সংযোজন

রৌরববাস, ২৫ মার্চ ১৯৭১

মীর ওয়ালীউজ্জামান | ২৫ মার্চ ২০০৯ ১:১০ অপরাহ্ন

wali-2.jpg২৫ মার্চ, ১৯৭১। সকাল। গত ক’দিনে বাসায় যাওয়া হয়নি। কাপড়চোপড় মলিন হয়েছে বেশ। পকেটের রেস্ত তলানিতে। বাড়ি যাওয়ার তাগিদ আসছে ভেতর থেকেই। প্রাণ বাঁচানোর গরজে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙলাম। নিচে সবুজ লন, তিনদিকে ছাত্রাবাসের ঘরগুলো কেমন পরিত্যক্ত, বিরান মনে হয়। বেশ ক’টি ডিপার্টমেন্টের এম.এ ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে। তড়িঘড়ি অনেকেই সুটকেস-বিছানা গুটিয়ে গ্রামের বাড়িতে পাড়ি দিয়েছে। আমি যাইনি। আমাদের পরিবার ঢাকাবাসী। ঢাকার বাইরে যাওয়া মানেই কোথাও বেড়াতে যাওয়া।

wali-6.jpgপ্রাতঃকৃত্য সেরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে ক্যাফেটেরিয়ায় ঢুকলাম। নাশতা দিতে বলে একা টেবিলে বসলাম। অন্য সময় হলে সকালের নাশতা পেতে সলিমাবাদের মতো লাইন দিতে হত। আজ সবশুদ্ধ মোটে ১০-১২ জনের গুঞ্জন সেখানে। হৈচৈ, চিৎকার কিচ্ছুটি নেই। কেমন সুনসান চারদিক। মন খারাপ হয়।

চা-খাবার খেয়ে হলের স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল বের করে ধীরেসুস্থে চেপে বসি। কলাভবনের পেছনের লাল ইঁটের পথ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরির সামনে দাঁড়ালাম। নাঃ, সোজা শরীফ মিয়ায় যাবো। সাইকেল রাখলাম লাগোয়া পাবলিক লাইব্রেরির ফাঁকা একতলার স্ট্যান্ডে ।

শরীফ মিয়ার বেড়ার ঘর, বাখারির বাতায়ন। দোকান ফাঁকা। অবশ্য, এখনও আড্ডা জমাবার বেলা মেলাই বাকি। তবুও কেমন যেন পোড়ো-পোড়ো, ছেড়ে যাওয়া, সরে যাওয়ার ছায়া পড়েছে গত ক’দিন থেকে, সেই সকাল ন’টা না বাজতেই জমাটি শরীফী আড্ডার কী হল?

wali-4.jpg
ছাড়া-ছাড়া, উদাসী আধঘন্টা কাটিয়ে উঠতে যাব। এমনি সময় টুকু বাতাসে ভেসে এল যেন। আবুল হাসান টুকু। বুভুক্ষু সর্বদাই। ‘দোস্ত, খাওয়াও কিছু।’

‘শরীফ মিয়া,’ হাঁক দিলাম আমি।

‘কন, কী দিমু?’ শরীফ মিয়ার বিরস বদন, খোঁচা দাড়ি হাফহাতা ময়লাটে গেঞ্জি সব মিলিয়ে এই শরীফ মিয়াকে ১৯৬৬ থেকে এরকমই দেখে আসছি। ‘হাসানরে মাখনবিস্কুট আর ডিমপোচ দ্যান। তারপর দুইজনরে চা দিবেন।’

‘ঠিক আছে, আমি ডিমের পোচ্ দিতাছি। আর কী দিমু, কলা দেই?’

‘দ্যান, দ্যান, কবির খিদা লাগছে। নিশ্চয় রাইতে খায় নাই।’ সহজভাবে বলি। হাসানের দূরনিবদ্ধ দৃষ্টিতে ক্লান্তি, মাথা নাড়ে। অর্থাৎ, রাতে মোটেই খায়নি কিছু।

হাসানকে খেতে দিয়ে শরীফ মিয়া ময়দা মাখতে শুরু করলেন। ছোট ভাই রমজান তেল চক্চকে কালচে কাঠের পাটায় সিঙাড়ার জন্য লুচি বেলার আয়োজনে মাতল। আলু তরকারির গামলা তারজালি ঘেরা কাঠের আলমারি থেকে বের করল। তেল-কালি-ধোঁয়া খেয়ে এখানে পরিবেশের রঙ আগাপাশতলা কালচে মেরেছে কবেই। চুমুক দিয়ে হাসান প্রস্তাব দিল, ‘চলো, ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি থেকে একটু ঘুরে আসি। বই খুঁজব। তোমার কার্ড আছে তো পকেটে?’

‘অবশ্যই, তামাকের কৌটো, লাইব্রেরির কার্ড আর পয়সাকড়ি না নিয়ে আমি বেরোই কখনো? অবশ্য, একবার বাসায় যাওয়াও দরকার। তুমি যাবে আমার সাথে? তোমার সাথে যেমন আমি পাঠাগারে যাচ্ছি?’ অনিবার্যভাবে, হাসান সোৎসাহে বলে, ‘আমার এই সদাবুভুক্ষু খোমাটা দেখলেই খালাম্মা যা একখানা খ্যাঁটনের আয়োজন করবেন! চলো বেরোব।’ আমি সরল দ্বিধায় বলি, একটা-দুটো গালপোড়ানো সিঙাড়া খেয়ে উঠবো না? আর এককাপ করে চা? আবার কখন কি জুটবে তার তো ঠিক নেই।’

এরি মধ্যে কার্তিক এসে জুটেছে। জগন্নাথ হলবাসী কার্তিক চন্দ্র শীল বরিশালের ছেলে। আমাদের সঙ্গে ইংরেজিতে পড়ছে গত চার বছর। অত্যন্ত সুবোধ। ধপধপে সাদা শার্ট-প্যান্ট পরে। রবীন্দ্র সঙ্গীতের টিউশনি করে, নিজের পড়ার খরচ চালিয়ে বাড়িতে মাকে টাকা পাঠিয়ে লেখাপড়ার পাট চুকিয়েছে কেবল।

‘বাড়ি যাব,’ কার্তিক বলল। তোমরা তো ঢাকাতেই থাকবে। আমি টিউশনি বাড়ি থেকে ছুটি নিয়ে ভাবছি ক’দিন বরিশাল ঘুরে আসব। রেজাল্ট হতে তো আরো অনেকদিন। দেশ একটু সুস্থির হলে একটা কলেজে ব্যবস্থা করে দিও আমার। ‘কী যে বল কার্তিক,’ এরিনমোর আর শিবম চেতনা মিশিয়ে বিড়ি তৈরি করতে করতে বলি, ‘আমরা আছি না, তোমার মাস্টারি ঠিক পেয়ে যাবে। আগে মাকে প্রণাম করে এস গিয়ে।’

