পুনর্মুদ্রণ

আহমদ ছফা: সুবিধাবাদ ও হীনমন্যতার রাজনীতির বিরুদ্ধে ‘জনসমাজ’ গড়ার আহবান

salimullah_khan | 2 Dec , 2013  

মহাত্মা আহমদ ছফা ১৯৯০ সালের দশকে দৈনিক ‘আজকের কাগজ’ পত্রিকায় কিছুদিন নিয়মিত নিবন্ধ লিখিতেন। তাহার কিছু কিছু এখনও পুস্তকাকারে প্রকাশ পায় নাই। নিচের নিবন্ধটি এই দলে পড়িবে।

আমাদের হাতেধরা এই নিবন্ধটির প্রথম প্রকাশ বাংলা ১৪০৩ সালের ৭ জ্যৈষ্ঠ অর্থাৎ ইংরেজি ১৯৯৬ সালের ২১ মে তারিখে। তখন দেশের শাসনভার ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নামে অভিহিত একটি অন্তবর্তীকালীন সরকারের হাতে ন্যস্ত। ১৯৯৪ সালের পর হইতে দেশে বিরাজমান এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের পটভূমিতে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হইয়াছিল।

সেই সংকটের দিনে মহাত্মা আহমদ ছফা যাহা লিখিয়াছিলেন তাহার খুঁটিনাটি আলাদা হইলেও মর্মকথা এখনও প্রাসঙ্গিক রহিয়া গেল। দুঃখের মধ্যে, আজ আহমদ ছফা বিগত। পরলোক গমনের পাঁচ বৎসর আগে লেখা এই সত্য কাহিনী তাঁহার জীবনাবসানের বারো বছর পরও সমান আকর্ষণীয় আছে।

আজ–২০১৩ সালের উপান্তে–আহমদ ছফা বাঁচিয়া থাকিলে কি বলিতেন জানিতে যাঁহারা আগ্রহী তাঁহাদের আগ্রহের আগুনে এই লেখাটি কিছু আহুতি দিতে পারে। সাক্ষাত সংকটের গোড়ায় যে গলদ লুকাইয়া ছিল আহমদ ছফা তাহার উল্লেখও এখানে করিয়াছিলেন। আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় গণতন্ত্রের গোড়ায় জলসেচনের মতন কোন সামাজিক গণতন্ত্র কদাচ প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। সুতরাং সংকট হইবে না কেন?

তিনি লিখিয়াছেন: ‘সেই সামরিক জবরদস্তির ভূমিকা এখন বেসামরিক আমলারা আয়ত্ত করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। সরকার বদল হয় কিন্তু আমলাতন্ত্রের নেপথ্য ক্ষমতার হেরফের হয় না। এদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এতই বিকল যে আমলারা এখন প্রকাশ্যে তাদের কায়েমী স্বার্থ বহাল ও বিধিসম্মত করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনে আমলাতন্ত্রের প্রভুত্ব গণতন্ত্রের বিকাশের পথে বিরাট এক অন্তরায়। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিসরে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াও নিদারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’

আহমদ ছফার বক্তব্য ছিল এই রকম। দেশে গণতন্ত্রের একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ কায়েম করিতে হইলে সর্বাগ্রে জাতীয় জীবনের একেবারে গোড়ায় জনসাধারণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে। শুদ্ধ সামরিক নহে, বেসামরিক আমলাদের কর্তৃত্ব হইতেও জাতিকে মুক্ত করিতে হইবে। কাজটি এখনও শুরুই করা হয় নাই। আমরা যে ২০১৩ সালে ১৯৯৫ সালের একপ্রকার পুনরাবৃত্তি দেখিতেছি তাহার কারণও কি এইখানে? কে জানে ইহার শেষ কোথায়? কোন প্রহসনে?
সলিমুল্লাহ খান
২ ডিসেম্বর ২০১৩

