জীবনের প্রান্তসীমায় মাতৃভাষা দিবসের রূপকার রফিকুল ইসলাম

সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল | ২৫ অক্টোবর ২০১৩ ১০:১১ অপরাহ্ন

dulal_2006.gifআন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার রফিকুল ইসলাম, আমাদের রফিক ভাই এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ভ্যাঙ্কুভার জেনারেল হাসপাতালে আইসিইউতে। দেহের অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় শরীর দুর্বলসহ জ্বর ও বমি হচ্ছে। খেতে পারছেন না, কথা বলতে পারছেন না। পদ্মার ভাঙনের মতো ভেঙ্গে যাচ্ছে জীবনের বন্ধন।

গত বছর সেপ্টেম্বরে চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার দেহে বোনম্যারো প্রতিস্থাপন করলে তার রক্তে কোষ উতৎপাদন প্রক্রিয়া শুরু হয়। ফলে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। কিন্তু, গত মাসে লিউকোমিয়ায় ফের আক্রান্ত হবার পর তার ডাক্তার আবু মুরাদ জানিয়েছেন, রফিকুল ইসলামের জন্য আর কোন চিকিৎসা নেই। তার সারা শরীরে ক্যান্সার মারাত্মক আকার ধারণ করে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে তিনি এখন শঙ্কামুক্ত নন। ফলে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে তাঁর বেঁচে থাকার সময়সীমা।

১ অক্টোবর বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিলো। আমাকে ফোন করে তিনিই দুঃসংবাদটা দিলেন। ডাক্তার আর মাত্র কয়েক মাস সময় দিয়েছেন। আমি একি শুনছি! কোনো কথা বলতে পারছি না। ও প্রান্ত থেকে রফিক ভাই আমাকে উল্টো শান্তনা দিয়ে ভেজা কন্ঠে বলেনঃ ‘দুলাল ভাই, মন খারাপ করবেন না। আমি ১৯৭১ সালে মরে যেতে পারতাম। আমার ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। আমি ৪২ বছর সুন্দর পৃথিবীটা উপভোগ করলাম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখলাম’।

আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! মানুষ মরণশীল। তবে দৃশ্যমান মৃত্যু আর অদৃশ্য মৃত্যুর ভেতর অনেক তফাৎ। ভাবতে ভাবতে ফিরে গেলাম অনেক পেছনে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল তিতাশ চৌধুরী একদিন বলেন, ‘তুমি কানাডায় থাকো। আমার ছাত্র রফিকের সাথে তোমার পরিচয় নেই?’

আমি তখন টরন্টো থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারের সম্পাদক। একুশের সংখ্যার জন্য যোগাযোগ করলাম। সারা দিলেন রফিক ভাই। তারপর থেকে তিনি সহোদর ভাইয়ের চেয়ে আপন হয়ে উঠলেন। তাঁর মুখে মধু। যিনি ভাষার জন্য কাজ করেছেন, সত্যি তাঁর মুখের ভাষায় এতো অমৃত! এতো মমতা দিয়ে ‘আমার’ শব্দটি ব্যবহার করতেন, যা আমি আর কারো সাথে তুলনা করতে পারি না। কি যে মায়া জড়ানো, মমতা মাখানো মধুর কন্ঠে বলতেন, ‘আমার ভাইটি কেমন আছে? আমার ভাবী কেমন আছেন? আমার মামনিরা কেমন আছে’!
lang-1.gif
তাঁর সাথে আমার অনেক স্মৃতি। তাঁর দু’টি দীর্ঘ সাক্ষাতকার নিয়েছি। একটি ছাপা হয়েছিলো ২০০৭ সালে সাপ্তাহিক বাংলা রিপোর্টারে, অন্যটি ২০১১ সালের দৈনিক কালের কন্ঠের একুশের সংখ্যায়। ভাষা বিষয়ক তিনি দু’টি লেখা লিখেছেন। একটি ছাপা হয়েছে ইত্তেফাকের সাময়িকীতে। আর একটি এখনো অপ্রকাশিত আমার কাছে সংরক্ষিত আবস্থায় আছে। কথা ছিলো তিনি ভাষা বিষয়ক আরো কিছু গদ্য লিখবেন, আত্মজীবনী লিখবেন। আমি বই বের করবো। আমরা কাজও শুরু করেছিলাম। কিন্তু তা আর শেষ হলো না।