চা-সিঙাড়া শেষ হতে আমরা উঠলাম। কার্তিক ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে ঢুকবে, আমরা দুজন চেতনায় দম দিতে দিতে ধীর পায়ে ফুলার রোডের দিকে এগোলাম। ব্রিটিশ কাউন্সিলের সবুজ বেড়ার ধারে পৌঁছতে পৌঁছতেই দুজনের বেশ ঝিমঝিম অবস্থা। আমি বাইরে বসে বসে দুধ-চিনি দিয়ে চা খাই। বললাম, বই বাছাই হলে আমাকে ধরে নিয়ে যেও। হাসান লাইব্রেরির ছিমছাম অন্দরে ঢুকে যায়। আমি ফটকের ধারে দাঁড়িয়ে এলাচি-লবঙ্গ দেয়া চা খেতে খেতে উইল্স ফিল্টার ধরাই। ওহ্। আরামের শব্দটা উচ্চারণের প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই টুকুর ডাক এল, লাইব্রেরির বাইরের বারান্দা থেকে। ‘শিমূল, এবার তোমার কাজ।’

সিগ্রেট নিবিয়ে, পকেট থেকে মেম্বারশীপ কার্ড বের করতে করতে টুকুর সঙ্গে ভেতর গেলাম। সামনের কাউন্টারে বাছাই করা বইয়ের ডাঁই। তিনটে বই ইস্যু করিয়ে নিলাম। টুকুর ঝোলায় বই ঢুকলো। সাইকেল শরীফ মিয়ায় বাঁধা থাক। আমরা দোতলা বাসে যাব, টুকুর প্রস্তাব। অতএব আবার ঢিকির ঢিকির করে টিএসসি-র মোড়ে যাওয়া এবং রাস্তা পেরিয়ে ওপারে রেসকোর্সের সাদা রঙকরা কাঠের রৈইলে হেলান দিয়ে বাসের অপেক্ষায় থাকা, আবার সিগ্রেট ধরানোর আগেই বিলেতি গা মোটর্সের লাল টুকটুকে দোতলা বাস সশব্দে ব্রেইক কষল আমাদের সামনে। আরও কজনের সঙ্গে আমরা দোতলায় গিয়ে উঠলাম। ‘বাঃ, বেশ ফাঁকা তো! চল, একেবারে সামনে গিয়ে বসি।’ টুকুর প্রস্তাবে অসম্মত হওয়ার কোন কারণ নেই। আমি সেই কবে, বছর দশেক আগে, মায়ের সঙ্গে ফ্রী স্কুল স্ট্রীট মামার বাড়ি যেতে ইপিআরটিসির টিয়াসবুজ বিলেতি বেডফোর্ড বাসের সামনের সিটে বসতে পেতাম। বড় হবার পর বাসে উঠে আর ঐ সামনের মহিলা ও শিশুদের জন্য রক্ষিত অংশে বসার প্রশ্ন ওঠেনি। কাজেই প্রথমবারের মতো ডাবল ডেকারের একবারে সামনে বসে আমার সত্যিই মনে হল, এ বাস চালাচ্ছে কে? টুকুকে কথাটা বলতেই অট্টহাসি। গুলিস্তানে নেমে ১০-১২ মিনিট রিকশা চেপে কাপ্তানবাজার, ঠাটারিবাজার, বামাচরণ চক্রবর্তী রোড, বনগ্রাম রোড পেরিয়ে হেয়ার স্ট্রিটে পৌঁছলাম আমরা। আমাদের বাড়ি ঢোকার আগেই ডানদিকে আলতাফ ভাইদের বাড়ি। ‘ত্রিরত্নের’ এক রত্ন আলতাফ ভাই তখন পূর্ব-পশ্চিম দুই পাকিস্তানেই মশহুর। সিনেমা প্রোডিউসাররা বাড়িতক ধাওয়া করছে। কিন্তু লুকিয়ে-চুরিয়ে আর কত অভিনয় করা যায়? আলতাফ ভাইয়ের বাবা কট্টর শৃঙ্খলাপরায়ণ মুরুব্বি। আমার বাবার মতো মোটেই নয়, মনে মনে ভাবি ও নিজেকে পিতৃসৌভাগ্যের কারণে কংগ্র্যাচুলেইট করি।

ভরদুপুরে, সদরের বেল টিপতে মা-ই এসে দরজা খোলেন। টুকু টুক্ করে সালাম দেয়। ‘বাড়ির কথা মনে পড়েছে তাহলে,’ মা মৃদুস্বরে বলেন। আমি নিঃশব্দে বাড়ি ঢুকি, পিছুপিছু টুকু। মা সদর বন্ধ করে বারান্দায় বসলেন। ‘বোস বাবা টুকু, তুমি যে আরো রোগা হয়ে গেছ, কী খাও, কী করে বেড়াও তোমরা, বল তো?’ টুকু অস্পষ্ট কী একটা জবাবের মতো দেবার চেষ্টা করতে করতে বারান্দায় রাখা চৌকিতে উঠে বসল। ‘খালাম্মা, ভাত খাব আজ এখানে।’ ‘আহারে, তুমি কি না খেয়েই চলে যাবে ভেবেছিলে? ওটি হবার নয় এবাড়িতে।’ মা বলে উঠলেন, ‘কিন্তু আমাদের নবাবজাদা কি শরীফ মিয়ার নহবতখানায় ফেরত গিয়ে বিরিয়ানি খাবেন, নাকি এখানেই তোমার সঙ্গে তশরিফ রাখবেন?’ টুকুর হো-হো হাসি আর থামে না। হাসি কমল তো কাশি শুরু হল। কাশির দমকে বুক চেপে ধরে সামনে ঝুঁকে পড়ল। মা চেয়ার ছেড়ে উঠে ব্যস্ত হয়ে ওর পিঠে হাত বুলোতে লাগলেন। ‘আঃ, মায়ের হাত কী আরাম,’ টুকুর বোঁজা চোখের কোল বেয়ে অশ্র“ গড়ায়। মা আঁচলে ওর মুখ মুছিয়ে দেন, ‘এতই যদি আরাম, তো বাড়ি গেলেই পার মাঝে-মাঝে, সে মা বেচারি তো আমার চেয়েও দুর্ভাগা, গুণের নিধি ছেলেকে তো চোখের দেখাও দেখতে পান না। যাকগে, আমি ভাত বাড়ি, তুমি হাত-পা ধুয়ে এস কলঘর থেকে।’