বাংলাদেশের বড় দলসমূহের রাজনৈতিক কর্মকা- গণতন্ত্রের নামে চালানো হলেও সেগুলো আসলে গণতন্ত্রের ধার ধারে না। বর্তমানে বাংলাদেশের ক্ষমতায় একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার অধিষ্ঠিত আছে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে নির্বাচনের আগে ক্ষমতা তুলে দেয়ার বিষয়কে কেন্দ্র করে বিগত দুইটি বছরে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং তিনটি বিরোধী দল জামাত, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ মিলে গোটা দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে যেভাবে অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিয়ে গিয়েছিল, বোধ করি পৃথিবীর কোন দেশে তার নজির নেই।

বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় শুধু যে অন্যদলগুলোর ন্যূনতম সহযোগিতা লাভের তোয়াক্কা রাখেনি তাই নয়, নিজ দলীয় তৃণমূল নেতৃত্ব ও কর্মীসমাজকে দূরে সরিয়ে রেখে এক সচিবালয়কেন্দ্রিক স্বেচ্ছাচারী মন্ত্রী ও পারিষদবর্গের ক্ষুদ্র গোষ্ঠিতন্ত্রকে প্রশ্রয় দিয়েছে। ফলে সার কেলেংকারী, ইয়াসমিন হত্যা ইত্যাদির দায় মাথায় নিয়ে বিএনপি সরকার আত্মরক্ষার্থে নিজেরাই সংবিধানের ছিদ্রান্বেষণ করে বিরোধী সাংসদদের পদত্যাগের সংকট এড়াবার চেষ্টা করেছে। শেষে সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার কথা তুলেই কোনমতে নিজ সম্মান রক্ষা করে ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানে যুক্ত করে পশ্চাদপসরণের সুযোগ পেয়েছে।

আর বিরোধী দলসমূহ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়ে সারা দেশের অর্থনীতির যে ক্ষতিসাধন করল, জানমালের নিরাপত্তার ওপর যেভাবে হামলা করল, এবং সারা দেশের জীবন প্রবাহ যেভাবে অচল করে দিল তার চূড়ান্ত পরিণতি হল এই। এখন এই দরিদ্র দেশটিকে ৮০ হাজার কোটি টাকার নগদ ক্ষতির বোঝা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। যে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে সে ক্ষতি কোনদিন পূরণ হবে না এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেভাবে মার খেয়েছে তার পুনরুদ্ধার করতে অনেক অনেক দিন লেগে যাবে।

আসলে আমাদের দেশের প্রকৃত যে সংকট তা মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার সংকট ছিল না। অন্যদিকে তৎকালীন সরকার চালাকি না করে সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষার সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিলে দেশের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দৃঢ়তর হতে পারত। সদিচ্ছা দিয়ে রাজনৈতিক মতভেদের শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হতে পারত। ক্ষমতামনস্ক মধ্যশ্রেণীভুক্ত গণবিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহ তাদের রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তার দেউলেপনা এবং কল্পনাশক্তির খর্বতার কারণে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিতে অক্ষম হওয়ায় তারা নিজেরাই এই ভয়ংকর সংকটটি সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে–এই রকম একটি সম্ভাবনা মূর্তিমান হয়ে উঠেছে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন যে অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে সেই বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট আশংকা রয়েছে। এবং আরো আশংকা আছে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও গণতন্ত্র সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারবে কি না। নানা লক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে গণবিচ্ছিন্ন মধ্যশ্রেণীভুক্ত যেসব দলের ক্ষমতায় যাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য তারা যদি মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না, তবে তারা মরিয়া হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঠেলে ফেলে দিয়ে জাতীয় জীবনে অধিকতর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে।

