বইয়ের আলোচনা

মিনার মনসুরের ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’

sams_arefin | 13 Oct , 2013  

গ্রীষ্ম যেমন উপস্থিত হয় রুদ্রমূর্তি নিয়ে, তেমনি কবিতার বিদ্রোহ উপস্থিত হয় সমাজের অসংগ্লনতা, অনাচার ও দুর্নীতি ইত্যাদি রুখবার প্রত্যয়ে। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তাই বলেছিলেন, ‘রাজনীতিহীন সাহিত্যচর্চা কপটতা ছাড়া আর কি?’ কেননা রাজনীতি একটি কবির আদর্শের মাপকাঠি। সামাজিক দায়বদ্ধতা কখনো কবি এড়িয়ে যেতে পারেন না। কবির কবিতা হবে সমাজ, সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। কবিতা যেমন হতাশের বুকে আশা জাগাবে, তেমনি দুর্নীতিবাজদেরকে চপেটাঘাতে করবে। এ বাস্তবতাই যদি কবিতায় না থাকল, তবে কবিতার সততা কতটুকুন টিকল। সত্তরের রাজনীতিসচেতন, নিভৃতচারী কবি হিসেবে খ্যাত মিনার মনসুর। ১৯৮৩ সালে তার কবিতার বই ‘এই অবরুদ্ধ মানচিত্রে’ বাজেয়াপ্ত হয়। ‘কবিতাসংগ্রহ’ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। তারপর আর কবিতার অলিগলিতে কবিকে খুব একটা দেখা যায়নি। প্রায় একযুগের দীর্ঘ বিরতির পর প্রকাশিত হল ‘মা এখন থেমে যাওয়া নদী’। শিরোনাম শুনেই মনে হবে, এ যেন নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত কোন কবিতার বই। কিন্তু কিছুদুর পাঠ করলে কবিতার উপমা, রুপক, চিত্রকল্প, রুপকল্প, শব্দের ঝংকার, শব্দের সাথে শব্দের অসাধারণ শৈল্পিক বিয়ে দেখে; যে কোন পাঠক সহজেই মুগ্ধ হবেন।