গত বছর রফিক ভাই আর বুলা ভাবী টরন্টোতে এসেছিলেন। কোনো ভীড়বাট্টায় নয়। আমি, অপি আর আমাদের বড় মেয়ে পিয়ারসন এয়ারপোর্টে নিরিবিলি দু’ঘন্টা সুন্দর সময় কাটিয়েছি। লাঞ্চ করেছি। ছবি তুলেছি। যা আমার জীবনের মূল্যবান স্মৃতি।

তিনি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য দ্রুত, খুবই দ্রুত চলে যাচ্ছেন। মৃত্যুর পথযাত্রী রফিক ভাইয়ের কথা এখন আর স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারি না। কি বলবো? এইতো গতকাল বুলা ভাবীকে ফোন দিলাম। তখন তাঁকে সিসিইউ থেকে বেডে আনা হয়েছে। আমার কথা শুনেই ফোনটা চেয়ে নিয়ে সেই আবেগ জড়ানো ক্ষীণ কন্ঠে বললেন, ‘আমার ভাইটি কেমন আছে? আমার ভাবী কেমন আছেন? আমার মামনিরা কেমন আছে! আমার জন্য দোয়া করবেন। আমরা আর দেশে যাওয়া হলো না। দেশবাসীকে আমার কথা জানিয়ে দিবেন’…
lang-2.gif
আমাদের ছোটবোন শাহানা আখতার মহুয়া প্রতিদিন রফিক ভাইয়ের খবর দেয়। ফেইসবুকে তার পাঠানো সর্বশেষ মেসেজ পেয়ে লিখলাম, মহুয়ার গন্ধে মন মাতাল হয়, আনন্দে ভরে যায় হৃদয়। আর এই শাহানা আখতার মহুয়ার কথা–মন ভিজে যায় বেদনায়, চোখ জিভে যায় কষ্টে। আমি ভ্যাঙ্কুভারে যেতে চেয়েছিলাম- আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের রূপকার জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা রফিকুল ইসলামকে দেখার জন্য। যাওয়া হলো না। গত বছর নিউইয়র্কে ক্যান্সারে আক্রান্ত হুমায়ূন আহমদকে একইভাবে দেখে এসেছিলাম। আর ক্যান্সারে আক্রান্ত রফিক ভাইকে এবার দেখি মহুয়ার চোখ দিয়ে। মহুয়া লিখছেঃ

“রফিক ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম আজ। দুপুরেও খবর নিয়েছি বুলি আপার কাছে। কিন্তু বিকেলে আর মন মানলো না কিছুতেই, ভাবলাম অন্তত দরজার এপাশ থেকে দেখে আসব। আমরা যখন যাই, তিনি বসে ছিলেন তখন। পরিস্কার গাউন, গ্লাভস আর মাস্ক পরে সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই চিনতে পারলেন। জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছি।

ব্লাড স্যুগার নেমে তখন ৩.৮। WCB বেড়ে গিয়েছে, গতকাল ছিল ৩৭ আর আজ ৬০।

চোখ মেলতে পারছেন না। খুব দুর্বল। একেবারেই কিছুই খেতে পারছেন না । নার্স চেষ্টা করছিল অরেঞ্জ জ্যুস খাইয়ে ব্লাড স্যুগার বাড়াতে। শুয়ে পড়লেন কয়েক মিনিট বাদেই। শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল বলে অক্সিজেন দেয়া হয়েছে। তবুও হাসিমুখ, কথা বলার ব্যাকুলতা। কেবল আমরা নির্বাক। যখন বেরিয়ে আসছি,কম্বলের ওপর দিয়ে হাত ছোঁয়ালাম তাঁর পায়ে। গভীর মমতা নিয়ে তিনি সেই আগের মতোই বললেন- ‘মহুয়া, বোনটা আমার, লক্ষ্মী আপু আমার, ভাল থেকো তোমরা। পৃথিবীটা খুব সুন্দর, একে আরো সুন্দর করার জন্য চেষ্টা করো। হয়তো আর দেখা হবে না। ভাল থেকো সবাইকে নিয়ে। আমরা বাঙালি, আমাদের চোখে জল আসে সহজেই।
lang-3.gif
মাস্কের আড়ালে কান্না লুকিয়ে বের হ’য়ে এলাম তাঁকে ছেড়ে। গাড়িতে উঠে নিজেকে আর ধরে রাখার ক্ষমতা থাকল না। চোখ ভিজে গেলো জলে।

