বনলতা সেন : আলোর শরীরী রূপ

জাহিদ হায়দার | ২২ অক্টোবর ২০১৩ ১২:৩৩ অপরাহ্ন

‘পথ’ হারানো এক বিপন্ন মানুষের, যে-মানুষ সব মানুষের প্রতিনিধি, গল্প শেষ হলে আর কোনো কথা ‘বনলতা সেন’ সম্পর্কে আমরা বলতে পারতাম না। প্রথম বাক্যের ‘শেষ’ শব্দটি নিরন্তর যত বিভ্রান্তি জাগায়, শুরু তার কাছে বিবিধ প্রশ্ন তোলে। কথা বলা ও অক্ষর লেখা জীবের আনন্দ আর কষ্ট-শ্রম, সব কাজকে ঋদ্ধ করে না, যে-সব কাজ, আলাপ, কথা, প্রতর্ক, সম্পন্নতা অর্জন করে, শ্রী অর্থে, তার মধ্যে এক স্থিতি খুঁজে ফেরার চেষ্টা আমাদের মধ্যে চলতেই থাকে।

পৃথিবীতে যখন পদচিহ্ন পড়েনি তখন পুরো পৃথিবীই এক বর্তুলাকার পথ। যেন বৃত্ত ছাড়া আর কোনো সত্য, সত্য নয়। মানুষ-পশু অন্য পশুদের থেকে আলাদা হবার বুদ্ধি অর্জন করতেই, ফেলে যাওয়া নিজের পদচিহ্ন দেখে দেখে পূর্ব আশ্রয়স্থানে, হয়তো গাছের ডালে, ফিরে এসেই বুঝে গিয়েছিল ঐ পায়ের চিহ্ন ধরে আবার গেলে তৃষ্ণা মেটাবার নদী পাওয়া যাবে, করা যাবে হরিণ শিকার অথবা দেখা যাবে সূর্যোদয়ের দিগন্ত। চলা বন্ধ করলেই অন্ধকার। অতএব হাঁটো, পেয়েছিলে দূরতম অতীতে একবার, ‘হাজার বছর ধরে’ শুধু হাঁটো, যদি পাও কোনো আলো, কোনো সত্য দ্যুতি, আলোর কোনো মুখ।

২.
বরিশালের মোটা লাল চালের ভাত খাওয়া থলথলে শরীরের মোটা এক মানুষ, গায়ের রং কালো, বড় বড় ড্যাবড্যাবে, কিছু একটা হারিয়ে ফেলা আহত চোখ, থ্যাবরা নাক, কপালটা বড়, আমরা জেনেছি, তিনি কোলকাতার রাস্তায় রাত্রিতে হাঁটতেন, রাতের টহল পুলিশ তাঁকে দু’একবার সন্দেহও করেছে, ‘হাইড্রান্ট’ খুলে ‘কুষ্ঠরোগী’র জল খাওয়া দেখেছেন, হয়তো কথা বলতেন নক্ষত্রের সঙ্গে, যা কবি না হয়েও সব মানুষই কমবেশি করে থাকে; তিনি বুঝেছিলেন, জাগরণের ক্লান্তি, জাগরণেই সব দ্বন্দ্ব নিহিত, তীব্র কষ্ট সইতে পারছে না বলে ‘প্রতিবাদ’ না করা অশ্বত্থের শাখায় চির ঘুমকে ‘শান্তি’র বিকল্প ভেবে একজন মানুষ কেন ঝুলে পড়ে। বেঁচে থাকা তাঁকে কোনো আনন্দ দিয়েছে বলে আমার জানা নেই, আমরা তাঁকে আমাদের ভাষার এক মহৎ কবি হিসাবে পেয়েছি, মানুষটির নাম জীবনানন্দ দাশ। তাঁর সব যাপনক্ষরণ আমাদের মধ্যে নদীধর্মে ছেড়ে দিয়ে বলে গেছেন, মানুষের বিপন্নতার গল্প, কোনো এক কালে পাওয়া ‘শান্তি’ নামের মিথের গল্প।