sofa-nasir11.gifএকটি নির্বাচন যদি অনুষ্ঠিত হয়ও, এই মধ্যশ্রেণীভুক্ত দলসমূহের মধ্যে একটি বা একাধিক দল ক্ষমতার মসনদে বসবে। এই শ্রেণীটির কাছে ক্ষমতা হচ্ছে একটি বড় বিনিয়োগ। এই রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে তারা সমাজ জীবনের সর্বস্তরে প্রতিপত্তির ক্ষেত্র বিস্তার করে। নির্বাচনে জেতার জন্য তারা পেশিশক্তি প্রয়োগ করবে, কালো টাকা ব্যবহার করবে এবং যত রকম দূর্নীতি ও জবরদস্তি আছে সব রকমের অপকৌশল প্রয়োগ করতে কুণ্ঠিত হবে না। এই ধরনের একটি নির্বাচনে যে দলই জয়লাভ করুক না কেন, তারা জনগণের তোয়াক্কা করবে না। যে একটি বা একাধিক দল বিজয়ী হবে সে বিজয়ে আমাদের জনগণের গণতান্ত্রিক মতামতের প্রতিফলন ঘটবে না এবং এই নির্বাচনও পারতপক্ষে জনমতের ওপর জবরদস্তি ছাড়া আর কিছু নয়। তার সবচাইতে বড় লক্ষণ, সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রামের জরুরি সমস্যাগুলো এদের কারও বক্তব্যেই প্রাধান্য পাচ্ছে না। কিছু ভাসাভাসা আশ্বাস আর বড় বড় বুলি কপচানো হচ্ছে মাত্র।

যে সমস্ত সংকট এই জাতির উত্থানশক্তিকে চেপে রেখেছে আসন্ন নির্বাচনে বড় বড় দলসমূহের নির্বাচনী অঙ্গীকারের মধ্যে তার কোন ছায়াপাত নেই। দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ কৃষক। প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কৃষকদেরই এই রাষ্ট্রশক্তির অন্যতম নিয়ন্তা হওয়া উচিত। কিন্তু মধ্যশ্রেণীভুক্ত দলসমূহে কৃষকদের স্থান নেই। শ্রমিকরা রাষ্ট্রের অন্যতম ভরকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হবে না। কিন্তু বড় বড় দলসমূহের রাজনৈতিক অঙ্গীকারপত্রে শ্রমিকরাও দাবার গুটি মাত্র। সারাদেশ সন্ত্রাসে ছেয়ে গেছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলসমূহের কর্তৃত্বপরায়ণ অবস্থান থেকেই এই সন্ত্রাস জন্ম নিচ্ছে। এককথায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য এই উভয় ধরনের সন্ত্রাসই বাংলাদেশের সমাজ নিয়ন্ত্রণ করছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কলকারখানা স্থাপন করে দেশকে স্বনির্ভর করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর কোন উন্নয়ন কৌশল কোন দল ঘোষণা করেনি।

ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে একটা অরাজকতা ও মাৎস্যন্যায় বিরাজ করছে। যারা ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা ঋণ পরিশোধ না করে কালো টাকা জমিয়েছে আর যারা কালোবাজারী আর একচেটিয়াপনার মাধ্যমে মুনাফার পাহাড় গড়েছে, জনগণের রাষ্ট্রীয় তহবিলকে ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে এবং নির্লজ্জভাবে শ্রমিকদের শোষণ করছে আজ দেশের রাজনীতি তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই নতুন জগৎশেঠদের প্রতাপ এত অধিক হয়ে পড়েছে যে প্রকারান্তরে তারাই দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সৎ এবং দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী, যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশের সমৃদ্ধি বাড়াতে চায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে বেকারত্বের অবসান ঘটাতে চায় তাদের অবস্থান অনিশ্চিত।

গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে পড়াশুনার নাম নেই, প্রাইভেট টিউশনি কিংবা নকলের ব্যবসা পসার জমিয়ে বসেছে। বড় বড় দলসমূহ ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহার করছে রাজনীতির শিশুশ্রমিক হিসেবে। ফলে জাতির ভবিষ্যত প্রজন্ম মানসিক বৈকল্যের শিকার হতে চলেছে। ফতোয়াবাজ-মৌলবাদী এবং আরো নানা ধর্মান্ধ শক্তি গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার পথ রুদ্ধ করছে। মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার আজ ভূলুণ্ঠিত। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ লক্ষ্যভ্রষ্ট। মুক্তিযুদ্ধ এখন কেনা-বেচার বিষয়ে পরিণত হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। নারীদের মত তাদেরও উৎপাদনক্ষমতার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হচ্ছে না। বেশির ভাগ মানুষই শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যে জীবনযাপন করছে।