আমরা বার বার ‘জীবিত রফিক’ ভাইকে নিয়ে আলোচনা করছি ‘মৃত রফিক’ ভাইয়ের বিষয়ে। তাঁর লাশ কিভাবে দেশে পাঠানো হবে? সেজন্য দূতাবাসের বন্ধুবর হাই কমিশনার কামরুল আহসানকে জানালাম। তাঁকে যাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে দাফন করা হয়, সেজন্য যোগাযোগ করলেন প্রধানমন্ত্রির মিডিয়ার দায়িত্বে থাকা মাহবুবুল হক শাকিলের সঙ্গে।

যে কোনো মুহুর্তে ভ্যাঙ্কুভার থেকে সেই দুঃসংবাদটা ভেসে আসবে। অপেক্ষা করছি, এরই মধ্যে চোখে পড়লো রিটনের লেখা। ‘ভাষাশহিদ রফিকের মেধাবী উত্তরসুরী অদ্বিতীয় দ্বিতীয় রফিক’। রিটনের লেখার সাথে যুক্ত করতে চাই, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিশেবে প্রতিষ্ঠার জন্যে ১৯৫২ সালে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন সালাম-রফিক। সালাম-রফিক-জব্বার-বরকতদের রক্তের গৌরবে অভিষিক্ত আমাদের গর্বিত বর্ণমালা।…

এতো বছর পর কাকতালীয়ভাবে ভ্যাঙ্কুভারের ভাষা সৈনিক আরেক রফিক, আরেক সালাম সেই ধারাবাহিকতায় মাতৃভাষার মর্যাদায় বিশ্ববাসীর জন্য এনে দিলেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

প্রিয় রফিক ভাই, আর মন খারাপ করছি না। আপনি তো বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় মানুষ। আপনি তো আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আপনি তো অমর। আপনার মৃত্যু নেই। পৃথিবীতে যতদিন ভাষা থাকবে, সেই ভাষার অস্তিত্বের ভেতর আপনিও ততদিন বেঁচে থাকবেন।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন subrata paul — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ১:২৮ পূর্বাহ্ন

      হে বিজয়ী বীর মুক্তি সেনা তোমার এই ঋণ কোনো দিন
      শোধ হবে না ।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Lovely Yasmin — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ৩:৩৪ পূর্বাহ্ন

      Ki bolbo vasa nai. Banglar akash theke arekti nokkhotrer Biday….! Allah imaner sathe unake boron kore nik. Ontoto ei bachar namer lorai theke mukto hok arekti bir . Ei jati sommanito koruk take . tar obodan jati kritoggotar sathe shoron korok chiro kaal. Allah Tomi rahmoter malik Onar attar shanti daw.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Shahin — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ১২:৩০ অপরাহ্ন

      মন খারাপ হয়ে গেল ভাই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন asraf — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ১:৩১ অপরাহ্ন

      প্রিয় রফিক ভাই, আর মন খারাপ করছি না। আপনি তো বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয় মানুষ। আপনি তো আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। আপনি তো অমর। আপনার মৃত্যু নেই। পৃথিবীতে যতদিন ভাষা থাকবে, সেই ভাষার অস্তিত্বের ভেতর আপনিও ততদিন বেঁচে থাকবেন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন TITO — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ৪:৫৩ অপরাহ্ন

      আমরা আমাদের প্রিয় রফিক ভাইয়ের জন্য দোয়া করি। তিনি এবং সালাম ভাই আমাদের দেশের জন্য যা করেছেন তার ঋণ কোনো দিন শোধ করা যাবে না । আমরা প্রতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি বিভিন্ন দেশের জাতীয় পতাকা নিয়ে টি.এস.সি থেকে শুরু করে শহীদ মিনার হয়ে আন্তর্জাতিক ভাষা ইন্সস্টিটিউট পর্যন্ত ‌র‌্যালি করা হয়।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ — অক্টোবর ২৮, ২০১৩ @ ৭:১৭ অপরাহ্ন

      রফিক ভাই’র জন্য দোয়া করি। ২১ ফেব্রুয়ারী-কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান মনে রাখার মতো।–আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ,চুয়াডাঙ্গা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ — অক্টোবর ২৮, ২০১৩ @ ৭:১৯ অপরাহ্ন

      আর এ তথ্য সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার জন্য দুলাল ভাই’কে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Alfaz Sarkar — অক্টোবর ২৯, ২০১৩ @ ৯:৩৭ অপরাহ্ন

      Lekha ta pore mon kharap hoe gelo.
      Mon kharap kora lekha ta ato abegi, ato bedonar.
      Ki likhbo vasa khuje pacchi na.
      Saifullah Mahmud dulal, Apni amon akti lekha amader poralen, ta shudhu kosto dilo.
      Tbuo onek kichu jante parlam.
      Susthota kamona kori.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com