কাপড় বদলে বাইরে এসে দেখি, টুকু উঠোনের প্রান্তে কলঘর থেকে পা-হাত মুখ ধুয়ে মায়ের এগিয়ে দেয়া গামছায় মুখ মুছছে। বারান্দায় চৌকিতে পা মুড়ে বসে খাই আমরা, মা তালপাতার পাখা হাতে টুকুকে বাতাস করেন, সে বাতাসের স্নিগ্ধতা আমাকেও ছুঁয়ে যায়।

বেরোনোর সময় আমি হাত পাতি, ‘মা, টাকাপয়সা হাতে নেই। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ থেকে বেতন পেলে আর চাইব না।’ তা তো বটেই তখন তো দিন-দশেক জনাবের দেখাই পাবে না বাড়ির কেউ। অত্যন্ত অসন্তুষ্ট মুখে মা ঘরে যান, আলমারি খোলেন ঝনাৎ শব্দে, বেরিয়ে আসেন একটি একশ’ টাকার নোট হাতে। ছোঁ মেরে টাকাটা নিয়ে আমি আর দাঁড়াই না। ‘চলো টুকু, কেটে পড়ি। ভোয়া, মাদাম।’ ‘আর তোর ফরাসি বুক্নি শোনাতে হবে না, দিনকাল খারাপ, সাবধানে থেক। আর ঐ ছাতার জিন্নাহ হল ছেড়ে এবার কুলোয় ফের, বুঝলে।’ মা গজগজ করতে করতে পেছন-পেছন সদর পর্যন্ত আসেন। আমরা বেরোলে দরজা বন্ধ করবেন। গিয়ে শোবেন একটু। আবার বিকেল হলে, উঠেই বাবা-ভাই-বোনদের জন্য নাশতার যোগাড়ে লাগবেন। আমি মায়ের অবিশ্রাম সংসারসেবার তাৎপর্য অনুসন্ধান করি মনে মনে। থৈ না পেয়ে বর্তমানে ফিরি। বললাম, ‘চলো পান্নু ভাইয়ের আস্তানায়। আজ তো আর পেটে শরীফের বিরিয়ানির জন্য জায়গা নেই!’

দুজনে যথারীতি রিকশায় গুলিস্তান পৌঁছে, দোতলা বাসে উঠে, টিএসসি-তে নেমে, ঝিমধরা শেষ দুপুরের শরীফ মিয়ায় বসে এক কাপ চমৎকার নতুন পাত্তি দেয়া চা খেয়ে, সাইকেলে ডাবল-রাইড করে এলিফ্যান্ট রোডে সায়েন্স ল্যাবোরেটরির আবাসিক এলাকায় পৌঁছে যাই।

শামসুল আলম পান্না। ল্যাবোরেটরি টেকনিশিয়ান। আমার খালাতো ভাই। অতএব, টুকুরও তাই। ফরিদপুরের মধুখালিতে পান্নু ভাইদের গ্রামের বাড়ি। টুকু আর নিজাম মামাতো-ফুপাতো ভাই। নিজাম, টুকু, আমি সবাই ইংরেজির ছাত্র। টুকু প্রমোশন নিয়ে সেকেন্ড ইয়ারে ওঠেনি। কাজেই তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া ওই প্রথম বর্ষেই বার দুয়েক কাটিয়ে চূড়ান্ত হয়েছিল। পান্নু ভাইয়ের যত সহকর্মী–ফোটোগ্রাফার এমএ বেগ, সদরুল আমীন, শহীদ ড. আমিন আরও অনেকে–সবাই টুকু ও আমার ভাই অথবা বন্ধু হয়ে পড়েছিলেন। ওখানে বিবাহিতদের পারিবারিক বাসাবাড়ির ফাঁকে ফাঁকে ব্যাচেলরদের মেস ছিল বেশ কয়েকটি, যার সবগুলোতেই আমাদের দুজনের অবাধ যাতায়াত ছিল–ওই পান্নুর ভাই হবার সুবাদে। কাজেই ২৫ মার্চ ’৭১-এর বিকেলে সায়েন্স ল্যাব এলাকায় বেদম আড্ডা দিয়ে আমরা হেঁটে সন্ধেবেলা ওদের সান্ধ্য আড্ডা রমনা রেস্তোরাঁয় পৌঁছে গিয়েছিলাম। রমনার আড্ডায় নিয়মিত আড্ডাধারীদের মোটামুটি তিনটি দল ছিল। বড়দের গ্রুপে মাহের আব্দুল্লাহ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মাহবুব জামিল, আতাউস সামাদ, জাহাঙ্গীর, কামাল ইবনে ইউসুফ, ইব্রাহিম সাবের, কামাল সিদ্দিকী এবং আরো কয়েকজন। ইন্টারমিডিয়েট গ্রুপের নেতা বাচ্চু ভাই। আমাদের আড্ডায় ছিলেন শফিকুর রহমান, সালাউদ্দিন জাকি, বাদল রহমান, দেওয়ান শামসুল আরেফিন, ফখরুল আবেদিন লালু, কুমারশঙ্কর হাজরা বালু, পিনাকি, মনিরুল আলম ছাড়াও অনেকে ছিলেন। জুনিয়র গ্রুপে নাসির উদ্দিন ইউসুফ, বেবি, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেলাল হাফিজ ও অন্যান্য। মাঝে-মাঝে গ্র“পভিত্তিক হাজিরা তেমন না জমলে আমরা-জুনিয়ররা মিলে-মিশে একসঙ্গে আড্ডা জমাতাম।

২৫ মার্চ সন্ধ্যাবেলা অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, শেখ মুজিবের অবস্থান, পাকিস্তানী সামরিক জান্তার সম্ভাব্য অ্যাকশন, সামরিক বাহিনীতে মতবিরোধ ও বিভ্রাট সব মিলিয়ে ছেঁড়া-ছেঁড়া, অসমর্থিত সংবাদ ও দুঃসংবাদ আমাদের কানকে আঘাত করছিল মুহুর্মুহু। পট পরিবর্তনের শঙ্কায় সবার বুক দুরুদুরু। কী হয়, কী হয় এরকম একটা বাতাস বইছিল রমনার আড্ডায় সেই সন্ধ্যায়।