৩.
‘বনলতা সেন’ পড়েছি ১০০ বারের বেশি। গতমাসে ‘পড়া’ হয়ে গেল এ সম্পর্কিত অধ্যয়ন। এক ধ্যানবোধ আমার চিন্তাচেতনায় অন্য কথা বলে গেল। মনে হলো, আমি কেন বনলতা সেনকে আমার গরিবী ভাবনায় ফেলে শুধু রক্ত মাংশের একজন নারী ভেবেছি? কেন ভেবেছি, একজন প্রেমিকের শেষ শান্তি-আশ্রয় হবে প্রেমিকার মুখোমুখি বসা? জীবনানন্দ দাশ শরীরী বনলতা সেনের আধারে শান্তিপূর্ণ আলোর প্রতিমা গড়েননি তো? মানুষের যুদ্ধ কি? অন্ধকারকে দূর করে আলোর আশ্রয়ে যাওয়া নয় কি? এই কবিতায় ‘অন্ধকার’ শব্দটি ৫-বার ব্যবহার করেও জীবনানন্দ অতৃপ্ত ছিলেন। ‘নিশীথ’, ‘ধূসর’, ‘বিদর্ভ (মধ্যপ্রদেশ অঞ্চলের প্রাচীন দেশ)’, ‘হাল ভেঙে’,‘হারিয়েছে’ ‘সন্ধ্যা’, ‘নিভে গেল’, ‘ফুরায়’ এইসব শব্দচিত্রে বিরাজে কত অন্ধকার! যার মুখোমুখি হয়ে একবার আমি-র মধ্যে জেগে থাকা একজন মানুষ ‘শান্তি’ পেয়েছিলো এবং আবার পেতে চায়। কাল নির্ধারক ‘হাঁটিতেছি’, ‘ঘুরেছি’, ‘ছিলাম’-এর পর ‘দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিল’ শ্রাবস্তীর কারুকার্য চিত্রিত মুখের এক নারী। অতীত ও বর্তমানের মিথোজীবিতার মধ্যে মানুষের নিরন্তর চলার এক গল্প, যা শান্তি না-পাওয়া মানুষকে পরম আলোর জন্যে ক্রমাগত অন্বেষণে ব্যস্ত রাখে। মানুষ মূলত অন্ধকারের জাতক, কিন্তু তার উদয়াস্ত শ্রম আলোর অন্বেষণে নিবেদিত। এখন আমার মনে হয়, বনলতা সেন আলোশরীরের এক রূপ, এক মানবিক নীল আলো, রক্ত মাংশের কোনো শরীর নয়, নারী নয়, শুধু আলো, যার ‘মুখোমুখি বসিবার’ জন্যে সব মানুষের প্রতিনিধি একজন মানুষ হাজার হাজার মাইল পথ শুধু হাঁটবে।

৪.
জীবনানন্দের একই কবিতায় নেগেটিভ ও পজিটিভ চিত্রের চড়াইউৎরাই প্রকৃতির সত্যচর্যাকে চিহ্নিত করে। ঐ চিহ্নপ্রকল্পে মানুষের বা অন্যসব প্রাণের অস্তিত্বের যুদ্ধ বারবার ব্যর্থ হয়। ‘আট বছর আগের একদিন’ বা ‘বনলতা সেন’ কবিতা দুটির সাক্ষ্য নিয়ে আমার এই বীক্ষণ বোঝার চেষ্টা কেউ করতে পারেন। স্বপ্নচাষী অসহায় মানুষের কর্ম-নিয়তি হচ্ছে আলোর জন্যে শুধু অন্ধকার খুঁড়ে যাওয়া। আমাদের কবি সেই কথাই বলেছেন নিজস্ব কাব্যভাষায়।