রাজনৈতিকভাবে অসচেতন বলে আমাদের আবেগ নিয়ে হোলিখেলা হয়। এ বাস্তবতা কবির চোখকে এড়ায়নি। তিনি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ দেখে আতংকিত। আর তাই বলেন, ‘কলেজপড়ুয়া ছেলে শেয়াল তাড়াতে গিয়ে নিজেই এখন মরে পড়ে আছে শেয়াল-কুকুরের মতো।’ পুলিশি নির্যাতেন পর্যদুস্ত বর্তমান নাগরিক সমাজ। এসবও তাঁর চোখ এড়ায় না। আর তাই তিনি বলেন, ‘বুনো মহিষের মতো ধেয়ে আসে রাইফেলের বাট’Ñ যেমন বুনো মহিষের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলে মৃত্যু অনিবার্য, তেমনি বুনো পুলিশের অস্ত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকাতে, বর্তমানে এত ক্রস ফায়ার। শুধু তাই নয়, স্মৃতিরা যেন তাঁর সঙ্গ ছাড়তে চায় না; নস্টালজিয়ায় মন যেন ডুবে থাকে কবির। এ কারণে ‘অশরীরী ঈগলের ছায়া’ কবিতায় তিনি বলেন, ‘আমাদের নাম ধরে ডাকে পেছনের ফেলে আসা পথ…../যুগল স্বপ্নের কিছু হাড়গোড় আর সাইবেরিয়ার হংসের মতন/ ধবধবে শাদা সেইসব প্রতিশ্রুতির ফসিল’ এই যে শব্দের ঝংকার ‘প্রতিশ্রুতির ফসিল’ তা হৃদয় না ছুঁয়ে পারে না। বা একে Allusion বললে ভুল হবে না। কারণ এখানে কবি পরোক্ষ উল্লেখের মাধ্যমে বাস্তবতাকে তীর্যক করে তুলেছেন। এভাবেই কবি যখন বলেন, ‘মহাপরাক্রান্ত পতাকা, সমুদ্রের সম্মোহন, শীতের তীক্ষè দাঁত, প্রিয়তম দশকেরা , ধুলোর চাবুক, বাঁধভাঙা প্রাণের প্লাবণ, রূপসী রাজনীতি, বর্ষণের তীক্ষè শর, বাচলতার বীজ’, তখন তাঁকে সত্তরের আবুল হাসান বলতে প্রলুব্ধ হই। কবি এ বইয়ে পাঠককে ভিজিয়ে দিয়েছেন যেন উপমার বৃষ্টিতে। তিনি যখন বলেন, ‘অন্ধকার অক্টোপাশের মতো নৃত্য করে তাকে ঘিরে।’ বা ‘কে হায় মূর্খের মতো জড়ো করে স্মৃতি সোনার শো-কেসে’, বা ‘কোথাও বৃক্ষের ডালে কিংবা বিদ্যুতের তারে মৃত হলুদ ব্যাঙের মতো ঝুলে আছে এক কিশোরী পুতুল’ বা ‘চোখ যার মৃত ইলিশের মতো’ বা ‘বৃটিশ রাজত্বের মতো সেখানেও সূর্য অস্ত যেত না কখনই’ বা ‘রৌদ্রদগ্ধ দিনে বটবৃক্ষের মতো তারা ছায়া দিত তাকে’ বা ‘তাতার দস্যুর মতো ধেয়ে আসে ধুলোর মিছিল’ বা ‘সেই ঘ্রাণ অভিজ্ঞ চিতার মতো সন্তপর্ণে এগিয়ে আসে আমার দিকে’ তখন পাঠক বুঝতে পারে উপমা কীভাবে কবিতা হয়? উপমা কেমন করে ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের প্রতিটি কোণ। কীভাবে প্রমাণ করা যায়, একটি সাবলীল উপমা একটি কবিতার প্রাণ? আর জীবনানন্দ তো যথার্থই বলেছেন, ‘উপমাই কবিতা’।
নারী সকল কবিতায় কম বেশি গুরুত্ব পাবার বিষয়। পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্যের আধার এই নারী। তাই তার হাতে হৃদয় দিয়ে কবিতা লেখাই কবির স্বভাব। এ ক্ষেত্রে মিনার মনসুরও ব্যতিক্রম নন। তাঁর কবিতায় আমরা কখনো নারীকে দেখি সুবিধাবাদী পিংকিরুপে। যাকে কবি চিত্রায়িত করেন এভাবে, ‘পিংকিরা চলিয়া যায় বারংবার কবিকে মথিত করে’। আবার কখনো সেই নারীর রূপেই কবি মুগ্ধ হন। মৃত্যুর চেয়ে নারীর সৌন্দর্যের দাপটে তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেন, ‘মৃত্যুর দাপট কে বলে অধিক নারীর বক্ষের চেয়ে?’। এই যে নতুন যুক্তি দাঁড় করিয়ে পাঠককে ভাবিয়ে তোলা, তা কেবল মিনার মনসুরের পক্ষেই সম্ভব। একজন কবি যে শুধু চিত্রাতীত বাস্তবতা তুলে ধরে উপমানির্ভর হন, তা সবসময় সত্য নাও হতে পারে। বরং কবিতার আকাশ তার ব্যতিক্রম হতেও পারে।
নারীও যে ফুলের মতো ফুটতে পারে, তা কবি ছাড়া আর কে ভাবতে পারে? তাই কবি যখন বলেন, ‘এই যে অপরুপ নারীফুল ফুটিয়াছেÑ তাহার সৌরভে মোহিত চারিদিক’ তখন সহজেই বোঝা যায় সুন্দরীর সৌন্দর্যে যেমন চারদিক মোহিত হয়ে থাকে, তেমন ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে থাকে চারদিক। তাই কবি এদিক থেকে ফুল ও নারীকে এক করে দেখেছেন, যা কবির মতোই পাঠকও ভাবতে ভালোবাসে। একজন কবির সার্থকতা এই যে, তিনি পাঠকের নতুন ভালো লাগার বিষয় তৈরি করবেন। সৃষ্টি করবেন এমন কিছু শব্দ, যা হৃদয়কে ভিন্নভাবে নাড়া দেয়। মন ছুঁয়ে যাওয়ার তো অনেক মাধ্যম আছে, তবে তার মাঝে কবির মন ছোঁয়ার ভাষা হবে ব্যতিক্রম। তাই নারীর প্রতি অনুভূতি প্রকাশে তিনি যখন বলেন, ‘কলসি ভরাই ছিল তবু বুকে তৃষ্ণার তুফান’ বা ‘নারীর নিতম্বের ঢেউ কিংবা চোখের বিদ্যুৎ’ বা ‘অনিচ্ছুক শাড়ি দিয়ে ঢেকে দিতে চায় প্রমত্ত বুকের উচ্ছ্বাস’ তখন বাঙালি নারীর সৌন্দর্য উপলব্ধি করতে আমাদের আর কোন কিছু পাঠের প্রয়োজন হয় না। এই ধরনের শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে তিনি অসংখ্য অসাধারণ চিত্রকল্প তৈরি করেছেন নারীকে নিয়ে। শব্দের সাথে শব্দের যে গাঁথুনি দিয়ে চিত্র তৈরি করা হয়, তাকেই যদি বলা হয় চিত্রকল্প, তবে এর চেয়ে সুন্দর চিত্রকল্প নারীকে নিয়ে আর কী হতে পারে! তাঁর প্রতিটি কবিতার পঙক্তিতে আমরা খুঁজে পাই সম্মোহনী চিত্রকল্প। চিত্রকল্পের নায়ক বিখ্যাত কবি এজরা পাউন্ড হয়তো তাঁর এ পথ চলাকে জীবিত থাকলে স্বাগতই জানাতেন। কারণ তিনিই মনে করতেন, ‘Image is the basic unit of poetry’ আর এ বাস্তবতা সত্তরের কবিদের মাঝে নান্দনিকরুপে উপস্থিত মিনার মনসুরের কবিতায়। পাঠককের মনে প্রেম, দ্রোহ ও নারীর প্রতি আকর্ষণের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করে না পাওয়ার বেদনাকে উসকে দেয়।