বাংলার হুমায়ুন ভাই, কবি হুমায়ুন কবির এল সেদিন আড্ডায়, সুলতানা রেবু সঙ্গে। আমরা রেবু আপাদের তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যেতে বললাম। ‘কেন, বাড়ি যাব কেন?’ হুমায়ুন ভাইয়ের রোখা উত্তর। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি, চটি, কালো শেলফ্রেমের চশমায় হুমায়ুন ভাইয়ের চিরকিশোর মুখ জানতে উৎসুক, আমরা কী ভেবে কী বলছি। ‘রেবু আপা, শুনছি আর্মি নামবে আজ রাতেই।’ ‘মিলিটারি ক্র্যাকডাউন?’ প্রশ্ন বিপ্লবীর। আমি জানতাম, টুকু জানতো, বাংলার প্রতিভাবান ছাত্র-প্রভাষক হুমায়ুন ভাইয়ের কোমরে পাজামার ভাঁজে গোঁজা রয়েছে অমোঘ মারণ–তাই কি সে অমন অকুতোভয় ছিল? সে যাই হোক, বুঝিয়ে সুজিয়ে ওদের বাড়ি পাঠিয়ে, জোর গেঁজিয়ে রাত দশটা নাগাদ আড্ডা ভেঙে টুকু-আমি ঠিক করলাম, সে রাতে আমরা জিন্নাহ হলে বা ইউনিভার্সিটি পাড়ায় যাব না। ‘এলিফ্যান্ট রোডে চল,’ টুকু বলল, ‘আর টাকা-পয়সা তো তোমার পকেটে বিস্তর, আজ পিয়া রেস্তোরাঁয় হাঁসের মাংস আর ভুনাখিচুড়ি খাব।’

‘চল,’ আমি উৎফুল্ল।

‘সঙ্গে একটা কিছু নেবে না?’

‘শুধুমুদু খিচুড়ি-মাংস আমরা খেয়েছি কখনো?’

‘তা বটে,’ টুকু চিন্তায় মগ্ন হল। ‘চল একটু গ্রীন হয়ে যাই। এখনো এগারোটা বাজেনি। তবে একটা কথা, রাস্তাঘাট কেমন ফাঁকা লাগছে, দেখ। অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে মনে হয়।’

‘আমরা যে কী টুকু, দেশকাল সম্পর্কে কিচ্ছু খবর রাখি না, আমার কন্ঠে ছদ্ম আফসোস বাজে।

‘হা-হা-হা,’ উদাত্ত হাসে টুকু। ‘থাক ওসব কথা, এই যে গ্রীন এসে গেছে। এত চুপচাপ! এখন তো শেষ অর্ডার নেবার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যাওয়ার কথা।’ একটি কি দুটি পর্দা টানা খুপড়িতে আলো জ্বলছে। রিকশা-গাড়ি-অটোরিকশা অপেক্ষমান নেই। মস্তানের দেখা নেই।

টুকু খুঁজেপেতে রামের একটি পাঁইটশুদ্ধ মস্তানকে ধরে এনেছে। আমি দশ টাকার নোট এগিয়ে দিলাম। আর খুচরো টাকা দুয়েক অতিরিক্ত বকসিস। আলো-আঁধারি প্রায় নির্জন পথে রিকশার চাকা আবার গড়াল। এলিফ্যান্ট রোডে পেট্রোল পাম্পের সামনে রিকশা থেকে নেমে রাস্তা পেরিয়ে আমরা উল্টোদিকের ফুটপাতে উঠলাম। পিয়া রেস্তোরাঁর ছোট্ট নিয়ন সাইনের নিচে সরু প্যাসেজে টিমটিমে হলুদ আলোর বৃত্ত। পেরিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। মন অস্থির। টুকুও উশখুশ্ করছে। ছোট ক্যাবিনে ঢুকে পাঁইট খুলে গলায় রাম ঢেলে শিশি এগিয়ে দিল আমার দিকে। গেলাসে ঢালা, জল মেশানোর আনুষ্ঠানিকতায় না গিয়ে তরল আগুন চালান করে দিলাম ভেতরে। সারাদিনের ক্লান্তি আর অব্যবহিত অনিশ্চয়তা ও অজানা শংকাকে ডুবিয়ে দেবার চেষ্টাতেই সম্ভবত এরকমটা করছিলাম, চট্জলদি নেশার আবাহনে নয় মোটেই। পিয়া রেস্তোরাঁর প্রিয় মেনুর খাবারও কেমন বিস্বাদ লাগছিল। হুড়োহুড়ি করে খিচুড়ি গলা দিয়ে নামানোর মাঝেই সংলগ্ন গলিপথে হৈচৈ শোনা গেল। হাতিরপুল এলাকার ক’টি মুখচেনা তরুণ, আমাদেরই বয়সী–ভেতরে এসে চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চ তুলে বাইরে নিয়ে যেতে যেতে বলাবলি করছিল, মন্টু ভাই কইছে, ব্যারিকেড দিতে অইব অক্ষনি আর্মি মনে হয় তেজগাঁও এয়ারপোর্ট পার অইছে…। আইতাছে…।

wali-3.jpgটুকু, আমি এ-ওর দিকে তাকালাম। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করে দাম চুকিয়ে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। তরুণ ম্যানেজার আমাদের বেরিয়ে আসার অপেক্ষায় ছিল। সেও ক্যাশ পকেটে ঢুকিয়ে দরজায় তালাচাবির কাজ সেরে এসে হাত লাগাল ব্যারিকেড দেয়ার কাজে। আমরা চুপচাপ এগিয়ে চৌরাস্তায় (এখন যেটা বাটার মোড়) গুমটি থেকে সিগ্রেট, ম্যাচ কিনে সায়েন্স ল্যাব কোয়াটার্সের ঢোকার শর্টকাট্ গলিতে ঢুকলাম। গফুর মুদি দোকানের ঝাঁপ ফেলছে। ওকে থামিয়ে কফি, বিস্কুট, মাখন, টুথব্রাশ কিনে আমরা পান্নু ভাইদের মেসে পৌঁছে গেলাম। ওখানে তখন তুমুল আড্ডা–দেশে কী ঘটতে যাচ্ছে–সে বিষয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ বিশেষ মতামত বাকি সবার কর্ণগোচর করতে তৎপর। অর্থাৎ, জোর হল্লা চলছে। আমার মন ভাল হয়ে গেল। হাতমুখ ধুয়ে এসে হুকুম করলাম, সবাইকে কফি খাওয়াও, আলি, ওই ঝোলায় দেখ কী সব রয়েছে, গুছিয়ে রাখ। গম্ভীর বালক আলি রান্নাঘরে চলে গেল। এতক্ষণ সেও এককোণে দাঁড়িয়ে স্যারদের দেশোদ্ধার ব্রতপালন থেকে তথ্য উদ্ধারের চেষ্টায় ছিল। কারণ এই ডাইজেস্ট তাকে আবার পাড়ার পরিচারকদের ক্লাব মিটিংয়ে পরিবেশন করতে হবে তো।