বনলতা সেন কবিতার মধ্যে নেগেটিভ ছবির সমবায় যত আছে, পজিটিভ অ্যাক্ট তুলনায় খুবই কম। ‘জীবনের সমুদ্র সফেন’ ‘সবুজ ঘাসের দেশ’,‘দারুচিনি-দ্বীপ’ ‘জোনাকির রঙে ঝিলমিল’- এইসব পজিটিভ মোটিফের তুলনায় অন্ধকারের অনুভবযোগ্য তরঙ্গ বেশি। আমি সে-সব উল্লেখ করেছি। যে-কণ্ঠস্বরটি ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ প্রশ্ন করে তাকে অন্য কোথাও নয়, দেখা গেছে অন্ধকারে। রবীন্দ্র্রনাথ যে-ভাবে বলেন : ‘ অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো’ অর্থাৎ আশ্রয়, ঐ প্রশ্ন বা স্বর দিশা হারানো নাবিকের আলো-আশ্রম।

৫.
পৃথিবীর শ্রেষ্ট কবিতাগুলি মাঝে মাঝে আমি শেষ পঙক্তি থেকে পড়া শুরু করে প্রথম পঙক্তিতে যাই। এবং ‘জলের ঘূর্ণির মত’ আমি ঘুরতে থাকি পঠিত কবিতার শব্দ ও গল্প-আধারে। এ আমার ব্যক্তিগত খেলা। অনেকবার ‘বনলতা সেন’ কবিতাটি শেষ পঙক্তি ‘থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’ থেকে পড়া শুরু করে ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে’ পড়া শেষ করতেই ‘থ্যাতা ইঁদুরের মতো রক্ত মাখা’ চিন্তা-গহ্বরে পড়ে যাই, ঘুরতে থাকি, নিরন্তর অন্বেষণের দাস হয়ে যাই, খুঁজি এক আলো-প্রতিমা, যার নাম কোনো এক সময় রাখা হয়েছিল বনলতা সেন।
০৫ কার্তিক, ১৪২০। ঢাকা।

পুনশ্চ : রবীন্দ্রনাথের কিছু গান ও জীবনানন্দের কিছু কবিতা বয়স ৩০ না হলে শোনা বা পড়া উচিৎ নয়। আমি ক’জনকে জানি যারা ৩০ বছর বয়সের আগেই বরীন্দ্রনাথ ও জীবনানন্দ কিছু পড়েই ‘প্রগাঢ়’ লেন্সের চশমা এখন পরে এবং চোখে মেঘভাব তুলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের দেখে কেবল কষ্ট হয়।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তানসেন — অক্টোবর ২৩, ২০১৩ @ ৮:৫৬ অপরাহ্ন

      ভালো লাগলো । সেই ‘আলো’ টা কি? জীবনমুখি অতৃপ্তি ?

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tajminur Rahman — অক্টোবর ২৫, ২০১৩ @ ৭:০৭ অপরাহ্ন

      জীবনান্দ কেন যে নাটোর গেলেন বুঝতে পারলাম না!

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tajminur Rahman — অক্টোবর ২৫, ২০১৩ @ ৭:১৪ অপরাহ্ন

      জীবনান্দ যদি বরিশাল থেকে নাটোর না যেতেন তাহলে “বনলতা সেন” আবিস্কৃত হত না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন maniryousuf — অক্টোবর ২৬, ২০১৩ @ ১২:১৫ অপরাহ্ন

      অনেক ভাল লাগল লেখাটা। এভাবে চিন্তার বাঁক বদল হয়। জাহিদ হায়দারকে অনেক ধন্যবাদ ভাল লেখা উপহার দেওয়ার জন্য।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ — অক্টোবর ২৮, ২০১৩ @ ৭:০৮ অপরাহ্ন

      অনেক ভাল লাগলো।লেখক অতি যত্ন সহকারে বিশ্লেষনের চেষ্টা করেছেন এবং সফল বলে আমি মনে করি।ধন্যবাদ লেখক’কে।—-আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ,চুয়াডাঙ্গা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Ratan Dey — এপ্রিল ১৮, ২০১৪ @ ১১:২১ অপরাহ্ন

      বিশ্লেষণ ভালো লেগেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com