দেশের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের মধ্যে ইতিবাচক ইশারা খুঁজে পাওয়া মুসকিল। ধর্মান্ধ চিন্তা-চেতনা, অপসংস্কৃতি ও আগ্রাসী সংস্কৃতির প্রভাবের দরুন জনগণের পরিচ্ছন্ন গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশলাভ করতে পারছে না।
সর্বোপরি ফারাক্কার মারাত্মক প্রভাব এবং এই দেশটিকে ঘিরে ভারত সরকারের বিশেষ মহল প্রতিনিয়ত যে গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতা চালাচ্ছে, এদেশের পরিবেশ-নির্ভর অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙ্গে দেয়ার লক্ষ্যে যে আগ্রাসী ভূমিকা ও কর্মকা-ে নিয়োজিত রয়েছে, মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের সাময়িক বক্তব্যে স্বাধীনতা ও দেশরক্ষার সে সব সংকটের যথাযথ স্বীকৃতি নেই। সংকট সমাধানের কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনাও নেই। কিছু বাঁধাবুলির পুনরাবৃত্তি রয়েছে মাত্র। সমমর্যাদার ভিত্তিতে উভয় দেশের জনকল্যাণের স্বার্থে ভারতের সঙ্গে ফয়সালার অক্লান্ত উদ্যোগ না নিয়ে যেন সমস্যা জিইয়ে রাখতে কিংবা দাসখতের অছিলা বের করতেই অনেক নেতার মাথাব্যথা।

অনেক সময় এই সব প্রশ্নে ভারত বিরোধিতাকে হিন্দু বিরোধিতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। আমরা তারও প্রতিবাদ করি। আরও একটা দুষ্টগ্রহের আত্মপ্রকাশ জনগণের জন্যে বিপদ সংকেত বয়ে আনছে। ঔপনিবেশিক আমলের শাসন কাঠামোর উত্তরাধিকারী সামরিক বেসামরিক আমলাচক্র প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে স্বৈরাচারের দোসর হয়ে বারবার সাধারণ নাগরিকের অধিকার হরণ করছে। অতীতে সামরিক উপশহরগুলো ছিলো পরাশক্তির চক্রান্তের আখড়া। রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে উর্দিপরা লোকেরা ডান্ডা উচিয়ে ক্ষমতার মসনদে চড়ে বসত। স্নায়ুযুদ্ধের ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে। এখন যে কোনো অছিলায় হই হই করে ক্ষমতা দখল করতে সামরিক বাহিনীর লোকেরা ছুটে আসে না।

সেই সামরিক জবরদস্তির ভূমিকা এখন বেসামরিক আমলারা আয়ত্ত করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। সরকার বদল হয় কিন্তু আমলাতন্ত্রের নেপথ্য ক্ষমতার হেরফের হয় না। এদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এতই বিকল যে আমলারা এখন প্রকাশ্যে তাদের কায়েমী স্বার্থ বহাল ও বিধিসম্মত করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনে আমলাতন্ত্রের প্রভুত্ব গণতন্ত্রের বিকাশের পথে বিরাট এক অন্তরায়। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিসরে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াও নিদারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

গণ ঐক্যের ডাক সম্পূর্ণ হবে না যদি না আমরা উপজাতিদের অধিকারের প্রশ্ন আমাদের অঙ্গীকারের অন্তর্ভুক্ত না করি। অস্ত্রের মাধ্যমে এই প্রশ্নের সমাধান হবে না, বরঞ্চ বিদেশি আগ্রাসনের পথ উন্মুক্ত করা হবে। আমরা মনে করি, উপজাতিসমূহের অধিকার লাভের সংগ্রাম দেশের নির্যাতিত জনগোষ্ঠির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠির গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম উপজাতিসমূহের অধিকারের সংগ্রামকেও বেগবান করবে।

দেশে একটি নির্বাচনের আয়োজন চলছে। কিন্তু দেশের জনগণ এই নির্বাচনের মাধ্যমে বিন্দুমাত্র উপকৃত হবে তেমন মনে করতে পারছে না। জনগণ তাদের ওপর বৃহৎ দলসমূহের চাপিয়ে দেয়া একটি গৃহযুদ্ধ রুখতে পেরেছে বটে। কিন্তু তারা আশঙ্কামুক্ত নয়। কারণ অসহযোগ আন্দোলনের সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটার সম্ভাবনা সমাজের শরীরে পুরোমাত্রায় বিরাজমান।