আড্ডার হৈচৈ ছাপিয়ে একটু দূরের স্লোগান ভেসে এল, ‘জয় বাংলা’। আমরা উৎকর্ণ। পান্নু ভাই বললেন, ‘আজ রাতে আর বাইরে যাবে না তোমরা! চল ছাদে যাই।’

‘আপনি আর টুকু চলে যান, আমি ফ্লাস্কে কফি, সিগ্রেট আর বিস্কুট নিয়ে আসছি,’ বলে আমি রান্নাঘরে গেলাম। তখন রাত বারোটার এদিক-ওদিক।

আড্ডার মেজাজে ছাদে উঠেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! টুকু, পান্নুভাই ছাদের নিচু রেলিং ঘেঁষে লেপ্টে বসে মাথা সামান্য উঁচু করে কী দেখতে ব্যস্ত। আমিও বসে পড়ি। চোখের লেভেল পর্যন্ত মাথা ওঠাতেই এলিফ্যান্ট রোড চৌমাথা নজরে এল। জনা চল্লিশেক মারমুখী তরুণ জ্বলন্ত মশাল তুলে স্লোগান দিচ্ছে। ‘পাকবাহিনী ফিরে যাও…!’ ‘বাংলা বড় কঠিন ঠাঁই…!!’ ইত্যাদি। আমরা নির্নিমেষে তাকিয়ে, বুক শঙ্কায় দুরু দুরু। খানিকবাদেই বিক্ষোভকারীরা নিউমার্কেটের দিকে হটে গেল, গুড়গুড় আওয়াজ শোনা গেল…।

জীবনে প্রথম চলন্ত ট্যাঙ্কের ধাক্কায় ব্যারিকেড গুঁড়িয়ে যেতে দেখলাম। সাঁজোয়া গাড়িগুলো রাস্তার অল্প আলোয় কালচে দানবের মতো নিউমার্কেটমুখো গড়িয়ে গেল। ভেরিলাইট পিস্তল থেকে ছোঁড়া আলোকসম্পাতী লাল-নীল-সবুজ-হলুদ আলোর মালাগুলো এলিফ্যান্ট রোড-নিউমার্কেট-পিলখানা এলাকা দিনের মতো উদ্ভাসিত করে তুলছে। পাকিরা ওপর দিকেও ফাঁকা গুলি ছুঁড়ছে অবিশ্রাম, বোধকরি ঢাকাবাসীকে ব্যাপকভাবে আতঙ্কিত করা ওদের লক্ষ্য। তা, আমরাও চরম আতঙ্কে মাথা নামিয়ে কফিতে চুমুক দিচ্ছি আর আঁচ করতে চাইছি, ব্যাপারটা হচ্ছে কী? টুকু ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ভাগ্যিস আজ তুমি হলে রাত কাটাতে যাওনি, আর আমি ও পাড়ায় আশ্রয়-আড্ডা খুঁজতে যাইনি।’ পান্নু ভাইয়ের শ্যামল মুখমণ্ডল ধূসর দেখায়, বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে সেখানে এই শেষ মার্চের হিম রাতে হিমে। ওদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পাড়ার আকাশেও অত্যুজ্জ্বল রঙিন আলোর খেলা। সাঁজোয়া বাহিনীর গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে নাকি? গোলাবর্ষণের বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছিলাম আরও দেড়দিন পরে।

শেষ রাতে, কফি শেষ হতে, ভয়ে ভয়ে, ঘাড় গুঁজে সিগ্রেট টেনে ক্লান্ত হয়ে আমরা নিচে নেমে যে যেখানে খুশি কুকুরকুণ্ডলী হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল ২৬ মার্চ সকাল ন’টায়। পান্নুভাইয়ের হাফহাতা গেঞ্জি, চশমার আড়ালে উজ্জ্বল চোখ, খোঁচা দাড়ি–সুখেই ছিলেন যেন। অত্যন্ত বাঙময় লাগছিল। ‘জান কী হয়েছে?’

‘শুনব, আলির চা’টা আগে খাই।’ ট্রে হাতে আলিকে সঙ্গে নিয়েই পান্নুভাই আমার ডানা ধরে টানাটানি করছিলেন। টুকুটা জন্মের আলসে, পান্নুভাই অবশ্য বলেন ক্ষীণজীবী। ‘এই টুকু, পান্নুভাই রাজ্যের সংবাদ পরিবেশনের জন্য তৈরি, ওঠো, চা নাও।’ চায়ের কথা কানে যেতেই টুকু হাত বাড়িয়ে দিল। উপুর হয়ে, কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বলল, শিমূল, একটা বিড়ি ধরিয়ে দাও।’ পান্নুভাই আমাদের স্থিত হতে দেখে শুরু করেন, ‘সায়েন্স ল্যাবের সংবাদ সূত্রে জানা গেছে যে, পাক আর্মি গতরাতে ঢাকা ইউনিভার্সিটি, পিলখানা, পুরোনো ঢাকার শাঁখারিবাজার, তাঁতিবাজার এলাকার দখল নিয়েছে। অনেক মানুষ, ছাত্রশিক্ষক, নিউমার্কেটে কাঁচা বাজারের ব্যবসায়ী, পথচারী, রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা বেশুমার গুলি খেয়ে মরেছে। মনে হচ্ছে, ওরা আক্রান্ত হবার ভয়ে, যাকে ভয়-সন্দেহ, তাকেই মেরে নিশ্চিন্ত হতে চাইছে। আর শিমূল, তুমি গতরাতে এখানে থেকে নিজে বেঁচে গিয়েছ, আমাকেও বাঁচিয়েছ। ভোর থেকে বার তিনেক তিন জায়গা থেকে তোমার খোঁজ করেছেন আত্মীয়বন্ধুরা। খালা তো খুশিতে প্রায় কেঁদে বললেন, পান্নু, তুমি ওকে আর কোথাও যেতে দিও না যেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেখা যাবেখন। আর দু’টো ফোন এসেছিল মেজ মামা আর তোমাদের বন্ধু মিঠুর বাড়ি থেকে। সবাইকে নিশ্চিন্ত করা গেছে। আর তোমরা আপাততঃ এখান থেকে ঠাঁইনাড়া হচ্ছ না। কারণ, অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাস্তায় কাউকে দেখামাত্র গুলি চালাবে আর্মি।’ বলে পান্নুভাই পাশের ঘরে আড্ডা দিতে গেলেন। প্রাতঃকৃত্য সারতে না সারতেই আলি আবার ট্রেতে প্রাতঃরাশ সাজিয়ে এসে গেল। আমার প্রিয় চুলের গোছার মতো লাল্চে-নরম আলুভাজি, সুজির মোহনভোগ আর ঘি-ভাজা লাল্চে বহুপরত পরোটা। ‘আলি একটা ফার্স্ট ক্লাস ছেলে, না কি বল শিমূল?’ টুকু মুচমুচে পরোটা ভাঙতে ভাঙতে বলে। ‘হুঁ, কিন্তু আমাদের কাজকর্ম খোঁজা, আড্ডার যে বারোটা বাজল,’ আমি চিন্তকের ভঙ্গিতে বলি।