ফরাসি দার্শনিক দেকার্ত-এর ১৫৯৬-১৬৫০ ‘ডিসকোর্স অন মেথড’-এর মধ্য দিয়ে মূলত সাহিত্যে এর আগমন । এ হচ্ছে এমন এক ধরনের উচ্চারণ, যার একদিকে বক্তা কবি, অন্যদিকে পাঠক বা শ্রোতা। আর এই ডিসকোর্সের বাস্তবতাও আমরা খুঁজে পাই মিনার মনসুরের বইটিতে। যেমন; ‘কতিপয় আদম ব্যাপারী ক্লান্তিহীন ফেরি করে বেহেশতের টিকেট’ বা ‘সকল ক্ষমতা আজ বোমাদের হাতে… তারাই মালিক আজ গণপ্রজাতন্ত্রী এ রাষ্ট্রের।’ বা ‘ছেলেটি কোথায় তাতে কী বা আসে যায়! শুধু মেয়েটি উড়ুক!’। এর ধরনের মনোমুগ্ধকর ডিসকোর্স যে কজন সত্তরের হাতে গোনা কয়েকজন কবির সম্পদ, তাদের মধ্যে মিনার মনসুর অন্যতম। তাঁর এ শক্তি প্রকৃতি থেকে সঞ্চারিত। আবেগের শৈল্পিক প্রকাশ নিজস্ব। কবিতার সম্মোহনী শক্তিতে তিনি সহজেই অভিভূত করেন পাঠককে। তার নিভৃতচারী মনোভাব যেন এ শক্তিকে আরও সীমা অতিক্রম হওয়ার পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আবুল হাসান ও সিকদার আমিনুল হকের অসাধারণ সমন্বয় হলেও তার কাব্যভাষা একটি আলাদা আকাশ বিনির্মাণে সক্ষম হয়েছে। কবির পাঠককে বিমোহিত করার শক্তি অবাক করার মতো। কবিতাপ্রেমী এ বাংলার আবহাওয়া তাকে স্বাগতম জানাবে।

সূত্র:
১ রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ রচনাবলী ১, সাক্ষাৎকার (২), প্রকাশক: মাওলা ব্রাদাস, প্রকাশকাল:২০১২, মূদ্রণ: চতুর্থ
২ Stephen Spender, The struggle of the modern( London; University Paperback,1965)
৩ সাহিত্য-কোষ,কবীর চৌধুরী, প্রকাশক: শিল্পতরু, প্রকাশকাল ২০০৫, মুদ্রণ: তৃতিয়

মা এখন থেমে যাওয়া নদী
মিনার মনসুর
প্রকাশকাল : একুশে বইমেলা ২০১২
মূল্য : ১০০ টাকা
প্রকাশক : শ. ম. গোলাম মাহবুব
সাহিত্য বিলাস, বাংলাবাজার।

Flag Counter


1 Response

  1. yusuf reza says:

    মানুষের পরে আশাবাদি কবি মিনার মনসুর এর এই বই তে হতাশার সুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.