জনগণ এখনও হতাশ, কেননা চলমান রাজনীতিতে জাতীয় জীবনের প্রধান সংকটসমূহ সমাধানের কোনো অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়নি। এই পরিস্থিতে মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ সমাধানের কোনো অঙ্গীকার ব্যক্ত করেনি। এই পরিস্থিতিতে মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহের অনুসৃত পন্থার বিপরীতে একটি সামাজিক এবং রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা গতিশীল করে তোলাই হলো এই সময়ের মুখ্য দাবি।

মধ্যশ্রেণীভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ গণতন্ত্রের নামে কার্যত সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে। মানুষের সেই হৃত অধিকার ফিরে পাবার একটি নানামুখী কর্মকা- সৃষ্টি করার এখনই প্রকৃষ্ট সময়। যে সমস্ত ব্যক্তি ও সংগঠন দেশে একটি অর্থপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ক্রিয়াশীল করতে চান তাদের ছোটখাট মতপার্থক্য বিসর্জন দিয়ে ঐক্যসৃষ্টির একটা পদক্ষেপ এখনই নেয়া প্রয়োজন। এই গণতান্ত্রিক ঐক্যপ্রচেষ্টা যাতে সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে সেজন্যে সামাজিক শক্তিবর্গের একটি সমাবেশ করাও অত্যাসন্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

আগামী নির্বাচন উপলক্ষ মাত্র। একটি সৃজনশীল ও ক্রমবিকাশমান কর্মসূচির মাধ্যমে আমাদের আশাহত জনগণের সামনে যদি আশার আলো তুলে ধরা যায় এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মসমূহের ভুলভ্রান্তি ও নিষ্ক্রিয়তার ভেতর থেকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করা যায় তা হলে আমাদের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অবশ্যই বিজয়ী হবে। দেশপ্রেমিক, চিন্তাশীল, সৎ ও মেধাবী যে সমস্ত মানুষ, যাদের অবদানে দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, বর্তমান ব্যবস্থায় যারা অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছেন, হাজার হাজার নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী যারা গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে দিশাহারা পরিস্থিতিতে অসহায়ত্বের শিকার হয়ে পড়েছেন, তাদের সবাইকে একটি ঐক্যমোর্চায় শামিল করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Flag Counter


8 Responses

  1. Nahid says:

    Boro shaktir unmesh gotuk

  2. mahmud tokon says:

    ‘সামরিক জবরদস্তির ভূমিকা এখন বেসামরিক আমলারা আয়ত্ত করার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। সরকার বদল হয় কিন্তু আমলাতন্ত্রের নেপথ্য ক্ষমতার হেরফের হয় না। এদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এতই বিকল যে আমলারা এখন প্রকাশ্যে তাদের কায়েমী স্বার্থ বহাল ও বিধিসম্মত করার তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতীয় জীবনে আমলাতন্ত্রের প্রভুত্ব গণতন্ত্রের বিকাশের পথে বিরাট এক অন্তরায়। আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর পরিসরে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াও নিদারুণভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।’- আহমদ ছফা

    আগামী নির্বাচন উপলক্ষ মাত্র। একটি সৃজনশীল ও ক্রমবিকাশমান কর্মসূচির মাধ্যমে আমাদের আশাহত জনগণের সামনে যদি আশার আলো তুলে ধরা যায় এবং পূর্ববর্তী প্রজন্মসমূহের ভুলভ্রান্তি ও নিষ্ক্রিয়তার ভেতর থেকে একটি সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্ম সৃষ্টি করা যায় তা হলে আমাদের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম অবশ্যই বিজয়ী হবে। দেশপ্রেমিক, চিন্তাশীল, সৎ ও মেধাবী যে সমস্ত মানুষ, যাদের অবদানে দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে, বর্তমান ব্যবস্থায় যারা অপাংক্তেয় হয়ে পড়েছেন, হাজার হাজার নিষ্ঠাবান রাজনৈতিক কর্মী যারা গ্রামে-গঞ্জে-শহরে-বন্দরে দিশাহারা পরিস্থিতিতে অসহায়ত্বের শিকার হয়ে পড়েছেন, তাদের সবাইকে একটি ঐক্যমোর্চায় শামিল করা অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    সলিমুল্লাহ ভাই, আহমদ ছফাকে রেফার করে এই লেখাটির জন্য আপনাকে শ্রদ্ধা জানাই।