আমাদের নাশ্তা শেষ হতে না হতেই আড্ডা থেকে পান্নুভাইয়ের ডাক এল, ‘শিমূল, টুকু, তাড়াতাড়ি এসো, স্বাধীনবাংলা বেতারের ঘোষণা শোন।’ চায়ের কাপ হাতে দুজন আড্ডায় ঢুকে দেখি এঞ্জিনিয়ার হাবীব ভাইয়ের ১৬ ব্যান্ডের পেল্লায় টেলিফুঙ্কেন রেডিও ঘিরে বসে বেগভাই, আওলাদ, খান, পান্নুভাই এবং সদুভাই। এরা সবাই সায়েন্স ল্যাবের কর্মকর্তা-কর্মী। আমিন ভাই এখনো এসে পৌঁছননি। আমরা গভীর অভিনিবেশে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, কালুরঘাট, চট্টগ্রাম থেকে প্রচারিত স্বাধীনতার ঘোষণা শুনলাম। পাঠ বারবার হচ্ছিল বাংলায়, ইংরেজিতে। বাংলায় পড়েছিলেন বেলাল ভাইও, আমার বন্ধু চিওড়া কাজীবাড়ির ছেলে হাবিব আর ইংরেজিতে মেজর জিয়াউর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষ থেকে।

সারাদিন সরকারি বেতারের কারফিউ হুঁশিয়ারি, স্বাধীন বাংলার আত্মপ্রকাশের ঘোষণা শুনে, তাস পিটিয়ে, খেয়ে আর গল্পগাছায় কাটল। রাতে অবসাদে, উত্তেজনায় ঘুম আসছে না। বাড়িতে নেশার জোগাড়ও কিছু নেই। সারা শহরে কাকের ডাক, ওড়াউড়ি ছাড়া বোধহয় সব চুপচাপ, সান্নাটা। ২৫শে রাতের মতো অত না হলে টুকটাক, ঠুসঠাস্ গুলি ফোটার ছড়া গত শব্দ আমাদের কানে ঠিকই বাজছিল মাঝে মধ্যে। আসলে, চেঁচামেচি করে আমরা ভেতরের শঙ্কা আর উত্তেজনাকে পাশ কাটাতে চাইছিলাম সকলেই। স্মার্ট, উচ্চ বেতনভোগী প্রকৌশলী হাবিবের হ্যান্ডসাম মুখ শুকনো দেখাচ্ছিল, বোধকরি দূর মফস্বলে মা-বাবা-ভাই-বোনের কথা ভেবে, ঢাকার খুচরো টেলিফোন বান্ধবীদের অবস্থান কল্পনা করে।

ইতিমধ্যে পরিচিত অনেকেই ফোন করে সংক্ষেপে, চাপাস্বরে কেমন এক উটকো অরাজক শাসন আচমকা শহরকে শৃঙ্খলিত করেছে, তার আঁচ দিয়েছে। তবে আমরা কোন স্পষ্ট, নিশ্চিত ধারণা পাচ্ছিলাম না কোন সূত্র থেকেই। তবে সবাই খুব অবাক ব্লিৎসক্রিগ ধাক্কা খেয়েছিলাম, এটা মনে আছে এখনো। টুকু ওর কিংস্টর্ক সিগ্রেটের ঢিলে করে, অনেকটা তামাক ফেলে, একপ্রান্ত গোঁফ মোচড়ানোর মতো চুমড়ে আমার হাতে দিল, ‘কলকে তো নেই। এটাই টান। দেখ কী হয়।’ ‘কী আর হবে, আমি বলি, বুকে-গলায় জোর ধাক্কা খেতে হবে, আর কি?’

‘পান্নুভাই, আপনার ক্যাপস্ট্যানের প্রতি অনুরাগ অক্ষুণ্ন রেখেই দু’টান দেবেন নাকি?’ টুকু উসকানি দেয়। ‘না, হাসান, আপনার মতো এলেম্বা-এলেম্বা আবেগ আমার পোষাবে না।’ পান্নুভাই টুকুকে কবি হিসেবে সমীহ করেন, ফরম্যাল নামেই সম্বোধন করেন, তবে আমাদের পাল্লায় পড়ে উনি নচ্ছার যতো পাকি সিনেমার এলেম্বা-এলেম্বা অতিস্বাস্থ্যল নর্তকী অভিনেত্রীদের ধিঙ্গিপনা দেখতে যেতে ভোলেন না। টুকুর বিচারে সর্বোচ্চ আবেদনময়ী এলেম্বা গুণান্বিত নাচিয়ে পাকি অভিনেত্রী এখন আলিয়া। নিলো-টিলোরা পাস্ট চ্যাপটার। তবে জেবা-মোহাম্মদ আলী জুটিকে পান্নুভাই প্রায় সুচিত্রা-উত্তমের পাকি জুড়িই ভাবেন। থাক ওসব। আপাততঃ ঘুমের প্রয়োজন। ঢিলেশুখা বগলায় দুই-দুই চারটান দিয়ে দমবন্ধ করে। দম ছেড়েই আমি বুঝলাম, দু’ পেগের মৌতাত অর্জিত হয়েছে। ‘ওহ্, টুকু, হোয়াট ইনোভেশ্যন!’ আমি কৃতজ্ঞ, উচ্চকিত। ‘বানাও আরও গোটা দুই, তোমার ওই প্রায় নিখরচায় রঙিন জলযোগের মিশেল!’

