোন করে। কথা চলাকালে ট্যাক্সিড্রাইভার হঠাৎ প্রশ্ন করে, আকরামের বাবার নাম মোশাররফ হুসেন আর তাঁর গ্রামের নাম আলগীর চর কি না! এবার হোঁচট খান আকরাম, ভয় পেয়ে যান, কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের হাতে পড়েছেন কিনা ভাবতে ভাবতে পুলিশ ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। পকেট থেকে মোবাইল বের করতেই ড্রাইভার তাঁকে মিনতি করে বলেন, প্লীজ পুলিশে ফোন করার আগে আপনার বাবাকে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলবেন? তিনি আমার বাল্যবন্ধু!

কিছুক্ষণ পর দেখতে পান কানের কাছে ফোন ধরে রেখে ভদ্রলোক অঝোরে কাঁদছেন। আকরাম ফোনটা হাতে নিতেই বাবা কাঁদতে কাঁদতে জানায়, দেশ ছেড়ে প্রবাসে পাড়ি জমানোর সময় এই বন্ধুই নিজের কিছু সম্পদ বিক্রি করে আকরামের বাবাকে টাকা দিয়েছিলেন। ধার নয়, তিনি বন্ধুকে দানই করেছিলেন টাকাগুলো। তারপর থেকে দুই বন্ধুর ভেতরে বহু বছর কোনো যোগাযোগ হয়নি। ভাগ্যান্বেষণে আকরামের বাবাকে লন্ডনে পাঠিয়ে দিয়ে বন্ধুটিও এক সময় পাড়ি জমান সিডনি।
সিডনি অপেরা হাউসের মঞ্চে পরের দিন আকরাম আমন্ত্রণ জানান সেই পিতৃবন্ধুকে। মঞ্চে, শো শুরু করার আগে দর্শকের উদ্দেশ্যে গত রাতের গল্পটি বলেন তিনি। মঞ্চে নিয়ে আসেন পিতার বন্ধুকেও। দর্শকরা আবেগে আপ্লুত হয়ে পরে। দর্শকদের একজন দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে আকরামকে, “আকরাম, তুমি কি তোমার প্রথম ট্যাক্সির আরোহীদেরকে চিনতে পেরেছিলে, যারা তোমাকে ধাক্কা দিয়ে ট্যাক্সিটি নিয়ে সরে পড়েছিলো?” আমরাম উত্তর দেয়, “না।“ এবার সমস্বরে দর্শকসারি থেকে উত্তর আসে, “ আমরা তাঁদের চিনতে পেরেছি, তাঁরা দু’জন ছিলেন এ্যাঞ্জেল! তোমাদের দেখা করিয়ে দেয়াই ছিলো তাঁদের উদ্দেশ্য।“

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md. Mahmudun Nabi Raja — december ২৩, ২০১৩ @ ১১:৩৮ অপরাহ্ন

      একটি চমৎকার লেখা পড়ে আমিও নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mohammad Rukunuzzaman — december ২৪, ২০১৩ @ ২:১৬ অপরাহ্ন

      Life is like that. It is more than the drama Mr. Akram play! Its so touchy!

      And, Mr. Akram, a person with vision, exceptionally motivated and dedicated by heart!

      Well portrayed by the reporter.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুমু — december ২৪, ২০১৩ @ ৩:০৪ অপরাহ্ন

      আকরাম খান বাংলাদেশের অহংকার। তাকেঁ নিয়ে পশ্চিমাদেশগুলোতে মাতামাতি হচ্ছে,অথচ আমাদের দেশের মিডিয়া এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিরব। সেরীন ফেরদৌসকে ধন্যবাদ তার প্রাঞ্জল রচনাশৈলীতে আকরাম খানকে আমাদের সামনে তুলে ধরার জন্য।
      আকরাম খান প্রবাসে বেড়ে উঠলেও বাংলাদেশেই তার শেকড়ের সন্ধান করছেন এবং বিশ্বদরবারে বাংলাদেশকে নিয়ে হাজির হয়েছেন। তাকেও জানাই ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দেওয়ান আব্দুল মান্নান — december ২৪, ২০১৩ @ ৩:৩২ অপরাহ্ন

      হৃদয় ছুয়ে যাওয়া গল্প। আসলে আমরা সাধারণ মানুষ দেশটাকে যে ভাবে ভাবি এটা কি সেই দেশ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তাপস গায়েন — december ২৫, ২০১৩ @ ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

      দারুণ এক লেখা । মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়েছি । YOUTUBE-এ শিল্পী আকরাম খানের পারফরমেন্স দেখেছি বিস্ময় নিয়ে । সেরীন ফেরদৌসকে অনেক ধন্যবাদ ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com