  3. poliar wahid says:

    অনেক সময় এই সব প্রশ্নে ভারত বিরোধিতাকে হিন্দু বিরোধিতার সঙ্গে এক করে দেখা হয়। আমরা তারও প্রতিবাদ করি। আরও একটা দুষ্টগ্রহের আত্মপ্রকাশ জনগণের জন্যে বিপদ সংকেত বয়ে আনছে। ঔপনিবেশিক আমলের শাসন কাঠামোর উত্তরাধিকারী সামরিক বেসামরিক আমলাচক্র প্রকাশ্যে বা নেপথ্যে স্বৈরাচারের দোসর হয়ে বারবার সাধারণ নাগরিকের অধিকার হরণ করছে। অতীতে সামরিক উপশহরগুলো ছিলো পরাশক্তির চক্রান্তের আখড়া। রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে উর্দিপরা লোকেরা ডান্ডা উচিয়ে ক্ষমতার মসনদে চড়ে বসত। স্নায়ুযুদ্ধের ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে।

    valo laglo. solimullah khan ke donnobad

  4. hasan ashik rahman says:

    লেখাটা এখনো খুবই প্রাসংগিক… Fanon কে মনে পড়ে, তার Pitfall of national consciousness, (Wretched of the Earth, Chapter-3) লেখাটায় সেই ৬০ দশকেই তিনি যে ভবিষৎ বানী করেছিলেন, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য আজ তা অক্ষরে অক্ষরে সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে।

    সলিমুল্লাহ স্যারকে ধন্যবাদ লেখাটি সামনে নিয়ে আসার জন্য।

  5. মোহাম্মদ জাহিদুর রহমান says:

    আমি নিয়মিতই এলান করি যে, বাংলাদেশে আহমদ ছফার মতো দুরদৃষ্টিসম্পন্ন কোন ব্যক্তির জন্ম হয়নি। এই লেখাই বলে দেয় তিনি কতদুর দেখতে পেতেন। দেশপ্রেম না থাকলে এমন দৃষ্টি জন্মায়ওনা।

    ছফার যুগে আরেকটি ক্ষমতালোভী প্রজাতির পয়দা হয়নি, তাই তারা বেঁচে গেলেন তাঁর বুলড্রোজারের(কলম)নিচ থেকে। তবে এই সুশীল প্রজাতি ছফা-শিষ্য সলিমুল্লাহ’র হাত থেকে রেহাই পাননি ভেবে আমরা তৃপ্ত। ছফা নেই, এই ক্ষতি পোষাতে আমরা সলিমুল্লাহ’কে জাতির সামনে একটি লাইটহাউজ হিসাবে দেখতে চাই।

  6. Debashis Maitra says:

    excellent

  7. তায়েব মিল্লাত হোসেন says:

    মহাত্মা আহমদ ছফা ১৯৯৬ সালে বসেই ২০০৬-০৮ এর উদ্দিনত্রয়ের যোগালো ড. কামাল, বি. চৌধুরী প্রমুখের চরিত্র-চিত্রণ করিয়াছিলেন…
    ‘নানা লক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে গণবিচ্ছিন্ন মধ্যশ্রেণীভুক্ত যেসব দলের ক্ষমতায় যাওয়াই একমাত্র লক্ষ্য তারা যদি মনে করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করে লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে না, তবে তারা মরিয়া হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে ঠেলে ফেলে দিয়ে জাতীয় জীবনে অধিকতর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করবে।’
    বাস্তবেই এক-এগারো আসিয়াছিলো বাংলাদেশে…

  8. সুদীপ্ত হাননান says:

    সলিমুল্লাহ খানের পক্ষেই আহমদ ছফাকে বুঝে লেখা সম্ভব। অভিবাদন…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.