টুকু মুখমণ্ডল নিঃশব্দ হাসিতে ভাঙে, ‘দেখেছ, হাতে হাতে মজমা। আমাকে কে শিখিয়েছে, জান? নির্মল।’ ‘কোয়াইট লাইক হিম, নির্মল ছাড়া এসব ইন্ডিজেনাস সম্পদের প্রবর্তনা কার মাথায় আসবে? উঃ কোলাহল দাদা, তোমার ক্ষুরে নমস্কার, আমি করজোড়ে অনুপস্থিত নির্মলেন্দু গুণের সমুখে দৃশ্যতঃ প্রণত হই।’ ‘শিমূল, তোমার হয়ে গেছে, তুমি এবার কুকুরকুণ্ডলী হতে পার,’ টুকু সাবধান করে, ‘আমার আরেকটু লাগবে।’ পান্নুভাই দাস স্পেইক জারাথ্রুস্ত্র থেকে মুখ তুললেন, ‘তাহলে কোলাহলটা গুণের কীর্তি? আমারও তাই মনে হয়েছিল, ভয়ে বলিনি।’

টুকু হতাশভাবে আমার পানে তাকায়, যেন এক মহাসিক্রেট আজ সর্বজনগোচর হয়ে গেল! তৎক্ষণাৎ আবার সামাল দেবারও চেষ্টা করে যদিও, ‘তবে কথা হল কি, পান্নুভাই, আপনার ওই সুপারম্যান কনসেপ্টের এদেশিকরণ ঘটালে নির্মলের অমনিপ্রেজেন্ট অস্তিত্ব আমাদের গর্বের কারণ হতে পারে, নয় কি?’ টুকুর টুকুস মন্তব্য ও পুনরায় চড়চড়াৎ টান নেশায়। পান্নুভাইও এবার হাত বাড়িয়েছেন, ‘হুঁ, দেখি, দেখি একটা পাফ্ নিয়ে। ইনসমনিয়া তো আমার নাছোড় প্রেয়সী হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ টুকু বিড়ি এগিয়ে দিয়ে ইতোমধ্যে কাত হয়ে পড়া আমাকে খোঁচায়, ‘তা তোমার অ্যাবসার্ড নাটক অনুবাদ কদ্দূর? কলম চলছে?’ ফাঁকে-ফাঁকে, আমি চোখ বুঁজে উত্তর দেই, ‘গোদোর প্রতীক্ষায় তো পান্নুভাইকে হ্যান্ডওভার করেছি। আয়োনেস্কোর চেয়ার-এ হাত মকশো করছি এবার। টুকু বলে, ‘সাহস আছে ছেলের, নাকি বলেন পান্নুভাই? ইউজিন আয়োনেস্কো ইংরেজিতে পড়েই তো বুঝিনি অনেক দিন, ও যে বাংলায় কী নামাচ্ছে।’ ‘হয়ে যাবে,’ পান্নু ভাইয়ের চোখ বোঁজা, টানের জন্য প্রস্তুত, ‘গোদোটা তো ভাল উতরেছে। অবশ্য এটা আমার এবং ডঃ আমিনউদ্দীনের মত।’ ধোঁয়া ছেড়ে টুকু পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া বাঁধানোর সুরে বলে, ‘অর্থাৎ, আপনার সেই পুরনো ধারণায় আপনি অটল রয়েছেন।’ চোখ খুলে আমি হাত বাড়াই, ‘দাও আমাকে লেজটুকু, টুকু। লাখো লেখকের ভিড়ে কে কার লেখা মন দিয়ে পড়ে?’ এবার শুরু হল রে সুন্দ-উপসুন্দের লড়াই। লম্বাটানে বিড়ি শেষ করে, অ্যাশট্রেতে পিষে নিবিয়ে দমবন্ধ আমি সোফায় পাশ ফিরে দেয়ালমুখি হই।

‘আর কথা নয়, হাসান, আসেন, এবার শুয়ে পড়া যাক। কাল সকালে কারফিউ ব্রেইক দিতে পারে। বাজারঘাট সারতে হবে। শুভ রাত্রি।’

টুকু বড় বাতি নিবিয়ে রাতবাতি জ্বেলে পান্নু ভাইয়ের বড় খাটে মশারি তুলে সেঁধিয়ে যায়। পান্নু ভাই তার আগেই মশারি নামিয়ে চিৎপাত।

২৭ মার্চ ১৯৭১। ন’টা নাগাদ আড়মোড়া ভাঙতেই পাশের ঘর থেকে হাবিব ভাইয়ে চিৎকৃত ঘোষণা কানে এল, ‘কারফিউ ব্রেইক! ১০ থেকে ১২টা!!’ আমি লাফিয়ে উঠে বাথরুমে ঢুকলাম। বেরিয়ে এসে টুকু আর পান্নুভাইকে ডেকে তুললাম, ‘অনেকগুলো কাজ সারতে হবে দু’ঘন্টায়।’ ‘কী কী কাজ?’ টুকুর প্রশ্ন। ‘বাজার, অর্থাৎ আহার্য ও নেশার যোগান সর্বাগ্রে, তারপর খোঁজ করা চারদিক–কে কেমন আছে, তার হদিস নেয়া, এই আর কি,’ পান্নু ভাই বলেন। আলি চা-জলখাবার নিয়ে এলে আমি হামলে পড়ি। তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে, দাঁত ব্রাশ করে, আরেকবার টয়লেট সেরে বেরোতে হবে। দমবন্ধ হবার যোগাড় হয়েছে সবার, মাত্রই একটা দিন রাস্তায় বেরোতে না পেরে, এমনকি টুকুও আজ আলসেমি ঝেড়ে ১০টা বাজার আগেই তৈরি।

‘তা, হাসান, আপনি কোনদিকে যাবেন? আমরা দু’ভাই তো বাজারে যাব,’ পান্নুভাই টুকুর পানে জিজ্ঞাসু তাকান, ‘দেখি কোথায় যাই, দু’ঘন্টায় যতদূর ঘোরা যায় ঘুরব, তারপর সুবিধে বুঝে কোথাও…’ টুকুর কথা শেষ হবার আগেই পান্নু ভাই ব্যগ্রভাবে বলেন, ‘আমার মনে হয়, আপনার বেশিদূর কোথাও যাওয়া ঠিক হবে না। আমার ব্যক্তিগত আশঙ্কা, শহরের হালচাল বোধহয় আপনাদের লাগামছাড়া চলাফেরার উপযোগী নেই আর।’ ‘দেখি, কী হচ্ছে সব, আপনি আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আরে, কাছের মধ্যে এই হাতি সড়কেই তো বটু ভাই, সিকদার ভাইয়ের আন্তানা রয়েছে। হলের দিকে আর যাওয়া ঠিক হবে না বোধহয়,’ টুকু আনমনে বলে। ‘শিমূল তো এখানেই আছো, নইলে মেজ খালা ঠিক কারফিউ ব্রেইক করেই তেড়ে আসবেন এখানে আর আমাকে পালাতে হবে জীবন বিপন্ন করে। ভাল কথা, এটা রেখে দিন,’ বলে পঞ্চাশ টাকার দু’টি নোট টুকুর বুক পকেটে গুঁজে দেন পান্নুভাই।

তিনজনে দশটা বাজতেই সায়েন্স ল্যাবের আবাসিক এলাকার পথে নামলাম। চেনাজানা সবাই ঝোলা, ঝুড়ি আর পরিচারক সমভিব্যহারে বাজারে চলেছেন। গলিপথে গফুর মিয়ার দোকান পর্যন্ত গিয়েই আমি মোড়া টেনে বসলাম, ‘গফুর মিয়া, এই ফর্দ দেখে আলির হেঁসেলের জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখেন, আমরা কাঁচা বাজার ঘুরে আসি।’ গফুর গিয়া কপালে করাঘাত করে বলল, ‘নিউমার্কেট? তালা দেওয়া হুনছি, আর ভিতরে যে কয়জন হুইয়া-বইয়া রইছে দ্যাখবেন, সব আর্মির গুলি খাইয়া মইরা শক্ত অইয়া রইছে।’ পান্নু ভাইয়ের সন্দিহান চেহারা দেখে গফুর আবার বলে, ‘যান স্যার, নিজের চক্ষে দেইখা আহেন গিয়া। তয়, সাবধান।’ সায়েন্স ল্যাবের ক’জন কর্মকর্তার একচেটিয়া পৃষ্ঠপোষকতায় গফুরের ছোট মুদিখানা সম্প্রতি ফুলে-ফেঁপে উঠছে। সোয়া দশ। রাস্তায় রিকশা বিশেষ নেই। ওরাও ভয় পেয়েছে। দ্রুত হেঁটে দু’ভাই নিউমার্কেট পৌঁছে যাই। প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ দু’ধারে। গলির ভেতরে পাড়ার মুদিরা সাহস করে পশরা খুলেছে একটি-দু’টি। নিউমার্কেট কাঁচাবাজারের সামনে জনাবিশেক মানুষের জটলা। আমরা পায়ে-পায়ে এগোই, সাবধানে। গফুর মিয়ার কথা মনে হয়। কোলাপসিবল গেইট ঠিকই তালাবন্ধ। তার ফাঁকে স্পষ্ট দৃশ্যমান সান্ধ্যবাজার শেষে যে দোকানিরা রাতের মতো যার যার ঠাঁইতে কাত হয়েছিল বা বসেছিল জিরোতে হয়তো–সকলেই সেইভাবে বসে, শুয়ে। খোলা মুখের সামনে মাছির ভন্ভন্। বেশি ভেতরে চোখ না চললেও ব্যাপারটা বোঝা গেল। প্রচুর গোলাগুলি চলেছে এখানে, বাইরে-ভেতরে দালানের প্ল্যাস্টার খসে গেছে, সরাসরি গুলির দাগ। ‘চল, চল, আর মোটে ঘন্টাখানেক আমাদের স্বাধীনতার আয়ু,’ পান্নু ভাই বলেন, ‘একটা রিকশা নেই, দেখেছ, যেখানে রিকশাওলাদের বিশাল জটলা দেখা গেছে এ্যাদ্দিন দিনরাতের মধ্যে কমপক্ষে ১৮ ঘন্টা।’ ‘টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাম, ঢাকা শহর মিসমার, কিছু আর নাইরে।’ বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, ওয়ারি, শাখারি বাজার, পিয়ারিদাস রোড…সব শেষ! এরি মধ্যে গুজব, সত্য আর লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্ক ভয়ের মশলা মিলিয়ে ভয়ংকর সব স্টোরি তৈরি করেছে কারা?

পান্নুভাই ইতিউতি তাকিয়ে টেলিগ্রাম কিনে ভাঁজ করে পকেটে ঢোকালেন। বাসস-এর নীলচোখো মাহ্ফুজের সঙ্গে দেখা। কোলাকুলি হল। ‘হাসানের খবর জান?’ মাহফুজের ফিসফিস্ প্রশ্ন। ‘ওতো আমাদের সঙ্গেই ছিল। এই যে, পান্নু ভাইদের আস্তানায়। সকালে বেরিয়েছে। ফিরে এলে বলব তোমার কথা,’ আমি টুকুর কেমন-যেন আত্মীয় এই বন্ধুটিকে আশ্বস্ত করি। ‘জগন্নাথ হল তো গুঁড়িয়ে দিয়েছে, হলে যারা ছিল…।’ ‘আমাদের কার্তিক, রথীন? গুহঠাকুরতা স্যার?’ আমার ব্যাকুল প্রশ্ন। মাহফুজের নীল চোখের মণি স্থির, ‘বোধকরি সব শেষ, গোবিন্দ দেব স্যার, মধুদা সপরিবারে…।’ ‘ইস্‌স,’ শিমূলের মুখ রক্তশূন্য। পান্নু ভাই বলেন, ‘চল, বাসায় ফিরি। চারদিকে মানুষজন কেমন হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছ?’ মাহফুজ রাস্তার দিকে চোখ নাচিয়ে পান্নু ভাইকে বলল, ‘দেখেছেন ব্যাটাদের? গাড়িতে বসে সবগুলো মারণাস্ত্র আমাদের দিকে তাক করে রেখেছে। শুধু ট্রিগার চাপবে আর আমি-আপনি লুটিয়ে পড়ব ধুলোয়, ভাবা যায়?’ ‘এই মুহূর্তে খুব ভাবা যাচ্ছে, কিন্তু আমার পায়ে জোর পাচ্ছি না যে মোটে। আমি অবসন্ন।’ করুণমুখে বলি। পান্নুভাই আমার ডানা ধরে টেনে নিয়ে চলেন প্রায়। এলিফ্যান্ট রোড চৌরাস্তা থেকে আমরা বাঁয়ে ঘুরলাম, গফুরের দোকান থেকে বাজার তুলব। মাহফুজ করমর্দন করে হাতিরপুলের দিকে এগোল। মাহফুজের বাসা হাতির পুলের ঢালে বাঁদিকে মোতালেব কলোনিতে। একটু বাদেই আবার কারফিউ লাগবে।

ঢাকা, ৭/১১/২০০৭

wali@bdcom.net

—-
ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহবুব — এপ্রিল ৭, ২০০৯ @ ৫:৩৬ পূর্বাহ্ন

      এভাবেই বর্তমান প্রজন্মের কাছে চলে আসবে মুক্তির ইতিহাস, জন্মযুদ্ধের ইতিহাস। ধন্যবাদ।

      – মাহবুব

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Raju,Uttara,Dhaka. — জুন ২০, ২০১২ @ ১০:২০ পূর্বাহ্ন

      খুব ভাল লেখা,বেশি করে লিখুন,আমরা জানতে চাই।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com